করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৩১৩২৬ ৪৭৫৮৯৯ ৮৮০৩
বিশ্বব্যাপী ৯৮৭৫০১০৩ ৭০৯৩৬৭৫০ ২১১৬৪৩৮

‘অপ্রকৃতস্থ, ঘোরের মধ্যে জীবনটাকে উপভোগ করতে চাইতাম’

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

নভেরা হোসেন প্রথম দশকের মেধাবী কবি ও গল্পকার। অভিনব শব্দঅভিধা ও অনবদ্য চিত্রকল্পের জন্যে তিনি এরই মধ্যে পাঠকের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন। ভিন্ন স্বরের, ভিন্ন লিখনভঙ্গিমার এই কবির সঙ্গে গপসপ করেছেন ছাড়পত্রের নির্বাহী সম্পাদক আবু তাহের সরফরাজ।

 

আবু তাহের সরফরাজ: শৈশবের গল্প বলুন। ধানখেত, নদী, পাখি প্রকৃতির এসব অনুষঙ্গ কীভাবে আপনার স্বপ্ন কল্পনায় একাকার হয়ে গেল।
নভেরা হোসেন: শৈশব, কৈশোর হচ্ছে একজন মানুষের বুনিয়াদ। যেভাবে সে বেড়ে ওঠে, তার মন ও মগজ তেমন সব প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকে পরের সময়গুলোতে। আমার শৈশব কেটেছে আশির দশকের ঢাকা শহরে। রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, শঙ্কর আর ধানমন্ডি এলাকায়। তখনকার ঢাকা ছিল অনেক পরিচ্ছন্ন, কোলাহলহীন। বড় বড় ইমারত তখনও গড়ে ওঠেনি। রাস্তাঘাট সীমাবদ্ধ, গাড়িও কম। স্কুলে যেতাম বেশ স্বাচ্ছন্দে। কখনো একা বা ভাইবোন, বন্ধুদের সাথে। ফেরার পথে এ-গলি সে-গলি ঘুরে খেলেটেলে বাসায় ফেরা। আম্মা লুৎফুন্নেসা রায়েরবাজার হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তাই বাড়ি ফিরেও কিছু সময় নিজস্ব জগতে থাকতে পারতাম। বাবা দার্শনিক ধরনের মানুষ। সারাক্ষণ পড়তেন বা কী যেন একটা ঘোরে নিমগ্ন হয়ে থাকতেন। ছোটবেলায় মাদারীপুরে নানাবাড়িতে যেতাম মামাদের সাথে। মাদারীপুর ভ্রমণ আমাকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যেত। মফস্বল শহরগুলো তখন ছিল আধাগ্রাম, আধাশহর। বাড়ির পেছনে সবুজ ধানখেত, বিল। বিলে নানা পরিযায়ী পাখি। একজন মামা ছিলেন আর্টিস্ট। তিনি প্রকৃতির রং চেনাতেন। আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড় ধরে বহুবার হেঁটে গিয়েছি হাউসদী গ্রামে। রাতে নদীর শান্ত, অন্ধকার রূপ অপার্থিব এক জগতে পরিভ্রমণ করাতো। হঠাৎ করে একটা দুটো মাছ শূন্যে লাফ দিত। যা স্থির পৃথিবীকে ভেঙে চুরমার করে নতুন এক সময়কে চোখের সামনে উপস্থিত করতো। ছোট দুই খালা, লাকি আর সাকি ছিল এসব আনন্দ ভ্রমণের সহচর। প্রকৃতি চারপাশে আছে, তা সর্বক্ষণ আমাদের সাব-কানসাস মনে একটা দ্যোতনা তৈরি করে। শৈশবের ঢাকা শহর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিকেলে মাঝে মাঝে তুরাগের পাড়ে বেড়াতে যেতাম। কাঁটাসুরের বাসার পাশে আম, জাম, সজনে নানা জাতের গাছ। গাছের ডালে চড়ে খেলতাম। দাড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, গোল্লাছুট। প্রকৃতি একটু একটু করে শরীরের কোষের সাথে অভিযোজন করে সঙ্গী হয়ে যায়। লেখকের ক্ষেত্রে তা লেখার অনুষঙ্গ হয়ে বারবার ফিরে আসে। মনে গাঁথা আর্কোটাইপ জীবন্ত ভিসুভিয়াস হয়ে ওঠে।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখালেখি শুরুর দিককার সময়গুলোর কথা বলুন। প্রস্তুতিটা কীরকম ছিল। সেই সময়ের উত্তেজনা... পড়াশোনা...
নভেরা হোসেন: লেখালেখির আগে পড়ার বিষয়টি এসেছে। বাবার বুকশেলফে থরে থরে সাজানো গীতা, বাইবেল, কোরআন, দাস ক্যাপিটাল, মাও ৎসে-তুং, নৃবিজ্ঞান, বার্টান্ড রাসেল, শেক্সপিয়ার, জীবনানন্দ দাশ। কিছু পড়তাম, কিছু অবোধ্য। দোতলায় সাংবাদিক মঞ্জুর আহমেদের বাসার সব বই, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে আনা বই, তলস্তয়, গোর্কি, দস্তয়ভস্কি, আল মাহমুদ, শওকত ওসমান, বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু। এক সময় হুমায়ূন আহমেদও মাথা খেলো। পাশের বাসার নদী পত্রিকার কবি আব্দুল্লাহ-আল-মামুনের বাসায় পরিচয় হলো বহু লিটল ম্যাগাজিনের সাথে। গাণ্ডীব, অনিন্দ্য, পেঁচা... আরো কত। কোলকাতার সুবিমল মিশ্রর ‘আসলে এটি রামায়ণ চামারের গল্প হয়ে উঠতে পারতো’, ‘নাঙা হাড় জেগে উঠেছে’, ‘ভাইটু পাঠার ইস্টু’। একঝাঁক তরুণ কবির সাথে পরিচয়। ব্রাত্য রাইসু, মাসরুর আরেফিন থেকে শুরু করে শামীম কবীর। সময়টা নব্বইয়ের সূচনা, টালমাটাল এক অবস্থা। বদরুন্নেসা কলেজে পড়াশোনা, সাথে আড্ডা। রায়েরবাজার টালি অফিস রোড, ধানমন্ডি পনেরো নম্বর, শাহবাগ, পাবলিক লাইব্রেরি, আজিজ সুপার মার্কেট, পিজির বারান্দা। একটু একটু করে লেখার শুরু। প্রথমে ডায়েরি, গদ্য... একটু একটু করে কবিতা... এ সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান ছেড়ে নৃবিজ্ঞানে পড়ার সূচনা। বন্ধু শামীম কবীরের আত্মহননের পর বেশ লম্বা একটা সময় ব্ল্যাঙ্ক কাটলো অর্থ এবং অর্থহীনতার দোলাচালে। সারাক্ষণ সাথে বই থাকতো। বই আমাকে সেসময় নতুন প্রাণ দেয়। মানুষ যা পারেনি দিতে, বই তা দিয়েছিল। পরোক্ষভাবে সেই মানুষই। আসাদ গেট থেকে সাভার যেতাম পড়তে পড়তে। আবার পড়তে পড়তে ফিরে আসা। কখনো বংশী নদীর পাড়ে বসে থাকা। চূড়ান্ত বোহেমিয়ান সময়। রাস্তা, ফুটপাথ, দেয়াল, নজরুলের কবরস্থান, হাকিম চত্বর, চাঁনখার পুল, ধানমন্ডি লেক, পুরান ঢাকা, লালবাগ— সব চষে বেড়ানো বন্ধুদের সাথে। তাজুল, পলি, বায়েজিদ, রোজি, আদিত্য কবীর, জুয়েল... কিছুটা অপ্রকৃতস্থ, ঘোরের মধ্যে জীবনটাকে চর্বচোষ্যলেহ্যপেয়— নানাভাবেই উপভোগ করতে চাইতাম। যাপন করতে চাইতাম। এই অস্থিরতা কানা উপচে পড়তে থাকতো। জীবন সে অস্থিরতার ভার বহন করতে অপারগ হলে কাগজ-কলমে তা প্রকাশিত হতে শুরু করে হয়তো কবিতার ফর্মে, কখনোবা জার্নাল বা গদ্যের ভেতর দিয়ে।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার প্রকাশিত বই নিয়ে বলুন।
নভেরা হোসেন: আমার প্রকাশিত কবিতার বই পাঁচটি, গল্পের বই দুটি আর একটি সম্পাদিত কাব্য। প্রকাশিত কবিতার বই: হারানো দোকান এলদরাদো (জনান্তিক, ফেব্রুয়ারি ২০০৯), একজন আঙুল শুধু হেঁটে বেড়ায় (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি ২০১০) আরকারনে শন ফুটলো থরে থরে (শুদ্ধস্বর ২০১৩), একটু একটু করে বোবা হয়ে যাচ্ছ তুমি (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৫),  বারুদ লোবানের গন্ধ (চৈতন্য, ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: পেন্ডুলাম ও শিশুর দোলনা (শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১১), জৌলুসী বেওয়া (দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৬)। এছাড়া পিয়াস মজিদের সাথে যৌথ সম্পাদনা ‘নির্বাচিত কবিতা: শামীম কবীর’ (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি ২০১০)।

আবু তাহের সরফরাজ: বর্তমানে আমাদের কবিতার মান কোন পর্যায়ের বলে আপনি মনে করেন? বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কবিতার তুলনামূলক অবস্থান নিয়ে শুনতে চাই।
নভেরা হোসেন: কবিতাকে মানদণ্ডে বিচার করা খুব কঠিন আর তাতে বিশ্বাসীও নই আমি। যেটা করা যায়, কবিতা নিয়ে কিছু অনুভূতি প্রকাশ করা যায়। বাংলা অঞ্চলের সাহিত্য মূলত একই কাণ্ডারি থেকে শুরু হলেও অঞ্চল ভেদে তার রূপ, বিষয়, ভাষা ও দর্শন— আলাদা হয়ে যায়। সাতচল্লিশ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে কবিতাটা মূলত এথনিক হয়ে পড়েছিল তার আগে মধুসূদন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ— এই সব্যসাচী কবিরা পৌরাণিকতা থেকে প্রাচ্য-প্রতীচ্য, আধুনিক মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন। জীবনানন্দ বাংলার প্রকৃতি এবং জীবনকে নিবিড় এবং নির্বিকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। একাত্তর পূর্ববর্তী ফররুখ আহমেদসহ অনেকেই বাংলা কবিতাকে ধর্মীয় লেবাসে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। আল মাহমুদ এই বাংলার আদিম গন্ধটিকে কবিতায় এনেছেন স্বতন্ত্র ধারায়। শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ অনেকেই স্বতন্ত্র একটা স্বর তৈরি করতে পেরেছেন। তাদের কবিতায় এই অঞ্চলের মানুষের রূপটিকে বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করা যায়। আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতায় নির্মোহতার এক নতুন ধারার স্রষ্টা। আশি-নব্বই দশকে বাংলাদেশের কবিতা এক নতুন পেরিফেরিতে প্রবেশ করে। দুই বাংলার কবিতায় যে ভিন্নতার কথা বলা হয় তার মূল সূচনা এই সময়ে। এখানকার কবিতায় ইউরোপিয়ান দর্শন এবং অস্তিত্ববাদী চিন্তা-চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং বহুধা বিভক্ত সমাজের প্রতিধ্বনি, আধুনিক মতাদর্শের সাথে যুক্ত হয়েছে সানিকে, লৌকিক স্বর। নিম্নবর্গীয় কণ্ঠস্বর কখনো কখনো কবিতাকে করে তুলেছে স্লোগানধর্মী। আবার এই কবিতাই হয়ে উঠেছে গভীর নিরীক্ষাধর্মী। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শান্তনু চৌধুরী, সৈয়দ তারিক, জুয়েল মাজহার, কাজল শাহনেওয়াজসহ অনেকেই এই অঞ্চলের কবিতাকে এক উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গেছেন। পরে মাসুদ খান, শামীম কবীর, মজনু শাহ অনেকেই আরও ছুরি-কাঁচি দিয়ে ডিসেকশন করেছেন ভিন্ন ভিন্ন সময়কে, বিষয়কে। বর্তমানেও সে যাত্রা অব্যাহত আছে। কবি পিয়াস মাজিদ, ইমতিয়াজ মাহমুদসহ বহু কবি বাংলাদেশের কবিতায় স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক কবিসহ অগ্রজ কবিদের কবিতায় ইউরোপিয়ান স্বতন্ত্রবাদী মনস্তত্ত্ব বেশ প্রভাব বিস্তারকারী। কবি বিনয় মজুমদার এবং এধারার পরবর্তী কবিরা নাগরিক সমাজের ভেতরের কঙ্কালটিকে চিরে বের করেছেন। আর তা করতে গিয়ে হাত হয়েছে রক্তাক্ত। কখনো কুসুমাস্তীর্ণ। দুই বাংলার কবিতার পার্থক্য খুঁজতে যাওয়া খুব একটা সহজ না এবং তার দরকারও তেমন নেই। কারণ বাংলা একটি ভাষা। এর বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এবং তা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা নিয়ে বিকশিত হচ্ছে। মোটাদাগে সদ্যস্বাধীন একটি দেশের মানুষের মনোসমীক্ষণ আর সত্তর বছর আগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশের মানুষ এবং কবিদের মনস্তাত্ত্বিক যে ব্যবধান, সেটা কোনো সরল সমীকরণ নয়, এক মিশ্র ভূরাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জটিল মানসাঙ্ক। এখানকার সমসাময়িক কবিতা হয়ে উঠেছে ফসলের খেতে নিড়ানি দেয়ার পরিশ্রমের মতো শুদ্ধ, সবুজাভ। আর পশ্চিমবঙ্গের কবিতা বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আজ তীরে এসে দণ্ডায়মান। সে কবিতা কালের সাক্ষ্য বহন করছে, তার হৃদপিণ্ডের আঘাত শুকিয়ে এখন বেগুনি পদ্ম প্রস্ফুটিত হচ্ছে। ঔপনিবেশিক সময়ের নীলকুঠিগুলো জানিয়ে দিচ্ছে, এখানে অনেক বেদনা, মৃত্যু ও জন্ম লুকিয়ে আছে। একটু একটু করে সে গর্ত খুঁড়ে খুঁজে আনতে হবে সময়ের নায়ককে। দুই বাংলার কবিতা একই ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে, কেউ খানিকটা এগিয়ে গেছে, কেউ পথ পরিক্রমায় ব্যস্ত। দুই বাংলার কবিরা সমবেতভাবে একটি কবিতাই লিখে চলেছেন, একটি সংগীত রচনা করছেন তাদের মন ও মগজে।

আবু তাহের সরফরাজ: আজকের প্রজন্ম পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। হোক সেটা সিনেমা বা অন্য কন্টেন্ট। ব্যাপারটি আপনি কীভাবে দেখছেন?
নভেরা হোসেন: আজকের প্রজন্ম দেখছে বেশি কারণ, দেখবার মতো উপকরণ তৈরি হয়েছে। যেটা আগে ছিল না। যখন যে প্রযুক্তি আসবে, চিন্তা আসবে— তাকেই মানুষ ব্যবহার করবে। এই দেখতে দেখতে পড়াও হচ্ছে, এতে খেদ বা অভিযোগ জানিয়ে তেমন কোনো অর্থ তৈরি হবে না। শুধু কাগজে ছাপা বই পড়ার সময় নয় এখন, গুগল থেকে শুরু করে শত শত ঠিকানায় রয়েছে অসংখ্য জ্ঞানভাণ্ডার। তরুণ, প্রাপ্তবয়স্ক সকলেই সেখান থেকে নিচ্ছে, শুনছে, পড়ছে, দেখছে। বই শুধু এখন পড়ার বস্তু নয়। একে আস্বাদন করার রয়েছে নানা প্রক্রিয়া। সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যেখানে সাহিত্য, শিল্পকলা, প্রযুক্তি— সবকিছুর একত্রে সমাবেশ ঘটে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজার হাজার ওয়েবজি, ব্লগ, পত্রিকা— এসব মানুষ তৈরি করছে, পড়ছে। তার মানে, মস্তিষ্ক অনেক বেশি কাজ করছে। যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক মনে হয়। এটা ঠিক, বই পড়ার মূল্য অনেক। তার প্রযোজনীয়তা আছে এবং সরাসরি বই ছাড়াও পড়ার অনেক মাধ্যম আছে এবং শেষ পর্যন্ত পড়ার বিষয়টি রয়েই যায়।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখার জন্যে নোট নেয়ার দরকার পড়ে কখনও?
নভেরা হোসেন: কবিতা লেখার জন্য ঠিক নোট নেয়ার দরকার না পড়লেও কোনো একটা শব্দ বা বাক্য মনে এলে কখনো কখনো সেটা লিখে রাখি মাথায় বা কাগজে আর খসড়ার থেকেও নতুন কবিতা লেখা হয়। গল্প বা গদ্যের ক্ষেত্রে কিছু কিছু নোট করে রাখি। পরে সেগুলো নিয়ে কাজ করি। আবার অনেক সময় এইসব নোট আর কাজে লাগে না। হারিয়ে যায় বা আগ্রহ থাকে না। সাহিত্য বিষয়টা আমার ক্ষেত্রে ভালো লাগা এবং নিজের কাজের সাথে যুক্ত থাকার মতো। ভালো লাগা থেকে লিখি বা লিখে ভালো লাগা পেতে চাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার লেখালেখি কী রুটিন মেনে চলে, নাকি যখন এলো তখন লেখা, এ ধরনের?
নভেরা হোসেন: রুটিন মেনে লেখার চর্চা এখনো করতে পারি নাই। করতে পারলে ভালো হতো। তবে দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লেখার একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে। কিছু না কিছু লেখা হয়। অন লাইনে থাকলে অযথায় লেখা হয়, পড়া হয়। এছাড়া বই পড়াও চলে নিয়মিত। তবে লেখাটা তো এক রকম নেশার মতো। কখনো কখনো জলোচ্ছাসের মতো আসতে থাকে। সব লেখা হয় না। চিন্তাগুলো হারিয়ে যায়। আবার কখনো পুরোপুরি ব্লক। একটাই নস্পিরেশন বহুদিন লিখিয়ে নেয় আবার কোনো বিষয় দীর্ঘদিন লেখা থেকে দূরে সরিয়েও রাখে।

আবু তাহের সরফলাজ: এবার বইমেলায় আপনার কোনো বই আসছে কি? এ বই নিয়ে কিছু বলুন।
নভেরা হোসেন: একুশে বইমেলায় আমার সরাসরি কোনো বই আসছে না। আসছে কোলকাতা বইমেলায়। কবিতার বই ‘জলে ডোবা চাঁদ’। প্রকাশক ঐহিক। এই বইটি আসলে ঢাকা থেকেই প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল গত বইমেলায়। কিন্তু প্রকাশকের অনিচ্ছাহেতু বইটি আর প্রকাশ হতে পারেনি। পরে আমি কোলকাতার দুই প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করি। দুজনেই করতে আগ্রহী হন। ঐহিকের তমাল রায় আমার বন্ধু। তার সাথে কাজ করতে আগ্রহবোধ করি। প্রচ্ছদ করেছে ঢাকার বিধান সাহা। এখানে পঞ্চাশের অধিক কবিতা আছে। চার ফর্মার বই পেপার ব্যাকে। কবিতাগুলো লেখা হয়েছে ২০১৭-১৯ সময়কালে। এ সময়ের সমসাময়িক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো কবিতায় গুরুত্ব পেয়েছে। নাগরিক জীবনের নানা টানাপোড়েন, রক্তপাত, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৃশংসতা, প্রেম-অপ্রেম, দেশভাগ, অগ্নিকাণ্ড, রোহিঙ্গা ট্রাজেডি, মানবিকতার অবমাননা, ভলোবাসা— বহু কিছুই এই বইয়ের কবিতায় স্থান পেয়েছে। নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে সকল এথনিক জনগোষ্ঠীর প্রতি একটা পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে সবসময়। এই বিষয়টিও লেখায় এসেছে সাঁওতাল গ্রাম, লোগাং এসব কবিতায়। নিজের কবিতাকে ব্যবচ্ছেদ করার চেয়ে পাঠকের প্রতি আমন্ত্রণ রইলো ঐহিক থেকে প্রকাশিত ‘জলে ডোবা চাঁদ’ বইটি নেড়ে চেড়ে দেখার। সম্ভব হলে পড়া এবং সমালোচনা করার। মেলার মাঝমাঝি সময় হতে ঐহিকের স্টলে বইটি পাওয়া যাবে মেলার সরওয়ার্দী উদ্যান অংশে।