আবু তাহের সরফরাজের নিবন্ধ ‘আলো কী’

প্রকাশিত : মে ০১, ২০২৬

আলো সেই শক্তি যে শক্তির সাহায্যে আমরা দেখতে পাই। ঢেউ বা তরঙ্গ আকারে আলো ছড়িয়ে পড়ে। আলোর সেই তরঙ্গ আমাদের চোখে এসে দেখার অনুভূতি তৈরি করে। যেখানে আলো নেই সেখানে আমরা কিছুই দেখতে পাই না। তাই, আলোর অভাবকেই অন্ধকার বলে। আলো কোনো জিনিসের নিজস্ব হতে পারে, আবার অন্য কোনো উৎস থেকে এসে ওই জিনিসটাতে বাধা পেয়ে আমাদের চোখে জিনিসটাকে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে।

অন্ধকার ঘরের কোনো ফুটো দিয়ে আলো ঢুকলে ফুটোর সেই পথটাতে ভেসে থাকা ধুলোকণা আমরা দেখতে পাই। এর কারণ, ফুটোর ওই পথটা দিয়েই আলো সরল পথ ধরে আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু ঘরের বায়ুতে ধুলোকণা না থাকলে ফুটোর যে পথ দিয়ে আলো ঢোকে, সেই পথটি আমরা দেখতে পাই না। কারণ, আলো নিজে অদৃশ্য। কিন্তু যে কোনো জিনিসকে আলো আমাদের চোখে দৃশ্যমান করে তোলে।

উৎস থেকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিগুচ্ছ বা প্যাকেজ আকারে আলো নির্গত হয়। শক্তিগুচ্ছের প্রত্যেকটি প্যাকেটকে কোয়ান্টা বলে। কোয়ান্টাগুলো কণার মতো আচরণ করে। প্রত্যেক রঙের আলোর জন্য শক্তি প্যাকেটের শক্তির একটা পরিমাণ আছে। সবচেয়ে কম পরিমাণের শক্তিসম্পন্ন কণাকে কোয়ান্টাম বা ফোটন বলে। ফোটনের ভর নেই, কিন্তু ভরবেগ আছে।

আলোর কণা রূপ ও তরঙ্গ রূপ দুটোই রয়েছে। আলো যখন চলাচল করে তখন আলো তরঙ্গের মতো আচরণ করে। আলো যখন পদার্থের সাথে তড়িৎচৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়া করে, তখন আলো কণা বা ফোটনের মতো আচরণ করে। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারদিকে বৃত্ত আকৃতির বিভিন্ন কক্ষপথে ইলেকট্রন ঘুরতে থাকে। নির্দিষ্ট দূরত্বের প্রতিটি কক্ষপথে নির্দিষ্ট সংখ্যার ইলেকট্রন থাকে।

পরমাণুতে তাপ কিংবা ওই রকম কোনো শক্তি প্রদান করলে প্রথম দিকের কক্ষপথের ইলেকট্রন লাফিয়ে পরের দিকের কক্ষপথে চলে যায়। আবার এই ইলেকট্রনগুলো তাদের ভেতর জমে থাকা শক্তি বিকিরণ করে নিজ নিজ কক্ষপথে ফিরে আসে। এই শক্তির বিকিরণ ঘটে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ আকারে। এই তরঙ্গ আলো রূপে আমরা আমাদের চোখে দেখতে পাই।

সুতরাং, আলো হচ্ছে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ। কারণ, আলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও চুম্বক ক্ষেত্র রয়েছে। অন্যদিকে, পদার্থের পরমাণুর ইলেকট্রন চার্জিত কণা। পরমাণুর বিভিন্ন কক্ষপথে ইলেকট্রনগুলো একটি নির্দিষ্ট শক্তির শক্তির আকর্ষণে আটকে থাকে। আলোর ফোটন একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম কম্পাঙ্ক নিয়ে কোনো পদার্থের (ধাতব পাত) ইলেকট্রনের কাছাকাছি পৌঁছালে ফোটনের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিয়ে পরমাণুর আকর্ষণ থেকে মুক্ত করে দেয়।

আলোর কম্পাঙ্ক নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের চেয়ে কম হলে কোনো ইলেকট্রন মুক্ত হবে না। আলোর কম্পাঙ্ক নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি হলে ফোটনের শক্তি পেয়ে ইলেকট্রন পরমাণুর আকর্ষণ কাটিয়ে গতিশীল হয়ে ছুটে যাবে। ইলেকট্রন ও ফোটন উভয়ই তড়িৎ চুম্বকীয় প্রকৃতির, তাই তাদের মধ্যে শক্তির আদান-প্রদান ঘটে।

ধরা যাক, একটি ইলেকট্রন পরমাণুর কক্ষপথে শান্ত হয়ে বসে আছে। বাইরে থেকে আলোর একটি ফোটন কণা তীব্র বেগে তার কাছে ছুটে এলো। আলোর শক্তিগুচ্ছ বাতাসের ভেতর দিয়ে যখন আসছিল তখন তরঙ্গের মতো দুলতে দুলতে আসছিল। যখনই সে ইলেকট্রনের সামনে পৌঁছালো তখন সে আর ঢেউ থাকল না, ফোটন রূপে ইলেকট্রনকে ধাক্কা মারল। ধাক্কা মারার সাথে সাথে ফোটনটি তার সব শক্তি ইলেকট্রনকে দিয়ে নিজে বিলীন হয়ে গেল।

ফোটনের শক্তি পেয়ে ইলেকট্রন পরমাণুর বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আলো ও বস্তু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা যায়।

তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালি
আলোর প্রতিটি শক্তিগুচ্ছের শক্তির পরিমাণ নির্ভর করে ওই আলোর কম্পাঙ্কের ওপর। যে আলোর কম্পাঙ্ক যত বেশি, সেই আলোর ফোটনের শক্তি তত বেশি এবং সেই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত কম। যে আলোর কম্পাঙ্ক যত কম, সেই আলোর ফোটনের শক্তি তত কম এবং সেই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত বেশি। আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হয়, কম্পাঙ্ক তত বেশি হয়। কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়।

এগুলো হলো: গামা রশ্মি, এক্সরে, অতিবেগুনি কিকিরণ, দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত রশ্মি, ক্ষুদ্র তরঙ্গ ও বেতার তরঙ্গ। এই সাত রকমের বিকিরণকে বলা হয় তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালি।

গামা রশ্মি: ১ মিটারের ১ লক্ষ কোটি ভাগের ১ ভাগ থেকে গামা রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১ মিটারের ১০০ লক্ষ কোটি (বা তারও বেশি) ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। এই দৈর্ঘ্য পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সমান ক্ষুদ্র। গামা রশ্মির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে ছোট। এ কারণে গামা রশ্মির কম্পাঙ্ক সবচেয়ে বেশি। তাই গামা রশ্মির ফোটনের শক্তিও অনেক বেশি। আমরা যে আলো চোখে দেখতে পাই, সেই আলোর চেয়ে গামা রশ্মির শক্তি পঞ্চাশ হাজার গুণ বেশি।

এক্স-রে: ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ থেকে এক্স-রের তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১ মিটারের ১ লক্ষ কোটি ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। এই দৈর্ঘ্য পরমাণুর ব্যাসার্ধের সমান ক্ষুদ্র। এক্স-রের ফোটনগুলো আমাদের শরীরের মাংসপেশী ভেদ করে যেতে পারে, কিন্তু হাড়ের ভেতর দিয়ে যেতে পারে না। এক্সরের সাহায্যে ফটো তুলে দেহের ভেতরের হাড় ও টিউমার শনাক্ত করা হয়।

অতিবেগুনি রশ্মি: ১ মিটারের ১ কোটি ভাগের ১ ভাগ থেকে অতিবেগুনি রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। এই দৈর্ঘ্য ব্যাকটেরিয়া কিংবা বড় ভাইরাসের সমান ক্ষুদ্র। অতিবেগুনি রশ্মির প্রধান উৎস সূর্যের আলো। অতিবেগুনি রশ্মি আমাদের শরীরের ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি করে। বেশি সময় ধরে অতিবেগুনি রশ্মি শরীরে পড়লে ত্বকের ক্ষতি হয়।

দৃশ্যমান আলো: ১ মিটারের ১৩ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ থেকে দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১ মিটারের ২৬ লক্ষ ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। এই সীমার মধ্যে সাত রকম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে কারণে আলোর সাতটি বর্ণ আমরা দেখতে পাই। দৃশ্যমান মানে যা চোখে দেখা যায়। সূর্যের সাদা আলো প্রিজমের একটি প্রতিসারক তলে আপতিত হলে সাদা আলোর ভেতর থাকা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের ৭টি আলোকরশ্মি বিভিন্ন কোণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ৭টি বর্ণ-রশ্মিকে বর্ণালি বলে।

বর্ণালির ৭টি বর্ণ হচ্ছে: লাল, নীল, বেগুনি, কমলা, সবুজ, হলুদ ও আকাশি। এটা থেকে বোঝা যায়, সাদা আলো আসলে ৭টি বর্ণের মিশ্রণ। বিভিন্ন বর্ণের রশ্মিগুলো প্রিজমের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন পরিমাণে প্রতিসৃত হয়। এ কারণে সাদা আলো প্রিজমের ভূমির দিক থেকে ৭টি বর্ণে বিভক্ত হয়ে বর্ণালি তৈরি করে। বর্ণালির সব থেকে ওপরে থাকে লাল বর্ণের আলো, আর সবার নিচে থাকে বেগুনি বর্ণের আলো। লাল বর্ণের আলোর কম্পাঙ্ক সবচেয়ে কম, তাই তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। বেগুনি বর্ণের আলোর কম্পাঙ্ক সবচেয়ে বেশি, তাই তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম।

যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, কোনো মাধ্যমে বাধা পেলে সেই আলোর বেঁকে যাওয়ার পরিমাণ তত কম। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি বলে প্রিজমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় লাল আলো সবচেয়ে কম বেঁকে যায়, তাই লাল আলো বর্ণালির ওপরে অবস্থান করে। বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম বলে প্রিজমের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বেগুনি আলো সবচেয়ে বেশি বেঁকে যায়, তাই বেগুনি আলো বর্ণালির নিচে অবস্থান করে।

সাতটি বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে শুরু ও শেষ সীমা

বর্ণ                            সীমা শুরু                                          সীমা শেষ
বেগুনি    ১ মিটারের ২৬ লক্ষ ৩১ হাজার ভাগের ১ ভাগ।    ১ মিটারের ২৩ লক্ষ ৮১ হাজার ভাগের ১ ভাগ।
নীল       ১ মিটারের ২৩ লক্ষ ৮১ হাজার ভাগের ১ ভাগ।    ১ মিটারের ২০ লক্ষ ৪১ হাজার ভাগের ১ ভাগ।
আকাশি   ১ মিটারের ২০ লক্ষ ৪১ হাজার ভাগের ১ ভাগ।     ১ মিটারের ২০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ।
সবুজ      ১ মিটারের ২০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ।                ১ মিটারের ১৭ লক্ষ ৫৪ হাজার ভাগের ১ ভাগ।
হলুদ       ১ মিটারের ১৭ লক্ষ ৫৪ হাজার ভাগের ১ ভাগ।     ১ মিটারের ১৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ।
কমলা     ১ মিটারের ১৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ।     ১ মিটারের ১৫ লক্ষ ৬২ হাজার ভাগের ১ ভাগ।
লাল       ১ মিটারের ১৫ লক্ষ ৬২ হাজার ভাগের ১ ভাগ।     ১ মিটারের ১৩ লক্ষ ৩৩ হাজার ভাগের ১ ভাগ।

১ মিটারের ভাগের সংখ্যা যত বেশি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ছোট। যেমন: বেগুনি।
১ মিটারের ভাগের সংখ্যা যত কম, তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত বড়। যেমন: লাল।

অবলোহিত রশ্মি: ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল একটি প্রিজমের মাধ্যমে সূর্যের আলোকে বিভিন্ন বর্ণের আলোয় বিভক্ত করেন। এরপর বিভিন্ন আলোয় থার্মোমিটার রেখে তিনি পরীক্ষা করেন, কোন বর্ণের আলো থার্মোমিটারকে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত করে। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, বর্ণালিতে লাল আলোর পরের অন্ধকার যে এলাকা, সেখানেও তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঘটছে। এর মানে, সেখানে এমন কোনো আলো আছে যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না।

বেগুনি বর্ণের আলোর কম্পাঙ্ক ধীরে ধীরে কমে সবচেয়ে কম কম্পাঙ্কের লাল বর্ণে রূপ নেয়। কম্পাঙ্কের এই পরিবর্তনই আমাদের চোখে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের আলো হিসেবে ধরা পড়ে। হার্শেলের চিহ্নিত সেই আলোর কম্পাঙ্ক লালের চেয়েও কম। তাই এই আলোর নাম অবলোহিত। অব মানে নিচের দিকে গতি, আর লোহিত মানে লাল বর্ণ। তাহলে অবলোহিত মানে দাঁড়াচ্ছে, লালবর্ণের চেয়েও কম কম্পাঙ্কের আলোক বর্ণ। ১ মিটারের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগ থেকে অবলোহিত রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয় এবং শেষ হয় ১ মিটারের ১৩ ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। অবলোহিত রশ্মির দৈর্ঘ্য একটি সরু সুতার আঁশের মতো।

তরঙ্গের ক্ষেত্রে কম্পাঙ্ক কমার মানে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়া। দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে অবলোহিত আলোর ফোটনের খুব বেশি শক্তি থাকে না। ফলে আমাদের চোখের রেটিনা অবলোহিত আলো শনাক্ত করতে পারে না। অবলোহিত আলো খালি চোখে দেখা না গেলেও এই আলোর তাপ আমরা অনুভব করতে পারি। তাপের সাথে অবলোহিত রশ্মির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোনো বস্তু যখন উত্তপ্ত হয় তখন সেই বস্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য নয়, বরং একগুচ্ছ তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্গত করে। তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে তাপ আমাদের ত্বকে এসে লাগে। কোনো বস্তুর তাপমাত্রা –২৭৩০০ সেলসিয়াসের বেশি হলেই সেই বস্তু থেকে অবলোহিত রশ্মি রূপে তাপ নির্গত হয়।

নির্দিষ্ট ওই সীমার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আমাদের চোখ দেখতে পাই না, কিন্তু আমাদের ত্বক ওই তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের তাপ অনুভব করতে পারে। ওই বস্তুর তাপমাত্রা আরও বেশি হলে বস্তুটি অবলোহিত রশ্মির পাশাপাশি দৃশ্যমান আলো নির্গত করে। তাপমাত্রা যত বাড়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত কমে। সূর্যের তাপমাত্রা ৫৭৭৮ কেলভিন বা ৯৯৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে সূর্যের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ০.৪ থেকে ০.৭ মাইক্রন। মানবদেহ থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১০ মাইক্রন। পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণ—এই তিন পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালিত হয়। অবলোহিত রশ্মি বিকিরণের ক্ষেত্রে সঞ্চালনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে তাপ।

বৈদ্যুতিক যে বাতি আমরা ব্যবহার করি সেই বাতিতে তাপশক্তি ১০ ভাগের মতো আলোয় রূপান্তরিত হয়, বাকি ৯০ ভাগ অবলোহিত রশ্মির রূপ নিয়ে তাপ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এর মানে, দৃশ্যমান আলোরূপে খুবই কম তাপ নির্গত হয়। বেশির ভাগ তাপ নির্গত হয় অবলোহিত রশ্মিরূপে। খালি চোখে দেখা না গেলেও অন্ধকারে ছবি তোলা ও টেলিভিশনের মতো যন্ত্রপাতির রিমোট কন্ট্রোলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা অবলোহিত রশ্মি ব্যবহার করে চলেছি।

আমাদের চোখ যদি অবলোহিত রশ্মি দেখতে পেত, তাহলে আমাদের চারপাশের পরিচিত পৃথিবীটা মুহূর্তেই সম্পূর্ণ বদলে যেত। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত বলে কিছুই থাকত না। কারণ, সূর্য না থাকলেও প্রতিটি বস্তু সারা দিন যে তাপ শোষণ করে, সেই তাপ রাতে অবলোহিত রশ্মি হিসেবে বিকিরণ করে। ফলে রাতে সব কিছু হালকা আলোর মতো উজ্জ্বল দেখাতো। আমাদের শরীরের তাপমাত্রা চারপাশের পরিবেশের চেয়ে বেশি। তাই অন্ধকারে কোনো মানুষকে দেখলে মনে হতো, মানুষটির ভেতর থেকে উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসছে। চুলায় হাঁড়িতে পানি গরম করার সময় তাপ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা রঙের খেলা হিসেবে আমরা দেখতে পেতাম।

মাইক্রো তরঙ্গ: ১ মিটারের ১০০ ভাগের ১ ভাগ থেকে মাইক্রো তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে সীমা শুরু হয়ে শেষ হয় ১ মিটারের ১ লক্ষ ভাগের ১ ভাগে গিয়ে। মাইক্রো তরঙ্গের দৈর্ঘ্য চিনির দানা থেকে শুরু করে মশার সমান।

বেতার তরঙ্গ: ১ মিটার থেকে শুরু হয়ে বেতার তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১০০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।