করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১১৭৯৮২৭ ১০০৯৯৭৫ ১৯৫২১
বিশ্বব্যাপী ১৯৪৮৪৬৫১৬ ১৭৬৭৮৮৬২৭ ৪১৭৫৪৩১

ফুকোর বয়ানে ক্ষমতার রূপ-রূপান্তর ও ডিস্কোর্স নিয়ন্ত্রণ

জগলুল আসাদ

প্রকাশিত : জুলাই ১১, ২০২১

ফুকো ইদানীং কমনসেন্স হয়া গেলেও মাঝে মাঝে পুরানা কথা মনে করিয়ে দেয়া জরুরি। তো ফুকো, আপনারা জানেন, ক্ষমতার কয়েকটি রূপ ও রূপান্তরের কথা কইছেন। এই রূপগুলোকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে হয় একত্রে না হয় কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে দেখা গেছে। তিন ধরনের ক্ষমতা  নিয়ে আজ ফুকোর আলাপটা সংক্ষেপে করা যাক। অর্থাৎ স্মরণ করা যাক।

একটা হলো Sovereign power। এটার বৈশিষ্ট্য হলো, সে সার্বভৌম, প্রকাশ্যে শাস্তি দেয়, কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে। এই ক্ষমতা নির্যাতক ও নিপিড়নকারী। ক্রিমিনালের শরীর যেন নিজেই সাক্ষ্য দেয় তার অপরাধের। ইউরোপে সসপ্তদশ শতকে ক্ষমতার এই চেহারা বিশেষভাবে খেয়াল করেন ফুকো। এই ক্ষমতা রিচুয়ালাইজড ও সিম্বোলিক। বেশ আয়োজন করে এই শাস্তি প্রদান করা হতো। যাতে ওই বিশেষ শাস্তি সকলের জন্যে বার্তা হয়ে ওঠে।

Discipline and Punish বইয়ের The Spectacle of the Scaffold চ্যাপ্টারে এই নিয়ে বিশদ পাবেন। এর আগের চ্যাপ্টার The body of the condemned এও পাওয়া যাবে। এ দুটো অধ্যায় বইটির Torture শিরোনামের অধীন। বর্তমানে এই ক্ষমতার রূপ ধরতে পারেন রাস্তাঘাটে ‘বৈধ’ অস্ত্রে নাগরিক হত্যাকে। আরেকটা রূপ হইলো, Disciplinary power। এই ব্যবস্থা অনেকটা গোপনেই সারা হয়, আগেরটির মতো প্রকাশ্যে নয়।

নাগরিকদের বাগে রাখবার জন্যে এই ক্ষমতার প্রয়োগ হয় নানারূপে, নানা প্রতিষ্ঠান ও আইনি প্রকৃয়ার মধ্য দিয়ে। কারাগার এরমধ্যে একটা। জেরেমি বেন্থাম কথিত প্যানঅপটিকনের ধারণা এই ডিসিপ্লিনারি ক্ষমতার ভালো উদাহরণ। প্যানঅপটিকন এমন এক কারাগার ব্যবস্থা যেখানে গার্ড সমস্ত বন্দির ওপর নজর রাখতে পারে নিজেকে লুকিয়ে। সবার অজান্তেই সবাইকে নজরবন্দি রাখা এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, এই নজর বন্দিত্বই এক প্রকারের শাস্তি।

অনুগত-বাধ্য নাগরিক তৈরির আধুনিক ব্যবস্থাপনাকে রাষ্ট্রের Disciplinary power বলা হয়। ব্যাংক স্টেটমেন্ট তলব, নৈতিক নজরদারি, মামলার ভয়, টেলিফোনে আড়িপাতা বা ফোনকল ফাঁস ইত্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্র Docile Body বা বশ্য-বাধ্য ব্যক্তি তৈরি করে। এখানে এই কথাও যোগ করা যায় যে, যে সত্য রাষ্ট্রের জন্যে বিব্রতকর, সেটা লুকোনো; বিশেষ অস্বস্তিকর ‘সত্য’কে লুকিয়ে ক্ষমতার জন্যে স্বস্তিকর ‘সত্য’ নিয়ে আলাপের পরিবেশ তৈরি করা।

যে সত্য ক্ষমতার জন্যে স্বস্তিকর সেটা প্রকাশ্যে আনা ও প্রচার করার ব্যবস্থা করা ডিসিপ্লিনারি পাওয়ারেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রচারণার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মিথ্যা সরবরাহ করে হলেও নাগরিকদের বাগে রাখা শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতার নজির। Normalisation বা স্বাভাবিকীকরণও এই ব্যবস্থার একটা মোজেজা। লোকে নিজের বন্দিত্বকেই স্বাভাবিক ভাববে, ভিন্ন কিছু ভাবাই মনে হবে অস্বাভাবিকতা। Disciplinary power এর অন্তরের ভেতরের জিনিসই হচ্ছে, নিজ ক্ষমতাকে সংহত করা।

আরেকটাকে বলে রাষ্ট্রের জৈব ক্ষমতা বা Biopower। রাষ্ট্র শুধু নীপিড়নমূলক বা নজরদারিমূলক ব্যবস্থা দিয়েই জনগণের উপর নিজের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত রাখে না, বরঞ্চ একালে বহু ‘জৈবিক’ বিষয়াদির ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েও সে তার জরুরতকে অব্যাহত রাখে। জনসংখ্যা, যৌনতা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মডার্ন স্টেইটের বিশেষ বিবেচনার জায়গা। প্রসূতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা নিয়ন্ত্রণ, টীকা কার্যক্রম ইত্যাদি ইতিবাচক ক্রিয়ার মাধ্যমে বায়োপাওয়ার কাজ করে।

পরিসংখ্যান তৈরি, বিভিন্ন এক্সপার্ট গ্রুপ ও পেশাজীবি তৈরি  করা এই বায়োপাওয়ারের নজির। মনিটরিং ও কন্ট্রোলের এই প্রোডাকটিভ ক্ষমতাকেই বায়োপাওয়ার বলা হয়। এই পাওয়ার রিপ্রেসিভ না, প্রোডাক্টিভ। ফুকো এই কাজগুলোর নাম দেন Governmentality বা প্রশাসনিকতা (পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ) যার মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পপুলেশনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যাই হোক, ফুকোর তত্ত্বের নানা ক্রিটিকও আছে। তা সত্ত্বেও, ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে— মাইক্রো ও ম্যাক্রো পরিসরে—  তা বুঝতে ফুকো এখনো সহায়ক।

দুই.
কোনো বয়ান বা ডিস্কোর্স সমাজের ভেতরে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তার বিশ্লেষণ আছে মিশেল ফুকোর বিখ্যাত প্রবন্ধ The order of discourse এ। বৃহত্তর অর্থে, পলিটিকাল পাওয়ার নিয়মিতভাবেই কোনো না কোনো ডিস্কোর্সকে সাপ্রেস বা ডিলিমিট করে। মিনিং মেকিং প্রসেসে ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে অনুমোদিত politically sanctioned বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশেষ কিছু বয়ানকেই শুধু আবির্ভূত হতে দেয়া হয়।

তো, বাহ্যিকভাবে তিনটা ফ্যাক্টর কোনো একটা ডিস্কোর্সের বিচলনকে নিয়ন্ত্রণ করে বা সীমায়িত করে। একটা হলো, ট্যাবু। দ্বিতীয়টা হলো, স্যানিটি-ইনস্যানিটি বা যৌক্তিক-অযৌক্তিকতার প্রসঙ্গ। এবং তিন নম্বর হচ্ছে, ইন্সটিটিউশনাল রেটিফিকেশন বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন। কোনো বিশেষ সমাজে ও নির্দিষ্ট সময়খণ্ডে কিছু কিছু বিষয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ বা কিছু আলোচনাকে থামিয়ে দেয়া হবে সমাজের কিছু বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে। নারীর বঞ্চনা বা অধিকারের কথা বলে ইসলামি ঘরানায় ফেমিনিস্ট ট্যাগ খাওয়ার ভয়কেও এটার মধ্যে ফেলতে পারি।

বা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রচলিত প্রবল বয়ানের বাইরে কেউ যদি ভিন্ন অর্থ দেয় তাহলেও এটা নিষেধাজ্ঞার শিকার হবে। এই ট্যাবু বা প্রহিবিটেড টপিক সমাজে সমাজে আলাদা হয়, একেক সমাজের ট্যাবু একেক জিনিস। ট্যাবুমুক্ত কোনো সমাজ নাই। আবার, সুস্থতা-অসুস্থতা বা যৌক্তিকতা বা অযৌক্তিকতার প্রসঙ্গ এনেও কোনো কোনো বক্তব্য বা বিশ্বাসকে বিস্তৃত হতে দেয়া হয় না। কাউকে পাগল, অস্পৃশ্য হিসেবে প্রমাণ করা গেলে তার ডিস্কোর্স আর গ্রহণযোগ্য হবে না। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জঙ্গি বলে একবার ট্যাগ দিয়ে আলাদা করে ফেলা গেলে তার আর কোনো বক্তব্য শোনার দরকার নাই। কারণ তখন ধরেই নেয়া হবে, সে কোনো মিনিংফুল ডিস্কোর্স-এর উপযোগী নয়।

এই ম্যাডনেস বা ইররেশনালিটি বা এই আদারিং বা অপরায়ন বিশেষ বিশেষ সমাজে বা সময়ে বিশেষ বিশেষভাবে করা হয়। ওয়ার অন টেররের যুগে মিলিটেন্ট ট্যাগটি অনেকটা এমনই। এই স্যানিটি-ইনস্যানিটি, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, যৌক্তিক-অযৌক্তিক বাইনারি দিয়ে কোনো ডিসকোর্সকে থামিয়ে দেয়াতেও ক্ষমতা-সম্পর্ক ক্রিয়াশীল। কে জঙ্গি, কে পাগল— এ সংজ্ঞায়নে আধিপত্য থাকে প্রবলেরই হাতে। সে প্রবল হতে পারে ক্ষমতার সাথে গাঁটছড়া বাঁধা মিডিয়া বা ডিসিপ্লিনারি ফোর্স। ভিকটিমের নিয়তি যেন সংজ্ঞায়িত হওয়া, সংজ্ঞা দেয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্জিত হওয়ার আগে সে সংজ্ঞায়িতই হবে।

তাই বলা যাবে, সত্য ও ন্যায় থাকে নির্যাতিতের বয়ানে, ভিকটিমের ভাষ্যে;  আর মুক্তচিন্তা মানে ক্ষমতাবানের ভাষ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা, সেটাকেই আগে সন্দেহ করা। তৃতীয়টি হলো, institutional ratifications, অর্থাৎ কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো ডিস্কোর্স তৈরি করে, অপর ডিস্কোর্সকে নিয়ন্ত্রণ করে বা ন্যায্যতা দেয়। যেমন, মিডিয়া বা নিউজ এজেন্সি, পাব্লিশিং ইন্ডাস্ট্রি, প্রেসনোট, পুলিশিভাষ্য, সরকারি প্রজ্ঞাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ সংস্থা ইত্যাদি। এরা মিনিং প্রোডাকশন, সার্কুলেশন ও কাজাম্পশনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বলতে পারি, এটা দুইভাবে ঘটে— একটা ইন্ট্রিন্সিকালি বা ফ্যাকচুয়ালি, আর আরেকটা মোটিভেটেড বা প্ররোচিত হয়ে!

যেমন, আজ যদি কেউ বলে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, এইটা প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা পাবে না। বিজ্ঞানীদের সংস্থা এটাকে খারিজ করে দেবে। আবার ধরা যাক, পুলিশি ভাষ্য। অনেকে এটাতেই আস্থা রেখে অন্য কোনো বয়ান ‘সত্য’ হলেও সেটাকে আস্থায় নেয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না। হুজুর বলেন চমৎকার, তো হুজুরের মতে অমতকার! কোনো বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করবার জন্যে যে শ্রম দেবার প্রয়োজন বা অনুসন্ধান দরকার বা ইন্টেলেকচুয়াল রিগার দরকার সেটা অনেকেরই না থাকায় কারণে প্রতিষ্ঠিত বয়ানেই তারা নত শির থাকে, নতুন বয়ানের প্রলিফারেশন বা বিস্তৃতিতে সায় দেয় না বা বিরোধিতা করে।

আজ বললাম ফুকোর The Order of discourse প্রবন্ধ অনুসারে এক্সটার্নালি ডিস্কোর্স কীভাবে রেগুলেটেড বা নিয়ন্ত্রিত হয়, যদিও ইন্টারনালি ডিস্কোর্স কীভাবে রেগুলেটেড হয় সে আলোচনা আপতত প্রাসঙ্গিক না হওয়ায়, তুললাম না। আরেকদিন বলব, ডিস্কোর্স কীভাবে উৎপন্ন হয়, যদিও ডিস্কোর্স  যা বা যারা রেগুলেইট করে তা বা তারাও ডিস্কোর্স উৎপাদন করে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক