বিনয় মজুমদার

বিনয় মজুমদার

বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ১৫

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৪, ২০১৯

১০.
বিনয়ের ঈশ্বরীতে ফিরি। উচ্চাকাঙ্ক্ষী গায়ত্রী আমেরিকায় গিয়ে ১৯৬০ সালে ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেন, এবং কিছুকাল পরেই তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমার মনে হয়, আমেরিকায় পাকাপাকি বসবাসের জন্য ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেছিলেন গায়ত্রী। আর ছাড়াছাড়ির পরেও তিনি নিজের নাম থেকে স্পিভাক পদবি বাদ দেননি। আমেরিকায় গিয়ে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি করেন। স্নাতক স্তরে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। বিনয় মজুমদার গায়ত্রীর প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে থাকবেন। কেননা হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্টের বাড়িতে আত্মগর্বী গায়ত্রীকে তিনি দেখে থাকবেন কয়েক ঝলক মাত্র। পরবর্তীকালে গায়ত্রীর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তাকে বিনয়ের কবিতার কেন্দ্রে এনে থাকবে। ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইটির খ্যাতির পরেও গায়ত্রী বহুকাল জানতেন না যে, বিনয় মজুমদার নামে প্রতিভাবান অথচ উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার যুবক তাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন। গায়ত্রী কেবল কলকাতার খ্যাতনামা উচ্চ পরিবারের মেয়ে নন, তার দাদুর বাবা ছিলেন রামকৃষ্ণদেবের চিকিৎসক, গায়ত্রীর বাবা সারদা দেবীর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন— কলকাতার বুর্জোয়া পরিবার বলতে যা বোঝায়। বিনয় তাই এঁদের বলেছেন পুরোহিত পরিবার।

ষাটের দশকে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয়, তখন আমিও জানতুম না যে, ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের চাকা হলো গায়ত্রী চক্রবর্তী নামের একজন বিদূষী। বিনয় মজুমদার দুই বছরের জন্য হাংরি আন্দোলনে ছিলেন। সেই সময়ে তিনি একটার পর একটা চারমিনার সিগারেট খেয়ে তর্জনিকে নিকোটিনের রঙে মুড়ে ফেলেছিলেন। উনি আমায় বলেছিলেন, “তুমি শক্তিকে নেতা করেছো আর শক্তি আমাকে নেতা করেছে।” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকায় মারুফ হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন, মলয় হাংরি সাক্ষাৎকারমালা নামের একটা বই প্রকাশ করেছে। ওতে আমাকে বা শক্তিকে প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়নি। এই বক্তব্য থেকে মনে হয় যে, হাংরি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি বিনয় চেয়েছিলেন, এবং তাঁকে প্রতিষ্ঠাতার আসনে বসাইনি বলে আহত বোধ করেছিলেন। উনি স্পষ্ট বললে, ওনাকে প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি দিলে, বরং পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে সুনীল-শক্তি-সন্দীপন যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করেছিলেন তা ঘটত না।

সেই সময়ে কলকাতায় হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল, তাতে বিনয় মজুমদারও প্রভাবিত হয়ে থাকবেন। ২২ জুন ১৯৬৪ তারিখে দেবী রায় আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তাতে এই কথাগুলো ছিল, “তুমি-আমি নাকি কলকাতায় অ্যারেস্ট হয়ে গেছি, চতুর্দিকে গুজব। কয়েকজন চেনা হেফচেনার সঙ্গে দেখা হলে অবাক চোখে তাকাচ্ছে। ভাবখানা এই, কবে ছাড়া পেলে? আমার তো এখন একতারা নিয়ে বাউল হয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে কলকাতায়। সবাই তালে আছে ‘বাঘে ছুঁইয়ে দেয়ার’, পর্নোগ্রাফি প্রমাণ করে। সুবিমলকে মেসে কে একজন বলেছে, ‘দেখব কী করে হাংরি বুলেটিন বের হয়।” সেপ্টেম্বর ১৯৬৪-এ আমরা সত্যিই গ্রেপ্তার হই আর আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা আরম্ভ হয়।

সেই সময়ের এলিট বঙ্গসমাজ যে কতটা চটেছিলেন হাংরি আন্দোলনের ওপর, তা অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুবের ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪-এর এই চিঠি থেকে অনুমান করা যায়:

Dear Mr. Ginsberg,

I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with the Communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate did not, however, surprise me ; for I never thought the Congress for Cultural Freedom had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeois’ or ‘respectable’.

If any known Indian writer or intellectual come under police repression for their literary and intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy and obscene language ( I hope you agree that the word ‘fuck’ is obscene and ‘bastard’ filthy, at least in the sentence ‘Fuck the bastards of the Gangshalik School of Poetry’; they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avantgarde exhibition ! You may think it your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks  in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.

It was of course foolish of the Police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now ) thus giving the publicity and some public sympathy — publicity is precisely what they want to gain through their pranks.

I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of of American Beatnik poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language — a language of which you to choose to remain totally ignorant.

With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.

Yours Sincerely
Abu Sayeed Ayyub

অ্যালেন গিন্সবার্গকে এই চিঠিটা লেখার সময়েও আবু সয়ীদ আইয়ুব আমাদের গ্রেপ্তার হওয়া ও মকদ্দমা সম্পর্কে কোনো খবর রাখেননি। আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কোমরে দড়ি বেঁধে আর হাতে হাতকড়া পরিয়ে, তা উনি জানতেন না। উনি যখন চিঠিটা লিখছেন তখন কেউই মকদ্দমা থেকে ছাড়া পায়নি; তারা ছাড়া পেয়েছিল ১৯৬৫ সালের মে মাসে। আইয়ুব সাহেব জানতেন না যে, আমার বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হয়েছে, যা পঁয়ত্রিশ মাস চলেছিল। শঙ্খ ঘোষ যখন ১৯৭১ সালে ‘শব্দ আর সত্য’ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন তিনিও খবর রাখেননি যে, ইতিমধ্যে নিম্ন আদালতে আমার জেল-জরিমানার দণ্ডাদেশ হয়ে গেছে, বা হয়তো জেনেও চেপে গিয়েছিলেন, আর প্রবন্ধতে কেবল লিখে দিয়েছেন ‘কয়েকজন যুবককে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল’। শঙ্খ ঘোষের এই বইটি বিভিন্ন কলেজে বাংলা ভাষার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত, এবং ছাত্রদের কাছে ভুল বার্তা চল্লিশ বছর যাবত চলেই চলেছে; নতুন সংস্করণেও তিনি সঠিক তথ্য দেবার প্রয়োজন মনে করেননি।

যাই হোক, পরে হাংরি বুলেটিন থেকে নেতা ব্যাপারটা আমি বাদ দিয়ে দিই। বিনয়ের কবিতা কয়েকটা বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেসময়ে বিনয় মজুমদারের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা লক্ষ্য করিনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক রাজনীতিতে বিরক্ত হয়ে বিনয় মজুমদার আন্দোলন ত্যাগ করেন, কিন্তু আন্দোলন ছাড়ার সময়ে শক্তি আর সন্দীপনকে গালমন্দ করে একটা বুলেটিন নিজেই ছাপিয়েছিলেন, বিলি করতে দিয়েছিলেন আমাদের। বিনয়ের কবিতার নতুনত্বের কারণে ওনার খ্যাতি তরুণ মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, যা সহ্য করতে পারছিলেন না পঞ্চাশ দশকের কবি আর লেখকরা। আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলুম বলে হয়তো বিনয়ের কিছু ভীতিও জন্মেছিল হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নির্মল মৈত্র এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে উল্লেখ করে তাঁর লেখা বুলেটিনটি তুলে দিচ্ছি এখানে। স্বাভাবিক যে, এই বুলেটিনটির পর তাঁর সময়ের কবি-সাহিত্যিকরা, যাঁরা তাঁকে আর্থিক সাহায্য করার কথা বলেছিলেন, সেই সাহায্য বন্ধ করার জন্যে তদবির আরম্ভ করেন আর শেষাবধি বন্ধও করে দেন।

১. শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনিপুণ নপুংসকরূপ। আশা করি এযাবৎ পাঠকপাঠিকা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাননি; সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করে অবস্থাকে বেশ মজাদার করেছেন; পদলেহী কুকুরের নিয়োগকারিণী চালচুলোহীন এক নারীর আত্মার নির্দেশনা অনুসারে উক্ত কবি নিজেকে মহিলা মনে করে কবিতা লেখেন; আর কথপোকথনকালে দেখি মহিলার অভিনয় করায় শ্রীমানটির কোনো ভাবলেশ উপস্থিত হয় না; অথচ ক্রমে-ক্রমে আমার দাসীত্ব দিয়ে সেই বেয়াদপ আত্মাটিকে শায়েস্তা করেছি আর অঙ্কশাস্ত্রে শ্রীমতি এখন মতামত জ্ঞাপনের মতন স্থূলতা দেখাবার বিপদের ঝুঁকি নিতে সক্ষম হবে কি? কবিটির জন্ম কি কুকুর আর গাধার সঙ্গমজাত ফল।

২. স্থাপত্যবিদ্যায় ফেল মেরে-মেরে এক ছাগছানা বীর্যজাত নির্মল মৈত্রেয় জীবিকায় হাস্যকর ভিক্ষাবৃত্তি ঝুলে আছে। তবে ভয় নেই, যতক্ষণ তার কচি পায়ু আছে, দালালি রয়েছে।

৩. সন্দীপন, হে শ্রীমান, দাস-অনুদাস শব্দটি শুনেছিলাম কবে যে ঠিক মনে নেই। তবে এটা নিশ্চিতই কবুল করতে হবে, দাসী-অনুদাস বলে কোনো শব্দ এ যাবৎ আমি তো শুনিনি। ফলে যথাযথরূপে তোমার অবস্থা প্রকাশের স্বচ্ছতা, বৎস, ভবিষ্যতে ভেবে দেখা যাবে।

৪. দল পাকাবার আগে, পরেও তাদের, রেকটাম বীট করে দিয়েছি বলেই, এইসব কেঁচোবৃন্দ বীটনিক নাম নিয়েছিল।

১০.৬.১৯৬৪
রচয়িতা ও প্রকাশক
বিনয় মজুমদার
৬৯, মীর্জাপুর স্ট্রিট, কলকাতা ৯

কফিহাউসে বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুণ পুলিশ হাজতে থাকার সময়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে থাকবে। হয়তো থানার লকআপে তাঁর আচরণেও স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগির ব্যাখ্যাহীন আস্ফালন নিচু স্তরের পুলিশকর্মীদের বিরক্ত ও ভীত করে থাকবে। আর হাংরি আন্দোলনে আমাদের গ্রেপ্তারি-মামলা ইত্যাদি নিয়ে কলকাতার সাহিত্যজগত তখন বেশ উত্তপ্ত। বিনয়ের ওপর হাজতে পুলিশ সত্যই খারাপ ব্যবহার করে থাকবে, যে কারণে বিনয়ের বাঁ কান আর বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সঞ্জয় চক্রবর্তীকে দেয়া ১৯৯৩ সালে ‘যোগসূত্র’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন যে, বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর চোখ কান সবই ভালো ছিল। কিন্তু কলকাতাতেই পরে লোকে ধরে বাঁ-চোখ আর বাঁ-কান নষ্ট করে দিয়েছিল। সম্ভবত বারবার ইলেকট্রিক শক দেবার ফলে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সঞ্জয় চক্রবর্তীকে বিনয় বলেছিলেন যে, উনি চারবার জেল খেটেছেন। দ্বিতীয়বার জেলে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে। অন্য দুইবারের তথ্য আমি যোগাড় করতে পারিনি। ১৯৭২ সাল থেকে যে সাক্ষাৎকারগুলো বিনয় মজুমদার দিয়েছেন, তাঁর উত্তরগুলো থেকে মনে হয় যে তিনি ঠিকমতন শুনতে পারছেন না, এবং মাঝে-মাঝে তাঁর উত্তর অস্ফূট হয়ে যাচ্ছে। পরে তাঁর ডান কানের ব্যথা বেড়ে গিয়ে শ্রবণশক্তি কমে যায়, যা উনি এই কবিতাটিতে লিখেছেন:

চোদ্দই অগাস্ট আজ
চোদ্দই অগাস্ট আজ দু-হাজার দুই সাল। কানে
তীব্র ব্যথা, ফলে
সব কাজ বন্ধ আছে, অতি কষ্টে কবিতাটি লিখছি এখন।
ডান কানে তীব্র ব্যথা, এবং ডাক্তার
ওষুধ দিয়েছে কিন্তু ব্যথা তো সারেনি।
কানের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমেছে।
যদি কেউ কথা বলে তাকে বলি ‘চিৎকার করো’।
যদি চিৎকার করে তাহলে শুনতে পাই, না হলে শুনি না।
                (হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ – ২০০৩)

১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে মারুফ হোসেন বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই”। জবাবে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ফিরে এসো, চাকা’ সমালোচনা করতে গিয়ে সম্প্রতি পত্রিকায় প্রথম লিখল ‘খুতকাতর সম্প্রদায়’। বলল, আমি নাকি হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা। এরপর হাংরি জেনারেশন পত্রিকা বেরোলো ‘ক্ষুধার্ত’। হাংরি জেনারেশনের বুলেটিন। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবিতাটিই ছিল আমার। ‘খেতে দেবে অন্ধকারে সকলের এই অভিলাষ’। আমার পরে শক্তির কবিতা। তারপরে মলয় রায়চৌধুরী প্রমুখের কবিতা। এরপর আমি শক্তিকে লিখলাম, না আমি প্রতিষ্ঠাতা নই। হাংরি জেনারেশন যখন শুরু হয়, যখন পত্রিকা বেরোয় তখন আমি দুর্গাপুরে চাকরি করি। ফলে আমার পক্ষে কোনো আন্দোলন শুরু করা সম্ভব নয়। সুতরাং আমি নই, শক্তি চট্টোপাধ্যায় হলো হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা। পরে শক্তি হাংরি থেকে বিচ্যুত হলো, আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। ফলে মলয় রায়চৌধুরী হাংরি প্রতিষ্ঠা করেছে বলে দাবি করে। কথাটা মোটামুটি সত্য কথাই। শেষ পর্যন্ত ও-ই যখন হাংরি জেনারেশন চালাচ্ছে তখন ওকেই প্রতিষ্ঠাতা বলা কর্তব্য বলে আমার মনে হয়। এটা উচিত।”

প্রথম সংখ্যায় নয়, বিনয়ের কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল দশ নম্বর বুলেটিন থেকে। তার আগের বুলেটিনগুলো আমি পাটনা থেকে ইংরেজিতে ছাপাতুম। দেবী রায় কলকাতায় ছাপানো আরম্ভ করলে বাংলায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। আর “ক্ষুধার্ত” হলো সুভাষ ঘোষ-শৈলেশ্বর ঘোষ-বাসুদেব দাশগুপ্তদের সত্তর দশকের পত্রিকা, হাংরি বুলেটিন নয়। মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুণ ওরা হাংরি শব্দটা তখন ব্যবহার করতে ভয় পেতো, তাই “ক্ষুধার্ত” বের করতো। আমি “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লেখার পরে ওদের টনক নড়ে। শঙ্খ ঘোষের বদান্যতায় হাংরি আন্দোলনের বিকৃত ইতিহাস ও আমাকে গালাগালসহ দে’জ থেকে “ক্ষুধার্ত” সংকলনগুলো হাংরি জেনারেশনের নামে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, তাতে বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, আলো মিত্র এবং আমার কোনো রচনা নেই। অর্থাৎ যাঁরা আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাঁদের লেখাই নেই।

শক্তি আর সন্দীপনও একই সময়ে হাংরি আন্দোলন ছাড়েন, প্রধানত আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওসকানিতে; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মনে করেছিলেন যে, তাঁর ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠী ভেঙে দেবার ষড়যন্ত্র হিসাবে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে। আর সেকথা তিনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। বস্তুত, সেসময়ে তিনি এতই হিংসুটে মনোভাবের হয়ে গিয়েছিলেন যে, তারপর আমার কাছ থেকে কখনও কবিতা চাননি। দাদাকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, মলয় কবিতা লিখতে জানে না, যদিও তার আগেই উনি ‘কৃত্তিবাস প্রকাশনী’ থেকে আমার ‘শয়তানের মুখ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় আমার যে কবিতা প্রকাশ করেছিলেন সেগুলো ‘কৃত্তিবাস সংকলন’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ও আমাকে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় কবিতা লিখতে বলেছিলেন। আমি ‘নীরার জন্য প্রেমের কবিতা’ লিখেছিলুম যা প্রকাশ করতে চাননি তাঁর সহসম্পাদকরা। এই কবিতাটা আমার ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো’ কাব্যগ্রন্থে আছে।

সেই সময়ে কফি হাউসের বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুণ বিনয় মজুমদারকে পুলিস আটক করেছিল। কুড়ি দিন জেল-হাজতে কাটাতে হয়েছিল। আরেকটা মারামারির দরুণ মাতালদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ আহত হয়েছিলেন, তাঁর চোখ-মুখে রক্তের কালশিটে পড়ে গিয়েছিল। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দাদাকে লেখা একটা চিঠিতে এই ব্যাপারগুলো বেশ রসিয়ে লিখেছিলেন। মারামারির একটা পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন; সুবিমল বসাককে কফিহাউসের সামনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর অনুজ কবিরা ঘিরে ধরেছিলেন মারার জন্য। কিন্তু সুবিমলের হিন্দি গালাগালের হুঙ্কারে সবাই পালিয়েছিল। চলবে

ধারাবাহিক