বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ১৬

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৬, ২০১৯

১১.
স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হবার বয়স হলো ষোলো থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে। তা মূলত জিনগত রোগ হলেও, জন্মের আগে গর্ভে ভ্রুণের দুর্বলতার জন্য, সামাজিক চাপে মস্তিষ্কে ডোপামাইন ও গ্লুটামেটের রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য, ভাইরাসের আক্রমণে জিনে প্রভাবের জন্যে ঘটতে পারে। চিকিৎসা হয় প্রধানত অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের দ্বারা, বন্ধুবৎসল পরিবেশের দ্বারা, পরিবারে আদর-যত্নের দ্বারা।

‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো লেখা হয়ে যাবার পর বিনয় মজুমদার প্রথমবার স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে অনুমান করা যায়। প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় তিনি স্বাভাবিক ছিলেন এবং ইডেন হোস্টেলের মাঠে ফুটবল খেলতেন; ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ছাত্র ইউনিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সুতরাং ছাত্রাবস্থায় তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হননি। তাহলে কি গায়ত্রীকে নিয়ে কবিতা রচনার প্রচণ্ড চাপ গড়ে উঠেছিল বিনয়ের ওপর?

সমর তালুকদার ১৯৮২ সালে কবিতীর্থ পত্রিকায় লিখেছিলেন, তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি যখন বিনয় মজুমদারকে দেখেছিলেন তখন “বিনয়ের মাথায় ঝাঁকড়া অগোছালো চুল, মুখভর্তি দাড়ি, জামাকাপড়ে মালিন্যের করুণতম ছাপ, গায়ে দুর্গন্ধ, আঙুলে বড় বড় নখভর্তি ময়লা। আর ছিল সমস্ত শরীর, স্নায়ু-গ্ল্যাণ্ডভর্তি রাগ। সবাইকে ভেংচাচ্ছেন— কাউকে খামচে দিচ্ছেন নিজের খেয়ালখুশিমতো। অশ্লীল ভাষায় থুতু ছিটিয়ে চলেছেন টেবিলে টেবিলে।”

আমি কিন্তু হাংরি আন্দোলনের শুরুতে বিনয়ের ওই রূপ দেখিনি। কোন ঘটনার চাপ তাঁর ভারসাম্যকে দুলিয়ে দিয়েছিল, তা জানি না। কবিতা লেখার চাপ ছাড়া। হিন্দি লেখক ও ‘জ্ঞানোদয়’ পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়া এই সময়ের বিনয় মজুমদারকে নিয়ে “কলেজ স্ট্রিট কা নয়া মসিহা” নামের একটা বই লিখেছিলেন। অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের তুলনায় বিনয় যে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন তা অবাঙালি লেখক শরদ দেওড়ার সাহিত্যিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন থেকে স্পষ্ট হয়।

স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জন্য একজন লোক কবি বা আঁকিয়ে হন, নাকি তিনি কবি বা আঁকিয়ে বলে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন জাগ্রত হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মনোবিদরা খুঁজে পাননি আজও। কোনো কোনো পুরাতাত্ত্বিক মনে করেন যে, গুহার দেয়ালে হোমো এরেকটারদের আঁকা যে ছবিগুলো দেখা যায় তা হয়তো স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন দেহে ছিল এমন মানুষদের আঁকা। অধিকাংশ বিখ্যাত লেখক-কবি-আঁকিয়ের চরিত্রে সমাজের বাইরে বসবাস করার এবং সীমালঙ্ঘনের আগ্রহ দেখা গেছে।

কবিতার ও ছবি আঁকার শৈলী সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে আর পরিবর্তনের সেই উত্থান-পতনের সঙ্গে নিজের কাজকে সামাল দেবার প্রয়াস করতে হয়। এই ব্যাপার যেমন দেখি পাবলো পিকাসো এবং পল গঁগার ক্ষেত্রে, তেমনই দেখা গেছে বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে। এর দরুণ আলোচকদের প্রশংসা অথবা কটূ সমালোচনা জোটে কবি-লেখক-আঁকিয়ের। তাঁদের ভাবতে বাধ্য করে যে সাহিত্য বা ছবি আঁকা তাঁদের সারা জীবন হয়তো চাকরিহীন থাকতে বাধ্য করবে, এই ভাবনা বিনয় মজুমদারে পাই আমরা।

এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিগ্যেস করা হয়েছিল, তিনি বিয়ে করেননি কেন? উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, তাঁর কোনো চাকরি নেই, বাঁধা আয় নেই, তাই। স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগের উপসর্গ হলো, অজীর্ণ, যা লোকটিকে সারা জীবন বইতে হয়। অনেক সময়ে পেট খারাপের দরুণ যেখানে-সেখানে মলত্যাগ হয়ে যায়; তারপর অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের ক্রিয়ায় অজীর্ণ স্থায়ী হয়ে যায়; ফলে ফ্যানাভাত খেতে হয় বা আলুসিদ্ধ খেতে হয়। বিনয় মজুমদার শেষ বয়সে তাঁর অজীর্ণ নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাতে “মুগ্ধ মলত্যাগ” অভিব্যক্তিটি অসাধারণ:

আর গাইব না

অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো।
যেখানে সেখানে মুগ্ধ মলত্যাগ শেষ হয়ে গেছে।
বর্তমানে বসে আছি আমার চৌকির উপরে।
পরনে একটি লুঙ্গি, গায়ে এক গেঞ্জি আছে।
ঢেঁকুর বেরোচ্ছে বটে, তবে এ ঢেকুর ধোঁয়া ঢেকুর নয়।
কোনো গন্ধ নেই এ ঢেকুরে; আমি একা একা আছি ঘরের ভিতরে।
আমার বাড়ির সব আলো জ্বালা আছে।
তদুপরি হারিকেন লণ্ঠনটি জ্বালা আছে টেবিলের উপরে।
অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো, আর গাইব না।

আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে গোলমেলে ব্যাপার হলো, বৃহত্তর সমাজ তাঁদের সম্পর্কে একটি নেগেটিভ ধারণা গড়ে তোলে, যেন নিউরোটিক এবং মনস্তাত্বিক বিপর্যয় কবিতা রচনা বা ছবি আঁকার জরুরি উপাদান। বঙ্গসমাজে আমরা দেখেছি যে, প্রাগাধুনিক কালে এই ধরনের মানুষ সমাজের বাইরে বেরিয়ে অঘোরী-তান্ত্রিক-সন্ন্যাসী-সুফি-দরবেশ-ফকির-আউল-বাউলের জীবন বেছে নিতেন। সুফি সন্তরা যেভাবে নৃত্য করেন তাকে সালাফিস্টরা বলেন পাগলামি। এর কারণ সবাইকে সালাফিস্ট ভাবধারায় পিটিয়ে সমরূপী করার তত্ত্বকে অস্বীকার করেন সুফিরা; এ এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদী প্রয়াস। তত্ত্বের উপনিবেশের জেলখানায় ঢুকিয়ে বন্দি করে রাখার চেষ্টা।

পাকিস্তানে সুফি সন্তদের সমাধিগুলোকে সালাফিস্টরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে। তার দরুণ সমবেত তীর্থযাত্রীরাও মারা যাচ্ছে। বুল্লে শাহের মতন সন্তের গান নিষিদ্ধ করে দিয়েছে সালাফিস্টরা। বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রেও বহু আলোচক তাঁকে ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্থের সাব-জনারেই আটক রাখতে ভালোবাসে। অথচ তিনি আরও তিনটি সাব-জনারের কবিতা লিখে গেছেন। আজকাল দেখি অনেকেই, এমনকি দরবারি তাঁবেদাররাও, উপদেশ দেন যে, হাংরি হলে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়! আমি পড়াশুনায় ভালো ছিলুম বলে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে উঁচু পদে চাকরি করেছি বলে আমাকে আক্রমণ করা হয়, যেন গরিব সেজে ঘুরে বেড়ানো উচিত ছিল। হাংরি আন্দোলনের সময়ে বিনয় মজুমদার যদি ভুট্টা সিরিজের কবিতা লিখতেন তাহলে সরকার সংবাদপত্র বিদ্যায়তনিক প্রতিনিধিরা তাঁর কি গতি করতেন তা সহজেই অনুমেয়। গোর্কি সদনের অনুষ্ঠান থেকে ‘বাল্মীকির কবিতা’র কবিতা পাঠ করার জন্য বিনয় মজুমদারকে অশ্লীল কবি ছাপ্পা দিয়ে বিতাড়ন করা হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে প্রকাশক ‘বিশ্ববাণী’র কাছে লালবাজার থেকে নির্দেশ গিয়েছিল যাতে বইটি বিক্রি করা না হয়। পুলিশকর্তারা তো নিজে থেকেই নির্ণয় নেন না; কোনো সাহিত্যিক খোচর তাঁদের কাছে বইটির কথা রসিয়ে-রসিয়ে বলে থাকবে, একটি কপি প্রেস সেকশানে জমা দিয়ে, একথা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, হাংরি মামলায় ‘উপদ্রুত’ নামের পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র বল্লভ পুলিশের খোচরের কাজ করতেন, এবং আমাদের যাবতীয় প্রকাশনা নিয়মিত পৌঁছে দিতেন লাল বাজারের প্রেস সেকশানে, তার বিভাগীয় প্রধান ডেপুটি কমিশনার ছিলেন আবার কবি তারাপদ রায়ের মেসোমশায়। এই খোচরটিকেই সৃজিত মুখার্জি তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে তুলে ধরেছিলেন।

আধুনিকতাবাদের ফলে কবি বা ছবি আঁকিয়ের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে উঠলে সাধারণ সমাজ এবং রাজনীতিকরা কবি বা ছবি আঁকিয়ের চরিত্রের নেগেটিভ দিকগুলোকে গুরুত্ব দেয়। বিনয় মজুমদারকে আর্থিক সাহায্যের সময়ে এই তর্ক তুলেছিলেন অনেকে। ইউরোপে নেগেটিভ ছাঁচে ফেলে মার্কা-মারা করে দেবার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আধুনিতাবাদের প্রভাবে আমরাও সেই ছাঁচটা নেগেটিভ বলে চিহ্ণিত করতে শিখেছি। এই ইউরোপীয় মানদণ্ডের ফলে সাহিত্য এবং ছবি আঁকার যে সৃজনশীল প্রক্রিয়া তার অর্থপূর্ণ বিশ্লেষণ হয় না। সৃজনশীল সাহিত্যিক ও ছবি আঁকিয়ে বা নৃত্যশিল্পীর ওপর ব্যাপারটা ভয়ংকর চাপের কাজ করে। এই প্রসঙ্গে আমরা আধুনিকতার বাইরে বসবাসকারী রামকিঙ্কর বেইজের প্রসঙ্গ তুলতে পারি। সামাজিক মানদণ্ডের বাইরে বসবাসকারি লালন সাঁই, তুকারাম, কবীর, রবিদাসের প্রসঙ্গ তুলতে পারি, যাঁদের এখন বলা হয় সন্ত।

কবি, লেখক, ছবি আঁকিয়ে যা করেন তার প্ররোচনার উৎস কোথায়? যাঁরা টাকা রোজগারের জন্য করেন তাঁদের কথা আমি বলছি না। এই প্রশ্নটা আলোচকদের, দার্শনিকদের, মনোবিদদের, চিকিৎসকদের বহুকাল ধরে ভাবাচ্ছে। নতুন প্রজন্মে নতুনতর তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে। সৃজনশীল প্রক্রিয়ার যুক্তিহীনতাকে নিদারুণ অবজ্ঞা করে প্ল্যাটো বলেছিলেন, “কবিরা সঠিক চেতনার মানুষ নন, তাঁরা সৃজনদেবীর নিশিডাকে যুক্তির জগত থেকে বিচ্ছিন্ন।”

১৪১৩ বঙ্গাব্দে ‘অউম’ পত্রিকার জন্য জয় মুখোপাধ্যায় ও সম্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল:

প্রশ্ন: ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’য় আক্রান্ত হয়ে স্বদেশ নির্বাচনের দায়িত্ব একদিন যে সাম্রাজ্যবাদ আপনাকে দিয়েছিল, আজ এই অন্ধকার ও প্রায় অজ্ঞাত পৃথিবীর মধ্যে বাঁচতে বাঁচতে আপনার কি মনে হয় না যে, বস্তুত সেই সাম্রাজ্যবাদই আসলে কোনও দিন ছিল আপনার বাস্তুচেতনা?
বিনয়: কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন— “তুমি মা কল্পতরু/আমরা সব পোষা গোরু।” বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন লোকে বলেছিল, ‘একটি এঁড়ে বাছুর জন্মেছে।’ প্লেটো বলেছিলেন— তাঁর রিপাবলিকে কোনো কবি রাখা হবে না। এই মত এখনও এই পশ্চিমবঙ্গে ছাপা হয় (ব্যঞ্জনবর্ণ পত্রিকা)। আর কবিরা নিজেদের ঢাক নিজেরাই শুধু পেটায়। তবে ওই প্লেটোই যখন জন্মেছিল, তখন মন্ত্র পড়া হয়েছিল কবিতায়, ওই প্লেটোর অন্নপ্রাশনের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল. সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর বিয়ের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর শ্রাদ্ধের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, তা-ও কবিতা, এমনকি জীবিত অবস্থায় প্রত্যেক রবিবারে ওই প্লেটো গির্জায় যে প্রার্থনা করত, তাও কবিতা— এরপরে আর কী বলা যায়।

বিনয় মজুমদার প্ল্যাটোকে একজন খ্রিস্টধর্মী অনুমান করে কথাগুলো বললেও, জয় মুখোপাধ্যায় ও সম্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের তথাকথিত জোলো বামপন্থী ভাবধারাকে যুৎসইভাবে উপড়ে দিতে পেরেছিলেন। বিনয় মজুমদার ধর্মে আস্থা রাখেননি কিন্তু ‘সৃষ্টিকর্তা’ নামের কোনো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করেছেন, যা তাঁর এই কবিতায় পাই আমরা:

২০ আগস্ট ১৯৯৮

তিন চোখ, চার হাত— এইসব দেবদেবীদের
মূর্তি দেখে যেতে হবে চিরকাল? কী করে টের
পেয়েছিল হিন্দুগণ— এরা সব আছে?
ধীরে ধীরে যেতে হয় হিন্দুদের পঞ্জিকার কাছে।
পঞ্জিকায় ছবি ছাপা— দশভূজা, আরো কতজন।
এদের এড়িয়ে দেখি বেঁচে থাকে খ্রিস্টানের মন।
এই বিশ্বে দীর্ঘকাল টিকে থাকে যা যা
তা তা সত্য; তাহলে দেবতাদের রাজা
ইন্দ্র আর সরস্বতী, লক্ষ্মী এরা আছে
তবুও আমার মনে সন্দেহ থেকেই যায়, বলি কার কাছে
সেহেতু কখনো কারো পুজাই করিনি।
তবু সৃষ্টিকর্তা আছে যার কাছে আমি আজো ঋণী।
আমার বাঁহাত আছে এটা যত সত্য বলে মানি
সৃষ্টিকর্তা আছে এটা তত সত্য বলে আমি জানি।
          (শিমুলপুরে লেখা কবিতা— ২০০৫)

বিনয় মজুমদারের সমসাময়িক কবিরা, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের কবিরাও, এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নগুলো নিয়ে নিজেদের ভাবনাচিন্তা উপস্থাপন করেননি। তাঁরা কেবল আঙ্গিক আর বিষয়বস্তুর ভেতরে নিজেদের চিন্তাকে সীমিত রেখেছেন। ফ্রেডরিক নিৎশে বলেছিলেন, “মানসিক অসুস্থ না হলে কবি বা শিল্পী হওয়া যায় না; অস্বাভাবিকতা থেকে সৃজনশীলতার সৃষ্টি হয়।” আবার ফ্রেডরিক নিৎশেই বলেছেন যে, খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটেছে মানুষের চরিত্রে সৃজনশীলতার অস্বাভাবিকতা থেকে। খ্রিস্টধর্মের প্রসার সম্পর্কে একই কথা বলেছিলেন টমাস অ্যাকুইনা। গভীরভাবে ভেবে দেখলে ধর্ম ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক; সেকারণেই ধর্মের মতন অব্যাখ্যেয় চিন্তার দরুণ মানুষ পরস্পরের সঙ্গে লড়ে মরে।

২০০১ সালে বাংলাদেশের ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “ধর্ম জিনিসটা বড় গোলমেলে। আমি ওই সাতে পাঁচে নেই। ধর্মীয় কারণে জীবনানন্দের চেয়ে নজরুল এদেশে উপেক্ষিত হচ্ছে এবং ঠিক একই কারণে নজরুলকে তোমরা জাতীয় কবি করেছ।” ওই সাক্ষাৎকারে বিনয় আরও বলেছেন, “গান্ধী বলেছেন ‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম সব কো সন্মতি দে ভগবান’। এই কথা বলাতে গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলল। ধর্মভিত্তিক একটা বিভাজন হয়ে গেছে। ধর্মের চেয়ে বরং মৃত্যু নিয়ে লেখা সাহিত্যিকদের স্মরণীয় করে রাখে। জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার’, ‘আট বছর আগে একদিন’ কী অদ্ভুত কবিতা!”

সবাই কবিতা লেখেন না, ছবি আঁকেন না, কৈশোরে আর তরুণ বয়সে আরম্ভ করে ছেড়ে দেন। কিন্তু অনেকে ছাড়তে পারেন না, খ্যাতি বা টাকাকড়ির জন্য নয়, তাঁরা ছাড়তে পারেন না কেননা, তাঁরা আটক পড়েন কোনও এক অস্বাভাবিক মননঘুর্ণিতে, তাঁরা তাড়িত হন সাইকোপ্যাথিক সাহসের কোনো এক মানসিক চাঞ্চল্যের নিশ্চয়তায়, যা কিনা সৃজনশীল ব্যক্তিমানুষের চরিত্রের সৎ উপাদান, এবং সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রিয়াবৈগুণ্যে সম্পর্কিত। ‘ট্রেণ্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’ পত্রিকার জুলাই ২০১৫ সংখ্যায় ‘থিংকিং টু মাচ: সেল্ফ জেনারেটেড থট অ্যাজ দি ইনজিন অফ নিউরটিসিজম’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে যে, স্বতঃচিন্তা সৃজনশীল কাজে সাহায্য করে বটে কিন্তু তা ব্যক্তিবিশেষের দুঃখেরও কারণ হয়ে ওঠে। বিনয় মজুমদার একটি লেখায় বলেছেন যে, দুঃখের কবিতা লিখে কবি আনন্দ পান। ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ পত্রিকার জুন ২০১৫ সংখ্যায় বলা হয়েছে যে, স্কিৎসোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার ব্যক্তি এককের ভেতরে ঘুমিয়ে-থাকা বংশগত জিনটি সহজাত সৃজনীপ্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে, এবং এই জিনগুলো সাধারণ মানুষের থেকে ভিন্ন।

কে জেমিসন তাঁর ‘টাচড উইথ ফায়ার: ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ইলনেস অ্যাণ্ড দি আর্টিস্টিক টেমপেরামেন্ট’ (১৯৯৬) বইতে বলেছেন, কবি ও ছবি আঁকিয়েদের সৃজনশীলতার সঙ্গে তাঁদের মুডের বিশৃঙ্খলা এবং শৈল্পিক বাতিকজনিত মনোভঙ্গের সরাসরি যোগাযোগ আছে। তাঁদের শৈল্পিক ক্ষমতা যত হ্রাস পেতে থাকে তাঁদের অবদমিত বিষণ্ণতাবোধ ও যৌনতায় বিফলতা তত বেশি তাঁদের মেজাজকে বিধ্বস্ত করতে থাকে। স্টিফেন ডায়ামণ্ডস ‘অ্যাঙ্গার ম্যাডনেস অ্যাণ্ড দি ডায়ামনিক: দি সাইকোলজিকাল জেনেসিস অফ ভায়োলেন্স, ইভিল অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’ (১৯৯৯) গ্রন্থে বলেছেন, সৃজনশীলতার সঙ্গে ক্রোধ, ক্ষিপ্তাবস্থা, আকস্মিক উদ্দীপনা, উগ্রতা, মন্দচিন্তা, অশ্লীল ভাবনা ও অসংলগ্ন আচরণের সম্পর্ক আছে, এবং তা কবিতায়-ছবি আঁকায় বা আচরণে  ফুটে ওঠে; বহুক্ষেত্রে শিল্পী তাঁর পুরোনো গড়ে তোলা ইমেজের বাইরে বেরিয়ে যাবার প্রয়াস করে।

বিনয় মজুমদারের কবিতাগুলো সম্পর্কে কেউ-কেউ সেরকম কথাই বলে থাকেন। অথচ বিনয় মজুমদার ইনসেন বা ম্যাড ছিলেন না, তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় ভুগতেন। স্কিৎসোফ্রেনিয়া যদি জিনগত রোগ হয়, তাহলে কেন তাঁকে ‘পাগল’ তকমা দিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো? প্রায় তিরিশ বার তাঁকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে; আটবার ভর্তি করা হয়েছে মানসিক চিকিৎসালয়ে, যেখানে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসার কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন না। যাঁরা চিকিৎসা করতেন তারা হয় এমবিবিএস অথবা মনোবিদ। সুমন গুণ, ছন্দবিদ অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছেন, বাঙালির সহজাত আলস্যপ্রবণতার একটি জনপ্রিয় প্রকাশ হলো জীবনানন্দের কবিতায় ছড়ানো অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। এই ছন্দই বিনয় মজুমদারেরও পছন্দ। তাঁর প্রতিটি কবিতা পয়ারে লেখা। সুমন গুণ বলেছেন, এই প্রাকরণিক সখ্য তাদের সংঘবদ্ধ করেছে। এই দুজন কবির ঘরানার মধ্যে একটি বৈষয়িক সম্বন্ধও আছে। তাঁরা দুজনেই কবিতায় এক স্মিত দার্শনিকতার প্রশ্রয় দিয়েছেন। জীবনানন্দের দর্শন ভেতরে জড়িয়ে রাখে সময়ের ইতিহাসের ঘোর। আর বিনয়ের কবিতা ঘটনার, বিজ্ঞানের, গণিতশাস্ত্রের উদাহরণ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের পরে সময় ও সমাচার নিয়ে এমন অক্ষুণ্ণ মনস্কতা অন্য কোনো কবির লেখায় বিশেষ পাওয়া যায় না। জীবনানন্দ ও বিনয় কোনও ঘটনার বিবরণ দিয়ে থেমে যান না, সেই ঘটনা বা প্রসঙ্গের একটি সাধারণ নির্ণয়ও রচনা করেন। সুমন গুণও ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্থের পর সম্ভবত আর এগোননি।

বিনয় মজুমদার তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্থে বলেছেন, গোবরডাঙায় সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একবার আলোচনা হয়েছিল। সন্দীপ এবং আমি একমত হলাম যে, গত আড়াই হাজার বছরে যত বই লিখেছে ভারতীয়গণ, তার একটা মোটামুটি হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, দুজন অমর কবি আছেন। এক শতাব্দীতে সারা ভারতে মাত্র দুজন। এই হিসেবটাই সত্য। সুতরাং হে বাঙালিগণ, কবি জীবনানন্দের কী দশা হবে আগামী ২০০০ বছর পরে, কে বলতে পারে? কিন্তু জীবনানন্দ খুব খারাপ কবিতা লেখেননি। জীবন যোগ আনন্দ— একসঙ্গে মিলে জীবনানন্দ। তা সত্ত্বেও জীবনানন্দ একটিও আনন্দের কথা লিখতে পারেননি। সব বেদনার কবিতা লিখেছেন।

‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্থে বিনয় আরও লিখেছেন, “আমি কৈশোরে দাড়ি গোঁফ গজাবার আগে, প্রায় প্রত্যহ দিলীপ গুপ্ত মশাইয়ের সিগনেট বুকশপে যেতাম। দিলীপবাবু আমাকে একটানা আবৃত্তি করে শোনাতেন, তৎকালীন তরুণ কবিদের কবিতা— জীবনানন্দ, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে প্রমুখ আরো নানাজনের কবিতার বাছা-বাছা অংশগুলি। আমি হা করে শুনতাম। ফলে সপ্তাহে অন্তত একখানা এদের রচিত বই খানিকটা প্রেমে পড়েই কিনে ফেলতাম। জীবনের আনন্দের, মানে জীবনানন্দের কোনো কবিতার বই তখন কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় কেনার জন্য পাওয়া যেত না। সুতরাং দিলীপ গুপ্ত মশাই জীবনানন্দের বাড়িতে গিয়ে একখানি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ এনে আমাকে দিয়েছিলেন। যতখানি ব্যথাভারাতুর মন হলে জীবনানন্দের ব্যথাভারাতুর কবিতাগুলি ভালো লাগে, ততদূর ব্যথাভারাতুর মন আমার তখনো হয়নি। তবুও আমার কবিতাগুলির প্রতি কেমন যেন মায়া জন্মেছিল। ধূসর শালপাতায় জড়িয়ে যেমন মাংস বিক্রি করে, তেমনি দু-খানি ধূসর মলাটের মধ্যে কবির হৃৎপিণ্ড জড়িয়ে আমার হাতে দেয়া হয়েছিল।”

মামুদ সীমান্ত, যিনি ভারতে এসে শিমুলপুর গ্রামে গিয়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, জোগিরার ১৮ অক্টোবর ২০১২ সংখ্যায় লিখেছেন, “যে দৃষ্টি দিয়ে বিনয়কে মানসিক অসুস্থ বিবেচনা করে থাকি, মূলত সেটাই বিনয়ের কাব্যভাষা। লক্ষ্য করার বিষয়, বিনয়কে আমাদের এই অপ্রকৃতিস্থ বোধ-বিবেচনার ফলে বিনয়ের কোনো কবিতায় ব্যঙ্গ-রসাত্মক উপমাটি আমাদের কাছে অন্য মানে তৈরি করে। জৈবনিক দীক্ষায় তিনি কি অন্যমনে শেষমেষ কবিতাকেই ধিকৃত করেছিলেন সমর্পণের দায়ে? বিনয়ের এইরূপ ভাষা-প্রক্রিয়ায় খেলা করার বিষয়টি বাংলা কবিতার সমঝদার পাঠকশ্রেণিকে নিশ্চয়ই আন্দোলিত করে। বিষয়-বৈচিত্র্যে বিনয়ের কাব্যভাষায় যথেচ্ছ চমক আছে। বিনয় সেই অবতারপ্রাপ্ত হয়েই জন্মেছেন। কিন্তু সমকালের বিকৃত বিবেচনাই তাঁর সে অবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। বৈচিত্র্যের বদলে হয়ে উঠেছেন মরুবৃক্ষের ন্যায় বিপন্ন, বৈভবহীন, ছিন্ন-মণিষা। ভুল আলোচনার শিকার হয়ে পীড়িত হয়েছেন তিনি। তাঁর কাব্যভাষা মহাকালের খণ্ডিত কম্পনরূপে স্বাক্ষরিত হয়ে থাকলো আমাদের কাছে।”

মামুদ সীমান্ত আরও লিখেছেন, “বিনয় তাঁর কাব্যে অবস্থান করেন উত্তমপুরুষে। এই উত্তমপুরুষটি এককেন্দ্রিক, অন্য অর্থে বহুধাবিভক্তও বটে। কবিতার অন্তর্গত সেই উত্তমপ্রকৃতিটিরই প্রকাশনা ঘটিয়েছেন নির্দ্বিধ, কোথাও ফাঁকি দেননি। এটি তাঁর একটি সেনশেশানাল ফেজ। অথচ তাতে বিনয়ের কোনো খেদ নেই। কেননা বিনয় সেদিকে ফিরেও তাকান না বা তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেন না। তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’, যাকে বলা হচ্ছে যৌনতার ভাষনির্মাণ, সেই কবিতাগুলোকেই আমার বহুল অর্থে লিখিত বলে মনে হয়। প্রশ্ন উদ্রেক হয় যে, কবিতাগুলো পাঠের শুরুতেই পাঠক যৌনতা বিষয়ক আচ্ছন্নতায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে যৌনতার সূত্র ধরে বাংলা কবিতায় উপমা ও বিবৃতির গাণিতিক ব্যাখ্যাটিকেই তিনি পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। কবিতাগুলোর মূল্যায়ন বিষয়ে অধিকাংশ পাঠকের নিম্নরুচির উপমাবিচার বাদ দিলে, কবিতাগুলো সর্বাধিক কাব্যশৃঙ্গারে উন্নীত। ভারতীয় উপমহাদেশে কামশৃঙ্গারের বিশ্লেষিত উপস্থাপনায় যেরূপ চিত্র সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত, বিনয়ের কবিতা মোটেও তা থেকে পিছিয়ে থাকে না। ‘আমার ভুট্টায় তেল’ জাতীয় কবিতায় রূপকার্থে ব্যবহৃত এমন সব শব্দ পাওয়া যায় যাকে বহু পাঠক, প্রাবন্ধিক, আলোচক এ যাবত কবিতাগুলিকে যৌনতার অপব্যাখ্যা দিয়ে কবিতার মূল টার্ম ভেঙে বিনয়কে কাণ্ডজ্ঞানহীন দোষী সাব্যস্ত করেছেন, যা একজন উচ্চমার্গীয় কবি-লেখকের ক্ষেত্রে কোনো কালেই প্রাপ্য ছিল না। কবিতাগুলি পাঠশেষে, সর্বাগ্রে আমি এটাই মনে করি, বিনয় মজুমদার এই কাব্যগুলোতেই ভাষার গূঢ়তাত্বিক কারিগরি করেছেন।”

তিনটি কবিতা পাঠ করে দেখা যাক:

বসার পরে

বসা শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় ভুট্টা অতি সামান্যই নরম হয়েছে।
নদী সোজা উঠে পড়ে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি গ্লাসের বাহিরে
রস লেগে আছে কিনা, নদী তার হাত দিয়ে আমার ভুট্টাটা
তখন— বসার শেষে কখনো ধরে না, ভুট্টা রসে ভেজা থাকে।

আমি কিন্তু হাত দিই, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,
ঘাস টেনে টেনে দেখি, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,
ঘাস টেনে টেনে দেখি, অনেক অশ্লীল কথা অনায়াসে বলি।
নদীর গ্লাসের দৃশ্য— গ্লাসের বাহিরটিকে প্রাণভরে দেখি
(গ্লাসের ভিতরে দেখি বসার সময়ে শুধু) বসা শেষ হলে
গ্লাস খুলে দেখতে সে এখনো দেয়নি, আমি বহির্ভাগ দেখি।
হঠাৎ বেলের দিকে চোখ পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই।
বেল দুটি এ বয়সে অল্প পরিমাণ ঝুলে পড়েছে, সে দুটি
মনোমুগ্ধকর তবু চোখ ফের নেমে যায় নিচের গ্লাসের দিকে, সেই
গ্লাসের উপরিভাগ বসার সময়ে যতো চওড়া দেখেছি
এখন ততটা নয়, সরু হয়ে পড়েছে তা ঘাসগুলি ঘন হয়ে পড়েছে এখন।

যৌবন কাহিনী

এখন ফুলকে খাই প্রায়শই কলকাতা গিয়ে।
কয়েক বছর ধরে খাওয়া হলো, ছেলেও হয়েছে।
আরো ছেলে মেয়ে চাই— এই কথা ফুলকে বলেছি,
খাওয়ার সময়ে আমি ধাক্কা দিতে দিতে এই কথাই বলেছি।
ফুল তাতে রাজি আছে, এই ভাবে দুজনের জীবন চলেছে।
ফুলের ঘরের পাশে আরো বহু ঘর আছে, প্রতিটি ঘরেই
নদী আছে, তারা সব আমার খাওয়ায় খুব সহযোগিতাই
করে থাকে সর্বদাই, ফুল যেই বলে ‘আজ একবার বসি’
অমনি সে নদীদের একজন জল এনে দেয়।
আমরা খাওয়ার পরে সেই জলে কলা গুহা ধুই।
আমি গেলে মাঝে মাঝে তাদের ভিতরে কেউ জিজ্ঞাসাও করে
‘আজ তুমি বসবে কি’ এইসব পরস্পর খাওয়ার সহযোগিতা করে
সেখানে— আমার ফুল যেখানে রয়েছে সেই বাড়িটিতে
নদী আছে, প্রতিবার খাওয়ার পরেই ভাবি তারা সব দেবী।

তিন ঘণ্টা পরে

একবার বসা হলে কমপক্ষে সারাদিন তার
আমেজ শরীরে থাকে, ভুট্টা থাকে কাৎ হয়ে পড়ে
সহজে দাঁড়ায় না সে; মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে
ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে আনি
হাতের আঙুল দিয়ে এবং সে ময়লা ও রসের সুঘ্রাণ
নাক দিয়ে শুঁকি খুব ভালো লাগে; প্রথম প্রথম
বসার পরেই আমি ভুট্টা ধুয়ে ফেলতাম— চাঁদ জল দিয়ে
গুহা ধুয়ে ফেলবার পরেই আমার ভুট্টা ধুয়ে দিতো জল ঢেলে ঢেলে।
অবশ্য কয়েকবার নিজেও ধুয়েছি আমি নিজে জল ঢেলে ।
তারপর ভাবলাম ভুট্টাতে গুহার রস লেগে থাকা ভালো।
তাতে বেশি সুখ পাবো, রস শুঁকে আনন্দও পাব।
সেহেতু এখন আর ধুই না এবং আমি মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে
ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে এনে তাই শুঁকি ।
ভালো লাগে, তার হেতু এই রস চাঁদের গুহার।

সমর তালুকদার বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “নারী সংসর্গের অভাব বোধ কর না?” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এটা ব্যক্তিগত— এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।” চলবে

ধারাবাহিক