করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৯৬৭৯ ৭০৭২১ ১৯৯৭
বিশ্বব্যাপী ১১২০৫০০৫ ৬৩৫৪২৬৯ ৫২৯৩৮০

মাসানোবো ফুকুওকার প্রবন্ধ ‘একটি তৃণখণ্ডে বিপ্লব’

প্রকাশিত : জুলাই ০১, ২০২০

মাসানোবো ফুকুওকা জাপানি দার্শনিক ও কৃষিবিদ। কিছুই না করে প্রাকৃতিক পন্থায় চাষাবাদের পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। ৩৫ বছর তার এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা জাপান ছাড়িয়ে বিশ্বের কৃষিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একটি গ্রাম ও একখণ্ড জমির ওপর তার নিবিষ্টতা ভারতীয় ঋষির মতোই একাগ্র ছিল। নিজে বিজ্ঞানী হয়েও বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন তিনি। ১৯১৩ সালে ফুকুওকা শিকাগো শহরে জন্ম নেন। মারা যান ২০১৩ সালে। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে, দ্য ওয়ান স্ট্র রেভ্যুলেশন, সোয়িং সিডস ইন দ্য ডিসার্ট, দ্য ন্যাচারাল ওয়ে অব ফার্মিং, দ্য রোড ব্যাক টু নেচার। রণজিৎ সেনগুপ্ত ও নির্মল চট্টোপাধ্যায় অনূদিত দ্য ওয়ান স্ট্র রেভ্যুলেশন বই থেকে কিছু অংশ পুর্নমুদ্রণ করা হলো

আমি মনে করি, একটিমাত্র তৃণখণ্ড থেকেই একটি বিপ্লব শুরু হতে পারে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে, ধানগাছের তৃণখণ্ডটি কত পলকা আর তুচ্ছ। কেউ একথা বললে বিশ্বাস করবে না যে, এটি দিয়ে একটি বিপ্লব ঘটানো যেতে পারে। আমার কাছে এ বিপ্লব অতি বাস্তব ব্যাপার।

রাই ও বার্লির ক্ষেতগুলোর দিকে একবার তাকাও। এসব শস্য পাকলে এক সিকি একর জমিতে প্রায় ১৩০০ পাউন্ড ফসল পাওয়া যাবে। আমার বিশ্বাস, সরকারি খামারের সবচেয়ে বেশি ফসলের সঙ্গে এর তুলনা চলে। অথচ আমার ক্ষেতে পঁচিশ বছরে একবারও লাঙল পড়েনি। হেমন্তকালে তখনো ধানকাটা হয়নি। আমি অন্য জমিতে রাই ও যবের বীজ ছড়িয়ে দিই। এই হলো আমার বীজ বপন। কয়েক সপ্তাহ পরে আমি ধান কাটি। পরে ধানগাছের খড়গুলো পুরো জমিতে ছড়িয়ে দিই। ধানবীজ বপনের সময়ও আমি এটি করে থাকি। শীতের এ ফসল সাধারণত ২০ মে নাগাদ কাটা হয়। ফসল পুরোপুরি পেকে ওঠার এক পক্ষকাল আগে রাই ও যবের ক্ষেতে ধানের বীজ ছিটিয়ে দিয়ে থাকি। শীতের ফসল কেটে নিয়ে মাড়াই করার পর ওই রাই ও যবের খড় মাঠে বিছিয়ে দেই।

আমার ধারণা, এ ধরনের কৃষিতে একই প্রণালিতে ধান ও শীতকালীন ফসলের বীজ বপন করাটা অভিনব ব্যাপার। কিন্তু সহজতর পন্থাও আছে। পাশের জমিতে ঘুরে এলে দেখব, ধান ও শীতের ফসলের বীজ গত হেমন্তে একই সময়ে লাগানো হয়। ওই জমিতে সারা বছরের বীজ বপনের কাজটা নববর্ষের আগেই সম্পন্ন হয়ে যায়। লক্ষ্য করে দেখবেন, শাদা ক্লোভার ও অন্যান্য আগাছা এসব মাঠে গজাচ্ছে। রাই ও বার্লির বীজ বপনের কিছু আগে অক্টোবরের প্রথম দিকে ক্লোভারের বীজ ধানগাছগুলোর মাঝে মাঝে ছড়ানো হয়েছিল। আগাছা বপনের ব্যাপারে আমার দুশ্চিন্তা নেই, এরা আপনা থেকেই বীজান্তরিত হয়।

এ মাঠে বপনের ধারাটা এরকম: অক্টোবরের প্রথমদিকে ধানগাছের মাঝে মাঝে ক্লোভার ছড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর মাসের মাঝামাঝি আসে শীতকালীন বীজ বপনের পালা। নভেম্বরের প্রথম দিকে ধানকাটা হয়। এরপর পরের বছরের জন্য ধানের বীজ বপন করা হয়। আর খড়গুলো মাঠের ওপর বিছিয়ে রাখা হয়। আপনাদের সামনে যে রাই ও যবের চারা দেখছেন, তাদের জন্মবৃত্তান্ত এই। এক সিকি একর বা এক বিঘা জমিতে ধান ও শীতের ফসল তৈরির কাজটা এক বা দুজন লোক অল্প কয়েক দিনের মধ্যে করে ফেলতে পারে। ফসল ফলানোর আর কোনো সহজ পন্থা আছে বলে আমার মনে হয় না।

এই পদ্ধতি আধুনিক কৃষি কলাকৌশলের সম্পূর্ণ বিরোধী। বলা যায়, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও চিরাচরিত চাষাবাসের প্রণালিকে একেবারে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। এ ধরনের চাষে কোনো যন্ত্র দরকার নেই। এরপরও গড়পরতা জাপানি খামারের উৎপাদনের সমতুল্য অথবা এর চেয়েও বেশি ফসল ফলানো সম্ভব। আপনাদের চোখের সামনেই পেকে ওঠা ফসল হলো এর প্রমাণ।

আজকাল অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, কেন অত বছর আগে এ ধরনের চাষ আমি শুরু করি। এখনো পর্যন্ত এ নিয়ে আমি কারো সঙ্গে আলোচনা করিনি। এ বিষয়ে বলার মতো আসলে কিছু ছিল না। এক ঝলক আলোর মতো হঠাৎ আমার মনে একটা অনুভূতি আসে, যা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দ্যায়। ছোট্ট সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমার নতুন এ পথের যাত্রা শুরু হয়।

এ উপলব্ধি আমার জীবনধারাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দ্যায়। এনিয়ে বিশেষ গল্প করারও কিছু নেই। তবে এভাবে হয়তো কিছু বলা যেতে পারে, মানুষ আদৌ কিছুই জানে না। কোনো বিষয়েরই নিজস্ব মূল্য নেই। মানুষের সকল কাজই ব্যর্থ অর্থহীন উৎসাহ। এ ধরনের উক্তি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হতে পারে। ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে এভাবে বলা ছাড়া উপায় নেই।

আমার বয়স যখন খুব কম, তখন এই ভাবনা হঠাৎ আমার মাথায় জাগে। মানুষের জ্ঞান যে কিছুই নয়, মানুষের প্রচেষ্টা যে শেষপর্যন্ত নিষ্ফল হয়ে যায়, এ অন্তর্দৃষ্টি সত্য না মিথ্যা, তা তখন বুঝিনি। কিন্তু আমার মনের ভেতর এমন কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যাতে এ ধরনের প্রত্যয়কে নস্যাৎ করে দিতে পারি। এর ওপর, প্রত্যয়টি আমার মনের ভেতর জ্বলছিল। ধরে নেয়া যায়, মানুষের বুদ্ধির চেয়ে চমৎকার আর কিছু নেই। জীবজগতে মানুষের রয়েছে বিশেষ মূল্য, মানুষের সৃষ্টি ও কীর্তি, যা তার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো বিস্ময়কর। এটিই হলো সাধারণ ধারণা। কিন্তু আমার চিন্তাভাবনা মানুষের সাধারণ বিশ্বাসের বিরুদ্ধেই চলছিল। এজন্য আমার মতামত কাউকে জানাতে পারিনি।

একপর্যায়ে এসে আমার চিন্তাকে একটি রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, বাস্তবে পরিণত করতে হবে। আমার উপলব্ধি ঠিক কি ভুল, তা ঠিক করতে হবে। সেই থেকে আমি আমার বোধকে স্পষ্ট রূপ দিতে বা বুঝতে সারাটা জীবন ধান ও গমচাষের মাঠে কাটিয়ে দিলাম। আমার সেই পরীক্ষা-নীরিক্ষাগুলোই কী আমার জীবনের মোড় বদলে দ্যায়? চল্লিশ বছর আগে, যখন আমার বয়স ছিল পঁচিশ বছর, আমি ইয়োকোহামা কাস্টমস ব্যুরোতে প্ল্যান্ট ইন্সপেকশন ডিভিশানে কাজ করতাম। আমার প্রধান কাজ ছিল, যেসব গাছ আমদানি করা হতো, তাদের সাথে কোনো রোগ-পোকার জীবাণু আছে কীনা, তা পরীক্ষা করে দেখা। সৌভাগ্যবশত, একাজে আমার খুব সময় লাগত না। ফলে হাতে প্রচুর অবসর থাকত। আমি তাই ল্যাবরেটরিতে গাছগাছড়ার রোগ নিয়ে নানা গবেষণা করতাম। এ ল্যাবরেটরিটা ছিল ইয়ামাতে পার্কের কাছে। এ পার্কের ওপর থেকে দেখা যেত অদূরের ইয়োকোহামা বন্দরটা। ল্যাবরেটরির ঠিক সামনেই ছিল ক্যাথলিক একটি চার্চ। এর পুবদিকে ছিল ফেরিস গার্লস স্কুল। পরিবেশটি ছিল শান্ত ও কাজ করার জন্য আদর্শ।

ল্যাবরেটরির প্যাথলজি গবেষক ছিলেন এইচি কুরোসাওয়া। গিফু কৃষি হাইস্কুলের শিক্ষক মাকেতো ওকেরার অধীনে আমি গবেষণা করতাম। কুরোসাওয়ার ছাত্র হবার সৌভাগ্য আমার হয়। যদিও তিনি বুদ্ধিজীবী মহলে তত পরিচিত ছিলেন না, তবু তিনি নীরবে-নিভৃতে ধানের রোগ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা করেন। বাকানায়ে নামে ধানগাছে যে ফাঙ্গাস রোগ হয়, তিনি এর কালচার করতে সক্ষম হন। ফাঙ্গাস থেকে গাছগাছড়ার বৃদ্ধির জন্য তিনিই প্রথম প্রয়োজনীয় হরমোন গিবারেলিন নির্যাস বের করেন। এ হরমোন যদি ধানের ছোট চারাতে দেয়া হয়, তবে ধানের চারাগুলো দ্রুত অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে ওঠে। আবার যদি এ হরমোন বেশি পরিমানে দেয়া হয়, তবে এর ফল হবে উল্টো। অর্থাৎ চারাগুলো আরো বেঁটে হয়ে যায়। জাপানে কেউ বড় একটা নজরই দ্যায়নি তার এ আবিস্কারে। কিন্তু দেশের বাইরে, বিদেশে এটি বিশেষ ঔৎসুক্য সৃষ্টি করে। কিছু দিনের মধ্যেই আমেরিকার এক বিজ্ঞানী গিবারেলিন ব্যবহার করে বীচিশূন্য আঙুর ফল সৃষ্টি করেন।

কুরোসাওয়ার নির্দেশে আমি একটি ডিসেকসন মাইক্রোস্কোপ বানাই। এর সাহায্যে আমেরিকা ও জাপানি কমলালেবু গাছের কাণ্ড, শাখা ও ফল নষ্ট করে দেয়ার ব্যাপারে রেজন রোগের বীজানুর কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে থাকি। ওর সাহায্যে নানা ধরনের ফাঙ্গাস, যাতে গাছের নানা রকমের রোগ ও ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা দেখতে পাই। দেখতে পাই, ফাঙ্গাস কালচার পরীক্ষার ফলাফল। নানা ধরনের সংকরজাতের ফাঙ্গাস, আর নানা ধরনের নতুন নতুন রোগ বীজাণু। গাছের ডালপালা ও কাণ্ডে ক্ষয়কারক এসব কাণ্ডকারখানা আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে থাকি। এ পরীক্ষা-নীরিক্ষার কাজে এত গভীর মনোযোগ দরকার যে, মাঝে মাঝে আমি অচৈতন্য হয়ে পড়তাম ল্যাবরেটরির মেঝেতে।

এ সময়টা ছিল আমার যৌবনের উদ্দাম দিন। মাইক্রোস্কোপের আইপিসের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত প্রকৃতিজগৎকে দেখে বিস্ময়ে আমার দিন কাটত। ক্ষুদ্র এ জগতের সঙ্গে অনন্ত বিশ্বজগতের মিল কেমনভাবে ঘটল, তা দেখে আমি অভিভূত হতাম। সন্ধেবেলা আকাশের দিকে আমি চেয়ে থাকতাম। লক্ষ্যহীন জীবন ও অতিরিক্ত শ্রমে আমার একবার কঠিন অসুখ হয়। নিমোথোরাক্স চিকিৎসার জন্য আমাকে ভর্তি করা হয় পুলিশ হাসপাতালে। শীতের রাতের জানলার ভাঙা শার্সি দিয়ে ঘরের মধ্যে বাতাসের সঙ্গে বরফ ঢুকে ঘরটাকে অতি ঠাণ্ডা করে তুলত। লেপ-কম্বলের মধ্যে দেহ ঢোকাতাম ঠিকই, কিন্তু বাইরের মাথা ও মুখ একদম ঠাণ্ডা হয়ে যেত, বরফের মতোই। নার্স এলে দেহের তাপ নিয়ে চটপট সরে পড়ত। আমার ঘরটা ছিল প্রাইভেট কেবিন। লোকজন বেশি ঢুকত না। আমার মনে হতো, যেন আমাকে ঠাণ্ডা একটা ঘরে নির্জনে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তীব্রভাবে আমি একাকিত্ব ও নির্জনতা অনুভব করতাম। মনে হতো, আমি যেন মৃত্যুর মুখোমুখি মুখ করে শুয়ে আছি। আজ যখন ভাবি, মনে হয়, ওই ভয়ের কোনো মানে হয় না। কিন্তু তখন আমার ওই ভয়টা ছিল খুবই আতঙ্কজনক।

কিছু দিন পর আমি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাই। কিন্তু মনের বিষণ্নভাব কিছুতেই কাটতে চায় না। কিসের ওপর আমি জীবনের বিশ্বাস রেখে চলেছি? আমার যেন কোনো ভাবনাচিন্তা ছিল না। আমার আত্মসন্তোষের কারণই বা কি? জীবন-মৃত্যু বিষয়ে আমার ধারণা অস্পষ্ট ছিল বলে আমার মনে একটা ভারি অসন্তোষ ছিল। আমি ঘুমুতে পারতাম না। কোনো কাজে মনও দিতে পারতাম না। রাতের অন্ধকারের জাহাজঘাটার আশপাশে ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু এতেও মন স্থির হতো না।

এক রাতে মনের অশান্তিতে যখন ঘুরছি পোর্টের অদূরে গাছতলায় আমি অবসন্ন ও অচৈতন্য হয়ে পড়ে যাই। শেষমেষ বিরাট একটা গাছের গুঁড়িয়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। না সত্যিকারের ঘুম, না জাগা, এমন একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে আমার রাত কাটে। শুধু এটুকুই মনে আছে, সেদিন ছিল ১৫ মে। ঘুমঘোরের মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি, সমুদ্রের বন্দরের ওপর দিয়ে সূর্য উঠছে। সব আলোকিত হয়ে উঠছে। কিন্তু ওই সূর্য ওঠা যেন দেখতে পাচ্ছি, আবার পাচ্ছিও না। বন্দরের দিক থেকে যেই হাওয়া বইতে শুরু করল, হঠাৎ কেটে গেল ভোরের কুয়াশা। ঠিক সেই মুহূর্তে বড় একটা রাতচরা সারস আমার মাথার ওপর দিয়ে ডাক দিয়ে দূরে উড়ে চলে গেল। আমি তার পাখার শব্দ শুনতে পেলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার মনের যত সংশয় ও বিষণ্নভাব, কুয়াশার মতোই কেটে গেল। এ পর্যন্ত আমার যা কিছুতে বিশ্বাস ছিল, যা কিছু আমি ধ্রুব বলে ধরে রেখেছিলাম, তা সহসা মিলিয়ে গেল। আমি কেবল একটি সত্যিই যেন বুঝতে পারলাম, এ জগতে কিছুই নেই। আমার মনে হলো, আমি কিছুই বুঝি না।

জগৎ বিষয়ে এ পর্যন্ত আমার যে ধারণা, এমন কি, এর অস্তিত্ব বিষয়েও যা ধারণা, তা সবই ছিল মনগড়া। আমার মনটা হালকা ও পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি আনন্দে নাচতে লাগলাম। গাছের মাথায় ছোট ছোট পাখিদের কলরবও আমি শুনতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, দূরে সমুদ্রের মধ্যে ঢেউগুলো সূর্য কিরণে ঝলমল করছে। গাছের সবুজ পাতা নাচছে ও ঝিকমিক করছে। আমার মনে হলো, এই হলো মর্ত্যে স্বর্গের আবির্ভাব। আমার মনে যত ভাবনা, বোঝা, ব্যথা ছিল, সহসা সব দূর হয়ে গেল। আমি অনুভব করলাম, এই হলো প্রকৃতির সত্যিকারের রূপ।

আমি একথা এখন বলতে পারি, সেদিনের সেই ভোরের অভিজ্ঞতা আমার জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে দ্যায়। এ পরিবর্তন সত্ত্বেও আমি সাধারণ একটি নিবোর্ধই আছি। আমার বিশেষ কোনো পরিবর্তনও ঘটেনি। বাইরের দিক থেকে দেখলে অন্যান্য পাঁচজনের চেয়ে আমাকে কিছু আলাদা দেখাবে না। কিন্তু জীবনের যে বিশ্বাসের নিশ্চিন্ততা আমি পেয়েছিলাম, তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে যে সাধনা আমি চালিয়ে যাচ্ছি, তাতে কিছুমাত্র সংশয় সৃষ্টি করেনি। আমার প্রত্যয়ে কোনো চিড়ও ধরেনি। এই যে প্রত্যয় আমার জীবনে এসেছিল, তাতে যে আমার দাম কিছু বেড়ে গেল, তা নয়। আমি সেই সাধারণ মানুষই আছি। আমার খামারে আসা ছাত্রছাত্রীদেরকে আমি সবসময়ে বলি, তারা যেন আমার অনুকরণ না করে। তারা যেন প্রকৃতিতে বাস করে। প্রতিদিনকার কাজে তারা যেন প্রকৃতির নির্দেশ বুঝতে চেষ্টা করে। না, আমার মধ্যে বৈশিষ্ট্য কিছু নেই। আমি হঠাৎ একদিন যা দেখেছিলাম, তার তাৎপর্যই বিশাল।

এ অভিজ্ঞতার পরদিন ১৬ মে, কাজে গিয়ে আমি পদত্যাগপত্র দাখিল করলাম। ওপরঅলা ও বন্ধুরা সবাই অবাক। তারা বুঝতে পারছিল না, কী করে এবং কেন এ যুবকটি চলে যাচ্ছে। জাহাজঘাটের ওপরে একটা রেস্তরাঁয় তারা আমার বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। এ অনুষ্ঠানে আমি তাদেরকে কেবল এ কথাই বললাম, বন্দরের এই এধারে আছে মাল ওঠাই-চড়াইয়ের জাহাজঘাট। আর ওপারে আছে চার নম্বর থাম। আপনারা যদি মনে করেন, এদিকটায় আছে জীবন, তাহলে অপরদিকে আছে মৃত্যু। মৃত্যুর ধারণা থেকে যদি রক্ষা পেতে চান, তবে এদিকে জীবন আছে, এ ধারণাও ছাড়তে হবে। জীবনও যা, মৃত্যুও তা।

এরপর সবাই আমাকে নিয়ে ভাবনায় পড়ল। কী বলছে ছেলেটা? নিশ্চয়ই ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমার রুমমেট পরামর্শ দিলেন বোসো বদ্বীপ বা শান্তিপূর্ণ কোনো স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে। আমি ছেড়ে এলাম ওই জায়গা। একটা বাসে উঠে পড়লাম। মাইলের পর মাইল বাইরে বড় রাস্তার দুধারে ছোট ছোট গ্রাম আর নকশাকাটা ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বাসে করে আমি চলেছি। বাসস্টপের এক জায়গায় ইউটোপিয়া নামে একটি সাইনবোর্ড দেখে নেমে পড়লাম। এবং সাইনবোর্ডে ইঙ্গিত করা ইউটোপিয়ার খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। সমুদ্রের উপকূলে ছোট্ট সরাইখানা। পাহাড়ের মাথায় উঠে দেখলাম, জায়গাটা সত্যিই বিস্ময়কর। আমি সরাইখানাতেই থেকে গেলাম। সমুদ্রের ধারে লম্বা লম্বা ঘাসের বিছানায় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে আমার দিন কাটতে লাগল। কিছু সময় সরাইখানায় থাকলাম, কত দিন? হয়তো এক সপ্তাহ, হয়তো একপক্ষ, কী এক মাসও হতে পারে। দিন যত যেতে লাগল, ততই আমার ভেতরকার উল্লাস স্থিমিত হয়ে আসতে লাগল। আমার জীবনে কী ঘটে গেল, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হলো। শেষপর্যন্ত যেন আমি আমাতে ফিরে এলাম।

এরপর আমি টোকিওতে গিয়ে কিছুকাল থাকলাম। সেখানে পার্কে পার্কে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়িয়ে, রাস্তায় লোকজনকে দাঁড় করিয়ে কথা বলে, যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে আমার দিনরাতগুলো কেটে গেল। একদিন আমার সেই রুমমেট আমাকে দেখতে টোকিও এলো। বলল, ‘তুমি কী কোন স্বপ্নজগতে কোন মায়ার জগতে বাস করছ?’ আসলে আমরা উভয়ই মনে মনে ভাবছিলাম, আমিই ঠিক কথা বলছি, তুমিই স্বপ্নে বাস করছ। বন্ধুটি ফিরে গেলে আমিও টোকিও ছাড়লাম। এরপর কানসাই (ওসাকা, কোবে ও কিয়োটা) অঞ্চলের মধ্য দিয়ে একেবারে দক্ষিণ মু্ল্লুক কিউসুতে এসে পৌঁছালাম। হালকা হাওয়ার সাথে এধারে ওধারে ঘুরে বেড়াতে আমার বেশ ভালোই লাগছিল। এ জগতে সবকিছুই অর্থহীন, কোনো কিছুরই কোনো মূল্য নেই, সবকিছুই শূন্যে মিলিয়ে যায়, আমার এ জাতীয় বিশ্বাস নিয়ে অনেক মানুষের সাথে তর্কবিতর্ক করতাম। কিন্তু প্রাত্যহিক জগতের লোকদের পক্ষে একথা নেয়া অসম্ভব। হয়, বিষয়টা তাদের বোঝার পক্ষে অতি উচ্চস্তরের, নয়তো নিতান্তই নগন্য ব্যাপার। কোনো সাড়া পেলাম না। অর্থহীনতার এ ধারণা জগতের পক্ষে, বিশেষ করে উল্টোপথে ধাবমান বর্তমান জগতের পক্ষে বিশেষ মঙ্গলকর বলে মনে হতো আমার। সত্যি সত্যি এ বাণী ছড়িয়ে দিতে আমি দেশজুড়ে ঘুরে বেড়ালাম। ফল হলো এই, যেখানেই যাই সেখানেই সবাই আমাকে পাগল বলে ধরে নেয়। এ কারণে গ্রামে আমার বাবার খামারে ফিরে এলাম।

সে সময়ে আমার বাবা কমলালেবু চাষ করছিলেন। আমি সোজা পাহাড়ের মাথায় একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে আশ্রয় নিলাম। সহজ সরল প্রায় আদিম জীবনযাত্রা শুরু হলো আমার। আমি ভাবলাম, যদি এখানে একজন লেবু ও শস্যের চাষি হিসেবে আমার উপলব্ধিকে প্রকৃত রূপ দিতে পারি, তবে জগতে আমার উপলব্ধির সত্যতা স্বীকৃত হবে। অনেক কথা বলে বোঝানোর চেয়ে আদর্শকে কাজে রূপায়িত করাটা কি শ্রেষ্ঠতম পন্থা নয়? এ ভাবনা থেকে শুরু হলো আমার কিছু না করার চাষ পদ্ধতি। পাহাড়ের কোলেই বসবাস শুরু করলাম। বাগানের ফলন্ত গাছগুলোর পরিচর্যার ভার আমার ওপর দেয়ার আগপর্যন্ত সবকিছু ভালোই চলছিল। বাবা এর আগে গাছের ডালপালাগুলো মদের পেলয়ালার মতো করে ছেঁটেকেটে দিয়েছিলেন। যাতে সহজে ফলগুলো পেড়ে নেয়া যায়। আমি গাছগুলোকে এ অবস্থাতেই ফেলে রাখলাম। ফলে গাছের ডালপালাগুলো জড়িয়ে গেল। গাছে পাকা ধরল আর অল্প সময়ের মধ্যে পুরো বাগানটাই মরে গেল।

আমার বিশ্বাস হলো এই যে, ফসল আপনা থেকেই জন্মায়। তাকে ফলানোর দরকার পড়ে না। আমি এ বিশ্বাস নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম যে, সবকিছু প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। কিন্তু আমি দেখলাম, পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া আমার চিন্তাকে প্রয়োগ করলে ফল ভালো হবে না। বাবা খুব আঘাত পেলেন। বললেন, আমাকে কাজ শিখতে হবে। পুরোপুরি তৈরি হয়ে যেন এরপর ফিরে আসি। বাবা ছিলেন গ্রামের মোড়ল। গ্রামের লোকদের পক্ষে তার এই পাগল ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সত্যি খুব কঠিন ব্যাপার। ছেলেটি তো বাইরের জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে পাহাড়ে-পর্বতে বাস করার জন্য ফিরে এসেছে।

এরপর আট বছর ধরে আমি বৈজ্ঞানিক ও প্রকৃতিনির্ভর চাষের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা করি। সবসময়েই আমার এ ভাবনা ছিল যে, বিজ্ঞানের মুখোমুকি হয়ে প্রাকৃতিক চাষ টিকে থাকতে পারবে কীনা। পরিবেশকে অসুস্থ করে ফেলার জন্যই ডাক্তার ও ওষুদের দরকার পড়ে। প্রচলিত বিদ্যাশিক্ষার অন্তর্নিহিত কোনো মূল্য নেই। কিন্তু মানুষ এমন এক অবস্থা তৈরি করে রেখেছে যে, বেঁচে থাকার জন্য তাকে ‘শিক্ষিত’ হতেই হয়।