সাতসকালে আগরতলা শহরে উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদের সামনে কবি এ কে শেরাম, কবি পুলিন রায় এবং কবি নিতাই সেনের সঙ্গে লেখক

সাতসকালে আগরতলা শহরে উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদের সামনে কবি এ কে শেরাম, কবি পুলিন রায় এবং কবি নিতাই সেনের সঙ্গে লেখক

আমরা কবিতার জন্য ইম্ফল গিয়েছিলাম

পর্ব ২৩

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৬, ২০১৯

ট্যাক্সি স্পিড পেতেই বাইরের ফুরফুরানি হাওয়া এসে বললো, মুখ গুমরো করে আছো কেন হে, রাজন?
রাজন? রাজন কি? আমি অবাক হয়ে শুধালাম।
সকালেই তো দেখলাম ঘুম থেকে জেগেই জানালা দিয়ে আগরতলার কোন রাজবধূর সঙ্গে বেশ চালিয়ে যাচ্ছ! তাহলে রাজন নয় তো, কি? রঞ্জন? রঞ্জন বলবো নাকি— অ্যাঁ?

হো হো করে আমি হেসে ওঠলাম। আর হাসির সঙ্গে সঙ্গে মনের সব তিক্ততা যেন এক লহমায় কোথায় উবে যেতে লাগলো। সকালে নাস্তা করতে গিয়ে একটা ‘ইয়ে’ ঘটনার শিকার হয়েছিলাম, ‘ইয়ে’ মানে আসলে বলতে চাচ্ছিলাম না, আচ্ছা না হয় ইঙ্গিতেই বলি— সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে যেন আগরতলায় মধ্যযুগীয় অন্ধতাও কিছুটা ফিরে এসেছে! সকালে চৌমুহনী মোড়ের মাথায় নাস্তা খেতে গিয়ে আমি ক্ষণকালের জন্য সেই অন্ধকারে বিলুপ্ত হয়েছিলাম। তারপর থেকেই মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তারপর সেই রেস্তোরাঁ থেকে রয়্যাল গেস্ট হাউজে ফেরার পরও, সেখান থেকে এয়ারপোর্টগামী ট্যাক্সিতে ওঠে বসেও মনকে ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে পারছিলাম না। তারপর দেখো, যেই কর্নেল চৌমুহনী রোডের মোড় ছাড়ালাম, ট্যাক্সিটা বেশ গতি পেতেই, কোথ থেকে যে ফুরফুরানি হাওয়া এসে তার রেশম কোমল সত্তা নিয়ে আমাকে টালকা টালকা রামচিমটি কেটে মন চাঙ্গা করার মিশনে নেমে পড়লো! আমি একটু বিমনা হই তো, অমনি সে কথার কাতুকুতু দিয়ে হাসিয়ে মারছে। যেন তোকে আমি কোনোভাবেই গম্ভীরমুখো পণ্ডিতিপনার আদল নিতে দেব না রে দেব না। আচ্ছা তাই-ই সই। আমিও ফুরফুরানি হাওয়ার কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করের বসে আছি। মাঝে মধ্যেই হেসে উঠছি উন্মাতাল! ভাগ্যিস ভালো যে, ফুরফুরানি হাওয়ার সঙ্গে আমার এসব বাতচিৎ কথাবার্তা হাসির ঝটকা সবই হচ্ছিল মনে মনে, তা না হলে, পাশে বসা কবি পুলিন রায়, কবি নিতাই সেন এবং সামনের সিটে বসা কবি এ কে শেরামদাসহ ড্রাইভার— সবাই নিশ্চয়ই আমাকে পাগল ঠাউরাতেন।

রেস্তোরাঁয় যে ঘটনাটা ঘটে গেল আজ সকালবেলা... অমনি আবার ফুরফুরানি হাওয়া এসে তর্জনী তুললো, আচ্ছা, তুমি এই ছোট্ট ঘটনাকে এতো বেশি পাত্তা দিচ্ছ কেন বলো তো! যতো পাত্তা দেবে ততো তোমার মন খারাপ হবে! সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে তার উৎকট গন্ধ। তারচেয়ে বাপু গতবার যে এসেছিলে আগরতলা, সেই ২০১৬ সালে, সেসব স্মৃতিগুলোর ভেতর কেন ডুবে যাচ্ছো না? মনে আছে, তুমি একজন মা পেয়েছিলে?

মনে থাকবে না আবার! ও স্মৃতি তো আমার আত্মসত্তার অংশ হয়ে গেছে!
একজন চির তরুণ সলিল দেব বর্মণ তোমাকে নিয়ে হেঁটেছিল পুরো আগরতলা শহর!
ওরে বাবা! কী যে অন্তর্শক্তি সত্তরোর্ধ সেই মানুষটার! আমি তার সঙ্গে হেঁটে কুলিয়ে উঠতে পারিনি!
ভুলতে পারবে কখনো তোমার আর মঞ্জু সরকারের জন্য কবি আকবর আহমেদের আন্তরিকতাভরা সময়গুলোকে?
কোনোদিনও না!
সাংবাদিক তাপস দেবনাথ, আকবর আহমেদ তোমাদেরকে নিয়ে কোন সুদূর জঙ্গলে চলে গিয়েছিল সারাদিনের জন্য! দেখিয়ে এনেছে নীরমহল আর সুব্রামের ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান! দুপুরের লাঞ্চটা কেমন জমেছিল সেদিন তৃষ্ণা অভয়ারণ্যে, বলো তো?

অমৃত! অমৃতের স্বাদ ছিল গো!
তারপর শ্যামল বৈদ্যর উজানভাটি! রাতুল দেব বর্মণের সঙ্গে খুমলুঙ!
অমূল্য প্রাপ্তি!
খুব তো রাতুল দেব বর্মণ রাতুল দেব বর্মণ করছো? তুমি কিন্তু রামেশ্বর ভট্টাচার্য মহাশয়ের বাড়িতেও গিয়েছিলে। ভুলে বসে আছো দেখছি। এক দুপুরে তাপস দেবনাথ তোমাকে আর মঞ্জু সরকারকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাবন্ধিক কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য মহাশয়ের বাসায়।

হ্যাঁ, কী নিরিবিলি ছিল বাসাটা। আর সৌম্য শান্ত স্নিগ্ধতা। বৌদি এবং রামেশ্বরদা দুজনের আতিথ্যই ছিল মনপ্রদীপে ঘেরা। সেই বাড়িটায় গিয়েছিলাম এটা মনে পড়লেই কেন যেন আমার গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা সিনেমার গানের এ দুটো লাইন ভেসে ওঠে মনের ভেতর, ‘মেঘের ওপর আকাশ ওড়ে, নদীর ওপার পাখির বাসা।’

আহা! কী যে ভালো লাগার আবেশ রচনা করে সে গানটা, গানের সুরের রেশটা!
চলো না সে গানটা দুজন চোখ মুদে শুনে নেই।
ফুরফুরানি হাওয়ায়ও সে গানের ভাসানে ভাসতে রাজি হয়ে যায়—

সোনারও পালংকের ঘরে
লিখে রেখেছিলেম দ্বারে
যাও পাখি বলো তারে,
সে যেন ভুলে না মোরে
সুখে থেক, ভালো থেক
মনে রেখ এ আমারে
বুকের ভেতর নোনা ব্যথা
চোখে আমার ঝরে কথা
এপার ওপার তোলপাড় একা
মেঘের ওপর আকাশ ওড়ে
নদীর ওপার পাখির বাসা
মনে বন্ধু বড়ো আশা—

গান শেষ হতেই আবারো ঠেকনা মেরের উঠলো ফুরফুরানি হাওয়া, তারপরও উনাকে ভুলে বসে আছো?
ভুলি নি তো!
একবারো বলেছো তোমার এই ভ্রমণকথায় রামেশ্বর ভট্টাচার্যের কথা!
ভুল হয়ে গেছে!
ভুলিনি তো আবার ভুল হয়ে গেছে। এসব কি! তুমি আসলে দেখছি একটা ভুলভুলাইয়া!

হো হো। আমি আবার ফুরফুরানি হাওয়ার খুনসুটিতে হেসে ওঠলাম। সে হাসিতে গললো না ভজখট্ট ফুরফুরানির মন, চালিয়েই যেতে লাগলো ওর তোফা চোপা, ভুলভুলাইয়া নয় তো কি? আগরতলার মূখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের সঙ্গেও তো তোমার দেখা হয়েছিল, তার কথাও তো একবার বলো নি?
না, বলিনি।
কেন?
আসলে সুযোগ পাইনি। হুট করেই তো আর একজনের নাম বা প্রসঙ্গ আনা যায় না। পারম্পর্য লাগে, প্রসঙ্গান্তর দরকার হয়।
এখন তো প্রসঙ্গ এলো, তাই না?
সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
থাক, এতো ফরমালিটিজ দেখাতে হবে না!

দেখো মূখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আমাদের সাক্ষাৎ দিয়েছিলেন— এটা সত্যি আমার জন্য দুর্লভ অভিজ্ঞতা। একজন মূখ্যমন্ত্রীর জীবন যাপন যে এতো সাধারণ হতে পারে, এতো সারল্যে ঘেরা— সেটাই তো আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল! মানিক সরকারকে এতো কাছ থেকে না দেখলে হয়তো কখনো বিশ্বাসই হতো না ব্যাপারটা। সলিলকাকা আর আকবর আহমেদের সহযোগিতায় দেখা পেয়েছিলাম মানুষটির! পরদিন তো শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। কী যেন নাম ভদ্রলোকের। তিনি আমাদের ভগত সিং যুবা সেন্টারে আরো দুটো দিন যেন থাকতে পারি, সে অনুমোদন দিয়েছিলেন কবি আকবর আহমেদের বদৌলতে।
যে ভদ্রলোক তোমার এতটুকু উপকার করলেন, তার নামটাও ভুলে আছো, তুমি ভুলভুলাইয়া নয় তো আর কে?
ধুর এভাবে লজ্জা দিয়ো না তো! আমি অবশেষে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ফুরফুরানি হাওয়াকে ধমকে ওঠি।
হ্যাঁ এখন তো চোটপাট দেখাবেই! আমাকে তো আর দরকার হবে না মন ভালো রাখার জন্য। ওই যে দেখো, দেখো দেখো তাকিয়ে— তোমার আগরতলা এয়ারপোর্ট এসে গেছে!
তাই তো। কীভাবে কীভাবে পৌঁছে গেলাম প্রায় এক ঘণ্টার পথ এতো চটজলদি! চলবে

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ধারাবাহিক