করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৪৬২১৬ ৪৯৬৯২৪ ৮৪০৮
বিশ্বব্যাপী ১১৪০০০৫৯৫ ৮৯৫৬৩৭৯৪ ২৫২৯৫৯৩

দুনিয়া মিখাইলের সাতটি কবিতা

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২১

মানুষের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে লেখা কবিতার ইতিহাস শত বছরের পুরনো। বিগত শতক থেকে শুরু হয়ে এখনো চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু কণ্ঠস্বর, যারা যুদ্ধের এই প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখছেন। যুদ্ধ নিয়ে সমসাময়িক বিশ্বে এত সহজ প্রকাশভঙ্গিতে, তীব্র আর সুন্দরভাবে দুনিয়া মিখাইলের মতো আর কাউকে বলতে দেখিনি। ১৯৬৫ সালে বাগদাদে জন্মগ্রহণকারী এ কবি ১৯৯০ এর মধ্যভাগে `রাষ্ট্রদ্রোহী` কবিতা লেখার অপরাধে সাদ্দাম হোসেনের নিপীড়নের শিকার হন। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে ওয়েইন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। বর্তমানে তিনি ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষার শিক্ষক। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কবিতার বইগুলো হচ্ছে, The War Works Hard (২০০৫), Diary of a Wave Outside the Sea (২০১০) and The Iraqi Nights (২০১৩)। দুনিয়ার কাছে কবিতা যুদ্ধের ক্ষত সারাতে ওষুধের কাজ করে না, এটি বরং এক্সরের মতো, যা যুদ্ধের ক্ষতগুলোকে আমাদের সামনে প্রকাশ করে। এখানে অনুদিত সবগুলো কবিতা The Iraqi Nights কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

দ্বিতীয় জীবন

এই জীবনের পর
দ্বিতীয় আরেকটা জীবন দরকার আমাদের
প্রথম জীবনে পাওয়া শিক্ষাগুলো
কাজে লাগানোর জন্য।
আমরা ভুল করি ক্রমাগত
আর এগুলো ভুলে যাবার জন্য
আমাদের দরকার আর একটা দ্বিতীয় জীবন।
তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায়
আমরা গুনগুন করি অন্তহীন:
পুরো গানটি গাইতে
আমাদের দরকার হবে আরো একটি জীবন।
আমরা যুদ্ধে যাই
এবং সায়মন যা যা বলে, এর সব করি:
ভালোবাসার জন্য
আমাদের দরকার আরও একটি জীবন।
জেলখাটার জন্য
আমাদের সময় দরকার
দ্বিতীয় জীবনে যেন আমরা
মুক্তভাবে বাঁচতে পারি।
আমরা নতুন ভাষা শিখি
কিন্তু এটি চর্চার জন্য লাগবে
আরেকটি দ্বিতীয় জীবন।
আমরা কবিতা লিখি এবং মরে যাই,
আমাদের দ্বিতীয় জীবন লাগবে
সমালোচকদের মতামত জানার জন্য।
আমরা ঘুরে বেড়াই
সবখানে
আমাদের দ্বিতীয় একটা জীবন দরকার
একটু থামা এবং ছবি তোলার জন্য।
আমাদের অমানিশি অনেক দীর্ঘ:
দ্বিতীয় আরেকটা জীবন দরকার আমাদের
বাঁচতে শিখতে
কষ্টহীন জীবন।

তোমার ই-মেইল

পর্দায় যখন তোমার নাম দেখি,
গ্রহগুলো সব ছুটে আসে আমার দিকে,
এমনকি প্লুটোও যোগ দেয় এতে;
আমার জন্য পাকে সব আঙ্গুর
আর ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশীর বাগানেও;
ইশতার আবার ফিরে আসে পৃথিবীতে
ধ্বংস হয়ে যাওয়া নগরগুলোর জন্য
গান গাইতে;
মুখ থেকে সব ধুলো মুছে
ঘুরে দাঁড়ায় সে, যেন নৃত্যরতা উর্বশী,
ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে ঘরে সব যোদ্ধাদের,
আর জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছে চড়ুইয়ের ভাঙা পা
দুই নদীর মাঝখানের এই জনপদে
এটিও আক্রান্ত হয়েছিল।
দরোজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ইশতার*
কিন্তু এখনও আমি অপেক্ষা করছি তোমার ই-মেইলের:
পর্দায় প্রতিফলিত হচ্ছে কেবল একজোড়া ক্লান্ত চোখ
যখন আমার ঘড়ির কাঁটাগুলো মিলিত হয়
তোমার নীরবতার সাথে।

*ইশতার: সুমেরীয়দের প্রেম, সৌন্দর্য ও যুদ্ধের দেবি

বিস্মৃত চাঁদ

সান্ড্রা ডে ও`কনরের জন্য
ছেলেটির একটা দীর্ঘ গল্প আছে,
মেয়েটিরও:
বিস্তারিত,
ঘটনা এবং
জনবহুল।
এই মুহূর্তে
এই বিস্মৃত স্থানে
তাদের জড়ানো আঙ্গুলের কাছে
এগুলো মূল্যহীন।
আশি বছর কেটে গেছে:
দূরে সরে গেছে কণ্ঠস্বর,
দরোজাগুলো খোলা আর
বন্ধ হয়েছে,
স্থানগুলো পূর্ণ আর
শূন্য হয়েছে,
ঝড়ো হাওয়ায়
মুছে গেছে সব নাম
তারিখ
নোট
আর ...
সবকিছু মিশে গেছে
তাদের পিছনে বয়ে যাওয়া নদীতে।
ছেলেটির একটা দীর্ঘ গল্প আছে,
মেয়েটিরও।
সে তাকে কিছুই বলছে না এর,
মেয়েটিও।
আকাশে উঠেছে আধখানা চাঁদ:
কেউ জানে না কোথায় লুকিয়ে আছে বাকি আধেক।

প্রাচীন জলপাই গাছ

শহরটি বদলে গেছে
আর ধোঁয়ার ভেতর থেকে
দৃশ্যটি আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে এসেছে।
সবখানে গর্ত:
বাড়িগুলোর দেয়ালে,
হৃদয়ের দেয়ালগুলোয়,
আর একটি বিড়ালের লেজে।
একটা খালি সুটকেস
হা করে খোলা
পড়ে আছে মাটিতে।
পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করছে
আরব এবং ইসরাইলিরা:
-আমি ইউসুফ,
এরা আমার ভাই,
এটা তার ছুরি,
কুয়োটা অনেক গভীর,
আমার ক্ষতের মতো গভীর,
কেন তুমি বাড়ি বানিয়েছো
আমার কবরের উপর?
-তাহলে আমি তা কোথায় করবো?
এই জায়গা থেকে এক সময় আমি উচ্ছেদ হয়েছি,
বিতাড়িত হয়েছি বহুদূর।
বছর-বছর ঘুরেছি পথে প্রান্তরে
যতদিনে আবার ফিরে এসেছি
যেখান থেকে আমার শুরু হয়েছিল,
তাই আমি বসেছি এখানে
একটা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন হয়ে।
-ঠিক এই জায়গাটি আমিও ছেড়ে গেছিলাম
এবং এর কাছেই
আমি ফিরে এসেছি।
ফিরে এসেছি
ঋতুর মতো, বৃষ্টির মতো
এমন কি যখন সবকিছু
আর ঠিকঠাক নেই।
-এই সেই বীজ যা আমি বুনেছিলাম
এ মাটিতে
যেখানে তুমি আমাকে দেখতে পেয়েছো:
আমি হারিয়ে গেছিলাম
আমার ফল পাকার আগে।
-তোমার যেমন একটা গল্প আছে
আমারও তেমনি:
শুরুটা দু`রকম
কিন্তু শেষটা একই।
-এবং এই শুরু আর
শেষের মাঝখানে
ওইসব ঘটনা
যা তোমাকে যন্ত্রণা দেয়
আমাকেও।
-যেহেতু কাহিনিটা মনে রাখা বেশ জটিল,
পাঠকেরা তাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে:
তাদের ঘুম পাচ্ছে
এবং আমাদের দেখছে দুঃস্বপ্নের মতো,
এবং এটাই এর পরিণতি।
-তাই চলো, আমাদের গল্পগুলো সাগরে ছুঁড়ে ফেলি
আর সামনে এগিয়ে যাই।
-আগামীকাল,
যখন তোমার নাতিদের সাথে আমি
খেলবো প্রাচীন এই জলপাই গাছটি ঘিরে,
এর গায়ে তারা দেখবে রক্ত
এবং দেখবে কিভাবে আমরা আঁচড়ে দিয়েছি আমাদের বর্ণমালা,
আরবি আর হিব্রু,
এর গায়
যতক্ষণ পর্যন্ত না এগুলো লাল হয়ে ওঠে
এবং পাতাগুলো শুকায়
এবং গায়ের উপর এসে পড়ে।
-এবং যখন তারা বড় হবে
এবং বসবে এর ছায়ায়
যেন প্লুটোর গুহার ভেতর, বোঝার চেষ্টা করবে
প্রাচীন এই জলপাই গাছের পিছনে
ছড়িয়ে থাকা
এই
আমাদের ছায়ার মানে।

কান্না

আমি একটা দোকানে কাজ করি যেখানে কান্না বিক্রি হয়
বিভিন্ন আকৃতি এবং মাপের বোতলে
একটা জনকোলাহলপূর্ণ এলাকায়
যেখানে রুমালের জন্যও কোনও সময় নেই।
লাইনে দাঁড়ানোদের মধ্যে প্রথম যে
সে নারীটি এখানে প্রতিদিন আসেন
রংহীন ফোটা কিনতে।
এগুলো কি তার নিজের, না অন্য কারো জন্য?
পরের জন, একটা নতুন খদ্দের:
এক সময় যে ভাবতো, সে কখনো তার দেশ ছেড়ে যাবে না,
এমন কি পর্বতগুলো যদি ধুলোয় মিশে যায়, তবুও।
তারপর আছে দাদিমার সাথে আসা একটি ছেলে:
তারা বন্যার কবল থেকে বেঁচে এসেছে-
যদিও পুরোপুরি নয়।
লাইনের শেষে দাঁড়ানো নারীটি
তার বোতলটি ফেরত দিতে চায়:
তিনি বলছেন, এ বোতলটি তিনি খোলেননি;
তিনি ভেবেছিলেন তার বন্ধুর মৃত্যুর পর
এটি তার কাজে লাগবে,
কিন্তু এর বদলে তিনি কেবল দুটি পার্কিং স্পটের মধ্যে
এদিক-ওদিক আসা-যাওয়া করেছেন।
সূর্য বিদায় নিয়েছে পৃথিবীর অন্য অর্ধেকের জন্য।
ঘরে যাবার সময় হয়েছে:
আমাদের কারো কান্না নেই।

অন্য সময়ের গান

একটা অন্য সময়ের গান
বেঁচে আছে আমার সাথে।
আমি যেখানে যাই, এটিও যায় সেখানে
ছুটে আসে আমার দিকে।
একটা টুকরো কাগজের মতো
আমি এটিকে দুমড়ে
ছুঁড়ে ফেলি দূরে।
কিন্তু যখন আমার মনে পড়ে
এক মৃত বন্ধুর কথা
ভাঁজ খুলে আমি কাগজটি দেখি
মসৃণ করি এটিকে।

বিক্রি হয়ে যাওয়া তোতা

সবকিছু নতুন
আজ
তোতাটির কাছে:
রুপালি মাছটি কোথায়
যে তাকে লেজ নেড়ে সম্ভাষণ জানাতো,
মুখ থেকে বের করতো বুদ্বুদ?
তারাভরা ওই কুয়োটা কই?
কোথায় সেই ছোট্ট ছেলেটি
যে সবসময় এটি দেখার জন্য
এর সামনে দাঁড়াতো,
কখনো কখনো ছুঁয়ে দেখতে চাইতো?
এবং সবচে` বড় কথা:
কোথায় সেই নারী যে তাকে হাত দিয়ে খাইয়ে দিত
যখন সে তার সাথে সাথে বলত:
হাবিবি, ‘প্রিয়তম’
হাবিবি?

অনুবাদ ও ভূমিকা: খায়রুল আলম চৌধুরী