খুমলুঙে কবি রাতুল দেব বর্মণ, কথাশিল্পী মঞ্জু সরকার এবং সাংবাদিক তাপস দেবনাথ

খুমলুঙে কবি রাতুল দেব বর্মণ, কথাশিল্পী মঞ্জু সরকার এবং সাংবাদিক তাপস দেবনাথ

আমরা কবিতার জন্য ইম্ফল গিয়েছিলাম

পর্ব ২২

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৮, ২০১৯

পুরো আগরতলা শহর ঘুরে, শহর ছাড়িয়ে নিবিড় প্রকৃতির বুকে ছুটে চললো কবি রাতুল দেববর্মণের ছোট্ট বিড়ালছানা। পথ কি আর সহজে ফুরোয়? ফুরোতে চায় না। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। যেন অন্তহীন পথচলা। তাই বলে যে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত লাগছে, তাও না। কীভাবে ত্যক্ত হবে মন! বাইরে যে অফুরন্ত সবুজ চারপাশে, গাছপালার ছায়াঘেরা পথ। সেই সবুজের নিঃশ্বাসে যতোই দম ফেলছিলাম, দম যেন বেড়েই চলছিল। মানুষ যে আজ কেন প্রকৃতি ধ্বংসের তাণ্ডবে মেতেছে! এ-যেন জাপানের সেই হারিকারি খেলা, সবাই মিলে পৃথিবীসুদ্ধ আত্মধংসে মাতোয়ারা।

দুপুরের রোদ যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল, আমরা— আমি, মঞ্জু সরকার, তাপস দেবনাথ আর রাতুল দেববর্মণ পৌঁছে গিয়েছিলাম আগরতলা শহর থেকে পনেরো মাইল দূরের এক সাজানো বাগানে। হ্যাঁ, তা ছিল সত্যিকারেরই এক নন্দনকানন! পথটা এখানে এসে বেশ প্রশস্ততা পেয়েছে। দুপাশের গাছগুলো যেন পরিকল্পনামতো বেশ রমণীয়। তাই বলে ভাবার কারণ নেই, গাছপালার ডালপালা শাখাটাখা ছেটেকেটে সমান্তরাল করে বাটিছাট দিয়ে রেখেছে কোনো ডিস্ট্রিক্ট কিংবা মিউনিসিপ্যালিটির নরসুন্দর। তাতো করেইনি, উলটো বুনোভাবটা মোহময়ী হয়েই চোখে ধরা দেয়! বেশ ঝাকড়া ঝাকড়া আর ধাঙড় সব গাছগাছালির সারি। প্রকৃতিকে তার মতো রেখেই শুধু পথঘাটটা ঝা-চকচকে নতুন এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়েছে। সেকারণেই বোধ হয় চোখ তো জুড়ায়ই, মনও প্রশান্তির ছায়াকোল খুঁজে পায়।

জায়গাটার নাম খুমলুঙ। একটা বাগানের গেটের সামনে কার থেকে নেমেই জানিয়েছিলেন কবি রাতুল দেববর্মণ। আমরা এখন আগরতলা শহর থেকে পনেরো মাইল দূরে আছি। খুমলুঙ ককবরক শব্দ। যার অর্থ ফুলের বাগান। জানিয়েছিলেন সাংবাদিক তাপস দেবনাথ। ককবরক বলে যে একটি আলাদা ভাষা আছে সেবারই প্রথম জানতে পারি। এটি আসলে ত্রিপুরি জাতির মাতৃভাষা। বহুকাল অবহেলিত থাকার পর ত্রিপুরার মানুষের ভালোবাসায় আবার ককবরক ভাষাটি জেগে উঠতে শুরু করেছে। ত্রিপুরার মানুষ ঐতিহ্য রক্ষার সচেতনতা থেকেই ককবরক ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কথায় কথায় জানতে পারি, কক অর্থ ভাষা আর বরক অর্থ মানুষ।

এই ককবরক প্রথম শতাব্দী থেকেই ত্রিপুরি সমাজে প্রচলিত। ওই শতকে এ-ভাষাতেই লিখিত হয় ত্রিপুরা রাজাদের ইতিহাস ‘রাজরত্নকর’। যে লিপিতে ত্রিপুরা রাজাদের ইতিহাস লেখা হতো, তার নাম কোলোমো লিপি। ১৪ শতক থেকে ২০শ শতক পর্যন্ত ককবরক ভাষা ত্রিপুরার মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে ব্যাপক প্রচলিত ছিল। পরে যখন বাংলা ভাষাকে ত্রিপুরার রাজদরবারের ভাষা বানানো হয়, আস্তে আস্তে ককবরক ভাষার প্রচলন কমে আসতে থাকে। তবে ত্রিপুরার অনেক মানুষই ককবরক ভাষার প্রতি আলাদা দুর্বলতা অনুভব করে। এমনকি আমাদের ভ্রমণের যিনি কাণ্ডারী, সেই কবি রাতুল দেব বর্মণের মাতৃভাষাও ককবরক। কিন্তু তিনি বাংলা ভাষাতেই কবিতা লিখতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কেন নিজের মাতৃভাষা রেখে বাংলাকে ভালোবেসে ফেলেছেন, বাংলায় লিখছেন কবিতা? তারও ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন বাগানের ভেতর আড্ডা দিতে দিতে।

হ্যাঁ, আমরা একটা অপূর্ব সুন্দর অরণ্যবেষ্টিত বাগানে প্রবেশ করেছিলাম। পরিকল্পিত সাজানো-গোছানো বাগান হলেও প্রাকৃতিক অকৃত্রিম ভাবটা ধরে রাখার চেষ্টা রয়েছে। বেশ বড় একটা খাল চোখে পড়ছিল। তারই ঘাটলায় বসে বসে আমরা কথার ফোয়ারায় স্নান করছিলাম। তখনই কথা প্রসঙ্গে রাতুল দেব বর্মণ জানিয়েছিলেন যে, ককবরক তার মাতৃভাষা। তা সত্ত্বেও আমি এ-ভাষায় কবিতা লিখতে পারি না। কারণ, আমি ভাষাটা শিখতে পারিনি। আমি যখন গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন শহর আগরতলায় ককবরক ভাষার কোনো প্রচলন ছিল না। ককবরক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাই ছিল না। পারিপার্শ্বিকতার কারণে আমাকে বাংলা ভাষাতেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। আমার মা ককবরক ভাষায় খুব ভালোভাবে কথা বলতে পারতেন। তা সত্ত্বেও তিনি আমাকে ককবরক ভাষা শেখার জন্য খুব একটা উৎসাহিত করেননি। সরাসরি বলতেনও, বাংলা, ইংরেজি ভালো করে শেখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

ককবরক ভাষার প্রতি প্রিয় কবির এই মোহমুগ্ধতা ও দুর্বলতার কথা শুনে আমি কেমন যেন হোঁচট খেয়েছিলাম। পরম প্রেমাকাঙ্ক্ষীর অন্য কারো সঙ্গে অ্যাফেয়ার থাকার কথা হঠাৎ শুনলে যেমন লাগে আর কি, অনেকটা সে-রকমেরই অনুভূতি। রাতুলদা নিজে না বললে কোনোদিন বুঝতাম না, তার মাতৃভাষা ককবরক। আমি খুমলুঙের বাগানে বসে এই প্রথম আবিষ্কার করলাম, বাংলা ভাষার প্রতি আমার প্রেমটা শুধু অন্ধ নয়, জন্মান্ধ। আমিও বুঝি এই ভাষার সম্মানের জন্য মর্যাদার জন্য সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতের মতো রাজপথে অকাতরে প্রাণ দিতে পারবো। চুপিচুপি নিজে নিজে আপন মনে গেয়ে ওঠলাম, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...

রাতুলদা বেশিক্ষণ বসে থাকার মানুষ নন। আমরা পুরো বাগানজুড়ে হাঁটি, বাগানময় পায়চারি করি। হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করি পরিষদীয় ভবনে, প্রশাসনিক ভবনে। এখানকার যারা উচ্চপদস্থ, তাদের সঙ্গে কথা বলি, জানি খুমলুঙ গড়ার পেছনে আছে এক মহৎ উদ্দেশ্য। রাজ্যের উপজাতি অংশের মানুষের স্বায়ত্ত শাসনের লক্ষেই এই প্রতিষ্ঠা। যার রয়েছে নির্বাচিত ৩০ সদস্যসহ আরো ২৮ জন সদস্য। যারা উপজাতি অংশের উন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছে নিরন্তর। খুমলুঙ থেকে ফিরতে ফিরতে সেদিন এমনই রাত হয়ে গিয়েছিল। আর রাত যত বাড়ে, ঘুম তত প্রিয়তমা হয়ে ওঠে, সে চুম্বন দেয়, নিবিড় জড়িয়ে রাখে নিজের সত্তায়।  

পরদিন সাতসকালে ঘুম ভাঙতেই জানালা দিয়ে যেই বাইরের দিকে চোখ গেল, দেখি টুলটুলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আগরতলা রাজবাড়ির কোনো এক মণিপুরি বধূ। কী অপূর্ব মায়ামুখ। চোখ আর সে-দুটি চোখ থেকে সরিয়ে নিতে পারি না। আমার এ-মুগ্ধতা দেখেই কিনা তার হাসিমুখে ফুটে ওঠলো লাজরক্তিম আভা। যেন গোধূলিবেলার মায়াব্যঞ্জনা। আনত ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে শুধায় মোরে, মণিপুর কখন যাচ্ছ?
আমি আড়মোড়া ভেঙে বললাম, আমার তো আর তর সইছে না, মন আকুল হয়ে আছে ইম্ফল দেখতে!
দেখো সাবধান! মণিপূরি রাজবধূ আমাকে সতর্ক করে দেয়, মণিপুরি মেয়েরা কিন্তু খুব সুন্দর। ওদের মায়া কাটিয়ে আগরতলার কোনো রাজপুরুষ একা কখনোই ফিরে আসতে পারেনি।
আমি পেছনের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে ভালোভাবে দেখেটেখে উত্তর দিই, শেরামদা মারবে।
খিলখিল করে হেসে ওঠলো সেই পরমাসুন্দরী রাজবধূটি, মারবে না গো মারবে না। শেরামদাকে আমি চিনি, তিনি যে কবি! তার বইয়ের নামই যে, কবিতা এক প্রগলভা প্রেমিকা আমার!
তুমি শেরামদাকেও চেনো! আমি প্রায় আর্তস্বরে বলে ওঠলাম, টের পেলাম বুকের ভেতর প্রবল এক ঈর্ষা বোধ মোচড় মেরে ওঠছে!
চিনবো না কেন! তিনি যে আমার মণিপুর আগরতলার সেতুবন্ধন! আমার মুরুব্বিতুল্য, আমি তাকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি।
ওহ আচ্ছা! মণিপুরি রাজবধূর কথা শুনে আমি আশ্বস্ত হই, নিজেকে হালকা অনুভব করি। তারপর আবারো মুখর হয়ে ওঠি, মণিপুর থেকে আমি একা একাই ফিরে আসবো, দেখো তুমি?
নিজের ওপর এত বিশ্বাস?
হ্যাঁ, কেন বিশ্বাস থাকবে না! আমি কি কোনো রাজপুরুষ, যে আমার শৌর্য আর ক্ষমতা দেখে সুড়সুড় করে আমার সাথে চলে আসবে মণিপুরি কোনো রাজকুমারী!

পরমাসুন্দরীর কোনো উত্তর পাই না। কেন, কী হলো? ভালোভাবে তাকিয়ে দেখি, সাদা মেঘের সুনীল আকাশটা হঠাৎ এক খণ্ড কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছে, আর সে সুযোগেই মণিপুরি পরমাসুন্দরী রাজবধূটি মেঘের আড়ালে কখন নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে। ওকে হারিয়ে যে মন খারাপ করে ঝিম মেরে বসে থাকবো, দেবদাসীয় বিলাসিতায় ক্ষণকালের জন্য বিলীন হয়ে যাব— সে-সুযোগও পেলাম না। কবি পুলিন রায় পেছন থেকে ডাকাডাকি শুরু করেছে, হামিদ বন্ধু! চলো! নাস্তা খেতে যাব। শেরামদা ডাকছে। চলবে

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ধারাবাহিক