ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান, চোক্তাখোলা, ত্রিপুরা

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান, চোক্তাখোলা, ত্রিপুরা

আমরা কবিতার জন্য ইম্ফল গিয়েছিলাম

পর্ব ১৯

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৭, ২০১৯

তাপস দেবনাথ ও আকবর আহমেদ একদিন আমাকে আর মঞ্জু সরকারকে প্রায় সারা ত্রিপুরা ঘুরে দেখিয়েছেন। হ্যাঁ, একটা প্রাইভেট কার ভাড়া করে আমরা চারজন বেরিয়ে পড়েছিলাম আগরতলা থেকে, সারাদিনের জন্য। প্রথমেই তারা দুজন আমাদেরকে নিয়ে যান সিপাহজালা জেলার জুমের ঢ্যাপা গ্রামে। বড় বড় গাছপালার ছায়াঘেরা মেইন সড়ক থেকে নেমে আরো ভেতরের একটা রাস্তায় গিয়ে হাবুল ব্যানার্জির বাগানে থেমেছিল আমাদের কার। গাছপালা, শাকসব্জির বাগানঘেরা এ-জায়গাতেই নাকি ১৯৭১ সালে ডা. জাফরউল্লাহর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল চিকিৎসাকেন্দ্র। শরণার্থী শিবিরের পীড়িত মানুষের যেমন চিকিৎসা সেবা চলতো এখানে, আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরও শুশ্রুষা-সেবা দেয়া হতো। আমি চারদিকের গাছপালার দিকে তাকাই, নিথর ছায়া শীতলতা। মাটির দিকে চোখ রাখি, মাটির রং লাল। কেন, এ মাটির সঙ্গে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের অজানিত শহিদের লাল রক্ত, সে-কারণে? এখানকার প্রকৃতিও যেন কেমন স্তব্ধ শান্ত রুদ্ধবাক। তবু কেউ না বলে দিলে বোঝার উপায় নেই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে নিভৃতি এ অঞ্চল।

মুক্তিযুদ্ধের রক্ত হিম করা বাস্তবতার জমিন দেখানোর পর, তাপস দেবনাথ আর আকবর আহমেদ আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন রূপকথার এক অপরূপ রাজ্যে। সিপাহজালারই মেলাঘরে। রুদ্রসাগরের তীরে ছায়াঘেরা মনোরম ঘাটলায় দাঁড়িয়ে দূরের নিরমহলকে দেখে আক্ষরিক অর্থেই আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম বন্দি রাজকুমারীর বিভোল রূপে। যে-রাজকুমারীকে প্রতিদিন ঘুম পাড়িয়ে রাক্ষসরাজ যান শিকার সন্ধানে। একদিন এক রাজার কুমার এসে সোনার কাঠি রূপার কাঠির ছোঁয়ায় রাজকুমারীর ঘুম দিল ভাঙিয়ে। পুকুরের নিচ থেকে রাক্ষসের প্রাণভোমরা উদ্ধার করে হত্যা করলো রাক্ষসরাজকেও। সেদিন দূরের নিরমহলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে পড়ছিল, এ কি শুধুই রূপকথা? রূপকথার আড়ালে কি নেই গভীর অন্তর্নিহিত কোনো রূঢ় সত্য? সুন্দরী নারীর প্রতি সমাজের ক্ষমতাশালী বা অশুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের লোভ কোন্ যুগে ছিল না? আজও কি তা এক মুহূর্তের জন্যও থেমেছে? কত নারী যে সেই লোভি রাক্ষসের রিপুতাড়নার বলি হয়েছে, আজো হচ্ছে, তার কি কোনো শেষ আছে? এদের হাতেই তো দগ্ধীভূত হয়ে করুণ মৃত্যুর শিকার হতে হলো ফেনীর নুসরাত জাহান রাফির মতো নিষ্পাপ মাদ্রাসা ছাত্রীকে। এখন আবার প্রকাশ্যে দেখো টাকা-পাগল উকিল সাহেব ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে চলেছে, নসরাত জাহান রাফি নাকি আত্মহত্যা করেছে। ধিক্কার! এদেরকে ধিক্কার! মিথ্যার মুখে থুতু!
 
অবশ্য ত্রিপুরা রাজাদের সম্পর্কে তেমন কোনো পীড়ন কাহিনির কথা শোনা যায় না। প্রজাহিতৈষী বলেই তাদের যতো সুনাম ছিল। আর তাদের একটা দুর্বলতা ছিল মণিপুরি নারীদের প্রতি। বেশ কয়েকজন ত্রিপুরার রাজা মণিপুরি রাজকুমারীকে বিয়ে করে চিরজন্মের মতো আগরতলায় নিয়ে এসেছিল রাণী বানিয়ে! আজো তাই যোগাযোগের পথ দুর্গম সত্ত্বেও ত্রিপুরা আর মণিপুরের মধ্যে মিঠা একটা সম্পর্ক জোরদার আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনকেও বাঙ্ময় করেছিল, কিছুটাও বুঝিবা সাজিয়েও দিয়েছিল ত্রিপুরার রাজপরিবার। তাই বুঝি সৃষ্টিকর্তা এ-পরিবারকে উপহার দিয়েছিল শচীন দেববর্মণ আর রাহুল দেববর্মণের মতো দুই যুগান্তকারী সঙ্গীত প্রতিভাকে। আহা, একজন যেমন বাঙলার নিজস্ব সুরের ধারা আত্মস্থ করে নিংড়ে দিয়েছে কত না নতুন যুগোত্তীর্ণ গান! আরেকজন সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা গানে যুক্ত করেছে পাশ্চাত্যের শিহরণ-অনুভূতি এবং ভঙ্গিমা! প্রিয় পাঠক, চলুন না, পাঠ-বিরতি দিয়ে চোখ বুঁজে শুনে নিই বাপবেটার দুটো গান। তারপর আবার আসা যাবে এই ভ্রমণ-পাঠে। আমার পছন্দ শচীন কর্তার, আকাশে, আকাশে ছিল না বলে হায়... চাঁদের পালকি, তুমি হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যায়... আসোনি কাল কি? আপনার? আপনার কোনটা পছন্দ? আর রাহুল দেব বর্মণের বেছে নিচ্ছি এ-গানটা, শোনো মন বলি তোমায়/ সব করো, প্রেম করো না/ প্রেম যে কাঁঠালের আঠা/ লাগলে পরে ছাড়ে না...

প্রিয় পাঠক, সাবধান! গানের ক্যারাভ্যানে কিন্তু আবার ভেসে যাবেন না! এ-দুটো গান শেষ হয়েছে তো, চলুন ফেরা যাক আবার আমার ভ্রমণ গহনে! তা যা বলছিলাম! নিরমহল নামের এই অনন্য জলঢাকা রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য। এর নির্মাণ শুরু হয় ১৯৩০ সালে, শেষ হয় ১৯৩৮ সালে। হিন্দু এবং মুসলিম স্থাপত্য শৈলীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নিরমহল রুদ্রসাগরের ওপার থেকে দেখতে যতটা রহস্যময় লাগে, কাছে গেলে ততটা নয়। কাছে গেলে তো স্বপ্নের মানুষটির প্রতিও মুগ্ধতা কিছুটা হলেও কমে আসে। আসে না? এটাই বাস্তবতা। তবু এই রাজপ্রাসাদ দেখার অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই ব্যর্থ হওয়ার নয়। ভালো লাগবে সুরম্য প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঘুরতে, প্রসাদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রুদ্রসাগরের নানা দিকের রূপকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনায় আবিষ্কার করতে! ভারতে এই জলপ্রাসাদটির পাশাপাশি আরো একটা জলপ্রাসাদ রয়েছে রাজস্থান রাজ্যের জালমহলে। ত্রিপুরার হ্রদ প্রাসাদ হিসেবে পরিচিত এ-নিরমহল তৈরি হয়েছিল রাজাদের গ্রীষ্মকালীন সময়ে বসবাসের জন্য। প্রাসাদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছিল ব্রিটিশ কোম্পানি মার্টিন ও বার্নস।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি জুমের ঢ্যাপা গ্রাম থেকে রূপকথাতূল্য নিরমহল, তারপর সে-অঞ্চল ছাড়িয়ে আমরা বেশ দীর্ঘ এক ভ্রমণ শেষে পৌঁছাই বিলোনিয়া মহকুমার সীমান্তবর্তী এলাকা রাজনগরে অবস্থিত তৃষ্ণা অভয়ারণ্যে। বনভূমির ভেতর জলসিঞ্চিত রিসোর্টে আড্ডা দিতে দিতে আমি, মঞ্জু সরকার, তাপস দেবনাথ ও আকবর আহমেদ অতি রোমাঞ্চকর এক গা থমথমে পরিবেশে খানিকটা হলেও আদিমতার স্পর্শ লাভ করি। আমরা শুনি অরণ্যকে ঘিরে রোমহর্ষক সব ঘটনার বিবরণ। এক নিরাপত্তা কর্মী নিজের রুমে বিছানায় বসে টিভিতে সিনেমা দেখছিলেন। হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখেন এক কিং কোবরা তার দিকে ফণা তোলে রয়েছে। প্রথমে ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন যে, এটা বুঝি সিনেমারই কোনো অংশ। শেষ পর্যন্ত গতিক সুবিধা হবে না দেখে দিশজ্ঞান হারিয়ে কীভাবে যে লম্ফঝম্ফ দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তা বলতে পারবেন না। পরে সাপটিকে লোকজনের সাহায্যে ধরে থলেতে ভরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল গভীর অরণ্য-মাঝে।

আরেক নিরাপত্তা কর্মী নাকি কর্মস্থলে আসার প্রথম দিনই, জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে গহিন নির্জনতায় গিয়ে যখন বিশুদ্ধ হাওয়া সেবন করছিলেন, তখনই দেখতে পান হাত দশেক দূরে দুপাশে দুটি বাঘ— প্রায় ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে আর কি! তিনি আর বীরত্ব দেখানোর কোনোরূপ চেষ্টা না দেখিয়ে সোজা অজ্ঞান হয়ে যান। বাঘ দুটিও আগরতলার বলে কথা, আগরতলার রাজা-মহারাজাদের মতোই বিনয়ের অবতার, অজ্ঞান মহাশয়কে করুণা দেখিয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল গভীর অরণ্যের ভেতর। এমন সব রোমহর্ষক ঘটনা নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে বিলোনিয়া মহকুমার সীমান্তবর্তী এলাকা রাজনগরের তৃষ্ণা অভয়ারণ্য। এখানে উল্লুক, বাইসন, চশমা বানরসহ দেখা মেলে অসংখ্য প্রজাতির পাখি এবং বিচিত্র বণ্যপ্রাণীর।

তৃষ্ণা অভয়ারণ্য থেকে আমরা যখন বেরিয়ে আসি তখন দুপুর পড়তে শুরু করেছে। রোদের তাপও উত্তাপ হারিয়ে হয়ে উঠছে পেলব। সেই মনোরম পরিবেশে কবি আকবর আহমেদ আর তাপস দেবনাথ আমাদেরকে দিলেন সর্বশেষ এক দারুণ চমক। তারা তৃষ্ণা অভয়ারণ্য থেকে বেরিয়েই মাত্র পাঁচ কী দশ মিনিটের মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন চোত্তাখোলায় নির্মীয়মান ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যানে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সারা ভারতের যতটুকু অবদান, তারচেয়ে বেশি অবদান শুধু এ-ত্রিপুরা রাজ্যের। এ-রাজ্যের প্রতি প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের অনেক ঘটনা, অনেক দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার। কত শরণার্থীকে যে তারা দিয়েছিল আশ্রয়, লক্ষ ঘরহারা মানুষ পেয়েছিল একটুকু বাঁচার অবলম্বন! শুধু কি তাই! বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের নানা কার্যক্রমের খবর পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে সহায়তা করেছিল আগরতলার সাংবাদিকবৃন্দ। বন্ধুত্বের সেই সহযোগিতার স্মৃতিকে মূর্ত করে তুলতেই চোত্তাখোলায় ১২১ কানি জায়গার ওপর গত পাঁচ বছর ধরে গড়ে উঠছে এই গৌরব স্মৃতিময় উদ্যান। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে এখানেও তৈরি করা হয়েছে বিশাল এক স্মৃতিস্তম্ভ। উদ্যানের প্রতিটি প্রান্ত থেকে চোখে পড়ে সে-স্মারক চিহ্ন। টিলাময় পাহাড়িসজ্জা, দীঘিকে ঘিরে জলের ফোয়ারা, অরণ্যের ধাচ জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যেমন যোগ করেছে অকৃত্রিম মাত্রা, তেমনি বিশাল এলাকাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক স্মৃতিফলক, ম্যুরাল, মনুমেন্ট, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত ঘিরে টেরাকোটা, ভাস্কর্য স্থাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে রেখেছে নানা শিল্পোত্তীর্ণ উদ্যোগ। এই উদ্যানের সজ্জা এবং আলংকরণের দায়িত্ব পালন করছেন নাকি বাংলাদেশেরই শিল্পীগণ। তারা বছরের পর বছর ধরে চোত্তাখোলায় থেকেই অংশ নিচ্ছেন এর সাজসজ্জার কাজে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এমন সব কৃতিমান শিল্পী কিংবা ভাস্কর দলের সঙ্গে দেখা হলো না। পুরো উদ্যানটি ঘুরেফিরে দেখেশুনে মনে হলো, এ জায়গাটা শুধু মানুষকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা রাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাই মনে করিয়ে দেবে না, প্রকৃতি প্রেমিক মানুষকে দেবে দু-দণ্ড আশ্রয়। চলবে

ধারাবাহিক