রাশেদ মেহেদী

রাশেদ মেহেদী

রাশেদ মেহেদীর গদ্য ‘দায় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে’

প্রকাশিত : জুলাই ০২, ২০২৬

কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে একজন ব্যক্তি যখন জাতীয় অর্জন এবং জাতির মূল ভিত্তির বিরুদ্ধে সরাসরি বক্তব্য দেয়, তার দায় সংশ্লিষ্ট চ্যানেল কর্তৃপক্ষেরও। কেউ যখন দিনের পর দিন ‘১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস নয়’ বলে বক্তব্য দেয় এবং সেটা জেনেও তাকে বারবার টকশোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন টেলিভিশন কর্তৃপক্ষও সমানভাবে দায়ী হয়ে যায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রধান ৩টি স্তম্ভ। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের সংবিধান স্বীকৃত বিজয় দিবস। এ দিবস অস্বীকার করা মানে স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্বীকার করা।

আমরা আপত্তিকর কনটেন্ট প্রচারের জন্য ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্লাটফর্মকে দায়ী করি। অথচ আমাদের  টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের বিরুদ্ধে চরম আপত্তিকর বক্তব্য প্রচার করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আপত্তিকর বক্তব্য যারা দিচ্ছে, তাদের বারবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! অথচ এরা আপন কর্মে কীর্তিমান কোনো বুদ্ধিজীবী কিংবা পেশাজীবী নন।

চরম ফালতু দুই-তিনজন মানুষ, যাদেরকে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে একটি রাষ্ট্রীয় অনাচারেরও কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ও তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তারা হঠাৎ করে টকশোজীবী হয়ে হয়ে, রাতারাতি বিখ্যাত (!) হয়ে গেল। তাদের বলার একমাত্র বিষয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকে অসম্মানিত করা, একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা, গণধর্ষণকে মহিমান্বিত করা এবং উগ্রবাদের উস্কানি ছড়ানো।

বিশ্বে বড় বড় সংবাদ মাধ্যমের একটা নীতিমালা  থাকে। এই নীতিমালা ওই সংবাদ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী সংবাদের কাঠামো তৈরি হয়। একই ভাবের নীতিমালার বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো আর্টিকেলও প্রকাশ করা হয় না, টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও এটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। যেমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিএনএন-এর প্যানেল অ্যানালিস্ট রায়ান গার্ডুস্কিকে চ্যানেলটি থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানে মুসলিম সাংবাদিক মেহদি হাসানকে উদ্দেশ করে তিনি লেবাননে পেজার বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিয়ে আক্রমণাত্মকভাবে বলেছিলেন, ‘আই হোপ ইউর বিপার ডাজেন্ট গো অফ।’ সঞ্চালক তাৎক্ষণিকভাবে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সিএনএন পরবর্তীতে বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট করে যে, বর্ণবাদ বা কুসংস্কারের কোনো স্থান তাদের নেটওয়ার্কে নেই।

২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর  ব্রিটেনের ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতা নিক গ্রিফিনকে বিবিসির ফ্ল্যাগশিপ রাজনৈতিক টকশো ‘কোশ্চেন টাইম’য়ে  অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। লাইভ শোতে ইসলাম ধর্ম ও কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালার বিরুদ্ধে গিয়ে আপত্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। এর পরপরই তাকে টকশোতে নিষিদ্ধ করা হয়।

বিবিসি-সিএনএনসহ বিশ্বের অনেক বড় গণমাধ্যমেই এ ধরনের নজির আছে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, আমাদের দেশে সংবাদপত্রগুলো লিখিত বা অলিখিতভাবে সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ করলেও টেলিভিশনগুলোতে কার্যত কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা নেই। যে কারণে যে কেউ টকশোতে এসে যা খুশি বলতে পারেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন। মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশ রাষ্ট্রর মূল ভিত্তি। অথচ সেই মূল ভিত্তিকে নিয়ে কিছু অর্ধশিক্ষিত, টাউট-বাটপার টকশোত দিনের পর দিন যা খুশি বলছেন, টেলিভিশনগুলোও তাদের নিয়মিত আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছে।

একজন সংবাদকর্মী হয়েও গভীর দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেলের মতো এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্তৃপক্ষ সম্ভবত বিশ্বের আর কোথাও কোনো গণমাধ্যমে নেই। সস্প্রচারের জন্য নিজস্ব নীতিমালা না থাকা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই সরকার আমাদের দেশে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে এত বেশি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। সরকারের উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করার জন্য সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়, আবার উপদেষ্টার ফোনে চাকরি ফেরত দেওয়া হয়, এতটাই নিজস্বতা বিহীন দুর্বল কর্তৃপক্ষ!

উপদেষ্টার কথায় চাকরি খাওয়ার জন্য একাধিক চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এক মুহুর্তেই এক কাতারে চলে আসেন। অথচ নিজেদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তারা কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না। দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই আমাদের দেশে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

দুনিয়া জুড়েই এখন ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দাপট। কিন্তু বিশ্বের আর কোনো দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা মূল ধারার গণমাধ্যমের চেয়ে শক্তিশালী নন। শুধু বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর যে ধরনের অসংলগ্ন, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে কনটেন্ট তৈরি করে, টেলিভিশন কর্তৃপক্ষগুলোও তাদের অনুকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই হচ্ছে বাস্তবতা। তবে বাস্তবতা যাই হোক, দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রচারের দায় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ