কাজী জহিরুল ইসলাম
কাজী জহিরুল ইসলামের তিনটি কবিতা
প্রকাশিত : জুন ২৪, ২০২৬
হে মহাসড়ক
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে নিবেদিত
সৈয়দ শামসুল হক
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল মহাসড়ক
এ মহাসড়কে রেখে পা
হেঁটে যাবে উত্তরপ্রজন্মের লেখক, কবি, সকলেই, স্থিতধী ও ক্ষেপা;
খুলবে নতুন কোনো উদ্ভাবনের দরোজা
আবিষ্কার করবে সাহিত্যের নতুন লোকালয়, চলবে নিরন্তর খোঁজা
কেউ যাবে পেছনে, সামনে কেউ কেউ
মহাসড়কে তখন তরঙ্গ, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ।
কাহ্নপার চর্যা থেকে, চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে
উঠে আসা এ-সড়ক ছুটে গেছে এঁকেবেঁকে
এগারোশো ঊননব্বইয়ের নুরলদীনের কাছে, অতন্দ্র প্রহরীর মতো দিয়েছে হাঁক
‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ মুহুর্মুহু প্রতিধ্বনিত হয় এই ডাক;
তেরোশো নদীর বুকে জেগে ওঠে ভালোবাসার তরঙ্গ
হাজারো কণ্ঠের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়—আমি জন্মেছি এই দেশে, আমার শেকড় এই বঙ্গ
সহসা মহাসড়কে উঠে আসে পলিমাটি-কাঁদামাখা নেংটি কৃষক
যার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন হক,
‘এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে’
দেখুন, দেখুন কবি, আজ সেই মাটির দেউল ছুঁয়ে উত্তরপ্রজন্ম শেখে
তার ভাষা, তার ঐতিহ্য, হাতড়ে খুঁজে বের করে অস্তিত্বের প্রাচীন শেকড়,
কৈবর্ত গ্রাম, পাহাড়পুর, পুন্ড্র-বরেন্দ্র, দিঘি-নালা হাওর-বিবর,
হাজী শরিয়ত, তিতুমীর, মহুয়ার পালা, অগ্নিবীণা-গীতাঞ্জলি,
কী নেই এই মহাসড়কে, কোনটা রেখে আজ কোনটা বলি।
হে কবি, হে সব্যসাচী
তেরেশো নদীর শপথ, যতদিন বাঁচি
শত্রুর সাথে করে যাব লড়াই, ‘স্বপ্নের সাথে বাস’
আসুক যত কালবোশেখি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস;
এই মহাসড়কের মেনিফেস্টো, দ্ব্যর্থহীন ঘোষণাই আমার পরিচয়
আমি বাঙালি, আমি বাঙালি, আমি বাঙালি, এই কথা জেনে রেখো নিশ্চয়
হে দূর ভূগোলের অধিবাসী
বাংলা আমার ভাষা, হাসি-কাঁদি-গাই এই ভাষাতেই প্রিয়তমাকে বলি, ভালোবাসি
এ-আমার পরিচয়, এ-আমার গৌরব
কাদা-মাটির সোদাগন্ধই আমার অস্তিত্বের সৌরভ।
হে সড়ক, হে মহাসড়ক, জন্ম তোমার চর্যা থেকে
ছুটে চলে গেছ এঁকেবেঁকে
কত দূর থেকে দূরে, আরও মহাদূরে…
কত চেনা-অচেনা পথের বাঁক ঘুরে।
এই মধ্য-শরতে
বাংলার জল-কাদা-মাটির পরতে পরতে
লেগে আছে তোমার চুম্বনের দাগ,
সেই দাগ ছুঁয়ে করছি শপথ হে কবি, আমি জেগে আছি, থাকব সজাগ
আবার যদি কোনো দিন ‘নষ্ট খেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট’ হয়
যদি আবার কোনো দিন এই বাংলায় উল্টো হাওয়া বয়
‘নিলক্ষার নীলে তীব্র শিস দিয়ে এত বড় চাঁদ’ যদি আর না ওঠে
যদি আমার আকাশে কোনো দিন দেখা দেয় অশুভ মেঘ, তারা না ফোটে
যদি আবার শকুন ডানা মেলে এই বাংলায়,
আমি তখন আবার ডাক দেব নুরলদীন হয়ে, ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’
ভুল গাড়ি
সুখের জন্য ছুটে গেছি কত দূর
হেঁটেছি মাটিতে, ভেসেছি সমুদ্দুরে
কণ্ঠে তুলেছি কত লয়, তাল, সুর
গোল ভূগোলের পথে হেঁটে ভবঘুরে।
রাস্তার বাঁকে বুনেছি স্বপ্নবীজ
কত চারাগাছ, বিটপী অঙ্কুরিত
পুষ্পে শোভিত নন্দিত দহলিজ
কাটা ছিল তবু হইনি কখনো ভীত।
আজ মনে হয় শুরুটাই ছিল ভুল
ভুল ট্রেনে উঠে যাত্রা করেছি শুরু।
চিরকাল আমি শূন্যে খুঁজেছি মূল
কোথায় নামছি! বুক কাঁপে দুরুদুরু।
প্রতিটি রাস্তা বলছে এখন ডেকে
দ্রুত নেমে যেতে হয় ভুল গাড়ি থেকে।
তোমাকে
মনের ভেতরে ছোট্ট একটি ঘর
তোমাকে রেখেছি যত্নে সেখানে প্রিয়
ভেবেছি এ মন চির অবিনশ্বর
যথার্থ আর আছে কোন ইন্দ্রিয়?
কিছু দিন পরে মন হলো বিস্মৃত
তোমাকে এবার হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই
বুঝিনি হৃদয় থেমে গেলে আমি মৃত
হারাবো যে প্রেম আমি খুব সহসাই।
এবার আমার হলো ঠিক বোধোদয়
আত্মায় লিখে রাখি নাম প্রিয়তমা
আজ থেকে নেই হারাবার সংশয়
অতীতের ভুল করে দিয়ো তুমি ক্ষমা।
দেহের মৃত্যু ঘটে, আছে পরাজয়
আত্মায় তুমি আছ তাই নির্ভয়।
























