কবি অমিয় চক্রবর্তীর আজ মৃত্যুদিন
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : জুন ১২, ২০২৬
কবি ও শিক্ষাবিদ অমিয় চক্রবর্তীর আজ মৃত্যুদিন। ১৯৮৬ সালের ১২ জুন শান্তিনিকেতনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০১ সালের ১০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে তার জন্ম।
তার পুরো নাম অমিয় চন্দ্র চক্রবর্তী। তার পিতা দ্বিজেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মা অনিন্দিতা দেবী। অনিন্দিতা দেবীও ছিলেন সাহিত্যিক। তিনি বঙ্গনারী ছদ্মনামে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করতেন।
আধুনিক কবিতার ইতিহাসে তিরিশের দশকের পঞ্চকবি হিসেবে বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে’র সঙ্গে সমসাময়িকতার বিস্ময়ে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে অমিয় চক্রবর্তীর নাম। শীর্ষস্থানীয় আধুনিক কবি এবং সৃজনশীল গদ্যশিল্পী অমিয় চক্রবর্তী শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করারও সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের অন্যতম কবি অমিয় চক্রবর্তীর জন্ম হয়েছিল। তিনি সংস্কৃতে পারদর্শী ছিলেন আর চার সন্তানকে সংস্কৃত শিখিয়েছিলেন নিজেই। গৌরীপুরের সংস্কৃত টোল থেকে প্রখ্যাত পণ্ডিতকে তিনি নিযুক্ত করেছিলেন কালিদাস, ভবভূতি, ভারবি প্রমুখের রচনা পাঠের সুবিধার্থে। এভাবেই অমিয় চক্রবর্তী শৈশবেই ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
অমিয় চক্রবর্তী কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর হাজারিবাগে আইরিশ মিশনের সেন্ট্ কোলাম্বাস কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯২১ সালে ইংরেজি সাহিত্য, দর্শন এবং বোটানিতে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২১ সাল থেকেই তিনি বিশ্বভারতীর কাজে কর্মে জড়িয়ে পড়লেন ঘনিষ্ঠভাবে। এতে করে ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার যে আশৈশব স্বপ্ন তার ছিল, তা শেষ হয়ে যায়।
বিশ্বভারতীতে মগ্ন থেকে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা অনেকটাই ব্যহত হয়। প্রাইভেট ছাত্র হিসেবে শেষাবধি তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন ১৯২৬ সালে। পরে আবারো প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার সুযোগ হলে তিনি বিলেতের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলিয়ল কলেজের ছাত্র হিসেবে ১৯৩৪-১৯৩৭ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন এবং কবি টমাস হার্ডির কবিতা নিয়ে গবেষণা করে ডি ফিল লাভ করেন ১৯৩৭ সালে।
শৈশব হতে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব নিয়ে গড়ে ওঠা অমিয় চক্রবর্তী পনের বৎসর বয়সেই রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি শান্তি নিকেতনেই থাকতেন। ক্লাস নেয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নানা গ্রন্থ-তথ্য দিয়ে সাহায্য করা, তার বিদেশ যাত্রার সঙ্গী হওয়া ইত্যাদি ছিল তার কাজ।
বিশ্বনাগরিক অমিয় চক্রবর্তী প্রশান্ত এবং আটলাণ্টিক মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া, দূরপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং জাপান ও কোরিয়াসহ পৃথিবীর নানা দেশ বহুবার পরিভ্রমণ করেছেন। পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, কান্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, স্মিথ্ কলেজ, ন্যুইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ভারতের কলকাতা ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি।
বিভিন্ন দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন বক্তৃতা দেয়ার জন্যে। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং রবার্ট ওপেন্ হাইমারের আমন্ত্রণে ১৯৫১ সনে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিট্যুট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিসের ফেলো হিসেবে ভ্রমণ করেন। ১৯৫১ সনেরই গ্রীষ্মে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিন প্রোটেস্টাণ্ট চার্চ সম্মেলনে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
এই সময় পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ধর্ম এবং প্রাচ্য সাহিত্য বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। একাধিকবার অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছেন শিবনারায়ণ রায়ের আমন্ত্রণে। তার মনোহর বক্তৃতায় মুগ্ধ করেন মেলবর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের। ১৯৪৮ সাল থেকে ভারত ছেড়ে স্থায়ীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হন অমিয় চক্রবর্তী। কিন্তু দেশের টানে দু`এক বছর পরপরই দেশে ফিরে এসেছেন। মৃত্যুর আগে ১৯৭৮ সালে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেন।
অমিয় চক্রবর্তীর প্রধান পরিচয় তিনি একজন আধুনিক কবি। ছন্দ, শব্দ চয়ন, শব্দ ব্যবহারের ধাঁচ, পঙক্তি গঠনের কায়দা সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন বাঙালি কবিদের মধ্যে অনন্য সাধারণ। কঠিন সংস্কৃত শব্দও তার কবিতায় প্রবেশ করেছে অনায়াসে। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত চরিতাভিধানে তাকে ‘সৃজনশীল গদ্য শিল্পী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে, ত্রিশোত্তর বাংলা গদ্য সাহিত্যে তিনি একটি বিশিষ্ট রীতির প্রবর্তন করেন।
রবীন্দ্রনাথের খুব ঘনিষ্ঠজন হয়েও কবিতায় অমিয় চক্রবর্তী সম্পূর্ণ স্বকীয়তার ও আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বলা যায় অক্লেশে তিনি রবীন্দ্র কাব্যবলয়ের বাইরে অবস্থান করেছেন শুরু থেকেই। অমিয় চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৫। তার প্রথম প্রকাশিত বই কবিতাবলি (১৯২৪-২৫)। তার অন্যান্য গ্রন্থ: উপহার (১৯২৭), খসড়া (১৯৩৮), এক মুঠো (১৯৩৯), মাটির দেয়াল (১৯৪২), অভিজ্ঞান বসন্ত (১৯৪৩), পারাপার (১৯৫৩), পালাবদল (১৯৫৫), ঘরে ফেরার দিন (১৯৬১), হারানো অর্কিড (১৯৬৬), পুষ্পিত ইমেজ (১৯৬৭), অমরাবতী (১৯৭২), অনিঃশেষ (১৯৭৬), নতুন কবিতা (১৯৮০), চলো যাই (১৯৬২), সাম্প্রতিক (১৯৬৩)।
এছাড়া ইংরেজি ভাষায় রচিত তার ৯টি বই রয়েছে। কবিতার জন্য তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬০), ভারতীয় ন্যাশনাল একাডেমী পুরস্কার। বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৬৩) এবং ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৭০) উপাধিতে ভূষিত করে।
























