করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

বইয়ের কথা বই প্রকাশের কথা

খন্দকার সোহেল

প্রকাশিত : মে ১০, ২০২০

বই আমরা কেন পড়ি? বই নিয়ে অনেক অনেক মনীষী, কবি, লেখক, সাহিত্যিক অনেক অনেক বাণী দিয়ে গেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি আমার বেশ মনে ধরে আছে। উক্তিটি এরকম, `বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সাঁকো।` বই পড়েই আমরা আমাদের অতীতকে স্মরণ করতে পারি, ধারণ করতে পারি, বরণ করতে পারি। অতীতের স্মৃতি, কথা আর ঘটনার পরম্পরাগুলো দেখতে পারি মনের আলোয়।

প্রিয়কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের `শৈশবের সিঁড়িগুলো: ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১` তেমনই একটি বই। যে সময়টা ছিল বাংলাদেশ নামের নতুন একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার আঁতুরঘর। বালকচোখে দেখা একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন এবং তুমুল সেই রাজনৈতিক সময়গুলো নিয়ে লেখকের এই বই। পাঠক, প্রকাশক, লেখক, সংগঠক নানানভাবে লেখক শাহরিয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটি ব্যক্তিক সম্পর্ক আছে। আছে তার কাছে জমে থাকা অনেক অনেক ঋণ। জীবনে প্রথম অনেক কিছুই তার কাছ থেকে শেখা। সেই শেখাগুলো প্রতিমুহূর্তে জীবনচলার পথে টের পাই নানাভাবে। তাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে তাই স্মৃতিপটে অনেক অনেক দৃশ্যপট এসে ভিড় করে। কোনটা রেখে কোনটা তুলে নিবো সেই ধন্দে পড়তে হয়।

এই যে বইটি নিয়ে কথা লিখতে বসলাম, মনে পড়ছে তার মুখে শোনা কিছু অনু্প্রেরণামূলক কথা। `প্রতিদিন নিজেকে আপডেট করতে হবে। সময়ের সাথে পথ চলতে গেলে চাই নিজের নবায়ন।` প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি। কিন্তু তার সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে টের পেয়েছি এর মর্মার্থ। ‘শৈশবের সিঁড়িগুলো: ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১’ বইটি ১৬৮ পৃষ্ঠার। এতে বড়ে একটি বই কম্পিউটার বা ল্যাপটের বড়ো বড়ো কিবোর্ডের কীওয়ার্ড নয়, তিনি লিখেছেন মোবাইলের ছোট্ট ছোট্ট বাটন ব্যবহার করে। অর্থাৎ মোবাইলে লেখা হয়েছে বইটি।

ষাটোর্ধ্ব লেখকের কাছ থেকে টেকনোলজির নতুন ভাষা আর ব্যবহার শিখেছি এই বইটি প্রকাশের সময়টাতে। এক একটি অধ্যায় লিখেছেন মোবাইলে আর আমাকে ট্যাগ করে নিজের প্রোফাইলে সেটির প্রাইভেসি সেটিংস-এ পাবলিক অপশনটা অফ করে রেখেছেন। হয়তো মোবাইল থেকে ইমেইল অপশনটা পাচ্ছিলেন না, তাই তার এই বিকল্প ব্যবস্থা। ট্যাগ হবার সাথে সাথে আমার কাজ ছিল, সেটি কপি করে কনভার্ট করে ভেঙেচুরে যাওয়া বর্ণগুলো ঠিক করে রাখা। ঠিক এইভাবে ৩৮টি অধ্যায়ের প্রাথমিক কাজটি শেষ হয়। একেকটি অধ্যায় শেষ হয় আর একেকটা যুদ্ধ জয়ের অনুভূতি টের পাই। এখানে শাহরিয়ার ভাইয়ের একটি খুঁতখুঁতে লেখকস্বভাবের রেফারেন্স না দিলেই নয়। শুনেছি লেখক তার `শ্রেষ্ঠ কবিতা` প্রকাশ করতে গিয়ে ২৭ বার বানান সমন্বয়/চেক করতে প্রিন্ট নিয়েছেন ২৭ বার!

আসলে লেখকের প্রিপ্রেস ওয়ার্ক নিয়েই একটি আস্ত বই লিখে ফেলা সম্ভব। এখানে তা করছি না। আমরা বরং বইটি নিয়ে একটু আলোকপাতে যেত পারি। ফ্ল্যাপে যদি একটু নজর দিই, কী বলা আছে সেখানে?

"জন্মের ১০ বছর পর থেকে এই বইয়ের আখ্যানগুলোর শুরু। ১৯৬৯-এ শুরু হয়ে ১৯৭১-এ শেষ। যখন শেষ, তখন শৈশব-কৈশোরের সন্ধিক্ষণ-১২ পূর্ণ করে ১৩`য় পা দিয়েছি। বইয়ের শেষ দুটি অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোর পূর্বাপর বিশ্লেষণ। অভিজ্ঞতা শৈশবের; অক্ষরবন্দি করেছি পরিণত বয়সে। বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

রামকৃষ্ণ পরমহংস বলতেন, `ঈশ্বরের বালকস্বভাব`। মানে, বালকেরও ঈশ্বরস্বভাব। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ আমি সর্বার্থে বালক ছিলাম। আর, এই সময়কালেই বাংলাদেশের জন্ম। একই সময় বাঙালির জাতীয় জীবনে শেখ মুজিবুর রহমান নামে একজন মহামানবের উজ্জ্বল আবির্ভাব। এতটা উজ্জ্বল যে, সমগ্র বিশ্বের চোখ তার ওপর নিবদ্ধ হয়েছিল। মহামানবের ঘনিষ্ঠ সতীর্থ সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমার গোলাপ নানা। নানার বাড়ি ও আমাদের বাসা ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজলগ্ন মাঠের এপার-ওপার হওয়ায় ওই বাড়িতেই আমার রাজনীতির বাল্যশিক্ষা।"

বই থেকে কিছু অধ্যায়ের নাম বলার লোভ সামলাতে পারছি না। "পদ্মাস্মৃতি/নীল দস্তানা এবং দুর্গাপুত্র কার্তিক/বাটা বিস্কুট ২ আনা/মৌচাকে ঢিল/জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব/মোড়গলড়াই এবং তুরস্কের জাতীয় খেলা/কুরুক্ষেত্র এবং আমার শোচনীয় পরাজয়/পায়ে পায়ে চৌদ্দ মাইল/বাবার চোখে জল/লুটের মাল অথবা মায়ের সাধের পালঙ্ক/বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ/একদিন অপারেশনে/মধুর শৈশবের শেষের দিনগুলো/আত্মহন্তারক জাতি/শৈশবের প্রতিচ্ছবি।" বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের নামগুলোই বইটি পড়তে চুম্বকের মতো টেনে নেয়।

প্রথম অধ্যায় `পদ্মাস্মৃতি`র শুরুতেই লেখক লিখেছেন, "পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। পুরোনো দিন চোখ মোছে স্মৃতির সিঁড়িঘরে। শৈশবস্মৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যদিও অধিকাংশ মানুষ এর মূল্য বোঝে না; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবকে ভুলতে থাকে। আমার ক্ষেত্রে উলটোটি ঘটেছে। শৈশবের স্মৃতিই আমার নির্ভেজাল স্মৃতি। তার কাছে বাকি সব স্মৃতি গৌণ।"

বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায় শৈশবের প্রাণোচ্ছ্বল উপস্থিতি। লেখকের কেতাদুরস্থ আর ডানপিটে বালকবেলা। আছে বইপড়ার মধুর স্মৃতি, বন্ধুদের কথা, পরিবার-পরিজন, স্কুল, শিক্ষক এবং একটি বড়ো অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্মসময় এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়জুড়ে আছে শিশুকালের বেড়ে ওঠা শিশুমন, আছে প্রকৃতি আর পরিবেশ সম্পর্কে শৈশবমনের ভালোবাসার নিটোল বয়ান, আছে আলোকিত শিশুমন গঠনে পঠিত অসংখ্য বইয়ের রেফারেন্স, আর আছে শিশুমনে দেখা তৎকালীন ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনীতির নিখুঁত বয়ান।

বই থেকে বরং কিছু অংশ উদ্ধারের চেষ্টা করা যেতে পারে। "স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রতিদিনই টমটম চোখে পড়ত। টমটম মানে ঘোড়ার গাড়ি। যখন চলত, টুংটাং করে ঘণ্টি বাজত ঘোড়ার গলায়। খুরের শব্দ আর ঘণ্টির টুংটাং ধ্বনি মিলেমিশে অপূর্ব শোনাত। এই টমটমও আমার হাঁটাপথের সঙ্গী ছিল।"

"বড়োপার চুলটানা, মেজপার মায়াকাড়া কান্না, আমার ঘুসি আর মুন্নীর খামচির সুনাম ছিল শৈশবে। তবে দ্বৈত লড়াইয়ে আমার ঘুসির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কেউ কুলিয়ে উঠতে পারত না।... "পরের ঘটনা ‘মহাভারত’-এর কুরুক্ষেত্রের চেয়ে কম নয়। বড়োপা রুদ্রমূর্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। দুই মুঠিতে প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরল আমার চুল। মেজপা এক ঘুসির বদলে উপর্যুপরি কিল-চড় বর্ষণ শুরু করল আমার শরীরের যত্রতত্র। বড়োপার নির্দেশে মুন্নীও তার ‘বিখ্যাত’ খামচি নিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করল। আগের দিন কানমলা খেতে হয়েছিল বলে ওরও কিছুটা রাগ ছিল আমার ওপর। টুকুন ভয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদছিল। আর, আমি আত্মরক্ষার্থে হাতের সঙ্গে এলোপাতাড়ি পা-ও চালাচ্ছিলাম। তবে, বড়োপা দুই হাতে আমার চুল ধরে ছিল বলে খুব বেশি জুত করতে পারছিলাম না। এমতাবস্থায় রান্নাঘর থেকে একটি খালি ছালার বস্তা নিয়ে আসার আদেশ জারি হলো টুকুনের প্রতি। কাঁদতে কাঁদতে বড়োপার আদেশ পালন করল সে। এরপর দ্রুতই যুদ্ধের সমাপ্তি। ছালার মধ্যে দুই পা চালান করা মাত্রই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। বেশি ছোটো ছিল বলে পাপড়িই শুধু এ যুদ্ধে অংশ নেয়নি। আরেকটু বড়ো হলে সে-ও যে বড়োপার আদেশ অমান্য করত না, এ ব্যাপারে আমার কোনও সন্দেহ নেই। মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডব বিজয়ী হন। সেদিন ভাইবোনের যুদ্ধে বিজয় হয়েছিল চার দুর্গতিনাশিনীর।"

"গোলাপ নানার বাড়ি আর আমাদের বাড়ি মাঠের এপার-ওপার ছিল। নানি প্রায়ই বেড়াতে আসতেন আমাদের বাসায়। নানির সঙ্গে একদিন নানাও এসেছিলেন। সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম, আইনব্যবসায় যোগ দেওয়ার আগে গোলাপ নানাও আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা করতেন। নির্বাচন ঘোষিত হলে নানার ব্যস্ততা বেড়ে যায় এবং তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সারা বাংলায় নির্বাচনি সফরে থাকতেন। এইসময় ময়মনসিংহের লোকজনকে একটি স্লোগান দিতে শুনেছি- ‘বাংলার বুলবুল, সৈয়দ নজরুল’। আমরা কলেজ রোডের ছোটোরাও স্লোগানটি দিতাম।"

"প্রাসঙ্গিক আখ্যানে যাওয়ার আগে আমার ঢাকার শৈশবের কথা একটু বলে নিই। উল্লেখ করার মতো খুব বেশি স্মৃতি নেই। বুড়িগঙ্গার ঢেউ আমার কচিবুকে নদীপ্রেম জাগাতে পারেনি। তবে, সদরঘাটের লঞ্চগুলো দেখে ভালো লেগেছিল। একবারই গিয়েছিলাম চাচার সঙ্গে। শাড়ি-চুড়ি নিয়ে তখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন ফেরিওয়ালারা। ভালো লাগত। ঢাকার শৈশবে কখনও সেলুনে গিয়ে চুল কাটাইনি। কাঠের ছোটো বাক্সে ক্ষুর-কাচি-আয়না নিয়ে পাড়া-মহল্লায় নাপিতরাই আসতেন। তাদেরই কেউ মাসে একবার আমার চুলের দেখভাল করতেন। ঢাকায় তখন অনেক জলাশয়। আমাদের কাঁঠালবাগানের পেছনেই ছিল বিশাল ঝিল। কোথাও কোথাও ছাড় দিয়ে সেই ঝিল রামপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন যেখানে হোটেল সোনারগাঁ, সেখানে বাঁশের টঙ ঘরে কাবাব বিক্রি করত বিহারিরা। হাতিরপুল দিয়ে যেতে হতো। ডাক্তারিপড়ুয়া চাচা বেশ কয়েকদিন সাইকেলের রডে চাপিয়ে কাবাব খাওয়াতে সেখানে নিয়ে গেছেন। চাচার সঙ্গে একবার তার মেডিকেল কলেজেও গিয়েছিলাম। তখনই প্রথম শহিদ মিনার দেখি। এখনকার মতো বিশাল ছিল না; তবু, ভালো লেগেছিল। বাড়িফেরার পথে হাইকোর্ট। ইদের সময় মায়ের সঙ্গে নিউমার্কেটে যাওয়ার গল্পও আছে আমার ঢাকার শৈশবে। নিউমার্কেট থেকে ইদের নতুন জামা-জুতো নিয়ে বাড়িফেরার স্মৃতি ভারি মধুর। নবাববাড়ি, বলধা গার্ডেন, কমলাপুর স্টেশন আর মহররমের মেলার কথাও বেশ মনে আছে। কুর্মিটোলা বিমানবন্দর যাওয়ার কথাও। হোসেনি দালান ঘিরে মহররমের মেলা হতো। ওই মেলা থেকে মাটির ‘দুলদুল’ কিনেছিলাম। ‘দুলদুল’ মানে ইমাম হোসেনের ঘোড়া। হোসেনি দালান থেকে শুরু হওয়া তাজিয়া মিছিলে ছুরি-চাকু নিয়ে ‘হায় হোসেন, হায় হাসান’ বলে রক্তাক্ত শোকের মাতম দেখে ভয় পেয়েছিলাম প্রথমবার। কারবালায় এজিদের সৈন্যবাহিনীর কাছে ইসলামের নবির দৌহিত্র ইমাম হোসেনের সপরিবারে নিহত হওয়ার কাহিনি ঢাকার শৈশবেই প্রথম শুনি। একবার শুনেই মনে গেঁথে গিয়েছিল। কান্নাও পেয়েছিল খুব। মহররম এলে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মহররম’ কবিতার ‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া!/আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে/সে কাঁদনে আসু আনে সিমারেরও ছোরাতে’
পঙক্তিগুলো প্রায়ই আওড়াতাম তখন।"

"একাত্তরের মার্চে এক রাখালরাজার বজ্রচেরা বাঁশিতে হাজার বছরের নৈঃশব্দ্য ভেঙে জেগে উঠেছিল একটি পরাধীন জাতি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ এই দৃঢ় প্রত্যয়ে সাত কোটি বাঙালি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ফেটে পড়েছিল। তাতে, স্বরের সর্বোচ্চ উচ্চতা নিয়ে আমার কচিকণ্ঠও যুক্ত হয়েছিল। জীবনের যে-গুটিকয় অর্জনের জন্য আমি অহংকার করি, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি সে-সবের একটি।"... "যত বঞ্চনাই থাক, আমাদের শৈশবে হাতে হাতে ফুটবল না থাকলেও পায়ে পায়ে মাঠ ছিল। কত দিন যে জাম্বুরা বা বাতাবিলেবু দিয়ে ফুটবল খেলেছি, তার হিসেব নেই। শৈশবের দিনগুলোয় হাত বাড়ালেই পেয়েছি শিউলিকুড়ানো ভোরের স্নিগ্ধতা। আকাশের সুবিশাল মনিটরে চোখ রেখে দেখেছি রৌদ্রমেঘের খেলা। এ খেলায় রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের অবয়ব ফুটে উঠলে একজন আরেকজনকে দেখিয়ে বিস্তর আনন্দ পেয়েছি। আমাদের শৈশব ছিল আম-জাম-লিচু-কাঁঠালের শৈশব। ‘ফ্রুটজুস’ কাকে বলে, জানতামই না। সেই শৈশবের বুকে কেউ যেন হঠাৎ সজোরে ছুরি বসাল।"

"অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে রণাঙ্গনগুলো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের খবর আসতে থাকে চারদিক থেকে। আগেই বলেছি ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ ও ‘আকাশবাণী’র পর ‘বিবিসি’ শুনে খবরগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত হতেন বাবা। বাঙালির যুদ্ধজয়ের খবরে উৎফুল্ল হতাম আমিও।"... "ক্লাস সিক্সে আমার স্কুলের নাম ছিল বাংলাদেশ এবং সিলেবাস ছিল মুক্তিযুদ্ধ। আমি ওই স্কুলের এত ভালোছাত্র ছিলাম যে, আজকের পড়া কখনও কালকের জন্য ফেলে রাখতাম না।"... "১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর এত আনন্দময় ছিল যে, আনন্দের কোনও বিশেষ স্মৃতিই আমার মনে নেই। তবে, এটা মনে আছে, ঘুমানোর আগে, মা-বাবার দেখাদেখি, বঙ্গবন্ধুর জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েছিলাম সে-রাতে। তার আগে বাবার সঙ্গে পড়া এশার নামাজে- দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের মরণোত্তর আত্মার শান্তি চেয়ে- সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনার হাত পেতেছিলাম। মানুষের দুঃসময়ে ওই হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মন্ত্র আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছি। আর, সেটা অগ্নিঝরা শৈশবের দিনগুলোতেই।"

"হায়, হতভাগা জাতি! না বুঝল বঙ্গবন্ধুর কথার মর্মার্থ, না চিনল তাকে! তাই, স্বাধীনতা ও মুক্তি এলেও বাঙালির চেতনার উন্মেষ ঘটল না। অন্যদিকে, মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়তে থাকল। ফিবছর বাজেটে ধাপে ধাপে বাড়ল এ বৈষম্য। ফলে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হলো শুধু কতিপয়ের জন্য। এমনকী চিকিৎসাও। সর্দিকাশিতেও উচ্চবিত্তরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা পাবে আর অবহেলার শিকার হতে সিংহভাগ মানুষ যাবে অনিয়মজর্জরিত সরকারি হাসপাতালে- মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি এ কথা কল্পনাও করেনি। মাথাপিছু আয়ের মাথা অগণন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে থাকলেও আয়ের পকেট ভরতে থাকল কতিপয়ের। বঙ্গবন্ধু এটা ‘বিলোপ’ করতে চেয়েছিলেন বলেই তাকে নির্মম মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। আহা! তার মতো উচ্চমানবের অমৃতবচন শুনতে হলে একটি জাতিকে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়। তার দর্শন পেতে হলেও হাজার বছর। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাঙালির জীবনে এই হিরন্ময় পর্ব হাজার বছরের জন্য অস্ত গেছে।

এ কলঙ্কজনক দিনগুলো আমার শৈশবকে স্পর্শ করতে পারেনি। ১৯৭৫ আসার আগেই মধুর শৈশব আমাকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছে। আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত শৈশবের সেই দিনগুলো এখন কেবলই রূপকথা। সেই লুপ্ত শৈশবই আমার তাবৎ গুপ্তধনের সিন্দুক।"

"ছোটোরা নয়, বড়োরা যুদ্ধ বাধায়। কিন্তু, যুদ্ধের শিকার বড়োছোটো সবাই হয়। বরং ছোটোরাই বেশি ভোগে। ইতিহাসবিকৃতও বড়োরা করে। অশুভপক্ষের বড়োরা তো বটেই, অজ্ঞানতাবশত শুভপক্ষের বড়োরাও কাজটি করে থাকে। তাই, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা অন্নদাশঙ্কর রায়ের চারটি কালজয়ী পঙ্ক্তি আট পঙক্তির কবিতা হয়ে যায় এবং আমরা বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরাও তার অশুদ্ধপাঠচর্চা করি; ভাবি, এ কবিতা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর লেখা। দুঃখজনক হলেও সত্য, ধানমণ্ডি বত্রিশের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরেও স্থান পায় এই অশুদ্ধপাঠ।"

"অর্জনকে বিসর্জনে পাঠানোর এটাই চিরকালের কারণ। শাসক গুণবিচারী না হলে অযোগ্যরা যোগ্য জায়গাগুলোর দখল নেয়। অযোগ্য আর অযোগ্যদের পৃষ্ঠপোষকদের মনে কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার সেই চিরদিনের পঙক্তিগুলো একবারও উঁকি দেয় না:

‘সবচেয়ে দুর্ধর্ষতম বীরত্বেরও ঘাড়ে একদিন মৃত্যুর থাপ্পড় পড়ে
সবচেয়ে রক্তপায়ী তলোয়ারও ভাঙে মরচে লেগে
এই সত্য কথাটুকু কোনো মেঘ, কোনো বৃষ্টি, কোনো নীল নক্ষত্রের আলো তোমাকে বলেনি বুঝি?

যারা এমতঅন্যায় দেখেও মুখ কুলুপ এঁটে থাকে, তারাও সমান অপরাধী। যতদিন পর্যন্ত না দলাদলি ভুলে রাজ্যের পালকগণ সব মানুষকে সমান মমতায় বুকে টানতে পারবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহামানব ফিরে ফিরে জন্ম নিলেও কোনও জাতিতে বঞ্চনার অবসান ঘটবে না; মহামানবের মহাপ্রয়াণের পর একদল লোক তার সম্পর্কে কুৎসা রটাবে, আরেকদল লোক তাকে ভাঙিয়ে খাবে। দিন বদলাক। আজকের শিশুকিশোররা স্লোগান দিক- ‘জেলের তালা ভাঙব, সুষম সুখ আনব’। সেইদিনও দ্রুত আসুক, যেদিন কাউকেই তার ন্যায্য পাওনার জন্য স্লোগান দিতে হবে না।"

লেখকের বয়ানে `শৈশবের সিঁড়িগুলো : ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১` বইটি লেখকের আত্মস্মৃতি। একবার দুবার নয় এই বই বারবার পড়ার মতো বই। এই বই অতীত আর বর্তমানকে সত্যিকার অর্থেই বেঁধে দেয়া সাঁকোসম। এই বই শৈশব আর বার্ধক্যকে স্মৃতির সুতোয় বেঁধে রাখা এক সাঁকো। এই বই বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের এক ইতিহাস। বইটি লেখক উৎসর্গ করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের দুই স্থপতিকে। উৎসর্গপত্রটি ছিল এরকম: "জন্মশতবার্ষিকীতে চিরবঞ্চিতদের স্বপ্নের মহামানব শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বপ্নমানবের সতীর্থ ও আমার গোলাপ নানা সৈয়দ নজরুল ইসলাম।"

প্রকাশক হিসেবে আমরা বারবার বলেছি, সমকালের চটুল বাজারসাহিত্য নয়, বই হোক চিরকালের বিষয়। এই বই প্রকাশে ভাষাচিত্রের এই স্বপ্নযাত্রারই প্রতিফলন ঘটেছে। বইটির প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০২০ হলেও এটির গৃহপ্রকাশ হয়েছে ২০১৯-এর জুলাই মাসে। বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ প্রকাশনার প্রথম বই হিসেবে এটি প্রকাশ করেছে ভাষাচিত্র।

শৈশবের সিঁড়িগুলো: ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১
আবু হাসান শাহরিয়ার
প্রচ্ছদ: খন্দকার সোহেল
প্রকাশক: ভাষাচিত্র
মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০ টাকা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০

একুশে বইমেলা ২০১৮