করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৪৫৮০৫ ২৫২৩৩৫ ৪৮৮১
বিশ্বব্যাপী ৩০৩৭৫৩৯৭ ২২০৬০০১৬ ৯৫০৯৮৮
জাহিদ সোহাগ (আলোকচিত্রী: শাহাদাৎ পারভেজ)

জাহিদ সোহাগ (আলোকচিত্রী: শাহাদাৎ পারভেজ)

‘নিজের রক্ত খরচ করে বই পড়তে শিখতে হয়’

প্রকাশিত : মার্চ ০৭, ২০২০

প্রথম দশকের মেধাবী কবি জাহিদ সোহাগ। জন্ম মাদারীপুর। প্রকাশিত কবিতার বই সাতটি, ছোটগল্পের একটি এবং যৌথ সম্পাদনার সংকলন একটি। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘কিছু একাডেমিক সার্টিফিকেট আছে, যা নীলক্ষেত থেকে বানিয়ে নিলেও চলতো।’ আত্মমগ্ন এই কবি নিজেকে ভাসমান অর্থে ইহুদি ভাবতেই পছন্দ করেন। ছাড়পত্রের নির্বাহী সম্পাদক আবু তাহের সরফরাজ নানা বিষয় নিয়ে কিছু সময় তার সঙ্গে গপসপ করেন।

আবু তাহের সরফরাজ: শৈশবের গল্প বলুন। ধানখেত, নদী, পাখি— প্রকৃতির এসব অনুষঙ্গ কীভাবে আপনার স্বপ্ন-কল্পনায় একাকার হয়ে গেল।
জাহিদ সোহাগ: আমার শৈশবের স্মৃতি যেখান থেকে মনে পড়ে— সেটা সম্ভবত চার বছর বয়সের— তখনো স্কুলে যাই না, জঙ্গলের ভেতর একটা পোড়ো-বাড়িতে আমাদের বসবাস, অনেকটা অন্যের সম্পত্তি দখলে রাখার জন্য আমাদের অস্তিত্ব, সাপের উপদ্রপ, সন্ধ্যায় রক্তহীম ভয়; এখানে আমরা বেশি দিন থাকিনি। কিন্তু মনের ভেতর এখানকার প্রকৃতির প্রভাব আমি ভুলতে পারি না। দুপুরে জঙ্গল থেকে বুনোঘ্রাণ আসতো। সেই ঘ্রাণে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতাম সিঁড়ির কাছে বা পাশের জামরুল গাছের তলায়। কখনো ঘাট বাঁধানো নির্জন পুকুরে পা ডুবিয়ে বসে থাকতাম। আমাকে শাসন করার যেমন কেউ ছিল না, তেমনি আমাকে সঙ্গ দেবারও কেউ ছিল না। সারাদিন একা একা আমার কেটে যেত। এই সময়ই আমি প্রকৃতির ঔদার্য ও মানুষের নীচতার সম্মুখিন হই।

আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল আমার স্বপ্ন, আমার কুহক। আমি সেই জঙ্গলের ভেতর হরিণ দেখতাম, দেখতাম কাদায় আটকে যাওয়া রথ। কখনো ছায়ার মতো ক্ষীণ কচ্ছপ শিকারিদের পেছনে পেছনে হেঁটে হেঁটে দেখিছি তাদের নিশ্চুপ কাজ করে যাওয়া। এই বাড়িটি ছিল জমিদারদের। হয়তো দেশভাগের সময় তারা চলে গিয়েছে। বাড়িটির গঠন দেখে পরে বুঝতে পারি এটা মন্দির। সবসময় বালি-পলেস্তরা ধসে পড়ে, স্যাঁতস্যাঁতে, শীতল আর অন্ধকার। এর ফোঁকরে ছিল টুনটুনির বাসা। আমাদের মানসিকতা ছিল শহুরে। নাগরিক। ফলে আমাদের কোনো কিছুর সঙ্গে মাখামাখি ছিল না। ইহুদির মতো ভাসমান জীবন। আর দ্রুতই আমার শৈশব ফুরিয়ে যায়। আমি বড়দের দোকানদারি বুঝে ফেলি বড় হবার আগেই। ফলে একঅর্থে একটি ক্ষীণ শৈশব আমি যাপন করেছি। তা এই পোড়া-বাড়িতেই।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখালেখি শুরুর দিককার সময়গুলোর কথা বলুন। প্রস্তুতিটা কীরকম ছিল। সেই সময়ের উত্তেজনা... পড়াশোনা...
জাহিদ সোহাগ: আমি বইপোকা বা বইপূজারি নই। ক্লাস সেভেন-এইটে এসে একটি বাজারি বইয়ের রগরগে বর্ণনা আমাকে ভাষার শক্তি সম্পর্কে জানান দেয়। তখন আমার ভেতরে ভাষার ক্রীড়া শুরু হয়। ভেতরের ভীষণ একাকিত্ব সম্পর্কে বুঝতে পারি। সেটাকে চাপা দিতেই লিখতে শুরু করি কবিতা, যাচ্ছেতাই রকমের কবিতা। সেসব সাত রাজার ধন কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে ঢাকা আসি। বলা যায়, ২০০৪-৫ সাল আমার লেখালেখির বা পড়াশোনার সূচনা সময়। আবারও বলি, আমি পড়ায় বিশ্বাস করি না। আমি অনেকটা ব্লটিং পেপারের মতো, চারপাশ থেকে আমি শুষে নিই। বই পড়ি সময় কাটানোর জন্য, বা অন্যরা কীভাবে শুষে নিয়েছে সেটা দেখা-বোঝার জন্য। আমি প্রস্তুতি নিয়ে লিখতে আসিনি, লিখতে লিখতে প্রস্তুতি নিচ্ছি, এই প্রস্তুতি কখনো সম্পন্নও হবে না বলে মনে হচ্ছে। আর উত্তজেনা বলতে যা বোঝায় তা আমার ভেতরে। আমি যারে বলি আগুনে লাফানো। নিজেকে বাঁচাতে জ্বলন্ত কয়লার উপর লাফাচ্ছি।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার প্রকাশিত বই ক’টি। এ বইগুলো নিয়ে বলুন।
জাহিদ সোহাগ: কবিতার বইতো সাতটি হয়ে গেল। গল্পের বই একটি। যৌথ সম্পাদনা আছে একটি। নিজের বই নিয়ে বলার কিছু নেই। নিজেকে নানাভাবে বুঝতে চেয়েছি মাত্র। বই একেকটা সিঁড়ি বা ধাপের মতো, যেগুলোকে ব্যবহার করে দেখা যায় কতখানি পতনের কাছে এলাম।

আবু তাহের সরফরাজ: এ দেশের প্রকাশক ও লেখক সম্পর্ক বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কীরকম?
জাহিদ সোহাগ: বাংলাদেশের মানুষ বা শিক্ষিত লোকেরা যদি লেখাপড়া জানতো, তাহলে এই প্রশ্ন হয়তো তুলতে হতো না। ভালো পাঠক থাকলে লেখক-প্রকাশক আপনাআপনি ঠিক হয়ে যেত। আপনি হয়তো বলবেন, ভালো লেখক তো ভালো পাঠক গড়ে তোলে। তোলে নিশ্চয়ই, কিন্তু আমাদের যে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অবস্থা বিরাজ করছে তাতে আশাবাদী হবার কারণ নেই। রাষ্ট্র চায় মানুষ জৈবিক মানুষে রূপান্তরিত হোক। মানুষ চিন্তা করতে না শিখুক। প্রশ্ন না তুলুক। আমার এই উত্তরটা হয়তো প্রশ্নানুগ হলো না, তবে আমার অভিজ্ঞতা ভালো। এখন আরো ভালো এই কারণে যে, এখন লেখক-প্রকাশক একই সত্তা। মানে আমার বইয়ের প্রকাশক আমিই।

আবু তাহের সরফরাজ: বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্য ও কবিতার তুলনামূলক অবস্থান নিয়ে শুনতে চাই।
জাহিদ সোহাগ: দেখুন, বাংলা সাহিত্য চালুনিতে নিয়ে ঝারা দিয়ে যা থাকবে, তাতো আমাদের সবারই জানা, অপচয় দুদিকেই প্রবল। আমাদের অপচয়ের কেন্দ্রে আছে জাতীয়তাবাদ। ওদের আছে মার্ক্সবাদ। তাছাড়া আমি পড়ার বস্তু খুব কমই পাই, তা নিয়ে আলোচনা করবো কীসের সঙ্গে কার! তার উপরে আমি বই-নির্ভর মানুষ নই।

আবু তাহের সরফরাজ: আজকের প্রজন্ম পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। হোক সেটা সিনেমা বা অন্য কন্টেন্ট। ব্যাপারটি আপনি কীভাবে দেখছেন?
জাহিদ সোহাগ: বই পড়তে হলে যে শিক্ষা থাকা লাগে তা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও পাওয়া যায় না। পরিবার তো আরো বড় বাধা। নিজের রক্ত খরচ করে বই পড়তে শিখতে হয়। আর তাছাড়া ভিজুয়াল মিডিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী, আপনার চারপাশে সারাদিন হাজির রাখার জন্য যত বিনিয়োগ, বইয়ের পেছনে তো তা নেই। এর মূলে আছে ব্যবসা। আবার ধরুন, যারা খুব ‘দেখক’ তারা কী দেখছে? কানে হেডফোন লাগিয়ে সারাদিন কী ‘শুনছে’? দেখুন, চেক করে দেখুন, সেসব আপনার দেখার মতো কিছু নয়। সেলফোননির্ভর ‘দেখক’রা সেইসব নাটক দেখছে যা আপনার দেখতে হবে বলে আপনি বাসায় টিভি রাখেন না। এমন কন্টেন্ট, ওয়াজ আছে, হিন্দি-তামিল সিনেমা আছে, এসবই তো? যে ছেলেমেয়েরা সারাদিন কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘোরে, তাদের কাছে জানতে চান তারা কী শোনে— দেখবেন, কী শুনতে হয় তা তারা জানে না, গানের স্রোতা বা ফিল্মের এত দর্শক থাকলে তো এই পোড়া দেশটা পাল্টে যেত। পাল্টাচ্ছে না কেন? কারণ তাদের চোখের সামনে, কানের ভেতর রাশি রাশি আবর্জনা জমে আছে।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখার জন্যে নোট নেয়ার দরকার পড়ে কখনও?
জাহিদ সোহাগ: নাহ্। নোট রাখি না। মাথায় এমনিতেই থাকে। যা হারায়, তো হারায়। হারানোর দরকার তো আছে।

আবু তাহের সরফরাজ: আপনার লেখালেখি কী রুটিন মেনে চলে, নাকি যখন এলো তখন লেখা, এ ধরনের?
জাহিদ সোহাগ: রুটিন মানে, সবসময় লেখাপড়ার মধ্যেই তো থাকি। কখনো না লিখলেও সেটা লেখার জন্য বীজতলা তৈরির কাজ করা। কোন লেখা কখন কীভাবে আসবে তা নিয়ে চিন্তা করি না। কোনো লেখা রুটিন মাফিক শেষ করতে হয়, কোনো লেখা হঠাৎ আসে, এমন।

আবু তাহের সরফরাজ: লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
জাহিদ সোহাগ: লিখতে লিখতে যেদিকে যাই, সেটাই আমার পথ!