মহাকর্ষের মহাকাব্য: নিউটন থেকে আইনস্টাইন

প্রাচ্য তাহের

প্রকাশিত : মে ০৫, ২০২৬

১৬৬৬ সাল। প্লেগের মহামারীর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। তরুণ আইজ্যাক নিউটন গ্রামের বাড়িতে বই পড়ে সময় কাটাচ্ছেন। একদিন বাড়ির বাগানে তিনি বসে আছেন। হঠাৎ একটি আপেল পড়ল তার সামনে। নিউটন ভাবলেন, যে বল আপেলটিকে টানছে, সেটি কি চাঁদকেও ধরে রেখেছে?

এই জিজ্ঞাসার মীমাংসা করতে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করলেন অভূতপূর্ব সত্য—মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে টানছে। তিনি একে বললেন মহাকর্ষ। নিউটনের কাছে মহাবিশ্ব ছিল এক বিশাল ঘড়ির মতো, যেখানে গ্রহ-নক্ষত্ররা একে অপরের সাথে অদৃশ্য এক `টান` বা `সুতো` দিয়ে বাঁধা।

নিউটনের সূত্র দিয়ে গ্রহের গতিপথ মেপে সেই সময় বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে যাচ্ছিল—সবই ঠিকঠাক মিলছে! কিন্তু একটা প্রশ্ন খচখচ করছিল—সূর্য তো কোটি কোটি মাইল দূরে, মাঝে তো কিছুই নেই (শূন্যস্থান)। তাহলে সূর্য পৃথিবীকে টানছে কীভাবে? এই টান কি তাৎক্ষণিক?

নিউটন নিজেও এর উত্তর জানতেন না। তিনি বলেছিলেন, "আমি কোনো কল্পনা করি না।” অর্থাৎ, এটা কাজ করছে এটাই সত্য, কীভাবে করছে, সেটা আপাতত রহস্য।

প্রায় আড়াইশো বছর পর এই রহস্যের মীমাংসা করলেন এক তরুণ পেটেন্ট অফিসের কেরানি—আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি ভাবলেন, মহাবিশ্বে কোনো কিছুই তাৎক্ষণিক হতে পারে না, এমনকি মহাকর্ষও নয়। আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে কিছু চলাও সম্ভব নয়।

তিনি কল্পনা করলেন, মহাকাশ বা `স্পেস` আসলে ফাঁকা কোনো জায়গা নয়। এটি একটি অদৃশ্য চাদরের মতো (যাকে তিনি বললেন স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল)।

ধরা যাক, একটি টানটান করা চাদরের মাঝখানে আপনি একটি ভারী লোহার বল রাখলেন। কী হবে? চাদরটি মাঝখানে দেবে গিয়ে একটি গর্ত বা বাঁকানো অবস্থার সৃষ্টি করবে। এখন যদি আপনি একটি ছোট মার্বেল সেই চাদরের ওপর ছেড়ে দেন, সেটি কি লোহার বলের `টানে` কাছে আসবে? না! সেটি আসলে ওই বাঁকানো পথ অনুসরণ করে ঘুরতে ঘুরতে কেন্দ্রের দিকে যাবে।

আইনস্টাইন ঘোষণা করলেন— সূর্য পৃথিবীকে কোনো অদৃশ্য সুতো দিয়ে টানছে না। সূর্য তার ভরের কারণে চারপাশের স্থান-কালকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। আর পৃথিবী সেই বাঁকানো পথেই সহজভাবে চলছে।

১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণের সময় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় সত্যিই বেঁকে যাচ্ছে—ঠিক যেমনটা আইনস্টাইন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। প্রমাণিত হলো যে, মহাকাশ সত্যিই বাঁকা! নিউটন যেখানে বলেছিলেন মহাকর্ষ হলো একটি `বল`, আইনস্টাইন সেখানে দেখালেন মহাকর্ষ আসলে স্থানের `জ্যামিতি`।

নিউটন ভুল ছিলেন না। তিনি কেবল চাদরের ওপর মার্বেলের চলাফেরা দেখেছিলেন। আর আইনস্টাইন এসে আমাদের দেখালেন খোদ চাদরটাই কেমন। আজ আমরা জানি, ব্ল্যাক হোলের মতো জায়গায় যেখানে স্থান-কাল ভীষণভাবে দুমড়ে যায়, সেখানে নিউটন অচল।

নিউটন মনে করতেন, সময় মহাবিশ্বের সব জায়গায় সমান—পৃথিবীতে ১ সেকেন্ড মানে মহাকাশেও ১ সেকেন্ড। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, যেহেতু ভর স্থান ও সময়কে বাঁকিয়ে দেয়, তাই সেই বাঁকানো পথে সময়ও বদলে যায়। যেখানে মহাকর্ষ বেশি (যেমন সূর্যের কাছে), সেখানে সময় ধীর গতিতে চলে। একে বলা হয় `টাইম ডাইলেশন`।

এর সহজ উদাহরণ আমাদের হাতের মোবাইল ফোনের জিপিএস ব্যবস্থা। এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে অনেকটা উঁচুতে থাকে যেখানে মহাকর্ষ পৃথিবীর তুলনায় কিছুটা কম। ফলে স্যাটেলাইটের ঘড়ি আর আমাদের হাতের ঘড়ির সময় এক গতিতে চলে না।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব ব্যবহার করে প্রতিদিন সেই সময়ের পার্থক্য ঠিক করা হয়। তা না করলে আমাদের লোকেশন বা ম্যাপ ভুল দেখাত। অর্থাৎ, আইনস্টাইন কেবল তত্ত্বই দেননি, আমাদের পকেটের স্মার্টফোনটাও তাঁর নিয়ম মেনে চলে।

আইনস্টাইন ১৯১৬ সালে বলেছিলেন, যদি মহাকাশে দুটি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, তবে স্পেস-টাইমের চাদরে ঢেউ খেলবে—ঠিক যেমন পুকুরে ঢিল ছুড়লে ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

শত বছর ধরে মানুষ এটা বিশ্বাস করেনি। কারণ, এই ঢেউ ধরা পড়ার মতো যন্ত্র আমাদের ছিল না। কিন্তু ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা ঠিক সেই ঢেউ বা Ripples শনাক্ত করলেন। শত বছর আগে একজন মানুষ শুধু চিন্তাশক্তি দিয়ে যা বলে গিয়েছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।

নিউটন আমাদের ভিত্তি দিয়েছেন, আইনস্টাইন দিয়েছেন দৃষ্টি। কিন্তু মহাবিশ্ব এখনও তার সব রহস্য ফাঁস করেনি। আইনস্টাইনের তত্ত্ব কৃষ্ণগহ্বরের একদম কেন্দ্রে গিয়ে থমকে যায়, সেখানে তাঁর অংক আর কাজ করে না।