করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

এহসান হাবীবের আত্মগদ্য ‘দুম করে মরে যেতে ইচ্ছা করে’

প্রকাশিত : জুন ২৭, ২০২০

আত্মহত্যা শব্দটি আমি খুব ভয় পাই। জীবন আমার কাছে সুন্দর। আমি মোটেই আত্মহত্যা করতে চাই না। সব সময় আমি এর থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু আশ্চর্য! আত্মহত্যা শব্দটি খুব লোভনীয় হয়ে আমার জীবনের সঙ্গে ঝুলে আছে। ঝুলে আছে বলছি এ কারণে যে, আমি মনে করি, আমার জীবন থেকে আত্মহত্যা শব্দের অধ্যায়টি একেবারে পুরোপুরি কাটআপ হয়নি। বরং এখনো কোন কোন সুন্দর সকালে খুব করে রোদ উঠলে, জীবনের নানা অর্থহীনতা চোখের সামনে আশ্চর্য প্রজাপতি হয়ে ওড়াউড়ি করলে, আমার এখনো দুম করে মরে যেতে ইচ্ছা করে।

তখন অনেককাল আগের কথা। আমি প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোইনি। আমার ভেতরে আত্মহত্যা একটা যুতসই জায়গা করে নেয়। খুব ছোট থাকতেই খেয়াল করছি, আব্বা আম্মার সাথে ঝগড়া হলেই তারা পরস্পরকে আত্মহত্যার হুমকি দিতেন। এই হুমকিতে ভালো কাজ হতো। সারাক্ষণই তুমুল ঝগড়া, কখনো কখনো হাত চালাচালির পর যখন আত্মহত্যার হুমকি আসতো তখন ব্যাপরটা আপাতত থেমে যেত। যদি হুমকিতে শেষ না হতো তাহলে বাবাকে দেখতাম তিনি আত্মহত্যার উদ্যোগ নিচ্ছেন। একসাথে অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট গিলে ফেলছেন এবং তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ছেন। আমরা তাকে ডাকাডাকি করছি। বাবা সাড়া দিচ্ছেন না। তখন আমরা ডাক্তারের কাছে দৌড়তাম। আমি তো তখন খুব ছোট। ছোট্ট আমিই যেতাম ডাক্তারের কাছে। ডা. মাসুদ করিম। তিনি আসতেন, নাড়ি দেখতেন, স্টেথো ধরে কিছুক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলে যেতেন। আমরা তাকে তেতুলের শরবত খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম। আব্বাকে ঘুমের মধ্যে রেখে আমরা তেতুলের শরবত খাওয়াতাম। আব্বা টানা একদিন ঘুমিয়ে তারপর উঠতেন।

পুরো বিষয়টা আমি সেই ছোট্ট থাকতেই খুব ভালো করেই খেয়াল রাখতাম। মাঝে মাঝে সেই ছোট্ট আমারও মরে যেতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু বয়স তখনো অতোটা অভিমানের হয়নি বলে ঠিক যুতসই কোন বাহানা খুঁজে পেতাম না। আর তাছাড়া ঘুমের ওই ওষুধ আমার কাছে কেউ দিতো না। দুয়েকবার মেডিসিন শপে গিয়ে কেনার চেষ্টা করেছি। "সিডিল আছে?" দোকানি নাই বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। আমার আর আত্মহত্যা করা হয় না। আমিও হাল ছাড়ি না। জানি ঠিকঠাক কোনদিন বাহানা এবং রসদ দুটোই মিলে যাবে। আমি আশায় আশায় থাকি। আম্মা। আম্মা একদিন আমারে খুব মারলেন। খুব মানে খুব।

আমি ছিলাম এক্কেবারে শয়তানের হাড়হাড্ডি। কঞ্চির বেতের মাইর আর হাতের কাছের জিনিস পত্র দিয়ে আম্মা আমাকে পেটাচ্ছেন এটা নিত্যদিনের ঘটনা। বেঁধে পেটাচ্ছেন এটাও হরহপ্তার ঘটনা। সুতরাং খুব মারলেন মানে বুঝে নিতে হবে ব্যাপারটা আরো ভয়ংকর। এতোকাল পর আমার ঠিক মনে নেই ভয়ংকরের মাত্রাটা কেমন ছিলো? শুধু মনে আছে মারের ঘটনাটা ঘটেছিলো দুপুর বেলা। মাইর দেযার পর আম্মা আমাকে গোসল করিয়ে খাওয়া দাওয়া করিয়ে, চুলে তেল দিয়ে জামা পড়িয়ে মাঠে খেলতে পাঠিয়েছেন। যখন আম্মা আমার মাথায় তেল দিচ্ছেন তখন আমি ঘরের কোনে কীটনাশকের একটা বোতল দেখতে পাই। বোতলটা দেখেই আমি শান্ত হয়ে যাই। সুবোধ ছেলের মতো আম্মা যা করছেন তা মেনে নিচ্ছি। আর মনে মনে ভাবছি, আজকে একটা বিরাট ঘটনা ঘটে যাবে। আমি মাঠে যাবো কিন্তু আর ফিরবো না। খেলা শুরু হওয়ার আগেই আমি কীটনাশক খেয়ে নেবো। তারপর মাঠের মধ্যেই মরে পড়ে থাকবো। আমি মরে যাবার পর আম্মা খুব কাঁদবেন। তার অনুশোচনা হবে, তিনি নিশ্চয়ই বিলাপ করে আপসোস করবেন এটা ভেবে আমি খুব উত্তেজিত হচ্ছি ভেতরে ভেতরে।

তো আমি যখন ঘর থেকে বের হই তখন চুপিচুপি শিশিটা প্যান্টের পকেটে পুরে ফেলি। কিন্তু বিধি বাম! মাঠে এসে দেখি, শিশির তলানিতে খুবই অল্প পরিমান কীটনাশক বাকি আছে। কী করা যায় ভাবছি। এতোদূর এসে পরিকল্পনাটা মাঠে মারা যাবে এটা ভেবে খুব খারাপ লাগছে। হঠাৎ একটা বুদ্ধি এলে মনে। টিউবওয়েল থেকে আমি বোতলে পানি ভরে নিলাম। তারপর ঢকঢক করে গিলে ফেললাম। একটা বিস্বাদ গন্ধ আর গা গুলানো একটা স্বাদ আমার মুখটাকে পুড়িয়ে ফেললো। আমি তখন আনন্দে আত্মহারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাবো আর আম্মা হাউমাউ করে কাঁদবেন। আমি একটা আনন্দ নিয়ে খেলতে শুরু করি। খেলায় দৌড়াচ্ছি আর ভাবছি, এই আমি এখনই পড়ে যাবো, মরে যাবো। কিন্তু আমি মরছি না। কাউকে বলতেও পারছি না। এই করে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমার আত্মহত্যার প্রথম পরিকল্পনাটা ব্যর্থ হয়ে গেলো। কিন্তু এই পরিকল্পনার একটা দাগ থেকে যায়। না। একটা না। দুটো। কীটনাশক দুর্বল হয়ে আমার জিহ্বা দুই জায়গায় পুড়িয়ে দুটো কালো ক্ষত করে দিয়ে যায়। যেগুলো আমি এখনো বহন করছি।

আত্মহত্যার প্রথম পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর আত্মহত্যা সম্পর্কে আমার ভেতর একটু একটু ভয় ঢুকতে শুরু করে। তারপর অনেকদিন আমি আত্মহত্যার কথা ভাবি নাই। তারপর এলো আরেকদিন। বাসায় আব্বা আর আম্মার ভয়াবহ ঝগড়া। এবার আব্বা আত্মহত্যা করবেন। তবে পুরনো পদ্ধতিতে নয়। ঘুমের ট্যাবলেটে কাজ হয় না। এটা আমরা বেশ বুঝে গেছি। আব্বা এবার রেললাইনের তলে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। আমি আর আব্বা আমরা দুজনে চুপিচুপি রেললাইনের পাশে চলে এসেছি। ট্রেন এলে আমরা দুজনে একসঙ্গে ট্রেনের নিচে ঝাপিয়ে পড়বো। আমরা লাইনের উপর বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার মনে আছে, লাইনের উপরে একটা সিরামিকের তৈরি টেলিফোনের ডাইস পড়ে ছিলো। পড়ে গিয়ে সেটা ভেঙে গিয়েছিল। আব্বা সেই ডাইসটাকে পাথর দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ি দিয়ে সুন্দর শেপ দিচ্ছিলেন। একবার সিরামিকে একটা টুকরো আব্বার হাতের উপরে পড়ে বিঁধে যায়। ওখান থেকে হালকা রক্ত বেরুচ্ছিলো। আমি বললাম, আব্বা তোমার হাত থেকে রক্ত বেরুেচ্ছে তো। আব্বা নির্লিপ্ত গলায় বললেন, এটা কিছু না,কিছুক্ষণ পর আমাদের সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। অনেক রক্ত বেরুবে আমাদের শরীর থেকে। এ তো কিছুই না।

আব্বা আমাকে সুন্দর একটা খেলনা বানিয়ে দিলেন। সেদিন আমরা আত্মহত্যা করতে পারিনি। ট্রেন আসতে আসতে আব্বার রাগ পড়ে গিয়েছিলো। আমরা ফিরে এসেছিলাম। খেলনাটা আমি অনেকদিন রেখে দিয়েছিলাম। তখন আমি মোটামুটি বড়ো হতে শুরু করেছি। সিগারেট ধরেছি। স্কুল পালাই নিয়মিত। সারাদিন বনে বাদাড়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরি। এখানে ওখানে যাই। তাস খেলি। আম্মা বলে বলে ক্লান্ত। তারপর একদিন আচ্ছামতো ধোলাই। আবার আমার অভিমান ফিরে এলো। আমি রুম খালি হওয়ার অপেক্ষা করছি। তখন সন্ধ্যা। সবাই চলে গেলে আমি চুপচাপ দরোজা বন্ধ করি। তারপর গলায় বড়ো একটা গামছা দিয়ে ফ্যানে ঝুলি। এইবার নিশ্চিত সাফল্য। এটা বড়ো পরীক্ষিত পদ্ধতি। আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন সবাই আমাকে ঘিরে কাঁদছিলো। আমি যখন ঝুলে পড়ছিলাম তখন আমার আপা আমাকে ঝুলতে দেখে ফেলে আর সবাই মিলে দরোজা ভেঙে আমাকে নামিয়ে আনে। এটা ঘটেছিলো আমার বয়োঃসন্ধির পর। ফলে আত্মহত্যা সম্পর্কে আমার ভেতর একটা বেশ ভয় ঢুকে যায়। আমি ভেবেছি দ্বিতীয়বার এই কাজে আর যাবো না। লোকে বলে, যে ব্যক্তি জীবনে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে দ্বিতীয়বার ওই পথে পা বাড়ায় না। কিন্তু লোকে যতো কথা বলে তার সবই আমার বেলায় মিথ্যে হয়েছে। এই ঘটনার পর আমি আরো একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছি। রাখি চলে যাওয়ার শোক আমি কাটিয়ে উঠেছি। নতুন আরেকটা প্রেম আমি চুটিয়ে করছি। তখন কী কী যে হতো! দুম করে মরে যাওয়ার ইচ্ছা করতো। আমি তখন পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে একটা নিরাপদ শান্তির আত্মহত্যার উপায় খুঁজতে থাকি। আমি ভাবি, একদিন রাতের খাবার খেয়ে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে বিছানায় চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকবো।

আমি তখন আনন্দ মোহন কলেজের হলে থাকি। আমি রাতের খাবার খেয়ে সুমন নামে আমার এক ছোট ভাইয়ের মেসে চলে যাই। ওখানে সম্ভবত কমলও ছিলো। আমি ওদের বলি, আমি একটু ঘুমাবো। আমি যদি সকালেও না উঠি তাহলে আমাকে ডাকিস না। আমাকে ঘুমাতে দিস। তারপর আমি বাইরে কলপাড়ে গিয়ে কুড়িটা ঘুমের ট্যাবলেট গিলে চুপচাপ সুমনের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ি। একটা ভোঁতা যন্ত্রণার মধ্যে আমার চেতনা ফিরতে থাকে। আমি চোখ খুলতে পারছি না। বুঝতে পারছি আমার হাত পা বাঁধা। মুখ হাঁ করানো। গলার ভেতর দিয়ে কিছু একটা ঢুকে যাচ্ছে। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে কিন্তু নড়তে চড়তে পারছি না। হাসপাতালে আমাকে ওয়াশ করানো হচ্ছে। আমি আত্মহত্যার পর্ব শেষ করতে পারি নাই। জীবনের অনেক অনেক কাল চলে গেছে। আমার বন্ধু মোস্তাকিম বিল্লাহ মনি, ও বলছে, আমি ফিনিক্স পাখির মায়াময় জীবন নিয়ে এখানে ওখানে উড়ে বেড়াচ্ছি। হ্যাঁ, হয়তো আমি ফিনিক্স পাখির মায়াময় জীবন পার করছি। কিন্তু মনি, তুই কি জানিস? ফিনিক্স পাখিরও কখনো কখনো আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে।

লেখক: কবি