মুজিব ইরম

মুজিব ইরম

মুজিব ইরমের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৪, ২০১৯

হাটুরে কবিতা

প্রথমেই শুরু করি বন্দনা তোমার। পরেতে বন্দিবো আমি যত পদকার। তারপর একে একে মহাজন কবি। পুঁথি দোঁহা পদাবলি মনে আছে সবি। বন্দনা করিবো শেষে শ্রোতাবন্ধুগণে। আমার কবিতা যারা মন দিয়া শোনে। শেষেতে করিয়া ক্ষান্ত সকল বন্দনা। গাইমু কবিতা আর সুরের বর্ণনা।

এই বার নিজনামে রচিবো কবিতা। শোনো তুমি ভদ্র অতি আর যত শ্রোতা। আমিও একদা সেই হাটে হাটে ঘুরে। কাটিয়েছি দিবারাতি শব্দাক্রান্ত ঘোরে। ভাট কবি নাম ধরি ভাবিয়াছি রোজ। তোমাকে নিরলে বসি করিয়াছি খোঁজ। আর তো চাইনি কিছু লিখেছি ভণিতা। মনে মনে রচে গেছি হাটুরে কবিতা। হাটুরে কবির মন তুমি শুধু বোঝো। দুর্জনেরা বলে বৃথা ভিনদেশে খোঁজো। লুকাইয়া রাখিও পুথি আঁচলের নিচে। রচেছি তোমাকে নিয়ে জানে লোকে মিছে। এই পদ গুপ্তকথা তুমি শুধু পড়ো। সেই শব্দে সেই সুরে এই বাণী ধরো।

এইটুকু চাই শুধু চাই না তো আর। তুমি শুধু গীত হও জগৎ মাজার। পাশে বসি শোনো তুমি কবিতা আমার। হাটেঘাটে এই বাণী করহ প্রচার। মুজিব ইরম বলে এই বর দিও। ভাট কবি লোক কবি আমারে ডাকিও।

জন্মপুথি

শোনো ভাই সভাজন অধমের নিবেদন। যেমত হইলো লেখা পয়ার বচন। মালাধর বসু নামে সেই যে রচেছি। এই নাম ডেকে ডেকে পয়ার ধরেছি। ভাবগত অর্থ যত পয়ারে ধরিয়া। লোক বুঝাইতে গাই পাঁচালি করিয়া। নারায়ণ দেব নাম ধরি তারপর। পয়ারে সঁপিয়া মন বাঁধিয়াছি ঘর। বিজয় গুপ্তের নামে বাঁধি এই পদ। নাম ধরি নাম জপি কাটাই বিপদ। লোচন দাসের কথা কী কহিবো আর। এই পদ বিরচিতে ধরি নাম তার। আরো আরো যারা যারা করিলা বর্ণন। শব্দলীলা পদ্যলীলা পয়ার তর্পণ। সেই কবে নিজগুণে বহু মহাজন। লাচাড়ি পয়ার ছন্দে করিলা সৃজন। তারপর ভিন রূপ ভিন ছলাকলা। বন্ধ হলো দেশি পদ দেশি রূপে বলা। একদা দুপুরবেলা কী যেন কেমনে। লিখিতে পয়ার বই পশিলো মরমে। অন্তরে আদেশ পাই নিজেই নিজের। তাইতো পয়ার বাঁধি মূলত বীজের। লিখিতে হইলো সাধ পুথির চরণ। পয়ারপুস্তক এক করিতে সৃজন। আমি অতি হীন মতি ছেড়েছুঁড়ে সব। আদি ও আসল সুরে করি জপতপ। ভুল হলে করো ক্ষমা জ্ঞানীগুণিজন। দেশি পদে দেশি সুরে রাখিও স্মরণ।

মাতা অতি পুণ্যবতী লাল বিবি নাম। তাহার উদরে জন্মি জপি নামধাম। অন্তর শুকায় মোর শব্দ অভিলাষে। ইরমে রচিলা পদ গীত ভালোবেসে।

গুপ্তকথা

এই বার সহি মনে গুপ্তকথা বলি। নিজে তো পারি না কিছু তুমি নামে চলি। তুমি বিনে কার সনে করি ওঠাবসা। পানি ছাড়া মীন যেন হৈলো মোর দশা। তব মন যাচিয়াছি পুরাতন রীতি। ভুলি নাই মনে রাখি কালার পীরিতি। আমি তো প্রস্তুত আছি নেও গো কিনিয়া। যেন আমি গত হই তোমারে চিনিয়া। চিনিবো চিনিবো আমি ব্যথা হলে দূর। এই নাম জপে জপে কাটিবে বেঘোর। এমন বেতাল দিন চাই বা না চাই। কান্দনে মাতমে হুঁশ হামেশা হারাই। খুঁজিতে খুঁজিতে দিশ হুঁশটুশ নাই। এ-বেদনা হৈব সুখ যদি দেখা পাই। খুঁজিলে পাইবো জানি সুরে আর তালে। কেন তবে খুঁজে মরি অনালে-বিনালে।

শেষমেষ বুঝিয়াছি আদি গুপ্তবাণী। এই পদে তুমি নাম তাই তুলে আনি। তোমারে ডাকিবো আমি বিনোদিনী রাই। তুমি বিনে ইরমেরে আর কোথা পাই।

পয়ার বাহার

এই বার বান্ধি পদ মনে থাকে ডর। ভুলভ্রান্তি হৈলে বুক করে ধড়ফড়। পয়ারপুস্তক লিখি জানা কিছু নাই। দূরবাস থেকে শেষে মিনতি জানাই। বিদেশেতে থাকি বন্দি বিদেশেতে ঘর। যদি বা হারাই দেশ এই মোর ডর। এই ডরে কান্দাকাটি করি বারোমাস। পরদেশে থেকে করি নিজদেশে বাস। কি বা জানি মারেফাত কি বা জানি ভেদ। জানি শুধু শব্দবাক্য সকলি অভেদ। দেশখেশ বাড়ি ছাড়া কি বা আছে আর। খায়েস হৈয়াছে বাঁধি পয়ার বাহার। এই পদে আমি নাই বৃথা খোঁজা তাই। আমারে খোঁজো না পদে নিষেধ জানাই।

এই বার লিখে রাখি নিজ সমাচার। বিদেশেতে করি বাস জগতে প্রচার। মধ্যভূমি নাম তার বিলাত নগর। যত দূর যাই আমি সাথে যায় ঘর। জাহেরি বাতেনি নয় নিজ দেশ লিখি। ইরমে নিয়ত কয় পদ বাঁধা শিখি।

পয়ার নছিহত

পয়ারপুস্তক পড়ে হও সাবধান। দেশি পদে দেশি গীতে রাখিও ঈমান। ডাঙ্গায় বাইলা নাও কত মহাজন। জলে ডুবে মোর নাও স্থলে ডুবে তন। তারা তো করিলা স্নান ভিজেনি বসন। আমার ভিজেছে দেহ ভিজে গেছে মন। সেই স্নান হয়নি তো মিটেনি পিয়াস। মন্ত্র দোয়া শিখিনি তো বেড়েছে তিয়াস। এসব ভেদের কথা যে কহিতে পারে। ভজিমু চরণ তার সৃজিমু পয়ারে। এই দুখ থাকে মনে এই দুখ থাকে। দিবানিশি মনমরা উচাটন রাখে। মুখে মুখে ঘুরেফিরে আকারে প্রকার। তেমন পয়ার লেখা হৈলো না তো আর। তবুও নিদানে আশা রাখি জমা মনে। প্রেমের বাজারে বুঝি নিবে সর্বজনে। কসম দোহাই তাই রাখি ধার করে। আমার পয়ার যেন প্রেমিকেরা পড়ে। জগতে প্রেমিক যারা তারা তো মহান। দয়ামায়া আশকারা বাটে দু’জাহান।

মনেরে বুঝিয়ে তাই বলি বারে বারে। অপ্রেমিক ছেড়ে যাও প্রেমিকের দ্বারে। মুজিব ইরম বলে এই তার সন্ধি। জগৎ ঘুরিয়া শেষে পয়ারেতে বন্দি।

কবি পরিচিতি: মুজিব ইরমের জন্ম মৌলভীবাজার জেলার নালিহুরী গ্রামে। পারিবারিক সূত্র মতে ১৯৬৯, সনদপত্রে ১৯৭১। পড়াশোনা করেছেন সিলেট, ঢাকা ও যুক্তরাজ্যে।  তার প্রথম কবিতার বই ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে, বাংলা একাডেমি থেকে। তার প্রকাশিত অন্যান্য কবিতার বইগুলো হচ্ছে: ইরমকথা ১৯৯৯, ইরমকথার পরের কথা ২০০১, ইতা আমি লিখে রাখি ২০০৫, উত্তরবিরহচরিত ২০০৬, সাং নালিহুরী ২০০৭, শ্রী ২০০৮, আদিপুস্তক ২০১০, লালবই ২০১১, নির্ণয় ন জানি ২০১২, কবিবংশ ২০১৪, শ্রীহট্টকীর্তন ২০১৬, চম্পূকাব্য ২০১৭, আমার নাম মুজিব ইরম আমি একটি কবিতা বলবো ২০১৮ এবং পাঠ্যবই ২০১৯।

কবিতা ছাড়াও মুজিব ইরম কাজ করেছেন গল্পে, উপন্যাসে, শিশুসাহিত্যে। তার প্রকাশিত উপন্যাস/আউটবই: বারকি ২০১১, মায়াপীর ২০০৯, বাগিচাবাজার ২০১৫। গল্পগ্রন্থ: বাওফোটা ২০১৫। শিশুসাহিত্য: এক যে ছিল শীত ও অন্যান্য গপ ২০১৬। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জয় বাংলা ২০১৭।

এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে ধ্রুবপদ থেকে মুজিব ইরম প্রণীত কবিতাসংগ্রহ: ইরমসংহিতা ২০১৩, বাংলা একাডেমি থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: ভাইবে মুজিব ইরম বলে ২০১৩, এন্টিভাইরাস পাবলিকেশনস, লিভারপুল, ইংলেন্ড থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: পয়েমস অব মুজিব ইরম ২০১৪, ধ্রুবপদ থেকে উপন্যাসসমগ্র: মুজিব ইরম প্রণীত আউটবই সংগ্রহ ২০১৬, পাঞ্জেরী থেকে: প্রেমের কবিতা ২০১৮, বেহুলা বাংলা থেকে: শ্রেষ্ঠ কবিতা ২০১৮।

পুরস্কার: মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার ১৯৯৬। বাংলা কবিতায় সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন সংহতি সাহিত্য পদক ২০০৯, কবি দিলওয়ার সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। কবিবংশ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। শ্রীহট্টকীর্তন গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘জয় বাংলা’র জন্য পেয়েছেন এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। কবিতা ও কথাসাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন শালুক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯। এছাড়া পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার ২০১৭।