বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ১৯

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৯, ২০১৯

১৪.
‘গ্রন্থি’ পত্রিকার জন্য চন্দন ভট্টাচার্যকে দেয়া সাক্ষাৎকারে (মে, ২০০৫) বিনয় মজুমদার কবিতা-বিশেষের মনে রাখা নিয়ে ছন্দ ও অন্ত্যমিলকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন:

চন্দন: আপনি কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ছন্দ ও অন্ত্যমিলে লিখলে সে কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায়। কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতাকে সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি। এখনও কি তাই মনে করেন কবি? তবে কি গদ্যে লেখা কবিতাগুলি মানুষ বিস্মৃত হবে কালে কালে?
বিনয়: আজও তাই মনে হয়।

চন্দন: কিন্তু ধরুন, লাতিন আমেরিকার বা ইউরোপেও তো শুধু গদ্য কবিতার ছড়াছড়ি। মিটার নামক শব্দটা ওরা হয়তো ভুলেই গেছে। শুধু কিছু গানের কথা ছাড়া—
বিনয়: গানও আজ কবিতা হয়ে গেছে। আমিও তো গদ্য কবিতা লিখেছি, প্রথম কবিতাটির নাম ছিল ‘আমার প্রথম গদ্যকবিতা’, বেরিয়েছিল ‘রোপণ’ পত্রিকায়। আমার ধারণা, লোকে গদ্য কবিতা পঙক্তির পর পঙক্তি এভাবে মনে রাখে না। মনে রাখে শুধু কবিতাটির বিষয়বস্তুকে।

চন্দন ভট্টাচার্য প্রশ্ন করতে পারতেন যে তাঁর ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো কি তাহলে বিষয়বস্তুকে মনে রাখার জন্য। বিনয় মজুমদারের কিন্তু প্রতিটি কবিতাই বোঝা যায়। ‘ফিরে এসো, চাকা’ এবং ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইয়ের কবিতাগুলো তো বটেই, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা করে ফিরে এসে লেখা যে কবিতাগুলোর জন্য তিনি অনেকের দ্বারা আজকাল নিন্দিত হন, সেই কবিতাগুলোও। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইতে ছয়টি দীর্ঘ কবিতা আছে। বিনয় মজুমদার বলেছেন, কবিতাগুলি যদিও নারীভূমিকাবর্জিত, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যাকে লেখা চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন কবিতাগুলো আদিরসাত্মক। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্থে বিনয় মজুমদার ‘অতিচেতনা’ ও ‘অতিসত্য’ নামে দুটি ভাবকল্পের সূত্রপাত ঘটালেন।

‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্থে বিনয় লিখেছিলেন:
আমার সচেতনতা যেন অতিচেতনার সমপরিমাণ হয়ে যায়
উভয় চেতনা যেন সমান কুশলী হয় সমান সক্ষম হয়ে যায়
দুই চেতনার মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থাটি যেন খুব স্বচ্ছলতা পায়।

বিনয় সচেতনতা ও অতিচেতনায় পার্থক্য করেছেন। সচেতনা কবির প্রতিস্বের, যিনি কবিতাটি অথবা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, তার। কিন্তু অতিচেতনা ও অতিসত্য পাঠবস্তুতে লুকিয়ে থাকে। কিছুকাল পরে পড়লে কবি অথবা পাঠক টের পান যে তাঁর সচেতনতায় ছিল না এমন জিনিসও রয়েছে পাঠবস্তুতে; আবার বহুকাল পরে পড়লে আরও নতুন উদ্ভাস পাবেন তিনি, যা প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার পড়ে পাননি। অর্থাৎ পাঠবস্তুটি নিজের উপরিতলের নিচে অতিচেতনার ও অতিসত্যের বহুবিধ স্তর সঙ্গোপনে রেখে দেয়। বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য তাঁর ব্যক্তিপ্রতিস্বের নয়, তা পাঠবস্তুটির।

১৯৮৭ সালে ‘পুনর্বসু’ পত্রিকার জন্য রণজিৎ দাশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য বিষয়ে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল:

প্রশ্ন: কথা হচ্ছে যে, আমি একটা কথা মনে করি, সেটা হচ্ছে যে আমি মনে করি, আমার সঙ্গে তখন একমত হয়েছিলেন আপনি— যে কোনও অভিজ্ঞতাই একজন কবির লেখার বিষয় নয়! মানে যে কোনও অভিজ্ঞতা, হঠাৎ একটা অভিজ্ঞতা হল, এটাই আমার লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে না। মানে যতক্ষণ না সেই অভিজ্ঞতাটা আমার মধ্যে জারিত হচ্ছে। জারিত হতে হতে এমন একটা পয়েন্টে এসে পৌঁছোল, যখন সেটা, শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা বা একটা সাধারণ উপলব্ধির স্তরে থাকে না— মানে সেটা একটা, কী বলব, অভিজ্ঞা বা আদ্যাজ্ঞানের অবস্থায় চলে যায়। তখনই একটা, সেই অবস্থা থেকে যখন একটি লোক লেখে, তখন সেটাই চূড়ান্ত কবিতা হয়ে উঠতে পারে, সম্ভাবনা থাকে। তো আপনি কি এটা মনে করেন? কেননা আপনার কবিতা পড়ে তো তাই মনে হয়েছে। কেননা চার বছর অতিক্রম করবার পরে–
বিনয়: কবিতায় অবচেতন মন বলে একটা জিনিস আছে, শুনেছ? সেটা কিছু-কিছু লোকের কবিতায় খুব থাকে। তুমি নিজের কবিতা রেখে দাও, ছাপা কবিতা… চার…পাঁচ, আস্তে আস্তে তোমার নিজের কবিতার মানেই তোমার কাছে কিন্তু ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হতে থাকবে, মনে হবে যেন, এই মানেটাও, রয়ে গেছে কবিতার মধ্যে, খেয়াল, খেয়াল না করে লিখে ফেলেছ, বুঝতে পারলে, এই যে জিনিসটা এটাকে তোমার অবচেতনাই বলো, অতিচেতনা, আমি ‘অতিচেতনা’ বলে একটা শব্দ সৃষ্টি করেছি, আলট্রা ভায়োলেট রে।

প্রশ্ন: এটা অনেক ভালো শব্দ, অনেক ভালো শব্দ।
বিনয়: অতিচেতনা।

প্রশ্ন: খুব ভালো, কাজে লাগবে।
বিনয়: আমি প্রথম ব্যবহার করেছি, ‘অতিচেতনা’ শব্দটা আগে ছিল না।

প্রশ্ন: আপনি তো ‘অতিসত্য’ বলেও একটা সাংঘাতিক শব্দ ব্যবহার করেছেন, এক জায়গায় আছে— অতিসত্য।
বিনয়: আচ্ছা, কনসাস মাইণ্ড, অ্যাঁ?

প্রশ্ন: অতিসত্য। অতিসত্য, আপনার লেখায় এক জায়গায় আছে। ’শুধু সত্য আমি’, ‘বাকিসব অতিসত্য, শুধু সত্য আমি’।
বিনয়: অতিসত্যটা তখন…

প্রশ্ন: আপনি ‘অতিসত্য’ ব্যবহার করেছেন। মানে, সমাসবদ্ধভাবে। তাহলে ‘আমার’ সঙ্গে চারদিকের তফাত একটা আছে?
বিনয়: অ্যাঁ?

প্রশ্ন: আমার সঙ্গে।
বিনয়: তুমি যা লিখে রেখেছ, রেখে দাও, ছাপা হোক, বই হোক, দশ, পনেরো, কুড়ি বছর পরে নিজেই টের পাবে ভিতরে-ভিতরে একটা গভীরতম অনুভূতিও রয়ে গেছে, নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করতে পারোনি লেখার সময়! বুঝতে পারছ! লেখার সময়ে তুমি নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করনি, তোমার অজ্ঞাত, তোমার নিজেরই অজ্ঞাতসারে এমন কিছু হয়ে গেছে। তাকে আমি নাম দিলুম অতিসত্য, সেটা একদম অতিচেতন মন। সাবকনসাস, কনসাস, এদুটো ছিল, আলট্রাকনসাস বলে, আলট্রা কনসাস, আলট্রাকনসাস, নাম দিলুম ‘অতিচেতনা’।

প্রশ্ন: আচ্ছা এটা কি সব লেখা সম্পর্কেই মনে হয়, না কিছু-কিছু লেখা সম্পর্কে মনে হয়?
বিনয়: তুমি নিজে মনে-মনে ভাব।

বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো অন্যান্য কবিদের সাক্ষাৎকারের থেকে একেবারে আলাদা। বিনয় সাক্ষাৎকারের মাঝেই নিজের কবিতা, জীবনানন্দের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আচমকা আবৃত্তি করে সাক্ষাৎকার যাঁরা নিচ্ছেন আর নিজের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন, দূরত্বকে মুছে ফেলেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর নিজের দেয়া সাক্ষাৎকার সম্পর্কে একবার বলেছিলেন Gesture towards a history of vanishing present এবং the interview is an enabling violation that allows the interviwee subject to produce a narrative of the self through a responsive encounter with the OTHER, as well as produce an ethics of accountable transformation. The interviewee not only articulates strategic essentialism but performs it. এই বক্তব্য বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোয্য। অন্যান্য লোকেদের যদি জিগ্যেস করা হয়, কেমন আছেন, তাঁরা উত্তর দ্যান ‘চলছে’। বিনয় কিন্তু জানান যে, তিনি আনন্দে আছেন।

সত্তর দশকের কবি বারীন ঘোষাল ‘অতিচেতনা’ নামে একটি কাব্যিক ভাবকল্পের কথা বলেছেন যা বিনয় মজুমদারের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বারীন ঘোষাল ব্যক্তি এককটির প্রতিস্বের অতিচেতনার কথা বলেছেন, সে কারণে বারীনবাবুর ‘অতিচেতনা’ কবিতার ভাবকল্পে সমর্পিত কবিদের আঙ্গিকে প্রতিফলিত হয়, এমনটাই তাঁরা মনে করেন, এবং সেই আঙ্গিকের প্রতি নজর দিলে স্তেফান মালার্মের বিখ্যাত কবিতা “এ রোল অফ দি ডাইস উইল নেভার অ্যাবলিশ চান্স’-এর প্রভাব সহজেই চোখে পড়ে। মালার্মে বলেছিলেন বস্তুজগতের সত্য স্বপ্রকাশিত হয় কবির অতিচেতনার (সুপারকনসাশনেস) দ্বারা। দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকা এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় বলেছে যে স্তেফান মালার্মে হলেন ‘প্রফেট অফ মডার্নিজম’। বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ কিন্তু বলেছেন যে অতিচেতনা (সুপার-কনসাশনেস) সম্ভব হয় মাদক সেবনের মাধ্যমে এবং সেই অবস্থায় সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য যে, বিনয় মজুমদারের অতিচেতনা থেকে এনাদের অতিচেতনা সম্পর্ণ আলাদা।

‘নিশিকড়’ প্রবন্ধে বারীন ঘোষাল লিখেছেন, “চেতনা শব্দটা একটু গোলমেলে। অনেকে একে বিবেক, চৈতন্য ইত্যাদির সাথে গুলিয়ে ফেলেন। মানুষের মনে যখন একটা বদ্ধমূল ধারণা হয় যা অন্ধ সেটাকেই তার চেতনা মনে করে। একই বিষয়ে অনেক চেতনা, আবার অনেকানেক বিষয়ে বহুবিধ চেতনা তার হতে পারে। অনেক সময়েই চেতনাগুলোর মধ্যে সংঘাত হয় তাদের আপাতবিশৃঙ্খলার জন্য, কার্য ও কারণের মধ্যে সম্পর্কহীনতার জন্য, মিথ্যা বিশ্বাসের জন্য, এবং ভাষা ও শব্দের প্রতীকভাষ্যের জন্য। চেতনাগুলির মধ্যে যদি শৃঙ্খলা সম্ভব হয় তবে তার মানসিকতাও সমৃদ্ধ হয়। আবার দেখুন, মানুষের শরীরে বস্তুগত শূন্যতা ৭০%, যা তার প্রতিটি পরমাণুর কোয়ার্কের সমষ্টিগত অন্ধকার। এই অন্ধকারও সচল, তার ডাইমেনশান আছে, আলোয় আসতে চায়। এটা তার প্রগতির লক্ষণ, প্রকৃতির শিক্ষা। চেতনাদলের অপার বিশৃঙ্খলার মধ্যে মানুষের পরিবেশ-সঞ্জাত যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্যাটার্নটি সম্ভাবিত হয় তা-ই তার অতিচেতনা।” প্রশ্ন হলো, বারীনবাবুর ‘নতুন কবিতা’ আন্দোলনের সকলেরই ব্যক্তি-প্রতিস্বে যা ঘটে তা কি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা?

অতিচেতনা সম্পর্কে ‘অষ্টাবক্র গীতা’য় বলা হয়েছে যে, “তুমি তখন পৃথিবী নও, জল নও, আগুন নও, বায়ু নও, আকাশ নও তখন স্বাধীনতাবোধের জন্য নিজের আত্মনকে অতিচেতন বলে মনে করো এবং ওই স্থিতিতে  সাক্ষী থাকো পঞ্চভূতের।” একটি থেকে আরেকটি সাব-জনারে বিনয় স্বচ্ছন্দে চলে গেছেন। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো এবং তার পরে লেখা কবিতাগুলো আঙ্গিক ছন্দ ও ভৌতজগতের নৈসর্গিক বিস্তার ‘ফিরে এসো, চাকা’ থেকে সম্পূর্ণ সরে গেল। প্রশ্ন ওঠে, তা কি এইজন্য যে, আলোচকরা তাঁর কবিতাকে বারবার জীবনানন্দের সঙ্গে তুলনা করছিলেন। বিনয় বলেছেন জীবনানন্দের কবিতা অত্যন্ত জটিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু চেষ্টা করেছিলেন জীবনানন্দের ঢঙে লিখতে। কিন্তু তিনি নিজে যে প্রভাবিত নন, এবং মৌলিকতা যাতে কবিতা রচনা করার সময়ে আসে শেষ পর্বের এই কবিতাটিতে বয়ান করে গেছেন:

কলমটি পড়ে আছে টেবিলের কোণে
হাত দিয়ে কলমটি ধরি…
এইভাবে আমি কবিতা রচনা করি
যাতে মৌলিকতা কবিতায় আসে
কারো কাব্য অনুসরণের চেষ্টা তো করিনি আমি
যা-যা ঘটে যা-যা করি তাই লিখি মাঝে -মাঝে। চলবে

ধারাবাহিক