সাহিত্যিক শেখ ফজলল করিমের আজ মৃত্যুদিন

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫

সাহিত্যিক শেখ ফজলল করিমের আজ মৃত্যুদিন। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। ১৮৮২ সালের ৯ এপ্রিল লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা বাজার গ্রামে তার জন্ম।

পিতা আমিরউল্লাহ সরদার এবং মাতা কোকিলা বিবি। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ফজলল করিম দ্বিতীয়। তার পারিবারিক ডাকনাম মোনা। ছোটবেলা থেকেই কবির লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল।

তিন-চার বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে স্কুলে চলে যেতেন। পাঁচ বছর বয়সে কাকিনা স্কুলে ভর্তি হন। প্রায় প্রতি বছরেই বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তিনি পুরস্কৃত হতেন।

ফজলল করিম ১২ বছর বয়সে প্রথম কবিতার বই ‘সরল পদ্য বিকাশ’ হাতে লিখে প্রকাশ করেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে তাকে রংপুর জেলা স্কুলে ভর্তি করা হলে তিনি তা ছেড়ে কাকিনা স্কুলে ফিরে আসেন।

সেখান থেকেই ১৮৯৯ সালে মাইনর পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। এরপর তাকে আবারও রংপুর জেলা স্কুলে দেয়া হলে স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনায় মন বসাতে না পেরে তিনি সেখান থেকে আবারও ফিরে আসেন এবং জ্ঞানার্জনে উৎসাহী হয়ে প্রচুর বই পড়তে থাকেন।

১৩ বছর বয়সে বসিরন নেসা খাতুনের সাথে ফজলল করিমের বিয়ে হয়। এরপর অনেক কারণে তার স্কুল জীবনের ইতি ঘটে। তবে পড়াশোনা, জ্ঞান চর্চা ও সংবাদপত্র পাঠে তিনি অনেক সময় ব্যয় করতেন। এ সময় আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যচিন্তা তাকে গভীরভাবে দোলা দিতে থাকে।

সাহিত্যচর্চার সুবিধার্থে তিনি নানা পত্রপত্রিকা ও পুস্তক সংগ্রহ করতেন। সে সমস্ত সংগ্রহ নিয়ে তিন ১৮৯৬ সালে নিজ বাড়িতেই করিম আহামদিয়া লাইব্রেরি নামের ব্যক্তিগত পাঠাগার তৈরি করেন। এভাবে সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে তিনি অনেক ঠাট্টা উপহাসের শিকার হন। কিন্তু প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কারণে দুর্বার গতিতে চলতে থাকে তার সাহিত্যচর্চা।

সাহিত্যের প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহের কারণে কর্মজীবন ফজলুল করিমকে তেমনভাবে আকর্ষণ করতে পারেনি। ছোটবেলাতেই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আয়ত্ব করেছিলেন যা তিনি কাজে লাগাতেন গ্রামের দরিদ্র মানুষের সেবায়। তিনি বাড়িতে বসেই দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা করতেন।

সাহিত্য সৃষ্টি, প্রকাশনা ও সাধনার প্রতি ফজলল করিমের প্রচণ্ড ইচ্ছা এবং আগ্রহ থেকে তিনি নিজ বাড়িতে আর পীরের নামানুসারে সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস নামের ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

শেখ ফজলল করিমের পরিচিত মূলত কবি হিসেবে হলেও তার জীবনী ও প্রকাশনা অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, তিনি কবিতা ছাড়াও বহু প্রবন্ধ, নাট্যকাব্য, জীবনগ্রন্থ, ইতিহাস, গবেষণামূলক নিবন্ধ, সমাজ গঠনমূলক ও তত্ত্বকথা গল্প, শিশুতোষ সাহিত্য, নীতিকথা চরিত গ্রন্থ এবং অন্যান্য সমালোচনামূলক রচনা লিখেছেন।

পুঁথি সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তার পরিচিত পাওয়া যায়। তার প্রকাশিত অপ্রকাশিত প্রায় ৫৫টি গ্রন্থ রয়েছে। ফজলল করিম রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তৃষ্ণা (১৯০০), পরিত্রাণ কাব্য (১৯০৪),ভগ্নবীণা বা ইসলাম চিত্র (১৯০৪), ভুক্তি পুষ্পাঞ্জলি (১৯১১) অন্যতম। অন্যান্যের মধ্যে উপন্যাস লাইলী-মজনু, শিশুতোষ সাহিত্য হারুন-আর-রশিদের গল্প, নীতিকথা চিন্তার চাষ, ধর্মবিষয়ক পথ ও পাথেয় প্রভৃতি অন্যতম।

এছাড়া প্রচারক, নবনূর, কোহিনূর, বাসনা, মিহির ও সুধাকর, ভারতবর্ষ, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, আরতি, কল্পতরু শিশু সাথী, মোসলেম ভারত মাসিক মোহাম্মদী, বসুমতী ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় শেখ ফজলল করিমের অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ প্রকাশিত হয়। সমকালীন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তার অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে।

গদ্য ও পদ্য উভয় শাখায় তার সমুজ্জল উপস্থিতি। ভাবের গভীরতাকে সরলভাবে উপস্থাপন করা ফজলল করিমের লেখনির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে কাজ করে গেছেন।

শেখ ফজলল করিম রচিত উল্লেখযোগ্য পদ্য হচ্ছে: সরল পদ্য বিকাশ, পরিত্রাণ কাব্য, চিন্তার চাষ, পথ ও পাথেয়, গাঁথা ও ভক্তিপুষ্পাঞ্জলি। জীবনকালেই তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হযন। বাসনা সম্পাদনার সময় রোমিও-জুলিয়েট সম্পর্কিত তার একটি কবিতা পাঠ করে তৎকালীন হিন্দু সাহিত্যিকেরা তাকে বাংলার শেক্সপিয়র আখ্যা দেন।

পথ ও পাথেয় গ্রন্থের জন্য তিনি রৌপ্যপদক লাভ করেন। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে নদীয়া সাহিত্য সভা তাকে সহিত্যবিশারদ উপাধিতে ভূষিত করে। চিন্তার চাষ গ্রন্থের জন্য তিনি নীতিভূষণ, কাশ্মীর শ্রীভারত ধর্ম মহামণ্ডল তাকে রৌপ্যপদকে ভূষিত করে। এছাড়া তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে কাব্য ভূষণ, সাহিত্যরণ, বিদ্যাবিনোদ, কাব্যরত্নাকর, ইত্যাদি উপাধিত ও সম্মানে ভূষিত করে।