আগরতলার উজ্জয়ন্ত রাজপ্রসাদ

আগরতলার উজ্জয়ন্ত রাজপ্রসাদ

আমরা কবিতার জন্য ইম্ফল গিয়েছিলাম

পর্ব ২০

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৪, ২০১৯

আমার গত ত্রিপুরা ভ্রমণের কথা মনে করিয়ে দেওয়া তাপস দেবনাথের আমার শহর আগরতলা বইটি কিনে নিয়ে, অক্ষরবৃত্তের আড্ডা শেষে আমরা যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম, সন্ধ্যা তখন ঘন হয়ে এসেছে। বিপুল অন্ধকার গ্রাস করে ফেলেছে শহর আগরতলাকে। শহরের বুকে হেঁটে যেতে যেতে এক নতুন আগরতলার রূপ আমাদের চোখে অদৃশ্য থাকে না। মোবাইল, কম্পিউটার এবং ইলেকট্রনিকস পণ্য-ভিত্তিক নানা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন জ্বলছে আলোকসজ্জিত হোর্ডিং ব্যানার নিয়ন সাইনবোর্ডে। আগের যাত্রায় এসে এ ধরনের কোনো বিজ্ঞাপন চোখে পড়েনি। বোঝা যাচ্ছে, বামফ্রন্ট থেকে বিজেপির হাতে ক্ষমতা আসার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে শহরের বাহ্যিক রূপ।

শুধু যে শহরের বাইরের রূপই পাল্টে যাচ্ছে তা নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনচর্চারও ঘটছে পরিবর্তন। পুলিন রায়ের জন্য একটি ব্যাগ কিনতে এবং ওর পেন ড্রাইভে আনা এনওসি-এর একটি প্রিন্ট নেয়ার জন্য কম্পিউটার দোকান খুঁজতে খুঁজতে আমরা শহরের নানা অলিগলি এ-প্রান্ত সে-প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছিলাম। সেই ঘোর হাঁটাহাঁটির সময়ই বদলে যাওয়া আগরতলার কোনো এক গলিতে দৃশ্যমান হলো, একটি দ্বিতল বাড়ির খোলা গেটকে ঘিরে এ-প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের লম্বা লাইন। তাদের প্রায় কারো শরীরেই চিরচেনা চিরন্তন বাঙালি পোশাক সাধারণ শার্টপ্যান্ট বা সালোয়ার কামিজ নেই। তরুণ-তরুণী সবাই পরে আছে পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাক-আষাক, যেমন শর্টস, গেঞ্জি, জিন্স প্যান্ট। সে-বাড়িটার ভেতর থেকে যেমন কেউ কেউ বেশ উৎফুল্লতা ছড়িয়ে বের হয়ে লাইনকে চলিষ্ণুতা দান করছে, নতুন আর একদল ছেলেমেয়ে স্কুটি কিংবা বাইক থেকে নেমে নেমে লাইনকে আবারো দীর্ঘতর করে যাচ্ছিল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, দ্রাক্ষারস কেনার জন্যই পড়েছে এমন-লাইনের হিড়িক। প্রতিদিনই এমন লাইন হয় কিনা জানি না, সেদিন বোধহয় ছুটির আগের দিনের সন্ধ্যা হয়ে থাকবে অথবা কোনো একটা পর্ব-টর্ব ছিল।

অক্ষরের আড্ডা দিতে গিয়ে যে আমরা বেশ সময়ই ব্যয় করেছি ফেলেছিলাম, তা টের পাওয়া যাচ্ছিল কম্পিউটার দোকানের খোঁজ করতে গিয়ে। অনেক দোকানের ঝাঁপিই এর মধ্যে নেমে গিয়েছে। অনেক ঘোরাঘুরির পর অবশেষে যখন পুলিন রায় এনওসি কপিটি প্রিন্ট করার জন্য কমপিউটার অপারেটরের হাতে ওর পেইন ড্রাইভটা তুলে দিতে পারলো, তখনই আমার হুঁশ হলো যে, আরে, আমারও তো পেইন ড্রাইভটা সঙ্গে নিয়ে আসা উচিত ছিল। এনওসি কপিটা যেমন পুলিন রায়ের আগামীকালই লাগবে, ইম্ফল এয়ারপোর্টে ওটা না দেখালে ও ইমিগ্রেশনের গণ্ডি পার হতে পারবে না, আমারো তো তেমনই নিজের পেইন ড্রাইভে রাখা কবিতাগুলোর প্রিন্ট নিতে না পারলে, কিছুতেই ইম্ফলের কবিতা উৎসবে কবিতা পাঠ করা সম্ভবপর হবে না! আজ যদি কবিতার প্রিন্ট না নেই হাতে, আগামীকাল তো আর আগরতলার কোনো দোকান থেকে কবিতাগুলো প্রিন্ট করিয়ে নেয়ার সুযোগ পাব না। কেননা আগামীকাল সকাল থেকেই ইম্ফল যাত্রার জন্য আমাদেরকে ধীরে ধীরে তৈরি হতে হবে। আপনভোলা স্বভাবটার জন্য নিজের ওপর খুউব খুউব রাগ হলো।

ফেরার পথে কর্নেল চৌমুহনী রোডের মাথায় কর্নেল মহিম ঠাকুরের ভাস্কর্য দেখেই মনে পড়ে গেল যে, আমি এই কর্নেল মহিম ঠাকুরের কথা পড়েছিলাম আগরতলার বিশিষ্ট কবি শঙ্খশূভ্র দেববর্মণের মা এবং আগরতলার বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং সংস্কৃতিজীবী সলিল দেববর্মণের জীবনসঙ্গীনী সবিতা দেববর্মণের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থপাতার ভেলা ভাসাই নীরে বইটিতে। অথচ শেষ বিকেলে যখন এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম, কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, মহিম কর্নেলের কথা কোথায় পড়েছি বা শুনেছি! লেখিকা সবিতা দেববর্মণের সঙ্গে আমারো একটা মহিমান্বিত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সে প্রসঙ্গ বলার আগে পাতার ভেলা ভাসাই নীরের বই থেকে এর প্রথম অধ্যায়ের কিছু অংশ তুলে ধরছি কর্নেল মহিম ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা আছে বলে।

‘ত্রিপুরাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাতবার এসেছিলেন। ত্রিপুরাকে তিনি মনেপ্রাণে ভালোবেসেছিলেন। সবুজ বনানীতে ঘেরা ত্রিপুরার জল, মাটি, ফুল-ফল, পাখির কলকাকলি সবই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আকৃষ্ট করেছে।... রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরা প্রসঙ্গ উঠলে মহিম কর্নেলের কথা আসবেই। মহিম কর্নেলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় কীভাবে হলো সেটাও একটা ঘটনা। মহিম কর্নেলের বাবার নাম ভারতচন্দ্র ঠাকুর, মাতার নাম সাবিত্রী দেবী। কলকাতার ডেভিড হেয়ার স্কুলে পাঠরত অবস্থায় বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মহিম কর্নেলের পরিচয়। সেই থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে যাতায়াত। শেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব। মহিম কর্নেলের পাঁচ ভাইয়ের বিরাট যৌথ পরিবার ছিল। বিশাল বড় বাড়ি। দুর্গাপুজার মণ্ডপ ছিল, সামনে পুকুর, পাকা বাঁধানো ঘাট। প্রত্যেক ভাইয়েরা মহারাজার আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই মহিম কর্নেল খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি নিজের বুদ্ধিবলে, পরিশ্রম করে মহারাজার সর্বক্ষণের বিশ্বস্ত সঙ্গী হতে পেরেছিলেন।... রবীন্দ্রনাথ যখন মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমন্ত্রণে প্রথমবার ত্রিপুরাতে আসেন, তখন বন্ধু মহিম কর্নেলের বাড়িতেই শুভ পদার্পণ করেন। ঠাকুমার কাছ থেকে শুনেছি, উনি একা আসেননি। ওঁর সাথে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পুত্রবধু প্রতিমা দেবী ও ছোট নাতি-পুয়াসহ এসেছিলেন।... রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথমবারের এই ত্রিপুরা আসা উপলক্ষে কর্নেলবাড়ির মেয়ে-বউয়েরা মিলে তাঁকে কিভাবে অভ্যর্থনা জানানো হবে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করে। খুব সুন্দর মালা তৈরি করা হয়, বিছানার ওপর ফুল দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম লেখা হয়। ফুলের পাখা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাতাস করা হয়। এসব দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুলকিত, শিহরিত হয়েছিলেন। অবাক হয়ে কতক্ষণ তাকিয়েছিলেন, কর্নেলবাড়ির মেয়েদের হাতের কাজের প্রশংসা করেছিলেন। যে কয়জন ফুল দিয়ে রবীন্দ্রনাথের নাম লিখেছিলেন, তার মধ্যে আমার ঠাকুমাও ছিলেন।’

সবিতা দেববর্মণের এই ঠাকুমাটি হলেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের বড়রাণী ভানুমতি দেবী। এবার সবিতা দেববর্মণের সঙ্গে আমার গড়ে ওঠা সম্পর্কের কথাটা না বললেই নয়। সেবার আমবাসা থেকে আগরতলায় ফিরে আমি আর মঞ্জু সরকার শহীদ ভগত সিং যুবা আবাসন কেন্দ্রে উঠেছিলাম। একদিন সলিল কাকা (সলিল দেববর্মণ) এসে আমাদেরকে তার বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন। আমরা দুজন সে-আমন্ত্রণ রক্ষা করি। সলিলকাকা আমাদেরকে সুবিখ্যাত উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। সে প্রাসাদের অভ্যন্তরে চক্কর দেওয়ার পরও উপলব্ধি হয়েছে সত্যিই রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আগরতলাকে কল্পনা করা যায় না। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরের যে-জাদুঘর রয়েছে, তাতে বেশ কটা গ্যালারীতে স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগরতলা-সম্পৃক্ত ছবি, সাহিত্যকর্ম এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, নিমন্ত্রণ খেয়ে যখন আমরা সলিল কাকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসব তার আগে আগে বিদায় ঘনিয়ে আসার মুহূর্তটিতে। সবিতা দেববর্মণ আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে ওঠলেন, তুমি আমার কুট্টি। একাত্তর সালে কুট্টি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তুমি আবার আমার কাছে এসেছো অপুর রূপ ধরে! আজ থেকে তুমি আমার আরেকটা ছেলে! অপার্থিব এই প্রাপ্তিতে আমি কতক্ষণ বিহ্বল হয়ে ছিলাম। তারপর কখন যে আমার হৃৎকমল থেকে বেরিয়ে আসে পৃথিবীর সবচেয়ে সমধুর শব্দ, মা! আমি বলতে পারবো না! যতদিন আগরতলা ছিলাম, প্রতিদিন আমি আমার মায়ের কাছে যেতাম, মাকে কথা দিয়ে এসেছি, সুযোগ পেলেই তাকে বছর-বছর দেখতে যাব!

যে-একাত্তরে মা কুট্টিকে হারিয়েছিলেন, সেই একাত্তরেই এ-বাড়িটা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট মানুষের জন্য হয়ে উঠেছিল পরম এক আশ্রয় কেন্দ্র। এ-বাড়িতে এসে উঠেছিলেন ড. এ কিউ এম বদরৌদ্দোজা চৌধুরী, রাজিউদ্দিন রাজুসহ বাংলাদেশের অসংখ্য নেতাকর্মী। চলবে

ধারাবাহিক