মারিয়া সালাম
উদয়ের ভাইরাল গল্প এবং ৪৩২-৪৪০ কম্পাংকের বিতর্ক
মারিয়া সালামপ্রকাশিত : জুলাই ১১, ২০২৬
উদয় রহমানের ভাইরাল এবং এরই মধ্যেই দারুণ জনপ্রিয় গল্পটা পড়েছি প্রায় এক নিঃশ্বাসে। লেখার প্রথম বাক্য থেকে ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত এক ধরনের আচ্ছন্ন করে রাখার বিষয় ছিল। খুব পরিচিত কিছু তত্ত্ব আর হ্যামেলিনের বাঁশিঅলার মতো বহুল প্রচলিত লোককথার উপাদান সামনে এনে একটা গল্প সহজ ভাষায় লিখে সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলা খুব কঠিন কাজ। সেই মুন্সিয়ানা লেখকের একশোতে একশো। গল্পে দাদি আর জ্বিনের আলাপ একটা অশরীরী রহস্য-রোমাঞ্চ তৈরি করেছে।
তত্ত্বগুরু হিসেবে যে বৃদ্ধের চরিত্র উঠে এসেছে, তার ব্যাপারে খুব কৌশলী মন্তব্য হলো—তার কথা বিশ্বাসও করা যাবে না আবার অবিশ্বাসও নয়। এই একটা বাক্য দিয়ে লেখক সুর, সঙ্গীত আর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নিজের বিশ্বাস খুব শক্তভাবে প্রতিষ্ঠাও করেছে, আবার বিশ্বাস করা বা না করা পাঠকের ওপরে ছেড়েও দিয়েছে। এই কৌশল এক কথায় একটা মুন্সিয়ানা।
এই গল্পটাকে গল্প হিসেবে নিলে সুখপাঠ্য। তবে যারা ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব আর সুর নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করেন, তাদের জন্য বড় অস্বস্তি আছে এই গল্পে। আর এ কারণেই সুর নিয়ে গবেষণা করা বৃদ্ধ, যাকে এক কথায় মায়েস্ট্রো বলা চলে, তার মুখে প্রচলিত গালগল্প বসিয়ে দেয়াটা গল্পের মূল ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। সুরের সাধনা করে বাকাবিল্লাহ হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনো জগতে চলে যাওয়ার মতো ক্ষমতাধর বা প্রজ্ঞাবান বৃদ্ধ যখন সুরের কম্পাংক নিয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্য করবেন, সেটা খুবই ক্লিশে শোনাবে। এখানেই আসলে এই গল্প নিয়ে আলাপ করার আগ্রহ হলো।
এই গল্পের মূল কথা, সুরের কম্পাংক নিয়ন্ত্রণ করে মানুষ অনেক অজানা-অদেখা অসম্ভবের দেখা পেতে পারে। মূল বিতর্ক সেটা হলেও খুব দারুণ হতো। কিন্তু সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক গল্পের উপাদান হিসেবে বাণিজ্যিক ৪৪০ আর ৪৩২ কম্পাংকের আলাপ আসা এবং হ্যামেলিনের বাঁশিঅলার ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীকে আচ্ছন্ন করতে ভিন্ন ভিন্ন কম্পাংকের সুর ব্যবহার করার সম্পর্ক খুবই দূরবর্তী।
এবার আসল কথায় আসি, গল্পের মায়েস্ট্রো বৃদ্ধ বলছেন, বিশ্বব্যাপী মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির মাথারা ৪৩২ কম্পাংক থেকে সরে ৪৪০ কম্পাংকে আসলেন মানুষকে অস্থির করতে, যুদ্ধবাজ করতে, নাজিদের ষড়যন্ত্রকে সফল করতে। কথাটা খুব ক্লিশে এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবর্জিত। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, ৪৪০ কম্পাংককে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই। তবে সেটা নাজি প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস মানুষের মধ্যে ভয়, আগ্রাসন ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করতে বা জনগণের মধ্যে যুদ্ধমুখী মানসিকতা তৈরি করতে বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তার কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সত্যটা হলো, ৪৪০ কম্পাংক নির্ধারণের আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে হয় ১৯৩৯ সালে। পরে ১৯৫৫ সালে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা ISO তা পুনরায় নিশ্চিত করে। সে সময় সঙ্গীতের পিচ বা স্বরের উচ্চতা এলাকা, বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা, স্থানীয় গির্জা বা অর্গানের ওপর নির্ভর করে একেক জায়গায় একেক রকম ছিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ‘পিচ ইনফ্লেশন’ নামে একটা প্রবণতা দেখা যায়। অর্কেস্ট্রা ও একক শিল্পীরা ক্রমে বাদ্যযন্ত্রের স্বর আরও উঁচুতে টিউন করতে থাকেন। কারণ তীক্ষ্ণ আর উচ্চশব্দ বড় কনসার্ট হলে বেশি স্পষ্ট শোনা যেত।
কিন্তু এই উচ্চ মাত্রার কম্পাংক গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে থাকে। কারণ এক স্থানের টিউনিং অন্য স্থানের সঙ্গে মিলত না। ফলে বিশ্বব্যাপী সঙ্গীত ও রেডিও সম্প্রচারে শৃঙ্খলা আনার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখান থেকেই ৪৪০ হার্টজকে আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কারণ এটা আগে ব্যবহৃত নানা পিচের মাঝামাঝি একটা গ্রহণযোগ্য মান ছিল, এবং রেডিও সম্প্রচার প্রযুক্তি ও প্রাথমিক ধ্বনিবিজ্ঞান পরীক্ষার জন্য উপযোগী ছিল। এখনও অনেক অর্কেস্ট্রা সব সময় ঠিক ৪৪০ হার্টজ ব্যবহার করে না। কিছু সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও শিল্পী আরও তীক্ষ্ণ শব্দ পেতে ৪৪২ বা ৪৪৪ কম্পাংক ব্যবহার করেন।
এখন বিষয় হচ্ছে, ৪৪০ আর ৪৩২ কম্পাংকের মধ্যে আসলেই কি অনেক বেশি তারতম্য বা আসলেই কি এসবের প্রভাব খুবই উল্লেখযোগ্য? কিছু সঙ্গীতশিল্পী ও তত্ত্ববিদ মনে করেন, ৪৩২ হার্টজে টিউন করা সঙ্গীত শরীরকে বেশি শান্ত করে, হৃদস্পন্দন কমায় এবং মনোযোগ বাড়ায়। আগে এই দাবির শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব কম ছিল, তাই গবেষকরা একটা ছোট আকারের পরীক্ষামূলক গবেষণা করেন। গবেষণায় ইতালির ৩৩ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। তারা দুই ভিন্ন দিনে একই চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাক ২০ মিনিট করে শোনেন—একদিন ৪৪০ টিউনিংয়ে, অন্যদিন ৪৩২ টিউনিংয়ে।
গবেষকরা তাদের রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, শ্বাসের হার, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, মানসিক অনুভূতি, মনোযোগ এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্তুষ্টি পরিমাপ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, ৪৩২ কম্পাংকের গান শোনার পর অংশগ্রহণকারীদের হৃদস্পন্দন গড়ে প্রায় ৪.৭৯ বিট প্রতি মিনিট কমে যায়। শ্বাসের হারও সামান্য কমে। সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপেও সামান্য কমার প্রবণতা দেখা যায়, যদিও তা পরিসংখ্যানগতভাবে খুব শক্তিশালী ছিল না। অংশগ্রহণকারীরা ৪৩২ সেশনে গান শোনার সময় বেশি মনোযোগী ছিলেন এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্ট ছিলেন।
এটা ছিল মাত্র ৩৩ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে করা একটা পাইলট স্টাডি। তাই এর ফল থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ৪৩২ হার্টজ সবার জন্য চিকিৎসাগতভাবে উপকারী। গবেষকরা বলেছেন, এটা প্রমাণ করতে ভবিষ্যতে বড় নমুনা আর র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল দরকার।
তবে এই ৪৩২ কম্পাংক তত্ত্বের সমর্থকেরা একে Verdi pitch বা মহাবিশ্বের ফ্রিকোয়েন্সি বলেন। তাদের বিশ্বাস, ৪৩২ জ্যামিতিকভাবে গোল্ডেন রেশিও এবং পৃথিবীর হৃদস্পন্দন বা শুমান রেজোন্যান্সের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সম্পর্কিত। এ থেকে দাবি করা হয় যে, ৪৩২ হার্টজ DNA নিরাময় করতে পারে বা হৃদয় চক্রকে সক্রিয় করতে পারে।
এ কারণেই বিভিন্ন মেডিটেশন বা স্নায়ুকে স্থির করতে যেসব সুর তৈরি করা হয় সেসবের কম্পাংক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৪৩২ রাখা হয়। আসলে, শব্দ বা সুরের সৃষ্টি প্রাণীর জন্যই। সুর আর শব্দের মাত্রা প্রাণীর শরীরে, মনে, স্নায়ুতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। আবার একের সুরের কাজও একেক রকম—রণ সংগীতের কম্পোজিশন, বিয়ের গানের কম্পোজিশন, ডিসকোর শব্দ আর মন শান্ত করার সুর সবই হবে ভিন্ন ভিন্ন। একেক কম্পাংকের কাজ একেক রকম। আর সেসবের উপযোগিতাও আলাদা।
আপনি ঘরে বসে ৪৩২ টিউনে যা শুনবেন, যুদ্ধের মতো উত্তাল সময়ে বা বিয়ের বাড়িতে সেই কম্পাংকের গান শুনবেন না। শুনলেও তার আবেদন কেমন হবে, সেটা বলা বাহুল্য। আপনি প্রতিদিন যেমন ডাল-ভাত খাবেন না, আবার প্রতিদিন বিরিয়ানি খাবেন না, আবার ইচ্ছা করে পচা-বাসিও খাবেন না। সুর যদি হৃদয়ের খোরাক হয়, তবে সুরের কম্পাংকেও পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন থাকবে। ফলে, এই গল্পে যতক্ষণ সুরের কম্পাংক নিয়ে রহস্য ছিল, ততক্ষণই রোমাঞ্চ ছিল। মাঝখানের বাণিজ্যিক আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বনির্ভর অংশটা কিছুটা গোলমেলে করেছে। আরেকটু গোলমেলে ছিল, `কুম` আর আজানের প্রভাবের তত্ত্ব।
তবে গল্পের মধ্যে বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক সত্যতা খোঁজার চেয়ে আনন্দ খুঁজতে গেলে উদয়ের এই গল্পটা সত্যিই চমকপ্রদ। গল্প যেমন ভুল ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তেমন গল্পই আবার ইতিহাসের কোনো একটা মুহূর্তের ঘটনা বা বিজ্ঞানের কোনো একটা আলোচনাকে উস্কে দিতে পারে। সেই জায়গা থেকে উদয়ের গল্পটা সফল। বিজ্ঞান আর তত্ত্ব নিজের গতিতে চলুক, মানুষের গল্প পাঠের অভ্যাসটা অন্তত তৈরি হোক।
গল্পের শেষের দিকে, আজান, মাখরাজ, ইস্রাফিলের বাঁশি আর কুম শব্দের কথা উঠে এসেছে। ভাষাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে সেটা নিয়ে বিস্তর আলাপের জায়গা আছে। সেটা আরেক দিনের জন্য তুলে রাখলাম।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী






















