করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৮২৪৪৮৬ ৭৬৪০২৪ ১৩০৭১
বিশ্বব্যাপী ১৭৬১০৪১৫৬ ১৫৯৬৯৯০৯৬ ৩৮০২১৬৫

যাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি, তাদের পকেটে নাই কানাকড়ি

পর্ব ২২

প্রকাশিত : মে ২০, ২০২১

কথাসাহিত্যিক মারুফ ইসলাম ‘দহনদিনের লিপি’ শিরোনামে আত্মজীবনীর মতো করে গদ্য লিখছেন ছাড়পত্রে। আজ প্রকাশিত হলো ২২ পর্ব

৮ মে ২০২১ শনিবার
সকালের আবহাওয়াটা অনেক স্নিগ্ধ ছিল। মৃদু হাওয়ার সঙ্গে মিশে ছিল ঠাণ্ডা আমেজ। আমি যখন বেরিয়েছি, তখনো পুরোপুরি ঘুম ভাঙেনি শহরের। একটা দুটো রিকশা, অল্প কিছু মানুষ, আর হঠাৎ হঠাৎ একটা দুটো বাস নজরে পড়ছিল। বসিলা রোডের পূর্ব পাশজুড়ে বুদ্ধিজীবী গোরস্তানের বিশাল প্রাচীর। সেই প্রাচীর ফুঁড়ে মাথা তুলেছে কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া। ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে তার মাথালের মতো মস্তক। শাখায় শাখায় নাম না জানা পাখির কুজন কানে মধু ঢালছিল।

এমন আবহাওয়া দেখলেই আমার মনে পড়ে, এই মনোরম মনোটোনাস শহরে... লাইনটা। শহরটা সত্যিই মনোরম এবং মনোটোনাস। অফিসে গেলাম নির্বিঘ্নেই। রুটিন মাফিক কিছু কাজ করলাম। দুপুরের দিকে একটা অপ্রত্যাশিত ফোন এলো। ফোন করেছে জসিম। জসিমের পরিচয় একজন কম্পিউটার অপারেটর। একটা প্রেসে কম্পোজ টম্পোজের কাজ করে সে। কিছুদিন আগে আমি একটা প্রুফ রিডিংয়ের কাজ করছিলাম। কাজের প্রয়োজনেই ওই প্রেসে যেতে হয়েছিল। সেই সুবাদেই জসিমের সঙ্গে পরিচয়।

জসিম বলল, সে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিল। শিমুলিয়া ফেরিঘাট থেকে পুলিশ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। যেতে দেয়নি।
ভর দুপুর। খাঁ খাঁ রোদ। সুর্য মাথায় নিয়ে জসিম নামের ছেলেটা আমাকে ফোন করেছে। আমি অসহায় বোধ করলাম। কীভাবে তাকে সাহায্য করা যায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
জসিম বলল, এমনিতেই ফোন করেছি ভাই। হঠাৎ আপনার কথা মনে পড়ল। কেমন আছেন আপনি?
আমার গলায় একদলা বিব্রতকর অনুভূতি জমে গেল। আমতা আমতা করে বললাম, ভালো। কিন্তু এরমধ্যে এভাবে আপনার বাড়ি যাওয়া কি জরুরি ছিল জসিম? (ছেলেটার বয়স আমার চেয়ে কম, তবু আপনি করেই বলি)।

কী বলেন ভাই! বাড়ি যাব না? তিন মাস হলো বাপ-মারে দেখি না, বউ বাচ্চারে দেখি না। নয় মাসের বাচ্চা রেখে ঢাকায় আসছিলাম। তারপর আর বাচ্চাটার মুখ দেখি নাই। বছরের একটা দিন ঈদ। সেটাও একলা একলা করব? আমি আপনার মতো পাষাণ না ভাই।
আমি তো পাষাণই। এ আর নতুন কি! মনে মনে বললাম। "এখন কী করবেন? কীভাবে যাবেন তাহলে?" জিজ্ঞেস করলাম তাকে।
দেখি কী করা যায়। হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরে যাই। মাছ ধরার ট্রলার মলার যদি পাই, একটাতে উঠে পড়ব।

ফোন রাখার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো ছুটে গিয়ে পুলিশদেরকে বলি, এই মানুষগুলোকে আটকাবেন না। এদেরকে যেতে দিন। ফেরি খুলে দিন। এদের থাকার ব্যবস্থা এ শহরে নেই। শহরটা আপনারা বানিয়ে রেখেছেন চোর, বাটপার, ঠক, জোচ্চোর, লুটেরা, বড়লোকদের জন্য। এখানে এই খেটে খাওয়া মানুষদের অবসর যাপনের জায়গা নেই। একটু দম ফেলার সুযোগ নেই। দুচোখ শীতল হয়, দেখার মতো এমন কোনো মুখ নেই। মরে গেলে কবরে একমুঠো মাটি দেবার কেউ নেই। এদেরকে যেতে দিন, প্লিজ।

জসিম শেষ পর্যন্ত যেতে পেরেছে কিনা জানি না। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে দেখলাম অনেক যানজট। শুনলাম, সাভারের কোথায় রাস্তা আটকে বেতন বোনাসের জন্য বিক্ষোভ করছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

আহারে! এদের শ্রমের উপর একটা দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। এদের শ্রমের উপর কত শিল্পপতির বিলাসী জীবন টিকে আছে। এদের রক্ত-ঘামের উপর কত বড়লোকের শান শওকত টিকে আছে। অথচ এদের পকেটেই কানাকড়ি নাই। আমার মনে পড়ল ‘হীরক রাজার দেশে’র সেই গান:

সোনার ফসল ফলায় যে, তার
দুইবেলা জোটে না আহার
হীরার খনির মজুর হয়েও কানাকড়ি নাই
ও ভাইরে... ও ভাই
কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।