হাসপাতালের বিছানায় লাহুম

হাসপাতালের বিছানায় লাহুম

পাপিয়া জেরীনের গপ্পো সপ্পো

পর্ব ৭

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯

মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে লেভেল ফোরে তেতাল্লিশ নম্বর বেডে আমি বসে আছি। একজন নার্স এসে বেডের সাথে লাগোয়া দেয়ালে লাগানো নামটা খুলে ওখানে `লাহুম` নাম ঝুলায়ে দিয়ে গেল। পাশের রুমগুলো থেকে বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আসতেছে। একটা ছোট্ট মেয়ে করিডোর দিয়ে এক পা দু’পা করে হাঁটতেছে। ওর মাথা থেকে একটা পাইপ ছোট্ট একটা রোলিং স্যালাইন স্ট্যান্ডের সাথে লাগানো। সেখানে একটা প্লাস্টিক ব্যাগে গোলাপি তরল জমা হয়ে আছে। এইটা শিশুদের ক্যানসার বিভাগ। পুরাটা সেকশন হিমঘরের মতো ঠাণ্ডা।

পাশের বিল্ডিংয়ে যাব। ডক্টর কিথ গো`র সাথে দেখা করতে হবে। উনি কল করছেন আমাদেরকে। কিথ গো অনবরত কথা বলে যাইতেছেন, তার ইংলিশ বুঝতে কষ্ট হইতেছে না। এইটা হলো মোহাম্মদ লাহুমের সেরিবেলাম। এখানেই ওর টিউমার। দেখো এই টিউমারটার নাম হলো, এস্ট্রোসাইটোমা। নামটা এমন কারণ এটা দেখতে একটা নক্ষত্রের মতো। তোমার ছেলের মাথায় এটা একটা নক্ষত্র, আমরা এটাকে অপারেশন করে বাদ দেব। এইটার আশপাশে দেখো, পানি জমে আছে। আমাদের এইটা কেটে বের করে আনতে ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে।

অপারেশনে ছয় ঘণ্টার জায়গায় বারো ঘণ্টা লাগলো। লাহুমকে আইসিইউতে দেয়ার পর কয়েকজন জানালো, সে নাকি বারবার বলতেছে, মাদার! মাদার! মানে, মাকে দেখতে চায়। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। সে মাদার বলবে কেন, মাদার বলা তারে কে শিখাইলো! পরে জানা গেল, সে নার্সদের দেখলেই বলতেছিল, ‘মাইর দেব, মাইর দেব।’ আর সেইটাই ওরা বলতেছিল, মাদার মাদার। এমন জটিল একটা পরিস্থিতি যে, কেমন করে হাসবো বুঝতে পারতেছিলাম না।

ডাক্তার আমাদের কাছে জানতে চাইলো, হু ইজ সুমাইয়া? মোহাম্মদ লাহুমের বোন? আমি অবাক! সুমাইয়া নাম এখানে আসতেছে কেন? সুমাইয়া আমাদের বুয়ার মেয়ে। আমি তাকে বললাম, সুমাইয়া ওর বোন না, ওর বোনের নাম তিতলী। ডাক্তার বলতেছিল, মোহাম্মদ লাহুম তার মাদারের পাশাপাশি সুমাইয়াকেও দেখতে চায়।

একদিন পর লাহুমকে বেডে দেয়া হইলো, সেই তেতাল্লিশ নম্বর বেড। তার সারাটা শরীর তার আর পাইপে জড়ানো। কিছুক্ষণ পরপর সে নিজের হাতের দিকে তাকায়ে ‘সাপ সাপ’ বলে চিৎকার করে উঠতেছে। কোনোভাবেই তারে কন্ট্রোল করা যায় না। একটু পর সে আবার চিৎকার... ওই যে তেলাপোকা! আবার আরো কিছুক্ষণ পর সে বললো, একটা বিশাল গাড়ি এই রুমে ঢুকে গেছে। শেষ রাতের দিকে দরজায় একটা হাতী।

নার্স জানাইলো, ওর হেলুসিনেশন হইতেছে, ডোন্ট অরি।

পরদিন লাহুম মোটামুটি স্ট্যাবল, এখন ভয় লাগতেছে না তার। তার কাছে ম্যাক্স আসছে। হাতি নাই, সাপ নাই, তেলাপোকাও নাই। আমরা ম্যাক্সকে দেখতাম না, ওই দেখতো।

ইন্ডিয়ান একজন নার্স আমাকে পরামর্শ দিলেন, ওর মাথার কাছে বসে হনুমান চল্লিশা পড়ো। আমি তারে বললাম, আমি তো হনুমান চল্লিশা পড়তে পারি না। সে বললো, তাইলে ওর বাবাকে বলো প্রে করতে। রুমের ছাদে কিবলার দিকে তীর আঁকা.. সেদিক দেখায়ে বলল, প্রে।

পরেরদিন সেই নার্স আমাকে বাইরে নিয়া আসলো, একটা লেমিনেটিং করা কাগজ দেখায়ে বলল, ভালো করে দেখো। এটা বেডের টেম্পোরারি নেইম প্লেট। লাহুমের আগে এই বেডে ম্যাক্স নামে একটা বাচ্চা ছিল। সেইটা তোমাদের জানার কথা না, আর কাগজেপত্রে লাহুমের বয়স আড়াই বছর, সে তো পড়তে পারে না, তাই না?

আমার এই কথা শুনে প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু কেন যেন আমার মাথা কাজ করতেছিল না। পরদিন আমি ডাক্তারকে বিষয়টা বললাম। উনি বললেন, হেলুসিনেশন, ইমাজিনারি ফ্রেন্ড। তারপর উনি বললেন, রিলিজ নেয়ার পর তোমরা কোথায় উঠবা?

আমাদের কিচেনার রোডে একটা হোটেলে ওঠার কথা, সেইটাই বললাম। কিথ্ গো বললেন, মোস্তফা প্লাজার ঐদিকেই একটা বড় মসজিদ আছে, মোহাম্মদ লাহুমকে নিয়ে যেতে পারো ঘুরতে।

হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার পরদিনই ছিল কোরবানির ঈদ, সিঙ্গাপুরের সবাই সেটাকে বলে হজ্জ। হজ্জের দিন আমরা লাহুমকে নিয়ে মসজিদে ঢুকলাম। খুব সাধারণ একটা মসজিদ। কী করা উচিত বুঝতে পারতেছিলাম না। মসজিদে কোনো ইমাম দেখতে পাইতেছিলাম না। লাহুমরে কোলে নিয়া পরম শক্তির কাছে মাথা নত করতেছিলাম বারবার। মসজিদ থেকে বের হয়ে সিঙ্গাপুর জু তে গেলাম। মেরিনা বে তে গেলাম। অনেক অনেক ছবি তুললাম। আমরা জানতাম না, আমাদের আসলে শেষপর্যন্ত কী হবে, শুধু ভাবতেছিলাম লাহুম আমাদের সাথে আছে, লাহুম আমাদের সাথে আছে। লাহুম আছে, আর কিছু চাই না।

চিকিৎসা পর্ব শেষ হইলো। আমরা তখন দেশে ফিরতেছি। প্লেনে লাহুমের হাতে একটা ছোট্ট বল আবিষ্কার করলাম। এই বল আমরা চিনি না, এইটা কার বল?

লাহুম বললো, এটা ম্যাক্স দিছে।
আমি বললাম ফেলে দেও, কার না কার বল। কোথায় পাইছো!
লাহুম কোনোভাবেই সেই বল ফেলে না। বাসায় আসার পরও অনেকদিন এই বলটা ছিল ওর সাথে। অনেকদিন ম্যাক্সও ওর সাথে ছিল। ম্যাক্স বেশিরভাগ সময় ওর ঘাড়ে বসে থাকতো। লাহুমরে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড সুড়সুড়ি দিতো। ও হাত দিয়ে ধরে কিছু খেতে গেলে ম্যাক্স হাত চেপে ধরতো, কোনোভাবেই মুখে তুলে নিতে পারতো না। এগুলাকে আমরা সমস্যা হিসেবে দেখতাম না। ভাবতাম, এতবড় অপারেশনের তো একটা সাইড ইফেক্ট থাকবেই।

মজার বিষয় হইলো, লাহুম ছোটোবেলা থেকেই একা একা ইংরেজিতে কথা বলে। সচেতন অবস্থায় বলে না। আমাদের সাথে বাংলায় বলে, অসচেতন অবস্থায় ইংরেজিতে। ওর বয়স সাড়ে ছয় এখন, অপারেশনের সময় ওর ব্রেইনের ওয়ান ফোর্থ ফেলে দিতে হইছে।

ও সারা রাত জেগে থাকে, ভোরে ঘুমায়, ঠিকমতো পেট ভরে খেতে পারে না। কিন্তু ও ডাইনোসরের প্রতিটার আলাদা নাম জানে, সমুদ্রের নীচের সবগুলা মাছের নাম জানে, অনেক জিনিসের নাম বলে যা আমি বা অন্য কেউ এর আগে শুনি নাই। লাহুমের ইচ্ছাতেই তাকে একটা স্কুলে ভর্তি করা হইছে এখন। তবে এখনো সেখানে ওর কোনো বন্ধু হয় নাই। ওকে এখন ম্যাক্সের কথা জিজ্ঞেস করলে ও মুচকি হাসে। এদিক ওদিক তাকায়ে বলে, কই ম্যাক্স? ম্যাক্স তো নাই!

লেখক: কবি, গদ্যশিল্পী ও চিত্রকর

ধারাবাহিক