গৌতম কৈরী

গৌতম কৈরী

গৌতম কৈরীর কবিতা ‘আমি খুব চিৎকার দিয়েছিলাম’

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৬, ২০১৯

পুড়িয়ে দিলো ঘরবাড়ি
ওরা, তাড়িয়ে দিলো পাড়া।
ওইখানে ওই নাগেশ্বর গাছ আর আমার জন্ম একই লগ্নে
আমার শিকড় ধরে টান মেরে
ওরা, তাড়িয়ে দিলো পাড়া।
আমি মরে গেলেও
খুব গোপনে বেঁচে থাকে আমার চিৎকার
শেষ বিন্দুতে।
যেকোনো বিন্দু থেকেই নতুন বৃত্ত রচিত হতে পারে।

আমি খুব চিৎকার দিয়েছিলাম
বাবা-মা। পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়েছিল নতুন বৌ।
পুড়িয়ে দিলো ঘরবাড়ি
ওরা, তাড়িয়ে দিলো পাড়া।
আমার রক্তের ভিতর পোড়া ছাই।
আমার নিঃশ্বাসের ভিতর কিছুটা জোনাক।

*
আমার লেখা একটা গান আমার মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে আছে
আমার আঁকা একটা সিনেমা আমার মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে আছে
এর থেকে প্রমাণিত হয়, মানুষ একবারে মরে না।
বরং
একটু একটু করে মরে যায় প্রতিদিন
প্রতিদিন একটু করে বাঁচিয়ে রাখছো সঞ্চয়, জীবনের জন্য?
ধীরে ধীরে একটা গল্পের দিকে যেতে থাকে জীবন।
যে গল্প তোমার চেনা
বয়ে নিয়ে যায় এক জীবনে, হাজার জীবনের আয়না।
আয়নার ভিতর টিয়াপাখি ও অন্য প্রজাতির প্রজাপতি একটা দুটো মৌমাছি।
মৌমাছির চাকের মতো দানা বাঁধছে ইতিহাস
দূর থেকে কেউ ঢিল ছুড়ে পালাচ্ছে। মেচৈাকে ঢিল...
আমার জন্ম সেই ভাঙা মৌচাকের ভিতর থেকে
আমার বিশ্বাসের জন্ম সেই ভাঙা মৌচাকের ভিতর থেকে
আমার খিদের জন্ম সেই ভাঙা মৌচাকের ভিতর থেকে
আমার ধর্মের জন্ম সেই ভাঙা মৌচাকের ভিতর থেকে

*
মৌচাকে ঢিল মেরে ওরা পালিয়ে গেল
কেউ কেউ মানচিত্র ছেড়ে
কেউ কেউ নিজের আয়না ছেড়ে।
কোনো এক স্তব্ধ রাতের পর...
কোনো এক বোবা রাতের পর...
ওরা ফিরে এলো।
ওই যে, মৌচাকে ঢিল মেরে যারা পালিয়ে গিয়েছিল
ওরা ফিরে এলো।

ওরা আমার শিরদাঁড়ার দখল নিতে চাইলো
ওরা আমার বিশ্বাসের দখল নিতে চাইলো
ওরা আমার তৃণভূমির দখল নিতে চাইলো

পুড়িয়ে দিলো ঘরবাড়ি
ওরা
ঘরের ভিতর পুড়ছে তখন গীতা, গীতবিতান ও ডাস ক্যাপিটাল
আমার কণ্ঠ ও জিহ্বা আমি হারিয়েছি সেই রাতেই
আমার পাড়ার সবাই বোবা ও বধির হয়ে গেল সেই রাতেই।
ঘরের ভিতর পুড়ছে তখন গীতা, গীতবিতান ও ডাস ক্যাপিটাল

*
সেই রাতে সবাই আশ্বিনের গুটিসুটি ঘুম ঘুমালো
বড় মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসার পর
গোটা পৃথিবী জানলো,
গোটা দেশ দেখলো,
একটা আস্ত পাড়া কাগজের মতো পুড়ে ছাই...
ছাইয়ের ভিতর আমি খুঁজি গীতা, গীতবিতান ও ডাস ক্যাপিটাল
আমার চোখে আগুন।
আগুন হাতড়ে আমি আমার মৃতদেহ খুঁজে পাই।
কিন্তু
আমি জানি, আমি মরে যাইনি সেই রাতে।
মৃতদেহের সাথে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।
কেবল মৃত্যুই মানুষকে অমর করে।

আমার পড়ার টেবিলে একটা ফুলতোলা চাদর ছিল
দেয়ালে ছিল পালতোলা নৌকা
বিপ্লবদা আর্ট পেপারে এঁকেছিল চে গুয়েভারা।
টিনের বাক্সে ছিল শৈশবের লেখা, দেশপ্রেমের পদ্য
সবকিছুর সাথে দেশপ্রেম পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
আমার পৃথিবীর আকাশ সেই ছাইয়ে কালো হয়ে যায়
কালো আকাশে আমি খুঁজতে থাকি...
পালতোলা নৌকা, চে গুয়েভারা, দেশ ও প্রেমের পদ্য।
তারপর অনেকদিন বৃষ্টি হয়নি এ পাড়ায়
তারপর অনেকদিন রক্তজবা ফোটেনি
এ পাড়ায়, আর শোনা যায়নি— আহা আজি এ বসন্তে...

*
আমি স্টেশনে এসে নামলাম
এই আমার তৃতীয় বারের মতো বড় শহরে আসা।

স্টেশনে এক বুড়ি মার সাথে আমার পরিচয় হলো
যে তার ছেলের লাশ নিতে স্টেশনে এসেছে
ছেলেটি কুয়েত অথবা কাতার অথবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে কাজ করতো
ছেলেটির লাশ আসছে কফিনে করে
বুড়ি মা ছেলেকে ঘরে নিয়ে যেতে এসেছেন।
যেন, স্কুলের গেটে অপেক্ষারত মা
স্কুল ছুটি হলে ছেলেকে নিয়ে ঘরে যাবেন।
বৃদ্ধার চোখে জল নেই
একটা সময় পর মানুষের চোখে আর জল থাকে না।

*
আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম
তোমাদের সবাইকে আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম
হতে চেয়েছিলাম বৈষ্ণবীর গানের সঙ্গী।
তোমারা ভালবাসাকে বিতাড়িত করলে বাগান থেকে।

চোখের উপর কালো পর্দা ঝুলিয়ে চাষ করলে কাঁটা ঝোপের
কৃষিখেত জুড়ে কাঁটাঝোপ
বাড়ির আঙিনা জুড়ে কাঁটাঝোপ
বুকে কাঁটাঝোপ হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেলে প্রধান সড়কের দিকে...
পোয়াতি খেতের কোল খালি করে, ধর্ষণ করলে তাকে।
নিজেকে বাদে সবাইকেই শত্রু ঘোষণা করলে
ঘোষণা করলে—
দখল... কতল...
কতল... দখল...
পাঞ্জাবির আস্তিনে ঘাম মুছে একবারও ভাবলে না,
কাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছ?
যে গাছের ছায়ায় বড় হলে, সেই গাছ উপড়ে কি প্রতিষ্ঠা করতে চাও?
একবারও ভাবলে না কাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছ?
তোমাদের এ যাত্রা ভালবাসার বিরুদ্ধে।

*
আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম
তোমাদের সবাইকে আমি ভালবাসতে চেয়েছিলাম।
মতের বিরুদ্ধে মত দিয়েই যেতে হয়
খিদের বিরুদ্ধে যাবার পথ এখনো তৈরি হয়নি।

সম্মিলিত হুংকারে ভরে উঠছে ময়দান
ট্রাকে, রাস্তায় উন্মাতাল চিৎকারে ভরে উঠছে আকাশ।
কিন্তু হৃদয়ের গভীরে যে বাঁশির ঢেউ বাজে, তা শুনতে পাও না?
হে মানব জনম...
হায় মানব! হায় জনম!

তাহারা বলিলেন মারো
তাহারা বলিলেন ভাঙো
তাহারা বলিলেন না, ভালবাসো

হে মানব জনম...
হায় মানব! হায় জনম!

*
বেহিসেবি কলম খুলে রেখেছি
প্রকৃতির প্রশ্রয়ে করিনি যাত্রা
যে পথে কুসুম ছড়ানো, সে পথে আমি নেই।

এখানে উচ্চস্বরে কথা বললেই ভুল বোঝে মাতাল সব
কেন সবসময় মৃদুস্বরে বলতে হবে কথা?
কেন?
একদল গর্দভ গণ্ডারের সাথে কেন আমাকে মাতালের অভিনয় করতে হবে?
কেন?

সারি সারি নাম নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে তালিকা।
আগামীকাল থেকে উন্মাদনা। লিফলেট পোস্টারে মিথ্যাচার।
যে জিতে যাবে, সেই হবে গর্দভ দলের সর্দার।

এই অচেনা নগরে আমাকে চেনে না কেউ।

*
আমার প্রতিটা দিন আমি বিক্রি করেছি
আমার প্রতিটা অঙ্গ, প্রতিটা সঙ্গ আমি বিক্রি করেছি
আমি উপরে উঠতে চেয়েছিলাম, সবাই যেমনটা চায়।
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজার পর...
স্টেশনে ট্রেন থামার পর...
নামকরা ব্র্যান্ডের দোকানে ৮০% সেলের পর...
সবাই যেমন দৌড়ায়
আমিও নাভিঃশ্বাসে দৌড়ে উপরে উঠতে চেয়েছিলাম।

ক্রমশ আমার টাইয়ের নট আরো টাইট হয়ে উঠছিল
লিফ্ট আমাকে উপরে নিয়ে যাও
ক্রমশ আমার জিভ সরু হয়ে বারবার ঠোঁট চাটছিল  
লিফ্ট আমাকে উপরে নিয়ে যাও
ক্রমশ আমার চোখ লাল ও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছিল
লিফ্ট আমাকে উপরে নিয়ে যাও

আমি আরো উপরে উঠতে চাই
লিফ্ট আমাকে উপরে নিয়ে যাও

আমি আরো উপরে উঠতে চাই
লিফ্ট আমাকে উপরে নিয়ে যাও

কবি পরিচিতি: গৌতম কৌরীর জন্ম ৯ আগস্ট ১৯৮৪, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। অদম্য ভ্রমণের নেশা এবং একইসঙ্গে ঘরকুনো। লেখালেখিতে আত্মপ্রকাশ প্রথম দশকে। প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘অপর পৃষ্ঠাই দ্রষ্টব্য’ ২০০৬ সালে। ২০১৭ সালে প্রকাশ হয় দ্বিতীয় কবিতার বই ‘দৃশ্যের ভেতর দিয়ে যাই’। সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘ঘুড্ডি’। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।

নিজের লেখা ও পরিচালনায় ছোট ছবি ‘রংপেনসিল’ দিয়ে নির্মাণযাত্রা শুরু। ২০১১ সালে নির্মাণ করেন প্রথম টিভি নাটক ‘একটি গল্পের চিত্রনাট্য’। উল্লেখযোগ্য নির্মাণ— কফিন কারিগর, বিশাল রুপালি পর্দা, অথবা রোদের মতো, কাগজের ক্যামেরা, কেন মেঘ আসে, হ্যালো ইয়েলো, বেনীআসহকলা, চন্দ্রবিন্দু, ৫ বছর ৭ মাস ২ দিন, সুবর্ণরেখার বাঁশিওয়ালা, অসময়ের লিরিক, এক যে ছিল গল্প, ফড়িংজীবন, বারান্দায় নয়নতারা, আবারো তোমার গল্প, শেষটা একটু অন্যরকম।