কাজী জহিরুল ইসলামের গদ্য ‘শিশুতোষ সাহিত্যে দুর্বোধ্যতা’
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : জানুয়ারি ০৬, ২০২৬
‘কে শ্রেষ্ঠ’ শিরোনামে বেশ লম্বা একটি কবিতা লিখি পরশুদিন। কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এবং দ্বিপদী। কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে একটি শিশু গাছতলায় বসে আছে তখন পাখি এসে বলছে, তুমি তো আমার মতো উড়তে পারো না, কাজেই আমিই শ্রেষ্ঠ। ছেলেটি তখন পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে, মাছ এসে বলে, পাখি বা মানুষ কেউই জলের নিচে সাঁতার কাটতে পারে না, কাজেই মাছই শ্রেষ্ঠ। এ কথা শুনে কেঁচো বলে, তোমরা কেউ কি মাটির নিচে বাস করতে পারো? কেঁচোই শ্রেষ্ঠ।
প্রত্যেকেই তার নিজের গুণে গর্বিত এবং অন্যের গুণকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। শিশুটির মন খারাপ দেখে পেঁচা একটি সমাধান দেয়। পেঁচা বলে, মানুষ উড়োজাহাজ বানিয়ে আকাশে ওড়ে, ডুবোজাহাজ বানিয়ে জলের নিচে যায়, মাটি খুঁড়ে খনিজ তোলে, কাজেই মানুষই শ্রেষ্ঠ। এই হলো কবিতা। আমি যেহেতু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে একটি বই লিখছি, এটি সেই গ্রন্থের ৮৩ নম্বর কবিতা। কবিতাটি আমার ফেইসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রশংসায় অভিষিক্ত করেছেন।
আমি আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার একজন প্রিয় বন্ধু, লেখক, অনুবাদক এবং ফিলাটেলিস্ট সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের অবতাড়না করেছেন। অনেকেই বলেছেন এটি শিশুতোষ কবিতা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এই কবিতায় বড়দের শেখার অনেক বিষয় আছে। হ্যাঁ, তা তো আছেই। এমন কী আপনি এটিকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে পারেন। একেকটি প্রাণীকে একেকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ভেবেও কবিতাটিকে বিশ্লেষণ করতে পারেন।
আমি সেই দিকে যাচ্ছি না। সিদ্দিক ভাইয়ের যে আশঙ্কা সেটি নিয়েই কিছুটা আলোকপাত করবো। তিনি বলেছেন, ‘কবিতাটি অতি সুন্দর। কিন্তু কুলোক আর সমালোচক খুঁজে বেড়ায় দোষ মানুষের, কবির, লেখকের! তাই আপনার ছড়াটিতে আমি মেলাই দোষ! শিশুদের কবিতা, তাই কয়েকটি শব্দের ব্যবহার একটু কঠোর, খটোমতো বিঁধবে ওদের আইকিউতে, এটা আমার মনে হলো! যেমন: শ্রেষ্ঠ, মাল্যবৃত্তে, গোয়ার্তুমি, উর্বশী, পুচ্ছ, অক্লেশ, কুভিক।’
খুশবন্ত সিং ‘দ্য লেসন্স অব মাই লাইফ’ গ্রন্থে লেখকদের পরামর্শ দিয়েছেন, কখনো পাঠকের স্তরে নেমে লিখবে না। তিনি এটা কেন বলেছেন? বলেছেন এ কারণে, লেখকদের একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব হচ্ছে জাতির বুদ্ধিমত্তার স্তরান্তর ঘটানো। একটি জাতির গড় বুদ্ধিমত্তা যদি ৮০ হয় এবং লেখকেরা আশিকে বিবেচনায় রেখেই সর্বদা লেখেন তাহলে তাদের বুদ্ধিমত্তা খুব সহজে বাড়বে না। একটি জাতির নাটক/সিনেমা নির্মাতাদের, গীত রচয়িতাদের, কবি-লেখকদের তাদের সৃষ্টিকর্মের ৮০ শতাংশ বোধগম্য এবং ২০ শতাংশ দুর্বোধ্য করে নির্মাণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
এক শ্রেণির দর্শক, পাঠক, শ্রোতা সেই কুড়ি শতাংশের মর্মোদ্ধারে ব্রতী হবেন এবং এভাবেই একটি টাইম-স্প্যানে জাতির গড় বুদ্ধিমত্তার উত্তরণ ঘটবে। আমার লেখালেখি জীবনের শুরু থেকেই আমাদের পণ্ডিত সমালোচকদের এই কথা বলতে শুনে আসছি, পাঠক বুঝবে কিনা এটা বিবেচনায় রেখে যেন লিখি। বিশেষ করে শিশুতোষ রচনার ক্ষেত্রে এই কথাটি তারা বেশি বলেন। প্রকৃতপক্ষে কঠিন কিংবা কিছুটা তাদের বয়সের তুলনায় ভারি শব্দ বা বিষয়ের মিশেল শিশুতোষ রচনায় থাকা উচিত বলেই আমি মনে করি। যা থাকা উচিত নয় শিশুতোষ রচনায় তা হচ্ছে অনৈতিক কোনো শিক্ষা, যেমন, দুধে জল মেশানোর অঙ্ক ইত্যাদি।
একজন স্বাভাবিক বুদ্ধির মানুষের গড় বুদ্ধিমত্তার সুচক হচ্ছে ৮৫ থেকে ১১৫। ১১৫-র চেয়ে ওপরে যাদের সুচক তারা অধিক বুদ্ধিমান এবং ৮৫-র চেয়ে নিচে যাদের সুচক তারা স্বল্প বুদ্ধির মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের গড় বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে ৭৪। এখন আমাদের, বিশেষ করে লেখকদের, দায়িত্ব হচ্ছে সুচকটিকে ৭৪ থেকে ওপরে তোলার জন্য চেষ্টা করা। এটি খুব দ্রুত ঘটবে না। এক বছরে বাঙালিরা যেসব বই পড়ে, যেসব নাটক/সিনেমা দেখে, যেসব গান শোনে তার কুড়ি শতাংশ যদি গড় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে কিছুটা ওপরের স্তরের হয় তাহলে বুদ্ধিমত্তার গড় একটু বাড়বে।
পরের বছরের প্রকাশিত বইপত্র, নাটক/সিনেমা, বা গান যদি এর চেয়ে আরো একটু অধিক বুদ্ধিমত্তার স্তরে নির্মিত হয় এবং এই ধারাবাহিকতা অব্যহত থাকে তাহলে ক্রমান্বয়ে জাতির বুদ্ধিমত্তার স্তরটি বাড়তে থাকবে। সেজন্যই জনপ্রিয় লেখকের পাশাপাশি একটি দেশে বা জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে একদল সিরিয়াস লেখক থাকা খুব দরকার। ৫২ বছরের বাংলাদেশে ভেবে দেখুন তো এই কাজটি আমাদের লেখকেরা কতটা করতে পেরেছেন?
আমি বরাবরই পণ্ডিতদের এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছি যে শিশুতোষ লেখাগুলো শতভাগ সরল সহজ যুক্তাক্ষর বর্জিত হতে হবে। বরং একটি সহনীয় মাত্রায় কঠিন শব্দ, কঠিন বিষয় শিশুতোষ লেখায় রাখারই চেষ্টা করেছি যাতে তারা সেই শব্দ এবং বিষয়গুলো শেখার জন্য বড়দের প্রশ্ন করে এবং সহায়ক গ্রন্থের, গুগলের (সার্চ ইঞ্জিনের) সাহায্য নেয়।
আমাদের মতো পাঠবিমুখ জাতির মধ্যে জনপ্রিয় লেখকের গুরুত্ব অপরিসীম। তারা বইবিমুখ মানুষকে বইয়ের কাছে টেনে আনেন। পাঠক তৈরি করেন। যে কাজ হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, তসলিমা নাসরিন, আনিসুল হকেরা করেছেন, এখনও করছেন। যখন একজন পাঠক ২০টি জনপ্রিয়, সহজ, আবেগাশ্রয়ী গ্রন্থ পাঠ করবেন তখন তার ইচ্ছে হবে একটি কঠিন এবং গভীর তাৎপর্যমূলক গ্রন্থ হাতে তুলে নেবার। এভাবেই পাঠকের স্তরান্তর হবে এবং জাতির বুদ্ধিমত্তার উত্তরণ ঘটবে।
শিশুদের প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলেই শেষ করি। শিশুরাই সবচেয়ে দ্রুত শিখতে পারে। কাজেই শিশুতোষ রচনায় তাদের বয়সের গড় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে কঠিন কিছু শব্দ এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় রাখলে তা বড়োদের তুলনায় অধিক কার্যকর হয়। একুশ বছরেই জীবনের ইতি টেনেছেন সুকান্ত, অথচ তার চিন্তা কত পরিণত ছিল তা বোধ করি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বিখ্যাত ইংরেজ কবি থমাস চেটারটন মাত্র ১৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করে জীবনাবসান ঘটান। অথচ এই বয়সেই তিনি রোমান্টিক কবিতার আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে ওঠেন।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলী, কীটসের সঙ্গে তার নাম উচ্চারিত হয়। শিশুদের মধ্যে অনেক পরিণত প্রতিভার আগুন গনগন করে, সেই আগুনকে উষ্কে দেবার জন্য কিছুটা কেরোসিন হচ্ছে এই দুর্বোধ্য শব্দ এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কোনো বিষয়।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক























