করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪৪৭৩৪১ ৩৬২৪২৮ ৬৩৮৮
বিশ্বব্যাপী ৫৮৯৮৩৫৩১ ৪০৭৬৫৫২১ ১৩৯৩৫৭১

দিন যায় কথা থাকে

পর্ব ২০

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২১, ২০১৯

তারা কেউ গান শুনিয়েছেন। কেউ লিখেছেন হিরন্ময় কবিতা। কেউ আবার গল্প-উপন্যাসের মালা গেঁথে সাজিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ঢালি। কেউ বা নিরলস জ্ঞানচর্চায় যোগ করেছেন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন মাত্রা। তাদের সেই দিন আজ আর নেই, কেউ হারিয়ে গেছেন মহাকালে, কেউ বা এক পা বাড়িয়ে রেখেছেন সেই পথে। তবে তাদের কথা আছে; তাদের কর্মে আর সৃজনশীলতায় তো বটেই, আমার কাছেও— কাগজের ভাঁজে ভাঁজে, শব্দগুচ্ছের আড়ালে, বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সাক্ষাৎকারে। হয়তো সেই কথাগুলো আবারো জেগে ওঠতে পারে আপনার মননস্পর্শ পেলে। চলুন পাঠ নেয়া যাক

আমি সব সময়ই বই পড়েছি মনের আনন্দের জন্য— আবু ইসহাক

বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য সৃষ্টি ‘সুর্য-দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসের রচয়িতা আবু ইসহাকের জন্ম  ১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর শরীয়তপুর জেলার শিরঙ্গল গ্রামে। শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে অবসর গ্রহণ করেন। সেই থেকে ১৯৬২ সালে শুরু করা সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান রচনায় পুরোপুরি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। নিভৃতচারী এবং কর্মনিষ্ঠ এই কথাসাহিত্যিকের সূর্য-দীঘল বাড়ী ছাড়া অন্যান্য রচনা-সম্ভার, উপন্যাস— ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’, রহস্যোপন্যাস— ‘জাল’, ছোটগল্প সংকলন— ‘হারেম’, ‘মহাপতঙ্গ’। এছাড়া তার বলিষ্ঠ শ্রমের স্বাক্ষর হিসেবে রয়েছে ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান (স্বরবর্ণ অংশ)’ যার ব্যঞ্জনবর্ণ  অংশ এখন প্রকাশের  অপেক্ষায়। সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন— বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৬২-৬৩, সুন্দরবন সাহিত্য পদক ১৯৮১, লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক ১৯৯০, কথাশিল্পী সংসদ পুরস্কার ১৯৯০, একুশে পদক ১৯৯৭।

বিছানার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অনেকগুলো অভিধান ও রেফারেন্স বই। একটি নয়, দু’টি নয়, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পুরনো, নতুন প্রায় সবগুলো অভিধানই তার সংগ্রহে রয়েছে। আর, সারা ঘরেই  ছড়িয়ে রয়েছে গোটা চল্লিশেক টিনের বড় কৌটা। যার মধ্যে সমকালীন বাংলা ভাষার বিশেষিত বিশেষণীয় শব্দের ছোট ছোট কার্ড বর্ণনাক্রমে সুইয়ে গাঁথা রয়েছে। সেই ১৯৬২ সাল থেকেই তিনি এই শব্দগুলো অভিধান রচনার জন্য সংগ্রহ করে আসছিলেন। অমানুষিক শ্রমে সেই শব্দগুলো নিজেই সাজিয়েছেন ঘরের এক কোণে রাখা কম্পিউটারে। এই অভিধানের স্বরবর্ণ অংশ ইতোমধ্যেই বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়ে দুই বাংলার বিদগ্ধ এবং বিদ্বজ্জনদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ব্যঞ্জনবর্ণের অংশও প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। কম্পিউটারে সংকলন ও সম্পাদনার কাজ চলছে। কাজের প্রতি গভীর এক মুগ্ধতায় তার কাছে এখন তুচ্ছ হয়ে ওঠেছে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম এবং বিশ্রাম। সকাল, দুপুর, গভীর রাত সব সময়ই নিবিষ্ট ধ্যানে আত্মমগ্ন থাকেন শব্দের পর শব্দ সাজানোর খেলায়। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম পায় বলে চেয়ারে নিজেই বেঁধে নিয়েছেন বেল্ট। এক নাগাড়ে বসে কাজ করলে কোমরে ব্যথা ধরে গেলে কাজ করেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এজন্য ক্যামেরার স্ট্যান্ড দিয়ে বানিয়ে নিয়েছেন একটি অভিনব টেবিল। এটি এমনই এক অভিনব বস্তু যে, এই রকম টেবিল পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। ইচ্ছেমতো টেবিলের মূল কাঠটিকে নিচে, মাঝখানে এবং ওপরে ওঠানো যায়। কাঠটিকে তিনটি অংশে নানাভাবে এবং একই সমান ভঙ্গিতে সাজিয়ে নেয়া যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই টেবিলে গভীর রাত পর্যন্ত অভিধানের কাজ করেন। শুধুমাত্র কাজের স্বার্থে এই যন্ত্র এবং উপাদানগুলো তৈরি করেছেন তিনি নিজের হাতে, নিজের উদ্ভাবনী কৌশলে। আর ঘরের একাংশ-ও শেলফ জুড়ে রয়েছে বই, অভিধানের নয়— গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, রাজনীতি, প্রবন্ধ, দর্শন— সব বিষয়ের। বিশালাকৃতির তিন খণ্ডের বই দেখিয়ে বললেন, ‘এ বইটি আমার ছেলের শাশুড়ির লেখা’।

হামিদ কায়সার: এটিতো অন্য ভাষার মনে হচ্ছে।
আবু ইসহাক: নরওয়োজিয়ান ভাষায়। তিনি নরওয়ের পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক। আমার ছেলে ওখানেই থাকে।

হামিদ কায়সার: বইটি কি নিয়ে?
আবু ইসহাক: পৃথিবীর নারীদের ইতিহাস। ভদ্রমহিলা এ বিষয়ের জন্য নিজ এবং ভিন্ন দেশে বেশ সম্মানিত। তার নাম প্রফেসর ড. ইডা ব্লারা ব্লম। তিনি নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

হামিদ কায়সার: এটি একটি চমৎকার কো-ইনসিডেন্স, তাই না? বরের পিতা এবং কনের মাতা দুজনেই লেখক— যারা বাস করেন পৃথিবীর দু-প্রান্তে, কথা বলেন সম্পূর্ণ দু-ভাষায়।
আবু ইসহাক: তিনি বাংলাদেশেও বেড়িয়ে গেছেন।

হামিদ কায়সার: তো, সম্প্রতি কি বই পড়লেন?
আবু ইসহাক: আমি কি আজকাল বই পড়ার সময় পাই? খবরের কাগজেও তো ঠিকমত চোখ বোলাতে পারি না। অভিধান নিয়ে খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে।

হামিদ কায়সার: এরমধ্যে কোনো বই-ই পড়েননি?
আবু ইসহাক: না। পড়ার সময় হয়নি।

হামিদ কায়সার: শেষ কবে পড়েছেন, কোন বইটি?
আবু ইসহাক: এভাবে বলতে পারব না। পড়েছিতো অবশ্যই, তবে সবকিছু ঐ অভিধানের কাজের জন্যই পড়েছি। আমার ‘সমকালীন বাংলা ভাষায় অভিধান’ স্বরবর্ণ  অংশের শেষে এবাংলা ওবাংলার দুশো সত্তরজন সাহিত্যিকের নাম আছে, যাদের রচনা থেকে আমি প্রয়োগ-উদাহরণ সংগ্রহ করেছি। সেই প্রাচীন পদাবলি থেকে আধুনিক সব সাহিত্য রচনাই আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি শব্দ সংগ্রহের জন্য।

হামিদ কায়সার: শব্দ সংগ্রহের জন্য এই পড়াটা আরম্ভ করেছিলেন কবে থেকে?
আবু ইসহাক: ১৯৬২ সাল থেকে। তখন থেকেই আমি বিশেষিত বিশেষণীয় শব্দ পেলেই সংগ্রহ করে রাখতাম— এ শব্দের খোঁজেই তালিকাভুক্ত বইগুলো আমি পড়েছি। যাতে, আমাদের প্রাচীন বাংলা ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখকদের রচনা থেকে শুরু করে সমকালীন কবি-লেখকদের রচনাও আছে। আমি এদের কারো কারো রচনা থেকে প্রয়োগ— উদাহরণ আমার অভিধানে সন্নিবেশিত করেছি। ১৯৮৪ সনে চাকরি থেকে অবসরের পর আমি এই অভিধানের কাজে ভালোভাবেই জড়িয়ে যাই।

হামিদ কায়সার: চাকরিকালীন সময়ে তো নিয়মিত বই পড়তেন?
আবু ইসহাক: চাকরিকালে অবশ্য লেখার সময় পাইনি, তবে পড়ার জন্য সামান্য সময় পেয়েছি। আসলে, আমার চাকরিটা ছিল পড়ালেখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। চাকরি, সংসার ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার তত্ত্বাবধান  করে পড়ালেখায় তেমন সময় করতে পারিনি। তাছাড়া, যারা লেখালেখি করে তারা বেশি পড়তে পারে না। বেছে বেছে পড়তে হয়।

হামিদ কায়সার: আপনার এই বেছে পড়া থেকেই জানতে চাচ্ছি, আপনার প্রিয় লেখক প্রিয় বই সম্পর্কে।
আবু ইসহাক: নির্দিষ্ট করে কি বলা যায়! একসময়ে প্রিয় ছিল শরৎচন্দ্র। তারপর তো কত বই-ই পড়েছি, ভালো লেগেছে, বিশ্বসাহিত্যের জনস গলসওয়ার্দি, রোঁমা র‌্যোঁলা, পিরেনদোল্লা, ইবসেন, ন্যুট হামসন, অলিভার গোল্ডস্মিথের অসংখ্য বই, হেমিংওয়ে, বার্নাড শ’র বইও বেশ  কিছু পড়েছি। শেক্সপীয়রতো আছেই। দস্তয়ভস্কির উপন্যাস, ভিক্টর হিগোর ‘লা মিজারেবল’, গোর্কির ‘মাদার’, পার্ল এস বাকের ‘গুড আর্থ’— এসব বই পড়ার আনন্দ কি কখনো ভুলতে পারব! আমি সবসময়ই বই পড়েছি মনের আনন্দের জন্য সমালোচকের দৃষ্টি দিয়ে নয়।

হামিদ কায়সার: বাংলা ভাষার লেখকদেরর কার বই পড়েছেন?
আবু ইসহাক: তাৎক্ষণিকভাবে যা মনে পড়ছে সেভাবেই বলছি, ছোটগল্প সুবোধ ঘোষ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অপরিণত বয়সে ভালো লাগতো প্রবোধ স্যান্নাল। এখন পড়লে কেমন লাগবে, জানি না। তারাশংকর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসুর বই ভালো লাগত। হুমায়ূন আহমেদের বইও পড়েছি। ভালো লেগেছে, ক্ষমতা আছে তার। কিন্তু আজকাল আমাদের দেশের লেখকরা খুব তাড়াতাড়ি লেখেন। আমি সংখ্যাবৃদ্ধির পক্ষপাতী নই। এছাড়া, সমকালীন অনেকের লেখাই পড়েছিÑ

হামিদ কায়সার: কাদের লেখা?
আবু ইসহাক: সেভাবে নাম বলছি না। তবে পড়ে যেটা মনে হয়েছে, এখনকার লেখকরা কমার্শিয়াল হয়ে গেছেন। অর্থ উপার্জন, বই বৃদ্ধির জন্য লেখেন অনেকে।

হামিদ কায়সার: বই পড়ায় আপনার হাতেখড়িটা হয়েছিল কোন্ বই দিয়ে?
আবু ইসহাক: মনে নেই।

হামিদ কায়সার: বই তো ছোটবেলা থেকেই পড়েন?
আবু ইসহাক: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। মনে আছে, ‘আনোয়ারা’ পড়েছিলাম ক্লাস ফাইভে থাকতে। তখন কিন্তু এই ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস সবার ঘরে ঘরে থাকত। বিশেষ করে মুসলিম পরিবারে। মেয়েদের বিয়ের সম্বন্ধ এলে বলা হতো— আমার মেয়ে আনোয়ারা পড়েছে।’  আমাকে কিন্তু ‘আনোয়ারা’ পড়তে হয়েছিল লুকিয়ে। ছোটদের পড়তে দেয়া হতো না। আর, খবরের কাগজ পড়তাম, আমাদের বাড়িতে সওগাত আসতো। বাড়ির অনতিদূরেই ছিল বিখ্যাত ফুটবলার গোষ্ঠ পালের বাড়ি। সেটা ছিল একটা জমিদারবাড়ি। সে-বাড়ির লাইব্রেরি থেকে আমার বড়ভাই পড়ার জন্য বই নিয়ে আসতেন। তার আনা বইগুলো আমি লুকিয়ে পড়ে ফেলতাম। এছাড়া, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ায়, আবৃত্তিসহ স্কুলের নানা প্রতিযোগিতায় জিতে সবসময়ই বই পুরস্কার পেয়েছি।

হামিদ কায়সার: সে সময়ে কি কি বই পড়েছেন?
আবু ইসহাক: শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’, জগদীশচন্দ্র বসুর ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’, এ ধরনের বিভিন্ন রকম লেখা পড়েছি। অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবীর গ্রন্থাবলি— তখন ৩/৪ টাকায় রচনাবলি কিনতে পাওয়া যেত। দেবদাসের দাম ছিল দেড় টাকা। ‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’ আমি ভিপি করে কলকাতা থেকে আনিয়ে নিয়েছিলাম। ক্লাস এইট থেকেই ছিলাম ‘দেশ’ পত্রিকার গ্রাহক। শরৎ-এর প্রথম লেখা পড়ি ‘পল্লী সমাজ’— তারপর থেকেই ওর ভক্ত হয়ে যাই।

হামিদ কায়সার: বই পড়া থেকেই কি লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা পান?
আবু ইসহাক: হয়তো বা। লেখালেখি আমার শরীয়তপুরের বিঝারি-উপসী হাইস্কুলে। আমরা স্কুলে প্রভাতী বলে একটি পত্রিকা বের করতাম। এ পত্রিকাটির আইডিয়া ছিল আমার এক সহপাঠি বন্ধু সুভাষ করের, তার বড় ভাই সুধীরচন্দ্র কর থাকতেন শান্তিনিকেতনে। তিনিই প্রভাতী’র জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে একটি আশীর্বাদবাণী লিখিয়ে আমাদের নামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল ‘প্রভাতীকে আশীর্বাদ’। এই সুধীর চন্দ্র কর পরে রবীন্দ্রনাথের উপর অনেক বই লিখেছেন। ক্লাস টেন পর্যন্ত ‘প্রভাতী’ দশ বারোটা বের হয়েছিল। বাংলার টিচার পণ্ডিত মশাই ছিলেন এর সম্পাদক। তখন লেখালেখি নিয়ে একটি ঘটনা ঘটেছিল।

হামিদ কায়সার: কি রকম।
আবু ইসহাক: সে সময়ে আমার লেখা কবিতার একটি খাতা ছিল। আমার এক ক্লাস ফ্রেন্ড আমাকে লুকিয়ে কখন যে সে খাতাটি বাংলার টিচার রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিল টের পাইনি।  স্যার ক্লাসে এলেন। দেখলাম টেবিলের ওপর কি একটা খাতার পৃষ্ঠা উল্টে দেখছেন। তারপর বলে ওঠলেন, ‘মেঘেতে ঢেকেছে রবি, ইসহাক হয়েছে কবি’। সারা ক্লাসে একটি হাসির হুল্লোড় উঠল। এরপর তিনি উপদেশে দিলেন, ‘দেখ, কবিতা রচনার ক্ষমতা ইশ্বর-প্রদত্ত। সবাই কবিতা লিখতে পারে না। তুমি কবিতা লেখার চাইতে গদ্য লিখো, প্রবন্ধ-গল্প লিখো, সবাই কবি হতে পারে না। কবিতা লেখা জন্মগত প্রতিভা। তারপর গল্প লিখতে শুরু করি। এ-সময় ‘প্রভাতী’তে প্রকাশিত আমার কয়েকটি গল্পকে সবাই খুব প্রশংসা করেছিল।

হামিদ কায়সার: শুধু, প্রভাতী’কে ঘিরেই সাহিত্যচর্চা চলতে লাগলো?
আবু ইসহাক: সে কথাতেই আসছি। তখন, ক্লাস নাইনে পড়ি। ট্রেন দেখেছি, স্টিমার দেখছি কিন্তু তাতে চড়িনি। ডাকযোগে কলকাতায় একটি গল্প পাঠিয়ে দিলাম কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায়। সপ্তাহখানেক পর অবাক হয়ে দেখি ‘নবযুগ’-এর রবিবাসরীয় ‘রসের জলসা’য় ছাপা হয়েছে আমার প্রথম গল্প ‘অভিশাপ’। এতে আমি সাংঘাতিকভাবে অনুপ্রাণিত হই। তারপর থেকে পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠাবার সাহস পাই।

হামিদ কায়সার: আর, পড়ালেখাও সমানভাবে করে যাচ্ছিলেন।
আবু ইসহাক: তা যাচ্ছিলাম। এর পরইতো, স্কলারশিপ নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হই। এ সময়ে যা পেয়েছি তাই পড়েছি গোগ্রাসে। হিসেব করে বা বেছে পড়িনি। ক’টা বইয়ের নাম বলব। বাইরের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। কলেজ ম্যাগাজিনে আমার অনূদিত একটি কবিতাও বেরিয়েছিল।

হামিদ কায়সার: কার কবিতা?
আবু ইসহাক: জেমস শারলির। এটি আমাদের পাঠ্য বইয়ে ছিল। ইন্টারমিডিয়েটের পর কিন্তু আর বই পড়ার পরিস্থিতি থাকলো না।

হামিদ কায়সার: কেন?
আবু ইসহাক: নিজের পাঠ্যবই পড়াই ছেড়ে দিয়েছিলাম।

হামিদ কায়সার: পড়তে না পারার কারণ?
আবু ইসহাক: সেটা ছিল ‘৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়। চারদিকে অনিশ্চয়তা। বাজারে চাল পাওয়া যেত না। আমি যে মাসে কলেজ হোস্টেলের ম্যানেজার ছিলাম, সে-সময়ে একদিন বাজারে গিয়ে চাল না পেয়ে ফিরে এসেছিলাম। কোনোমতো জোগাড় হলেও তার মধ্যে কাঁকর থাকতো। বাবুর্চি প্রত্যেক ছাত্রের সিটে এক সের করে চাল দিয়ে যেত কাঁকর বাছতে। সব ছাত্রকে সেই কাঁকর বাছতে হতো। তারপর হতো রান্না। সে সময় কিভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল— যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের জন্য পরীক্ষা হবে না। আমরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের মধ্যে লঙ্গরখানায় খিচুড়ি পরিবেশনের কাজ করেছি। কিন্তু, দেখা গেল, গুজব মিথ্যে, পরীক্ষাটা সময়মতই হয়ে গেল। তারপর তো কোলকাতায় গিয়ে সিভিল সাপ্লাইয়ের চাকরি পেয়ে গেলাম। তখন চাকরি পাওয়াটা কঠিন বলে পড়ালেখা সব চুকিয়ে মন দিয়ে চাকরি করতে লাগলাম।

হামিদ কায়সার: এই দুর্ভিক্ষ-এর প্রেরণাতেই কি ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ লেখা?
আবু ইসহাক: তাহলে একটু খুলেই বলতে হয়। ১৯৪৪ সালে আমার পোস্টিং হয় নারায়ণগঞ্জে। লেখালেখিও কিছু করছি। সওগাত, আজাদ পত্রিকায় বেশ কয়েকটি গল্প বেরিয়েছিল। ছুটির দিনে নারায়ণগঞ্জ থেকে বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা করার জন্য ঢাকায় যেতাম। তখন দেখতাম জয়গুনের (সূর্য-দীঘল বাড়ীর নায়িকা) মতো মেয়েদের চাল কেনার জন্য ময়মনসিংহ যেতে। আবার বিকেলেও, ফেরবার সময় দেখতাম ওদের। ফতুল্লায় পৌঁছার আগেই ওরা ট্রেন থেকে চালের থলে দুপদাপ ফেলে দিত। ওখানে দু’-একটা ছেলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। এ বিষয় নিয়েই একটা গল্প লিখতে শুরু করি। লিখতে লিখতে মনে হলো এটার মধ্যে উপন্যাসের এলিমেন্ট আছে। নারায়ণগঞ্জেই থাকতেন প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি আনিসুল হক চৌধুরী। যে ‘রূপালী নদীরে, রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল’ গানটির গীতিকার, তো, তিনি এটাকে উপন্যাস লেখার জন্য সাংঘাতিকভাবে প্রেরণা জোগালেন। নারায়ণগঞ্জ বসেই উপন্যাসটি অর্ধেকটা লিখি, বাকি  অর্ধেকটা লিখতে হয় পাবনায় বসে।

হামিদ কায়সার: পাবনায়, চাকরির কারণে।
আবু ইসহাক: ঢাকায় তখন তেমন কোনো ভালো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল না। ১৯৪৮-এর আগস্ট মাসে কলকাতায় গিয়ে প্রথমেই আমার বন্ধু পুর্ণেন্দুশেখর রায়কে সঙ্গে নিয়ে গেলাম ‘পরিচয়’ পত্রিকা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অফিসে। সম্পাদকের সাথে বইটির প্রকাশনার ব্যাপারে কথা বলি। তিনি পাণ্ডুলিপি রেখে দিয়ে তিন-চার দিন পর তার সাথে দেখা করতে বলেন। চারদিন পর তার সাথে দেখা করলাম। তিনি প্রকাশের যোগ্য নয় এরকম ভাব দেখিয়ে যে ড্রয়ারে পাণ্ডুলিপিটি দিয়েছিলেন, সেখান থেকেই বের করে দিলেন। বললেন যে, ‘এখন তাদের পক্ষে বই বের করা সম্ভব নয়, পরিচয়ে ছাপাও সম্ভব নয়।’ আসলে পাণ্ডুলিপিটি ওরা খুলেই দেখেনি।

হামিদ কায়সার: বুঝলেন কিভাবে?
আবু ইসহাক: বইটির প্রথম দিকের কয়েকটি পৃষ্ঠার কোণায় আমি আঠা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের অফিসের বাইরে এসে দেখলাম যে, আঠা লাগানো পৃষ্ঠার কোণগুলো ঠিক সেভাবেই আছে। তাতে ঝুঝলাম যে, পাণ্ডুলিপিটি তিনি আদৌ পড়েননি!

হামিদ কায়সার: খুব মজার ব্যাপারতো !
আবু ইসহাক: আরো, মজার ব্যাপার হলো, ‘৫৫ সালে কলকাতা থেকে বইটি প্রকাশের পর ‘পরিচয়’ পত্রিকাতেই প্রথম আলোচনাটি বেরোয়। সে আলোচনায় আলোচক লিখেছিলেন ‘উপন্যাসটি এক নিঃশ্বাসে পড়বার মতো। মুসলমান প্রধান সমাজ জীবনের এমন উজ্জ্বল ও অন্তরঙ্গ ছবি  বাংলা সাহিত্যে খুব কমই আছে।’

২২ জানুয়ারি ১৯৯৮, সাময়িকী, দৈনিক সংবাদ