কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৫, ২০২৫

বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন। ১৯৩৩ সালের ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বহড়ু গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বামানাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম কমলা দেবী। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান এবং দাদুর বাড়িতে বড় হন।

১৯৪৮ সালে তিনি কলকাতার বাগবাজারের একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি প্রথম মার্কসবাদ সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রগতি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রগতি নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করা শুরু করেন। পরে হাতে লেখা ওই ম্যাগাজিন বহ্নিশিখা নামে মুদ্রিত আকারে বের হয়।

১৯৫১ সালে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং সিটি কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। একই বছরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সদস্যপদ লাভ করেন। শক্তি ১৯৫৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন। এরপর তিনি বাংলা সাহিত্যে অনার্স করার উদ্দেশে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তাকে স্নাতক পাঠ অর্ধসমাপ্ত রেখে প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়তে হয়।

১৯৫৬ সালে তাকে উল্টোডাঙার একটি বস্তিতে মা ও ভাইকে নিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। সে সময়টায় তার পরিবার পুরোপুরিভাবে ভাইয়ের সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৫৬ সালের মার্চে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় তার ‘যম’ কবিতাটি ছাপা হয়। পরে তিনি কৃত্তিবাস ও অন্যান্য পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।

একটাসময় বুদ্ধদেব বসু তাকে নবপ্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যকোর্সে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং তিনি ভর্তিও হন। কিন্তু এখানেও তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। ১৯৫৮ সালে শক্তি চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কের ইতি টানেন।

জীবিকার জন্য তাকে সাক্সবি ফার্মা লিমিটেডে স্টোর সহকারীর চাকরি করতে হয়েছে। কিছু দিন শিক্ষকতা ও ব্যবসা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও কাজেই তিনি ঠিক মন বসাতে পারেননি। কৃত্তিবাসের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম সাহিত্যিকমহলে একত্রে উচ্চারিত হতো।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা প্রথম উপন্যাসের নাম, কুয়োতলা। কিন্তু কলেজ জীবনের বন্ধু সমীর রায় চৌধুরীর সঙ্গে আড়াই বছর থাকার সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন সফল গীতিকবিতে পরিণত হন। নিজের কবিতাকে তিনি বলতেন, পদ্য। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, ধর্মেও আছো জিরাফেও আছো (১৯৬৭), সোনার মাছি খুন করেছি (১৯৬৮); অন্ধকার নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকার (১৯৬৮); হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান (১৯৬৯); চতুর্দশপদী কবিতাবলি (১৯৭০); পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি (১৯৭১); প্রভু নষ্ট হয়ে যাই (১৯৭২); সুখে আছি (১৯৭৪); ঈশ্বর থাকেন জলে (১৯৭৫); অস্ত্রের গৌরবহীন একা (১৯৭৫); জ্বলন্ত রুমাল (১৯৭৫); ছিন্নবিচ্ছিন্ন (১৯৭৫); সুন্দর এখানে একা নয় (১৯৭৬); কবিতায় তুলো ওড়ে (১৯৭৬), ভাত নেই পাথর রয়েছে (১৯৭৯); আঙ্গুরী তোর হিরণ্য জল (১৯৮০); প্রচ্ছন্ন স্বদেশ (১৯৮১); যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো (১৯৮৩); কক্সবাজারে সন্ধ্যা (১৯৮৫); সন্ধ্যার সে শান্ত উপহার (১৯৮৬); এই তো মর্মর মূর্তি (১৯৮৭); বিষের মধ্যে সমস্ত শোক (১৯৮৮); আমাকে জাগাও (১৯৮৯); ছবি আঁকে ছিঁড়ে ফ্যালে (১৯৯১); জঙ্গলে বিষাদ আছে (১৯৯৪) ইত্যাদি।

কবিতার স্বাতন্ত্র্যতা সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। শক্তি শুধু পদ্যে নয়, গদ্যেও তার একটা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। তবে সাহিত্যে তার অনুপ্রবেশটা একটু ভিন্ন পথে। তার শুরুটা কুয়োতলা দিয়ে। তার পর কত কণ্টকময় কবিতার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তপ্ত কাব্য রবিকে স্পর্শ করে পৌঁছেছিলেন কাব্যদিগন্তের শেষ সীমায়।

শক্তির কবিতাও একটু ভিন্ন স্বাদের। সেজন্যই ব্যতিক্রম ও বিস্ময়কররূপে বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবিদের একজন হয়ে ওঠেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। কবিপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় আনন্দ পুরস্কার ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারসহ প্রচুর পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।