আধ্যাত্মসাধক অরবিন্দ ঘোষের আজ মৃত্যুদিন
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৫, ২০২৫
আধ্যাত্মসাধক ও দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষের আজ মৃত্যুদিন। ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। ১৮৭২ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় তার জন্ম। তার পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন রংপুর জেলার জেলা সার্জন। মা স্বর্ণলতা দেবী, ব্রাহ্ম ধর্ম অনুসারী ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসুর কন্যা।
অরবিন্দ ঘোষ বাল্যকালে ইংল্যান্ডে যান লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ট্রাইপস পাস করে দেশে ফিরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার অনুজ বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি কংগ্রেসের চরমপন্থী গ্রুপের নেতৃত্বে থাকাকালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে (১৯০৫-১৯১১) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রংপুরে তার বাবা ১৮৭১ এর অক্টোবর থেকে কর্মরত ছিলেন, অরবিন্দ রংপুরে জীবনের প্রথম পাঁচ বছর পার করেন। ড ঘোষ এর আগে বিলেতের কিংস কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্রে লেখাপড়া করেন। তিনি সন্তানদের ইংরেজি পন্থায় এবং ভারতীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাদানের মনোভাব পোষণ করতেন। তাই ১৮৭৭ সালে দুই অগ্রজ সহোদর মনমোহন ঘোষ এবং বিনয়ভূষণ ঘোষ সহ অরবিন্দকে দার্জিলিংয়ের লোরেটো কনভেন্টে পাঠান হয়।
লোরেট কনভেন্টে দুই বছর লেখাপড়ার পর ১৮৭৯ সালে দুই সহোদরসহ অরবিন্দকে বিলেতের ম্যাঞ্চেস্টার শহরে পাঠান হয় ইউরোপীয় শিক্ষালাভের জন্য। জনৈক রেভারেন্ড এবং শ্রীমতি ড্রিয়ুইটের তত্ত্বাবধানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। রেভারেন্ড ড্রিয়ুইট ছিলেন অ্যাংলিকান যাজক, রংপুরের ব্রিটিশ বন্ধুদের মাধ্যমে যার সাথে ড ঘোষের পরিচয় ছিল। ড্রিয়ুইট পরিবার তিন ভাইকে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষাদান করেন।
১৮৮৪ সালে অরবিন্দ লন্ডনের সেইন্ট পলস স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে গ্রীক, লাতিন এবং শেষ তিন বছরে সাহিত্য বিশেষত ইংরেজি কবিতা অধ্যয়ন করেন। ড কে,ডি, ঘোষ ভেবেছিলেন, তার তিন পুত্রই সম্মানসূচক ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করবেন, কিন্তু ১৮৮৯ সালে দেখা গেল একমাত্র সবার ছোট অরবিন্দই বাবার আশা পূরণ করতে পারবেন, বাকি ভাইয়েরা ইতোমধ্যেই ভিন্ন দিকে নিজ নিজ ভবিষ্যতের পথ বেছে নিয়েছেন।
আইসিএস কর্মকর্তা হওয়ার জন্য ছাত্রদেরকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাশ করতে হত এবং ইংরেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর অধ্যয়নের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন ছিল। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বৃত্তি অর্জন ছাড়া ইংরেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা অরবিন্দের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কিংস কলেজের বৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করায় তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। তিনি কয়েক মাস পর আইসিএস এর লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেন ২৫০ প্রতিযোগীর মাঝে ১১তম স্থান অধিকার করেন।
দুই বছর প্রবেশনের শেষ দিকে অরবিন্দ নিশ্চিত হন যে ব্রিটিশদের সেবা করার ইচ্ছা তার নেই, অতএব, আইসিএস পরীক্ষার অংশ অশ্বারোহণ পরীক্ষায় হাজির না হয়ে অকৃতকার্য হন। একই সময়ে বারোদার মহারাজ ৩য় সায়াজিরাও গায়কোয়াড় বিলেত ভ্রমণ করছিলেন। স্যার হেনরি কটনের ভাই জেমস কটন, যিনি কিছুদিন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং সাউথ কেন্সিংটন লিবারেল ক্লাবের সচিব ছিলেন, অরবিন্দ ও তার বাবার পূর্ব পরিচিতির সুবাদে বারোদা স্টেস সার্ভিসে অরবিন্দের চাকুরির ব্যবস্থা করেন এবং যুবরাজের সাথে অরবিন্দের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। অরবিন্দ বিলেত ছেড়ে ভারত অভিমুখে যাত্রা করেন ১৮৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে।[৮] ভারতে অপেক্ষারত অরবিন্দর বাবা বোম্বের এজেন্টের কাছ থেকে ভুল সংবাদ পান, পর্তুগালের উপকূলে অরবিন্দর জাহাজডুবি ঘটেছে। ড ঘোষ আগেই অসুস্থ ছিলেন, এই দুঃসংবাদের ধাক্কা সামলাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন।
বারোদায় অরবিন্দ স্টেস সার্ভিসে যোগদান করেন সার্ভিস এন্ড সেটলমেন্ট বিভাগে, পরে কোষাগার হয়ে অবশেষে সচিবালয়ে গায়কোয়াড়ের জন্য বক্তৃতা লেখার কাজে নিযুক্ত হন। বারোদায় অরবিন্দ ভারতীয় সংস্কৃতির উপর গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন, নিজ ঊদ্যোগে সংস্কৃত, হিন্দি এবং বাংলা, বিলেতের শিক্ষায় যেসব থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। অধ্যয়নে বেশি মনোযোগী হওয়ায় অন্যান্য কাজে সময়ানুবর্তিতার অভাব দেখা দেয় এবং ফলস্বরূপ পরবর্তীতে তাকে বারোদা কলেজে ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানে অল্পদিনেই তিনি জনপ্রিয়তা পান অপ্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির কারণে। পরবর্তীতে কলেজের উপাধ্যক্ষের পদেও আরোহণ করেন। তিনি বারোদা থেকেই তার প্রথম কাব্য সঙ্কলন The Rishi প্রকাশ করেন। একই সময়ে তিনি ব্রিটিশবিরোধী সক্রিয় রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
বারোদা স্টেটে অধিকৃত পদের কারণে পর্দার আড়াল থেকেই কাজ করা শুরু করেন। বাংলা ও মধ্য প্রদেশে ভ্রমন করে বিপ্লবী দলগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। লোকমান্য তিলক এবং ভগিনী নিবেদিতার সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বাঘা যতীন হিসেবে পরিচিত যতীনাথ ব্যানার্জীর জন্য তিনি বারোদার সেনাবিভাগে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং পরবর্তীতে তাকে বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলোকে সংগঠিত করার কাজে পাঠান। অরবিন্দ ঘোষের রচিত ৩২টি গ্রন্থের মধ্যে বাংলা গ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি।























