সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম থাকা সংকট নয়: সাজ্জাদ শরিফ

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৫, ২০২৬

সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম থাকাটা কোনো সংকটের ব্যাপার নয় বলে মন্তব্য করেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক সাজ্জাদ শরিফ। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পরীবাগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ‘জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

সংস্কৃতিবাংলা আয়োজিত বক্তৃতায় তিনি বলেন, “সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম থাকাটা কোনো সংকটের ব্যাপার নয়। ইউরোপের সংস্কৃতির মধ্যে এখনও ধর্ম একটা বড় ব্যাপার হয়ে আছে। শামুসর রাহমান ও আল মাহমুদকে আমরা যে জাতীয়বাদ ও ধর্ম দিয়ে দেখি এটা অনেক পরের নির্মাণ। এই দুজনেরই সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ এক।”

জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের বিবেচনায় আমাদের দুই প্রধান কবিকে বিবেচনার রাজনীতির সংকীর্ণ দিক উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের এবং বাংলার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন।

সাজ্জাদ শরিফ বলেন, “আমরা সবকিছুকে আমাদের পুরনো প্রজ্ঞা ও ধারণা দিয়ে বুঝতে চাই। অনেক সময় সেই বোঝার প্রকি্রিয়াটা ব্যর্থ হয়। জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের ফ্রেমে আমরা যেভাবে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে দেখি, সেটা ঠিক নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন— এই ধরনের ফ্রেম করাটা আমাদের দৈন্য। আমাদের প্রধান কবিদের নতুন উপলব্ধির আলোকে আবিষ্কার করা জরুরি।”

পরিচয়ের রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে সাজ্জাদ শরিফ বলেন, “মানুষ যখন পরিচয়ের রাজনীতিতে ঢুকে যায় তখন সে অন্য পরিচয়ের লোকদের একেবারে মেরে ফেলে। বৃহত্তর অর্থে এই দুই কবিও তখন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করছেন।”

সাজ্জাদ শরিফ বলেন, “আমরা এটা পছন্দ বা অপছন্দ করতে পারি, পরিচয়বাদী রাজনীতির সমালোচনা করার মতো নানা তাত্ত্বিক অস্ত্র এখন আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা। আমরা ইতিহাস বদলাতে পারি না।”

অনুষ্ঠানের সভাপতি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, “একজন মানুষ মুসলিম হতে পারে, বাঙালি হতে পারে, একজন মানুষের এ ধরনের অনেকগুলো পরিচয় থাকাটা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। এই সবগুলো পরিচয়কে ধারণ ও সামঞ্জস্য রাখতে হবে।”

জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস দুর্ভাগ্যজনক।”

শামসুর রহমান ও আল মাহমুদের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, “শামসুর রহমানকে একসময় আমরা বলতাম নাগরিক কবি আর আল মাহমুদকে গ্রামীণ কবি। ভাষার চমক না দেখিয়েও সুন্দর কবিতা লিখেছেন আল মাহমুদ। কবি নজরুল ইসলামের পর বাংলা কবিতায় ইসলামি শব্দ ব্যবহারে আল মাহমুদ সবচেয়ে সফল।”

আয়োজনের শুরুতে সূচনা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিবাংলার সচিব লেখক ও সাংবাদিক ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের কবিতার প্রধান দুই কবিকে নিয়ে যে ধরনের বিভাজন তৈরি করা হয়েছে তা ওই দুই কবিকে যেমন সংকীর্ণ রাজনৈতিক ধারণার মধ্যে বন্দি করা হয়েছে, তেমনই আমরাও তাতে বন্দি হয়ে গেছি। এ থেকে বেরিয়ে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে দুই কবিকে বিবেচনার মাধ্যমে একটা নতুন চেতনার জায়গায় পৌঁছানোর লক্ষ্যেই আমাদের এই আলোচনা।”

একক বক্তৃতার এই আয়োজনের শুরুতে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন সংস্কৃতিবাংলার আহ্বায়ক অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু। আয়োজনের শেষে ছিল সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রশ্নের উত্তর দেন সাজ্জাদ শরিফ ও খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। সবশেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন মাসউদ ইমরান মান্নু।