করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৪৫৮০৫ ২৫২৩৩৫ ৪৮৮১
বিশ্বব্যাপী ৩০৩৭৫৩৯৭ ২২০৬০০১৬ ৯৫০৯৮৮
রাশেদ রহমান

রাশেদ রহমান

রাশেদ রহমানের পাঁচটি কবিতা

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২০

উন্মূল বাতাস

বাতাসের মূল কোথায়! সাকিন বায়বীয়, উন্মূল—
আমরা সঙ্গমে, জঙ্গমে শিশ্ন পাকাই, হাত পাকাই
আমরা মূলের খোঁজ করি না—
মানুষের আর কতটা শক্ত শেকড়
সামান্য ঝড়ঝাপটা এলেই তো সে উপড়ে পড়ে—
বাতাসের মতোই উন্মূল মানুষ!
অথচ দেখো— আমরা মূলের সন্ধান না করে
যুযুধানে ব্যস্ত উন্মূল বাতাসের সঙ্গে!

যুদ্ধজয়ী অর্জুন: চোখে জল

যুদ্ধজয়ী বীরের চোখেও নামে জল; প্লাবিত হয় রণভূমি
আমরা কুরুক্ষেত্রে দেখেছি বিজয়ী বীর অর্জুনের অশ্রুসজল চোখ
পরাজিত সেনানির মতো বিষাদমাখা নত মুখ
যুদ্ধের চতুর্দশ দিবস; পাণ্ডব-কৌরব-দলের
কত বীরের মস্তক যে ভূপাতিত তার লেখাজোখা নেই
কুরুক্ষেত্র যেন রক্তের সরোবর; হস্তিনাপুর কতদূর
সাঁঝবেলা অর্জুনের তীরবিদ্ধ জয়দ্রথ; যুদ্ধ গড়ালো রাতে
পাণ্ডবকুলের পরামর্শক কৃষ্ণ স্বয়ং; কৌরবদের মন্ত্রণাদাতা বৃদ্ধ দ্রোণ
রাত্রিবেলার যুদ্ধ; গর্দান কাটাই লক্ষ্য, কোনো রীতিনীতির বালাই নেই
কৌরব-দলের সেনাপতি মহাবীর কর্ণ; অর্জুন-বধে তার অস্ত্র একাঘ্নী বাণ
এই অগ্নিজাত মহামারণাস্ত্র ভূ-ভারতে মাত্র একটিই; দ্বিতীয়টি নেই
কৃষ্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন, অর্জুনকে রাখতে হবে এই বাণ-সীমানার বাইরে
রাতের যুদ্ধে কর্ণের প্রতাপ দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত জ্যেষ্ঠ-পাণ্ডব যুধিষ্ঠির
হস্তিনাপুরে বুঝি আর কোনোদিন পড়বে না পাণ্ডবকুলের পা
হিড়িম্বানন্দন ঘটোৎকচকে রণক্ষেত্রে পাঠালেন কৌশলী কৃষ্ণ
রাক্ষসী হিড়িম্বার গর্ভে জন্ম ভীমপুত্র মহাবীর ঘটোৎকচের
কত রথী-মহারথীর প্রাণহীন দেহ ধুলায় লুটাচ্ছে এই কুরুপ্রান্তরে
জগৎশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর অর্জুনের প্রাণ সংরক্ষণে রাক্ষসীপুত্রের মৃত্যুতে ক্ষতি কী
সফল কৃষ্ণের কৌশল; যুদ্ধজয়ী পাণ্ডবকুলের হাতে আবার কুরুবংশের শৌর্যদণ্ড
কিন্তু দেখো— অর্জুনের মস্তক নত, চোখে জল
তার বীরের মর্যাদা যে রক্ষিত ভাতুষ্পুত্র বালক ঘটোৎকচের প্রাণের বিনিময়ে...!

অনেকদিন পরের গল্প
 
অনেকদিন বৃষ্টি হয় না, বিদ্যুৎ চমকায় না আকাশে
বৃষ্টি ও বিদ্যুৎ, কেউ মানুক বা না-মানুক
ভালোবাসার আধার
বৃষ্টি নামে মেঘ বেয়ে; এই তো ভালোবাসা—
বিদ্যুৎ অগ্নি-সৃষ্টির উৎস; এটাও ভালোবাসা...!
অনেকদিন আমরা ঘরবন্দি, বোতলবন্দি ভূতের মতো
অনেকদিন চুম্বনরহিত আমাদের যাপিত-জীবন
আমরা এখন পরস্পরের শত্রু, কেউ কাউকে বিশ্বাস করি না...!
আমাদের গেরস্থালির দূর্বাঘাসে রচিত সব শর্ত ও চুক্তি এখন ছিন্নভিন্ন
আমরা বাবার ঔরস ও মায়ের গর্ভ অস্বীকার করতে দ্বিধা করি না
আমরা অদৃশ্য শত্রুর ভয়ে তটস্থ সর্বদা, হায়, আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই...!
অনেকদিন বৃষ্টি হয় না পৃথিবীতে, বিদ্যুৎ চমকায় না আকাশে
অনেকদিন যাবত সৃজিত হয় না কোনো কবির করোটিতে নন্দিত একটি কবিতা
কবিতার খাতা সন্ত্রস্ত হলে শব্দ-বাক্য-উপমা-চিত্রকল্পের খোঁজ মেলে না এই ভূ-ভারতে...!
হয়তো একদিন পৃথিবী ফিরে পারে তার অপরূপ সৌন্দর্য
হয়তো আবার একদিন ঘোর অন্ধকারেও প্রেমিক খুঁজে পাবে তার প্রেমিকার অপেক্ষমাণ ঠোঁট
হয়তো একদিন আবার সৃজিত হবে অনেকদিন পরের গল্প...!

অচল অস্ত্র

তুমি যে এতটা দুর্বল, ভীরু, নখদন্তহীন; তা আমাদের জানা ছিল না
এতদিন আমরা তোমাকে অযথাই যমের মতো ভয় করেছি
তোমার অগণিত মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র পরমাণু বোমা কোথায় রেখেছ
ঘরে ঘরে শত্রু ঢুকেছে— কচুকাটা করছে তোমার দেশের মানুষ—
তারপরও পেন্টাগন কেন ব্যবহার করছে না কোনো অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র...!
তোমার কথাই যেখানে সর্বোচ্চ আইন নিশ্ছিদ্র প্রাচীরঘেরা দেশে
উহানেই তোমার পারমাণবিক বোমা তৈরির সবচে বড় কারখানা
দেখো, শত্রুর বুকে কত সাহস— গোপনে ঢুকে পড়লো সেখানে
তোমার প্রশিক্ষিত গোয়েন্দাদের চোখে পড়লো না কেউ
অসহায়ের মতো রাজপথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তুমি দেখলে শবমিছিল...!
পৃথিবীর কোথাও ডুবতো না বৃটিশের সূর্য; বলে ইতিহাস
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা; তারাও নাকি ছিল ‘মহান-রাজা-রানীরর একান্ত অনুগত
এখনো এই নীল রক্তবাহীদের যুদ্ধজাহাজ-বোমারু বিমানের খ্যাতি বিশ্বজোড়া
অথচ দেখো, গাছমরা পাতার মতো অবিরাম ঝরে পড়ছে তারা
এখন বুঝি রানীর সূর্য পুরোটাই ডোবে...!
আমরা কত না শুনেছি রোম-সাম্রাজ্যের সৌর্য-বীর্যের কাহিনি
তোমাদেরও অভাব নেই সিপাইসান্ত্রী-সৈন্যসামন্ত-জীবাণু অস্ত্রের
অথচ শত্রুর মুখোমুখি শক্ত পায়ে তোমরা দাঁড়াতেই পারলে না
আমরা দেখলাম তোমার আতংকগ্রস্ত ঊর্ধ্বমুখি পরাজিত দুই হাত
অতঃপর সভ্যতার মুখে থুথু ছিটিয়ে মৃত মানুষেরা ঢুকলো গণকবরে...!
করডোবার জগৎবিখ্যাত ইতিহাস-ঐতিহ্য মানুষের মুখে মুখে
তোমাদের যুদ্ধকৌশলের কাছে হার মানে পৃথিবীর সব সেরা সমরবিদ
তোমরা রণতরীর ইস্পাতকঠিন পাহারা বসিয়েছ দেশের চারদিকে
এখন দেখো, তোমাদের সব কৌশলই কেমন বালকদের তীর ছোঁড়ার মতো ব্যর্থ
ক্ষুদে এক শত্রুর রোষানলে পুড়ে তোমরা ছারখার...!
তোমরা যারা এতদিন করেছ শক্তির বড়াই
কারুণের মতো নিজের ঘরে মজুত করেছ পৃথিবীর সব মারণাস্ত্র
কাকে মেরে কে খাবে— এই ছিল তোমাদের নিরন্তর প্রতিযোগ
এখন তোমাদের ঘরে ঘরে ঢুকেছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শত্রু
অথচ দেখো, তোমাদের সব অস্ত্রই এখন অচল; কোনো অস্ত্রই কোনো কাজে আসছে না...!

প্রণোদনার জল

আমি ভাগচাষি নই; চকে একটুকরো সোনা-ফলা জমি আছে
বিআর ২৯ ধান বুনেছি, দুধ-ধান দুলছে বাতাসে; পাকবে কদিন পর
আমার উঠোনবাড়ি ম-ম করবে নতুন ধানের সুগন্ধে
মাত্র কটি দিনের অপেক্ষা—
কিন্তু এখন বাড়িতে উনুন জ্বলে না; হাঁড়িতে চাল নেই...
আমি ভাগচাষি; নিজের জমি নেই
শহরবাসী জালাল চাচার গাঁয়ের চকে কয়েক খাদা ভুঁই
আমি তার দুবিঘার ছামটা চাষ করি নিজের মনে করে
আর কদিন গেলেই ঘরে উঠবে সোনার ধান—
কিন্তু এখন সইতে পারছি না ক্ষুধার জ্বালা...
বাজারের সবচে চালু মনোহারি দোকানটা আমার
দোকানের তাকে-তাকে রোদের মতো ঝলমল করে বাহারি সব শখের পণ্য
কীভাবে সকাল-দুপুর— সন্ধ্যা গত হয়ে রাত নামে ঠাহর পাই না
মধ্যরাতের ক্ষণকাল আগে দোকানে তালা ঝুলিয়ে ঘরে ফিরি—
এখন দোকান বন্ধ; খাচ্ছি চালান ভেঙে ভেঙে...
আমি পোলট্রি খামারি; বাড়ির পাশেই মুরগির খামার
দীর্ঘদিন বেকার বসে ছিলাম বাড়িতে; কাজ পাইনি কোথাও
শেষতক এনজিও থেকে ঋণ তুলে ডিম-মাংসের ব্যবসায় নেমেছি
এখন জলদরেও বিকায় না মাংস-ডিম; মড়ক খামারে—
ভিটেবাড়ি বিক্রি করেও ঋণ শোধ হবে না আমার...
মণ্ডলবাড়ির দশ বিঘা জমিতে সৃজিত আমার ফুলবাগান
নিজের জমি নেই; সাহস করে পরের জমি লিজ নিয়ে বাগান করেছি
গোলাপ রজনীগন্ধা জুঁই চামেলি জারবেরা— কত যে চোখ-জুড়ানো ফুলের কলহাসি বাগানে
আহারে! সব ফুল এখন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে; বিক্রিবাট্টা নেই—
ব্যাংকের ঋণ, মহাজনের দাদন, জমির লিজের টাকার বাড়ি কই...?
আমি সৌদি-প্রবাসী; ক্ষেতখোলা বিক্রি করে জেদ্দা গেছিলাম
ওদেরই এখন মরার দশা; জোর করে প্লেনে তুলে দিয়েছে
ফিরে এসেছি কপর্দকশূন্য হাতে, যেন পথের ভিক্ষুক আমি
কাঙালের মতো পথে-পথে ঘুরছি; বউ-বাচ্চার সামনে যাওয়ার সাহস নেই—
আর কি কখনো ফিরে পাব সুদিন...?
আমি সকাল-বিকাল টোল চালাই আমার পর্ণ কুটিরে
কিছু শিশু-কিশোর পড়তে আসে; আমাকে বলে পণ্ডিত মশাই
লোকের ঘরে-ঘরে গিয়েও পড়াই দুচারজন
এখন আমার টোল বন্ধ; কেউ পড়তে আসে না, বেতনও বন্ধ—
গৃহবন্দি পণ্ডিত-পরিবারের ভুখ নিবারণের কেউ নেই...
আমরা কেউ ভিক্ষুক নই; হতদরিদ্র নই; অন্নবস্ত্রের অভাব ছিল না কোনোদিন
আমাদের প্রাচুর্য হয়তো ছিল না; কিন্তু কখনোই আমরা চালসংকটে পড়িনি
স্ত্রীপুত্রকন্যাপরিজনের মুখে দু`বেলা দুমুঠো তুলে দিতে পেরেছি
এখন এই করোনাকালে আমরা আর পারছি না; আমরা ক্ষুৎপিপাসায় ভীষণ কাতর—
ঈশ্বরের একটু প্রণোদনার জল পেলে প্রাণে বেঁচে যাই...!