তৈমুর খানের গদ্য ‘সাহিত্যপাঠে কী হয়?’
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : জানুয়ারি ০৮, ২০২৬
সাহিত্য না বোঝার বয়স থেকেই আমি সাহিত্যে আলোড়িত হয়েছি। সাহিত্য পাঠের একটা আবহাওয়া বাড়ির মধ্যেই ছিল। বাবা পাঠ করতেন প্রাচীন নানা পুঁথিপত্র ও কেচ্ছা-কাহিনি। পয়ার-ত্রিপদীতে লেখা সেসব পুঁথিপত্রের সুরমাধুর্য আমার হৃদয়ে প্রবেশ করত। নিজের মধ্যেই একটা কল্পনার স্বর্গরাজ্য নির্মাণ করতে শিখেছিলাম। বাড়িতে অন্নের অভাব থাকলেও দারিদ্র্যকে চরম তাচ্ছিল্য করতে শিখেছিলেন বাবা সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করে। সেদিন বাবার ওই আদর্শই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তারপর যত বড় হয়েছি সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরেছি। যত মনখারাপ ও আঘাত এসেছে, সাহিত্যের কাছেই ছুটে গেছি। যত দুঃখ বেদনা শূন্যতা জীবনে এসেছে তা কেবল সাহিত্যের কাছেই সেই অভিমান বলতে পেরেছি।
বাবার সত্যবাদিতা ও সততা যেমন আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে তেমনি আমিও সেখান থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেছি আর এর মূল উৎস যে সাহিত্যই তা ভাবতে আমার দ্বিধা হয়নি। তাই সাহিত্যকেই জীবনের চরম ও পরম পাথেয় করে বেঁচে থাকার আশ্রয় ও রসদ পেয়েছি। সাহিত্যকে ভালোবাসার কারণে অনেকের কাছেই উপেক্ষার পাত্র হয়েছি, কটূ কথাও শুনতে হয়েছে। সাহিত্যকে ভালোবাসা কোনো বীরত্বের কাজ নাকি? সাহিত্যকে ভালোবাসা স্বর্গ লাভের উপায় নাকি? সাহিত্যকে ভালোবাসা উন্নতি লাভের সূচক নাকি? সাহিত্যকে ভালোবেসে কি পেটের ভাতের সংস্থান হয়? সাহিত্যকে ভালোবেসে কি সংসার করা যায়? এসব প্রশ্নও কোনো না কোনো সময় কারো না কারো মুখ থেকেই শুনতে হয়েছে।
কখনো উত্তর দিয়েছি নিচু স্বরে, কখনো নীরবতার মধ্য দিয়ে। তারপর বহু খোঁজাখুঁজির পর এই প্রশ্নটিই মনের মধ্যে জেগে উঠেছে, সাহিত্যকে যারা ভালোবাসে না তারা কেমন মানুষ হতে পারে? আবার যারা সাহিত্যকে ভালোবাসে তারা কি সবাই ভালো মানুষ হয়? এই দুটি প্রশ্নেরই উত্তর চেয়েছি নিজের কাছেই আর তা নিজের মতোই উত্তর দেবার চেষ্টা করেছি এখানে।
যারা কাব্য-সাহিত্য ভালোবাসে না তাদের সম্পর্কে সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের ধারণা সাধারণত খুব একটা ইতিবাচক নয়। কবি ও লেখকরা মনে করেন, সাহিত্য মানুষের মনের জং ধরানো ভাব দূর করে, হৃদয়কে কোমল করে এবং সহমর্মিতা শেখায়। তাই যারা এর থেকে দূরে থাকেন তাদের সম্পর্কে বেশ কিছু কড়া মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
সংস্কৃত শ্লোকে কঠোর সমালোচনা করেছেন ভর্তৃহরি
প্রাচীন সংস্কৃত কবি ও দার্শনিক ভর্তৃহরি তাঁর `নীতিশতকম` গ্রন্থে সাহিত্যবিমুখ মানুষদের সম্পর্কে সবচেয়ে বিখ্যাত ও কঠোর উক্তিটি করেছেন, সাহিত্যসংগীতকলাবিহীন: সাক্ষাৎশু: পুচ্ছবিষাণহীন:। বাংলায় অনুবাদ করলে, যে ব্যক্তির সাহিত্য, সংগীত বা কলার (শিল্প) প্রতি কোনো অনুরাগ নেই, সে লেজ ও শিংবিহীন পশুর সমান। সে ঘাস না খেয়েও বেঁচে থাকে, এটা পশুদের পরম ভাগ্য (কারণ সে ঘাস খেলে পশুদের খাবারে টান পড়ত)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, মানুষের জীবনের দুটি দিক আছে— একটি হলো প্রয়োজনের দিক (জীবিকা, টাকা), আর একটি হলো অপ্রয়োজনের দিক (আনন্দ, সাহিত্য, শিল্প)। যারা সাহিত্য ভালোবাসে না তারা কেবল `প্রয়োজনের` কারাগারে বন্দি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মতে, সাহিত্যের কাজ হলো মানুষের হৃদয়কে বিশ্বের সাথে যুক্ত করা। যারা সাহিত্য পাঠ করে না তাদের মন বা হৃদয় সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে। তারা হয়তো ভালো কর্মী বা ব্যবসায়ী হতে পারে, কিন্তু তাদের মানবিক বা নান্দনিক সত্তাটি অপূর্ণ থেকে যায়।
শেকসপিয়রের দৃষ্টিভঙ্গি
উইলিয়াম শেকসপিয়র তাঁর দ্য মার্চেন্ট অফ ভেনিস নাটকে গান বা সুরের প্রসঙ্গ তুললেও, এটি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি মনে করতেন, যার হৃদয়ে সুর বা ছন্দ নেই সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর অর্থ করলে দাঁড়ায়, যে মানুষের নিজের মধ্যে কোনো সংগীত (বা কাব্যবোধ) নেই এবং যে মিষ্টি সুরে বিচলিত হয় না, সে বিশ্বাসঘাতকতা, চক্রান্ত এবং লুটতরাজের যোগ্য। তার আত্মাকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
প্রমথ চৌধুরীর মন্তব্য
বাংলা সাহিত্যে বীরবল নামে খ্যাত প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাহিত্যবিমুখদের মানসিক দৈন্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করতেন, সাহিত্যচর্চা না করলে মানুষের মন ও বুদ্ধি সজাগ থাকে না। তাঁর মতে, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।’ তার এই স্বশিক্ষার প্রধান মাধ্যম হলো লাইব্রেরি বা সাহিত্যচর্চা। যারা এর ধারেকাছে যায় না, তাদের মনের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে।
সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
যারা সাহিত্য ভালোবাসেন না তাদের ব্যক্তিত্বে সাধারণত এই বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা যায় বলে লেখকরা মনে করেন:
কল্পনা শক্তির অভাব: তারা বাস্তববাদী বা বস্তুবাদী হন, কিন্তু তাদের কল্পনার জগৎ খুব ছোট হয়।
সহমর্মিতার অভাব: সাহিত্য আমাদের অন্যের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। যারা সাহিত্য পড়েন না তারা অনেক সময় অন্যের আবেগ বুঝতে অক্ষম হন বা রুক্ষ স্বভাবের হতে পারেন।
রসবোধহীনতা: জীবন কেবল বেঁচে থাকা নয়, জীবনকে অনুভব করা। সাহিত্যবিমুখ মানুষেরা জীবনের এই সূক্ষ্ম `রস` বা সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হন।
লেখকদের মতে, যারা কাব্য-সাহিত্য ভালোবাসে না তারা হয়তো জাগতিকভাবে সফল হতে পারে, কিন্তু তাদের আত্মার জগৎটি দরিদ্র। তারা জীবনের স্থূল দিকটি দেখে, কিন্তু সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও গভীরতা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়।
তবে সাহিত্যকে ভালোবাসলেই কিংবা পড়লেই কি মানুষ ভালো হয়ে যায়? এটি সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে একটি চিরন্তন বিতর্ক। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নাকি ‘জীবনের জন্য শিল্প’— এই দুই দর্শনের সংঘাত বহু পুরনো। এখানে আমার বিশ্লেষণ ও দ্বিমতের জায়গাগুলো আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
সাহিত্য কেন কেবল বিনোদন নয়, তা সহমর্মিতারও জাগরণ
সাহিত্য মানুষকে ভালো হতে সাহায্য করে— এই যুক্তির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সহমর্মিতা। একজন পাঠক যখন একটি উপন্যাস বা কবিতা পড়েন, তিনি সাময়িকভাবে নিজের সত্তা ভুলে অন্য একজন মানুষের (চরিত্রের) জীবন যাপন করেন। তিনি সেই চরিত্রের কান্না, আনন্দ বা হতাশা অনুভব করেন।
যিনি জীবনে কখনো যুদ্ধ দেখেননি তিনি `পথের দাবী` বা তলস্তয়ের `ওয়ার অ্যান্ড পিস` পড়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুভব করতে পারেন। এই অনুভূতি মানুষের মনের রূঢ়তা কমিয়ে তাকে সংবেদনশীল করে তোলে। আর সংবেদনশীল মানুষ সাধারণত নিষ্ঠুর হতে পারেন না।
সাহিত্য দর্পন হিসেবে আত্ম-শুদ্ধির ক্ষেত্র
সাহিত্য সমাজের ও ব্যক্তির আয়না। শেক্সপিয়রের `ম্যাকবেথ` পড়লে মানুষ ক্ষমতার লোভের ভয়াবহ পরিণাম দেখতে পায়। রবীন্দ্রনাথের `শাস্তি` গল্প পড়লে বোঝা যায় সমাজের নিষ্ঠুরতা। ভালো সাহিত্য আমাদের নিজেদের `অন্ধকার দিক` চিনতে সাহায্য করে। যখন আমরা নিজের ভুলগুলো সাহিত্যের পাতায় অন্যের মধ্যে দেখি, তখন নিজেদের শুধরে নেওয়ার একটি অবচেতন প্রক্রিয়া শুরু হয়। একে গ্রিক দর্শনে `ক্যাথারসিস` বলা হয়, যা মনের জঞ্জাল সাফ করতে সাহায্য করে।
বিনোদনের ভূমিকা যা নান্দনিক আনন্দ
অবশ্যই সাহিত্য বিনোদন, তবে তা `লঘু বিনোদন` নয়। একে বলা হয় `নান্দনিক আনন্দ`। একটি সুন্দর উপমা, একটি ছন্দের দোলা বা গল্পের নাটকীয় মোড়— এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দ দেয়। কিন্তু এই আনন্দ আমাদের চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে না (যেমনটা কিছু সস্তা বিনোদন করে), বরং চিন্তাশক্তিকে শানিত করে। তাই এটি এমন এক বিনোদন, যা মানুষকে ঋদ্ধ করে।
আমার দ্বিমত
সাহিত্যকে ভালবাসলেই মানুষ ভালো হয়ে যায় এই বিষয়ে আমার দ্বিমত আছে নানা কারণে। সাহিত্য পড়লেই মানুষ `ভালো` হয়ে যাবে— এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে অত্যন্ত সাহিত্য-প্রেমী, সংস্কৃতিবান মানুষও চরম নিষ্ঠুর কাজ করেছেন। নাৎসি বাহিনীর অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অত্যন্ত রুচিশীল পাঠক ছিলেন, তারা গ্যেটে বা শিলার পড়তেন, অথচ তারা গণহত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরা সেই শিক্ষিত শয়তান।
সাহিত্য কেবল একটি `টুল` বা যন্ত্র। এটি আপনার হাতে একটি প্রদীপ তুলে দিতে পারে। সেই প্রদীপ দিয়ে আপনি ঘর আলোকিত করবেন, নাকি অন্যের ঘরে আগুন দেবেন— তা নির্ভর করে পাঠকের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও শিক্ষার ওপর। অর্থাৎ চেতনার জগৎ সবার সমান নয়।
অনেকে সাহিত্য পড়েন কেবলই `পলায়নবাদী মনোবৃত্তি` থেকে। তারা বাস্তব জগৎ থেকে পালাতে বইয়ের জগতে ডুব দেন, কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষার প্রয়োগ ঘটান না। তাদের ক্ষেত্রে সাহিত্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না।
আমার মনে হয়, সাহিত্য মানুষকে সরাসরি `ভালো মানুষ` বানায় না, তবে সাহিত্য মানুষকে `ভালো মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা` তৈরি করে দেয়। এটি আমাদের মনের মাটি কর্ষণ করে নরম ও ঊর্বর করে, যাতে সেখানে বিবেকের বীজ সহজে অঙ্কুরিত হতে পারে। কিন্তু সেই বীজ বোনার এবং যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজেরই।
লেখক: কবি






















