দিন যায় কথা থাকে

পর্ব ৩

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮

তারা কেউ গান শুনিয়েছেন। কেউ লিখেছেন হিরন্ময় কবিতা। কেউ আবার গল্প-উপন্যাসের মালা গেঁথে সাজিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ঢালি। কেউ বা নিরলস জ্ঞানচর্চায় যোগ করেছেন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন মাত্রা। তাদের সেই দিন আজ আর নেই, কেউ হারিয়ে গেছেন মহাকালে, কেউ বা এক পা বাড়িয়ে রেখেছেন সেই পথে। তবে তাদের কথা আছে; তাদের কর্মে আর সৃজনশীলতায় তো বটেই, আমার কাছেও— কাগজের ভাঁজে ভাঁজে, শব্দগুচ্ছের আড়ালে, বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সাক্ষাৎকারে। হয়তো সেই কথাগুলো আবারো জেগে ওঠতে পারে আপনার মননস্পর্শ পেলে। চলুন পাঠ নেয়া যাক।

তখনো বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রবল অগ্রাসন ভাসিয়ে দেয়নি তারুণ্যকে, আকাশ সংস্কৃতিও অনেক সুদূরের ব্যাপার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা উপলক্ষেই বেজে ওঠে গণসঙ্গীতের সুরধ্বনি, আবৃত্তির ঝনৎকারে কাব্যময় হয়ে ওঠে পরিবেশ। সামরিক শাসনের শৃংখলা ভেঙে নতুনভাবে সূচিত হয়েছে গণতন্ত্রের যাত্রা। ৯০ দশকের সেই প্রারম্ভিক কালসময়েই একদিন দৈনিক সংবাদ অফিসে যেতেই, সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাই বললেন, শিল্প-সংস্কৃতির পাতার দায়িত্বটাও আমাকে দিয়েছে। আমি একটু নতুনভাবে করতে চাই সবকিছু। আপনি আমাকে কয়েকজনের ইন্টারভিউ করে দেন।  

আমি তো ভেতরে ভেতরে মুখিয়েই ছিলাম ইন্টারভিউ গ্রহণ করতে। জাহানারা ইমামের সংস্পর্শে পৌঁছেছিলাম এই ইন্টারভিউয়ের কথামৃতের জগতে। তার ওপর হাসনাত ভাই যে ক’জনের নাম দিয়েছিলেন, আমার উৎসাহ তাতে আরো বেশি বেড়ে গিয়েছিল। ওস্তাদ বারীণ মজুমদার, ওস্তাদ শেখ ফজলুল হক, গণসঙ্গীত শিল্পী শেখ লুৎফুর রহমান, গণসঙ্গীত শিল্পী আবদুল লতিফ, আলোকচিত্র শিল্পী আমানুল হক। এর মধ্যে শিল্পী আবদুল লতিফের সাক্ষাৎকারটি কী কারণে যেন নেয়া হয়নি, তিনি কী অসুস্থ ছিলেন, নাকি সময় দিতে পারেননি, কিছুই আজ মনে নেই। তবে মনে আছে আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম, ইস্কাটন রোডে, সরকারি কোনো বাসভবনে তিনি থাকতেন। তার সঙ্গে কথাও বলেছিলাম।

আলোকচিত্র শিল্পী আমানুল হকের সঙ্গে দেখা করেছিলাম তার মহাখালির বাসায়। তিনি সাক্ষাৎকার দিতে কোনোক্রমেই রাজি হলেন না। আরেকজন অত্যন্ত প্রবীণ কোনো নৃত্যশিল্পীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিলাম। বাড়ি খুঁজতে গিয়ে হন্যে হতে হয়েছিল, তারপর মিলেছিল তার দাম্ভিক কন্যার দুর্ব্যবহার! আজ সেই শিল্পীর নামটি পর্যন্ত স্মরণ করতে পারছি না। মোহাম্মদপুরে অনেক খুঁজে খুঁজে বের করেছিলাম ওস্তাদ ফজলুল হকের বাড়িটি। কিন্তু তাকে দেখার পর সাক্ষাৎকার নেয়ার সমস্ত উৎসাহ দপ করে নিভে গিয়েছিল। বিছানার সঙ্গে মিশে আছে শরীর। হাড্ডিচর্মসার দেহ! কথা বলেন ক্ষীণ স্বরে। বোঝা যায় কী যায় না। মৃত্যুর জন্য নিজেকে পুরো সমর্পিত করে রেখেছেন। সাক্ষাৎকার না নিয়েই ফিরে এসেছিলাম, বদলে লিখেছিলাম তাকে চাক্ষুস করার অভিজ্ঞতা।

বারীণ মজুমদারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তার সিদ্ধেশ্বরী নাকি মালিবাগের বাসায়। মুগ্ধ হয়েছিলাম তার জীবনসঙ্গীনী ইলা মজুমদারের স্নিগ্ধ ব্যবহারে। আতিথ্যের সেই স্মৃতি আজো মনকে প্রষণ্ণ করে তোলে। কী একটা মিষ্টান্ন খাইয়েছিলেন, দুধের ক্ষীর? অমৃতের স্বাদ ছিল। পুরনো ঢাকার একটি বাড়িতে শেখ লুৎফুর রহমানের হুইল চেয়ারে বসে দেয়া কথা বলার ভঙ্গিটা আজো কত স্পষ্ট কত কাছের! এই পর্বে আমার নেয়া প্রথম সাক্ষাৎকার ছিল ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের।

এ দেশের মাটির সঙ্গে আমার সব মিশে আছে, আমার রক্ত, মাংস হাড়, নিঃশ্বাস। এদেশ ছাড়ার কথা আমি ভাবতেই পারি না
                                                                                  ওস্তাদ বারীণ মজুমদার

না, তার প্রিয় তানপুরাটায় ধুলো জমেনি। তবে এখন সেই তানপুরাটার ছড়ে তার হাত পড়ে না। তানপুরাটিকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে একটা দামি পশমি চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। যিনি এক সময় এই তানপুরার ছড়ে হাত বুলিয়ে ধ্রুপদী সুরের মূর্ছনা তুলতেন তিনি, সেই বারীণ মজুমদার জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন মৃত্যুপথযাত্রী। পাবনার রাধানগর অভিজাত জমিদার মজুমদার বংশের সন্তান দীর্ঘদেহী মানুষটি নার্ভাস সিস্টেমের সমস্যায় ভুগে আজ ক্ষীণকায়া। অজানা কারণে তার ব্রেনের নার্ভগুলো শুকিয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ১৯৯০ সাল থেকে তিনি অসুস্থ। মাঝখানে কথা বলার ক্ষমতা একরকম হারিয়েই ফেলেছিলেন। এখন কথা বলেন খুব কষ্টে, শব্দগুলো জড়িয়ে যায়। তবু তিনি প্রাণভরে কথা বলেন, তার ভেতরের শিল্পীসত্তাটি আজো এই জটিল অসুস্থতার মাঝেও তাকে সজীব রেখেছে। জমিদার বংশের ছেলে হলেও, আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও শিল্পের জন্য, জীবনের জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। জীবনে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকবার, কিন্তু পরাজিত হননি একবারও। এই ৭৩ বছর বয়সে জ্বরা, অসুস্থতাকে ভ্রুকুটি জানিয়ে কথায় সরগরম হয়ে গেলেন তিনি পহেলা এপ্রিলের সন্ধ্যায়, যখনই জানতে চাওয়া হলো তার কাছে, ‘কেমন আছেন?’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘প্রেসার খুব বেশি হচ্ছে।’ তারপর ছড়িয়ে পড়লো তার গলায় আক্ষেপ, ‘কি  বলব? বলার কথা সব ফুরিয়ে গেছে। রেওয়াজ করার অবস্থা আমার নেই। দু’চারজন ছাত্রছাত্রী আসে, ওদের দেখিয়ে-টেখিয়ে দেই।’ বিশুদ্ধ সঙ্গীতচর্চার জন্যে গভীর আকুতি তার রোগাক্লিষ্ট মুখে চাপা রইল না। বললাম, ‘সারাজীবন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে নিবেদিত থেকেছেন, এর পেছনে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কিভাবে?’ বারীণ মজুমদার গভীর অতীতে হারিয়ে গেলেন, স্মৃতিতাড়িত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হইনি। ছোটবেলা থেকেই, বাড়ির পরিবেশ আমাকে সঙ্গীত, নাট্য এবং শিল্পকলার প্রতি আসক্ত করে তোলে। জমিদার বাড়িতে যা হতো আর কি। প্র্যাকটিক্যালি ১৩/১৪ বছর থেকে সঙ্গীতচর্চায় ঝুঁকে পড়লাম। বাবা-মাকে বললাম গান শিখতে লক্ষ্ণৌ যাব। এখানে কেউ নাই গান শেখানোর। তখন কলকাতায় আমরা বছরে চার/পাঁচ মাস থাকতাম। বাবা-মা বললেন, এখানে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় আছে, এখানেই থাকো। কলকাতাতেই থাকতে হলো। ভীষ্মদেবের কাছে ভর্তি হলাম। দু’বছর পর ভীষ্মদেব সন্ন্যাসী হয়ে পণ্ডিচেরিতে চলে গেলেন। আমি আবার লক্ষ্ণৌ যেতে চাইলাম। বাবা-মা বললেন, লক্ষ্ণৌ গেলে ছেলেপুলে খারাপ হয়ে যায়। তার চেয়ে লক্ষ্ণৌ থেকে ওস্তাদ নিয়ে আসি। লক্ষ্ণৌ থেকে ওস্তাদ রঘুনন্দন গোস্বামীকে আনা হলো আমাদের বাড়িতে। তার কাছে তিন বছরের কোর্স কমপ্লিটও করলাম। তারপর একদিন মার বিছানার নিচ থেকে ২৫ টাকা চুরি করে চলে গেলাম লক্ষ্ণৌ। উঠলাম সেখানকার বেঙ্গলি হোস্টেলে। হোস্টেলের ম্যানেজারকে বললাম, পয়সা নেই। আমার বাবাকে টেলিগ্রাফ করে দিন। ম্যানেজার আমাকে দেখেই বুঝতে পারলেন অভিজাত ঘরের ছেলে। তিনি আমাকে একটি ঘরে ঠাঁই দিলেন। এর তিন-চারদিন পরই বাড়ি থেকে টাকা পৌঁছাল। শুরু হলো আমার নতুন জীবন। সেখানে তখন রবিশংকরও ছিলেন, ও তখন নাচতো উদয়শংকরের টিমে। লক্ষ্ণৌতে পাবনার ছেলে চিন্ময় লাহিড়ী আমার দায়িত্ব নিলেন। সে আমার মাত্র দু’বছরের বড়’ কিন্তু সে নিজ দায়িত্বে আমাকে গান শেখাতে লাগলো। মরিস কলেজে ভর্তি হলাম। চিন্ময় আমাকে নিয়ে গেলেন ডি.টি যোশীর বাসায়। সব বড় বড় ওস্তাদ সে বাসায় নিয়মিত যাওয়া-আসা করতো। তাদের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। আমাদের হোস্টেলেই থাকতো এক কাশ্মিরী ছেলে, নামটা মনে নেই, সে আমাকে একদিন খুরশিদ আলী খানের বাসায় নিয়ে গেল। খুরশিদ আলী খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলাম। ডি.টি যোশীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল।

আলী আকবর খান তখন লক্ষ্ণৌ রেডিওতে চাকরি করতেন। বেলায়েত খানের সঙ্গে ডি.টি যোশীর বাসায় তিনিও আসতেন। সেই সুবাদে তার সঙ্গেও আমার যোগাযোগ হয়েছিল। তিনি আমাকে ফৈয়াজ খাঁ’র কাছে গান শেখার সুযোগ করে দিলেন। হামিদ খান সাহেবসহ আরো কত ওস্তাদের সঙ্গে আমার স্মৃতি রয়েছে। পাস করার পর লক্ষৌতেই থেকে গেলাম।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘দেশে অর্থাৎ পাবনাতে ফিরে এলেন কখন?’ কথা বলতে বলতে খানিকটা হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। একটু থেমে জবাব দিলেন, ‘পারটিশানের পর। নতুন দেশ পাকিস্তান হলো। আমি ফিরে এলাম পাবনায়। এদেশে এসেই বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম।’ জানতে চাই, ‘কেনো?’ তিনি বললেন, ‘এসে দেখি গানের জগৎটা একেবারে শূন্য। শূন্য মানে মহাশূন্য। সব গুণী শিল্পীরা এদেশ ছেড়ে চলে গেছে ভারতে। এমনকি আলাউদ্দিন খাঁ’র মতো শিল্পীও। সঙ্গীতচর্চার কোনো পরিবেশ কিংবা প্রেরণা কিছুই পেলাম না। লোকজন আমার গান শুনে ঢিলও ছুড়েছে। তাই সঙ্গীতচর্চা ছেড়ে দিলাম।’ ‘ছেড়ে দিলেন!’ বিস্মিত গলায় বলতেই তিনি আরো জোরালো গলায় বললেন, ‘ছেড়ে দিলাম মানে, টানা দশ বছর সঙ্গীতচর্চা করিনি, বিন্দুমাত্র প্র্যাকটিসও না। অথচ আমি আগে দিনে ১২/১৩ ঘণ্টা নিয়মিত গানের রেওয়াজ করতাম।’ জানতে চাইলাম, ‘গান ছেড়ে সময় কাটাতেন কিভাবে?
তিনি উদাস স্বরে জবাব দিলেন, ‘বসে বসে, পড়াশোনা করে।’ দশ বছর সঙ্গীতের সঙ্গে সাময়িকভাবে বিচ্ছেদ ঘটলেও বারীণ মজুমদারের ভেতরের মানুষটি ষোলআনাই আকণ্ঠ সুরের ভেতরই নিমজ্জিত থেকেছেন গভীর গোপনে, আত্মভাবনায়। সেই জন্যই সঙ্গীতচর্চা থেকে টানা দশ বছর দূরে থাকলেও, তার প্রতিভার স্ফূরণ দশ বছর পরও উত্তুঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগৎটাকে গভীর বাঙময়তা দিয়েছিল। এই দশ বছরের ভেতর তার ব্যক্তিজীবনে নেমে এসেছে ধস। ১৯৫২ সালে তাদের জমিদারিটা দখল হয়ে গেল। পাবনার ১৮ বিঘা আয়তনের বিশাল পিতৃ-ভিটাটাও হাতছাড়া হয়ে গেছে। তবু তিনি এদেশের মাটিকেই নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে রইলেন।

দীর্ঘক্ষণ পিনপতন নিস্তব্ধতায় কাটে। স্তব্ধতা তাড়িয়ে বললাম, ‘গানের জগতে ফিরে এলেন কিভাবে?’ তিনি বললেন, ‘১৯৫৭ সালে একদিন ডিসি মাহতাবউদ্দিন সরকার আমাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। তিনি এবং তৎকালীন একজন চীফ সেক্রেটারি (অনেক কষ্টেও নাম মনে করতে পারলেন না) আমাকে একরকম জোর করেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নিয়ে এলেন শিক্ষক হিসেবে। এখানে এসে দেখি হারমোনিয়াম ছাড়া কেউ অন্য কিছু চেনে না। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শুরু থেকেই সম্পর্ক ভালো থাকলো না। ওদের মতামতের সাথে একমত হতে পারতাম না। মিউজিক আমার জীবন, সাধনা। মিউজিক সম্বন্ধে তো অমিউজিশিয়ানের কথা মানা যায় না। ওখান থেকে আমি বেরিয়ে এলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম একটা মিউজিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করবো।’

আজকের যে সরকারি সঙ্গীত কলেজটি গ্রীন রোডে দাঁড়িয়ে আছে, এর প্রতিষ্ঠার পেছনে সম্পূর্ণ বারীণ মজুমদারেরই অবদান ছিল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সঙ্গীত কলেজটির প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলেও এখান থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে তাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে কিছু ক্ষমতালিপ্সু চক্রান্তকারীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। এ প্রসঙ্গে কথা উঠতেই ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আমার ইচ্ছে ছিল লক্ষ্ণৌর মতো এদেশে একটি বিশ্বমানের সঙ্গীত কলেজ প্রতিষ্ঠার। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গীতকেও একটা গ্রুপ হিসেবে চালু করার জন্যে আমি একটা সিলেবাস তৈরি করে ইউনিভার্সিটিতে দিলাম পাস করার জন্য। ব্যাচেলর অব মিউজিক গ্রুপের আমার প্রস্তাবিত এ সিলেবাসটি পাস করানোর জন্যে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর যখন কলেজটি বেশ ভালোভাবে চলতে শুরু করেছে, আমার গদি দখল করার লোকের অভাব হলো না। তারা ‘মালাউন’ খেদাতে নোংরা পলিটিক্স আরম্ভ করলো। তারপর ১৯৭৮ সালে একরকম জোর করে মিউজিক কলেজ থেকে আমাকে বের করে দেয়া হলো। ওসব কথা থাক। শুধু ভাবি, মানুষ এত সংকীর্ণ হয় কেন। কত স্বপ্ন ছিল লক্ষ্ণৌর মতো বিশ্বমানের একটা সঙ্গীত কলেজ প্রতিষ্ঠার। আজ মিউজিক কলেজে কিছুই হচ্ছে না। ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে কতবার চাকরির অফার পেয়েছি, কিন্তু কেউ আমাকে এখান থেকে টেনে নিতে পারেনি। এ দেশের মাটির সঙ্গে আমার সব মিশে আছে, আমার রক্ত, মাংস হাড়, নিঃশ্বাস। এদেশ ছাড়ার কথা আমি ভাবতেই পারি না।’ একটু থেমে বারবার তিনি খেদ প্রকাশ করতে লাগলেন, ‘এদেশের মানুষ কি নিয়ে সুখে থাকবে, কি নিয়ে?’

মিউজিক কলেজ ছেড়ে যাবার পর বারীণ মজুমদার থেমে যাননি, নিজের বাসাতেই গড়ে তুলেন ‘মনিহার সঙ্গীত একাডেমি’। বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা শিল্পীকে তিনি গানের দীক্ষা দিয়েছেন, অদ্যাবধিও দীক্ষা দিয়ে চলেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ‘আমার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা থাকতো খুবই কম। কারণ পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই তো আমি সব শিখিয়ে দিতে পারব না।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমার বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে বুলবুল মহলানবীশ এবং সৈয়দ আবদুল হাদীর বোন হাছনা বেগম, এ দুজনই বেশ ভালোভাবে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু বুলবুল ঠিকমতো দেশে থাকে না, হাছনা ব্যবসাতে নামায় সময় দিতে পারছে না। অথচ এ দুজনের মধ্যেই ভালো সম্ভাবনা ছিল।’

‘আমাদের দেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চার সার্বিক পরিস্থিতি দেখে আপনার কি মনে হয়?’ তার গলায় নেমে এলো সীমাহীন নৈরাশ্য, ‘কোনো উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। এদেশের মানুষের ধৈর্য ভারী কম। গভীর অধ্যবসায় নেই, প্রেম নেই। ৫/৬ মাসের মধ্যেই সব শিখে ফেলে খ্যাতির জন্যে হন্যে হয়ে যায়। আর শিল্পীদের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকও কি রয়েছে? সবাই নিজেদের আখের গোছানোতে ব্যস্ত।’

‘চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনায় আপনাকে কখনো দেখা যায়নি কেন?’ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি শুধু সংক্ষেপে বললেন, ‘ওসবে আমার ঝোঁক ছিল না, তাই।’  জিজ্ঞেস করলাম, ‘আধুনিক ইলেকট্রনিক্স সঙ্গীতের উত্থানকে আপনি কি দৃষ্টিতে দেখেন।’ তিনি শান্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘ব্যান্ড দলগুলো যা করছে তাও যদি শিখে করতো, হতো! না শিখেই ওরা গীটার ধরছে, গাইতে নেমেছে।’

২২ মার্চ ১৯৯৩, শিল্প ও সংস্কৃতি, দৈনিক সংবাদ

ধারাবাহিক