মঞ্জুশ্রী দাশ

মঞ্জুশ্রী দাশ

জীবননামা

গৌতম মিত্র

প্রকাশিত : এপ্রিল ২৫, ২০১৯

জীবনানন্দ দাশ তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন— যখন আমি আমার পরিত্যক্ত ছোট্ট মেয়েটির কথা ভাবি, উদলা, টুরটুর করে হাঁটছে, এবং সকলের দিকে তাকাচ্ছে, যেখানে সব্বাই সহানুভূতিহীন, আমার চোখের জল বাঁধ মানে না।

কবিতায় লিখছেন—

আমার এ ছোটো মেয়ে— সব শেষ মেয়ে এই
শুয়ে আছে বিছানার পাশে—
ভুলে যাই ওর কথা— আমার প্রথম মেয়ে সেই
মেঘ দিয়ে ভেসে আসে যেন
বলে এসে, ‘বাবা, তুমি ভালো আছো? ভালো আছো?— ভালবাস?’
হাতখানা ধরি তার, ধোঁয়া শুধু
কাপড়ের মতো শাদা মুখখানা কেন!...
তবু তারে চাই আমি— তারে শুধু— পৃথিবীতে আর কিছু নয়...

চিদানন্দ দাশগুপ্তকে চিঠিতে দুঃখ করে সন্তানের পরীক্ষায় ব্যর্থতার কথা জানাচ্ছেন। চিদানন্দবাবুর সন্তান অপর্ণার সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা করছেন জীবনানন্দ। অপর্ণা সেন জীবনানন্দ দাশের বোনের মেয়ে।

মেয়ে মঞ্জুশ্রী (১৯৩১-৯৫) যেন কক্ষপথ হারা কোনো গ্রহ। জীবনটাকে কোনোদিনই জুতসই করে বুনতে পারলেন না। ট্রেন থেকে নামার সময় ভুলে গিয়ে বাবার অনেকগুলো খাতা হারিয়ে ফেললেন, অনেক খাতা বন্ধুবান্ধবদের দিয়ে আর ফেরত নিলেন না।

আবার বাবাকে নিয়ে পিএইচডিও শুরু করলেন। থিসিসটা পড়তে পড়তে বুকে পাথর চেপে বসে। দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে মৃত বাবার সম্পর্কে সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করছেন। বাবার মতো কোনো চাকরিই টিকিয়ে রাখতেন পারতেন না। জার্মানির বন শহর থেকে কাশ্মীর-পঞ্জাব কোথাও থিতু হতে পারেননি। সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে বাংলা অকাদেমি কোথায় না চাকরি করেছেন! কবিতা লিখতেন যে কবির বড় আদরের মেয়েটি! বাবা তুমি ভালো আছ? ভালোবাস তো?

বাউলমনে মঞ্জুশ্রী যেদিন মারা গেলেন, শুনেছি সামান্য টাকার জন্য তাকে দাহ করা যাচ্ছিল না। জীবনানন্দপ্রেমী তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেববাবু থাকা সত্ত্বেও। শ্রদ্ধেয় সুমিতা চক্রবর্তীর সহযোগিতায় তা শেষ অবধি সম্পন্ন হয়।

হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশের মেয়ের এই করুণ পরিণতি। ছেলে তো আগেই কোনো মানসিক কেন্দ্রে রোগভোগে মারা গেছেন। স্ত্রী ছেলেমেয়েকে নিয়ে শেষজীবন ভাড়া বাড়িতে কাটিয়েছেন। এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারতেন না। বাড়ির মালিক উঠিয়ে দিতেন।

কবির বড় আদরের মেয়ে ছিল মঞ্জু। ডায়েরির পাতায় পাতায় তার সাক্ষ্য। কে একটি ছোট মেয়ে `বাবা` `বাবা` বলে ডাকে আর জীবনানন্দের মঞ্জুর কথা মনে পড়ে।

জীবনানন্দ দাশ মেয়ের নাম বড় সাধ করে রেখেছিলেন `মঞ্জুশ্রী`। আপাত নিরীহ এই ঘটনার নেপথ্যে কোনো অভিপ্রায় থাকতে পারে ভেবে দেখিনি। কিন্তু মানুষটা যে জীবনানন্দ দাশ।

জীবনানন্দ দাশের বৌদ্ধধর্ম প্রীতির কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। জানি অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে তার মুগ্ধতার কথা। এমনকি কখনও মনে হয়, বনলতা সেনের যাত্রাপথ তো প্রকৃত প্রস্তাবে কোনও বৌদ্ধ চিন্তকের যাত্রাপথ। `মঞ্জুশ্রী` নামটাও এই বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। `মঞ্জুশ্রী` একটা দর্শন আর এই দর্শন জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভরকেন্দ্র।

কী সেই ভরকেন্দ্র? সেই ভরকেন্দ্র প্রজ্ঞা ও করুণা। যা জীবনানন্দের কবিতার পরতে পরতে দেখতে পাই। `করুণ শঙ্খ` থেকে `করুণ স্তন` কোথায় না জীবনানন্দ করুণার ছায়া বিছিয়েছেন! চারদিকে রাত্রি-নক্ষত্রের আলোড়নও তো তার কাছে দয়ার মতো। জ্ঞানের বিহনে তার মতে প্রেম নেই।

জীবনানন্দ দাশই তো লেখেন— এই মশারির ছায়ার ভিতর প্রেম নয়, কামনা নয়, শক্তির আনন্দ নয়, প্রতিভার গৌরব নয়, অনেকদিন থেকে, করুণা আমার ঘরের ভিতর বাসা বেঁধে রয়েছে।

মহাযানী বৌদ্ধরা নিজেদের বোধিসত্ত্ব বলে মনে করেন, তাই মহাযানকে বোধিসত্ত্বযানও বলা হয়। বোধিসত্ত্ব সকল জীবের জন্য অসীম করুণা ও মৈত্রী অনুভব করেন। তিনি দুঃখ জর্জরিত প্রাণীদের উদ্ধারে বিগলিতপ্রাণ। জগতের কল্যাণ সাধনেই বোধিসত্ত্বজীবনের সার্থকতা। বিশ্বের একটি প্রাণীও যদি দুঃখানুভব করে, অমুক্ত থাকে তবে তিনি নিজের মুক্তিকে তৃণবৎ ত্যাগ করেন। বোধিসত্ত্বের এ কল্যাণ চেতনাই বোধিচিত্ত। বোধিচিত্ত অর্জিত হলেই সর্বার্থ সিদ্ধ হয়, ভবসাগর থেকে উত্তীর্ণ হয়ে নির্বাণমার্গে উপনীত হওয়া যায়। জগতের সকল প্রাণীর জন্য বোধিসত্ত্ব এরূপ করুণা অনুভব করেন বলে তিনি পরমকরুণাময়।

‘বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা’ গ্রন্থে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। জন্মের ক্রমানুসারে বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। তার প্রথম রূপ হচ্ছে, অবলোকিতেশ্বর। অবলোকিতেশ্বর করুণার আধার। তারপর মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্ব। তিনি প্রজ্ঞার আধার। অতঃপর বজ্রপাণি, বজ্রগর্ভ, জ্ঞানগর্ভ, রত্নগর্ভ, আকাশগর্ভ, সূর্যগর্ভ, মৈত্রেয় প্রভৃতি বোধিসত্ত্বের কল্পনা করা হয়। বোধিসত্ত্বের এরূপ রূপকল্পনা মূলত গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মসমূহের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। বোধিসত্ত্বের এ ধারণা ভারতবর্ষ থেকে এশিয়ার সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ সকল অঞ্চলের মানুষ আজও বোধিসত্ত্বের আদর্শে উৎসর্গ করে চলেছেন।

আনুমানিক খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতকে রচিত ‘গুহ্যসমাজতন্ত্র’ কিংবা তারও আগে রচিত ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ গ্রন্থে প্রথম বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর নাম পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে রচিত অনেক বৌদ্ধগ্রন্থে তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের সন্ধান মেলে। ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, ইৎ সিঙ প্রমুখের ভ্রমণবৃত্তান্তে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর নামোল্লেখ আছে। ‘সদ্ধর্মপুণ্ডরিক’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, শাক্যমুণি বুদ্ধের সঙ্গে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এছাড়া ‘নামসঙ্গীতি’ গ্রন্থে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে আদিবুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চীনা বৌদ্ধধর্মে প্রচলিত একটি কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, চীনের সাধারণ মানুষের মুক্তি ও তাদের সধর্ম শিক্ষা দেয়ার জন্য গৌতম বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বয়ম্ভূপুরাণও বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে একজন মহান সাধক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া এখানে আরো অনেক মনোমুগ্ধকর কাহিনি আছে। সেসব কাহিনির ভিত্তিতে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে নেপালের সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কারো কারো ধারণা, বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুক হিসেবে নেপালে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। মঞ্জুশ্রীকে কৃষির দেবতা, আধ্যাত্মিক জগতের স্থপতি এবং বিজ্ঞানের দেবতাও মনে করা হয়। বছরের প্রথম দিনটি মঞ্জুশ্রীর উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত বিধায় এদিন নেপালে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।

বোধিসত্ত্বযানের শাব্দিক অর্থ বোধি বা জ্ঞান প্রাপ্তির মার্গ। এই মার্গ দিয়েই অগ্রসর হলেই সাধক এক বিশিষ্ট মার্গফলের অধিকারী হন। তা প্রাপ্তির জন্য অন্য এক বিশিষ্ট সাধনার প্রয়োজন, তা হল সপ্তত্রিংশৎ বোধিপীয় ধর্মের মাধ্যমে পারমিতা সমূহের পূর্ণতা প্রাপ্ত করা। স্থবিরবাদীদের মতে পারমিতা সিদ্ধান্ত দশ প্রকার— দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য, প্রজ্ঞা, বীর্য,শান্তি, সত্য, অধিষ্ঠান, মৈত্রী ও উপো। পরন্তু মহাযানী গ্রন্থে পারমিতা ছয় প্রকার— দান, শীল, শান্তি, বীর্য, ধ্যান ও প্রজ্ঞা। পরবর্তীকালে উপায়কৌশল্য, প্রণিদান, বল ও জ্ঞান সহযোগে তার সংখ্যাও দশ করা হয়েছে; পরন্তু ইষ্ট পারমিতাই অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রামাণিক মানা হয়। এদের মধ্যেও আবার প্রজ্ঞার প্রাধান্যই সর্বাধিক। বোধিসত্ত্বযান বা মহাযানের অনুশীলন ঐ সকল ব্যক্তির পইে সম্ভব, যাঁদের প্রজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে মহাকরুণাও বিদ্যমান। ‘আর্য গয়াশীর্ষ’ নামক তন্ত্র গ্রন্থে মঞ্জুশ্রী হতে জিজ্ঞাসা করছেন যে, বোধিসত্ত্বচর্যার আরম্ভ কি? আর ইহার অধিষ্ঠান বা আলম্বন কি?

উত্তরে মঞ্জুশ্রী বলেছেন, বোধিসত্ত্বচর্যা মহাকরুণা পরঃসর আর মহাকরুণাই ইহার আরম্ভ এবং দুঃখিত প্রাণীই মহাকরুণার আলম্বন। এজন্য ধর্মসঙ্গীতিতে বোধিকারক ধর্মসমূহে মহাকরুণাকে সর্বপ্রথম স্থান দেয়া হয়েছে। এর মতে বোধিসত্ত্বদের কেবল একই ধর্ম স্বায়ত্ব করা দরকার যার নাম মহাকরুণা। এই মহাকরুণা যেই মার্গানুসরণ করে, অপর বোধিকারক ধর্মসমূহও সেই মার্গরই অনুগমন করে, যেমন জীবিতেন্দ্রিয় থাকলেই অন্য ইন্দ্রিয় সকল প্রবৃত্ত হয়।

আসলে জীবনানন্দ মানুষটা খুব সহজ সরল নন, তিনি এইসময়ের একজন প্রধান চিন্তক, তার নিরভিসন্ধি স্নায়ুর আঁধারে এভাবেই বারবার কেঁপে উঠেছে।