করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ২৪৬৬৭৪ ১৪১৭৫০ ৩২৬৭
বিশ্বব্যাপী ১৮৭২০৪৭৩ ১১৯৩৬৪১৭ ৭০৪৬৪৫

সমকামিতা: একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

শামসুর রহমান ওমর

প্রকাশিত : জুলাই ০৫, ২০২০

সম্প্রতি টেন মিনিটস স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত একজন সমকামিতাকে সমর্থন করে একটা পোস্ট দিয়েছেন। সেই সূত্র ধরে সমকামিতার পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই সমাকামিতা বৈধ। আবার অনেক দেশ জনমতের চাপের কারণে সমকামিতাকে বৈধ করার পথে হাঁটছে। সেই সব দেশে বেশ ঘটা করে সমাকামি জুটিদের বিয়ে হয়। পত্রিকার পাতায় তাদের নিয়ে আবেগঘন শিরোনাম হয়, স্টোরি হয়।

পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশেও অনেকে সমকামিতাকে বৈধ করার পক্ষে। ধর্মীয় বিধানকে পাশ কাটিয়ে এর স্বপক্ষে তারা নানা ধরনের যুক্তি দিচ্ছেন। ধর্ম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই, এমন তরুণ-তরুণীরা তাদের মিষ্টি মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে। নিজেদের উদার প্রমাণ করতে গিয়ে সমাকামিতাকে সমর্থন জানাচ্ছে। সমকামি জুটির প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করছে। সমকামিতার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে সাধারণত দুটো যুক্তি দেয়া হয়।

এক. সমকামিতা বিজ্ঞানসম্মত বিষয়। বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত মানুষের শরীরে থাকা জীন ও কিছু জীববৈশিষ্ট্য মানুষের সমকামি হবার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। কিছু মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। বিপরীত লিঙ্গ তাদেরকে খুব একটা টানে না। সমকামিতার সুযোগ না থাকা কিংবা বিপরীত লিঙ্গের সাথে তাদের জোর করে জোড়া বেঁধে দেয়া তাদের প্রতি অবিচার ও অন্যায়।

দুই. প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা থাকা উচিত। দুজন মানুষ তাদের সম্মতির ভিত্তিতে কি করবে না করবে তা একান্তই তাদের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত বিষয়। এর বিরোধিতা করার কোনো মানে হয় না। প্রত্যেকের অধিকার আছে, নিজের ইচ্ছার ভিত্তিতে জীবন যাপন করার। পছন্দমতো যে কোনো কিছু বেছে নেয়ার। আপাত দৃষ্টিতে দুটো যুক্তিকেই অত্যন্ত যথাযথ মনে হয়। কিন্তু বিষয়ের গভীরে গিয়ে ভাবলে বোঝা যায়, দুটো যুক্তিই অত্যন্ত দুর্বল।

সমকামিতার পক্ষের মানুষদের কাছে ধর্মের বাণী কিংবা বিধানের কোনো গুরুত্ব নেই। তাই আলোচনার স্বার্থে আপাতত ধর্মকে একপাশে সরিয়ে রাখছি। চলুন দেখা যাক, তাদের দেয়া দুটো যুক্তি আসলে কতটুকু গ্রহণযোগ্য।

বিজ্ঞান জগতে চিরন্তন ও সর্বজনগ্রাহ্য তত্ত্ব খুব কমই আছে। প্রায়ই দেখা যায়, নিত্যনতুন গবেষণার আলোকে প্রতিষ্ঠিত সব তত্ত্ব বাতিল হয়ে যায়। আজকের জনপ্রিয় তত্ত্বই কাল হয়ে যায় বাতিল, সেকেলে। সমাকামিতার পক্ষে বৈজ্ঞানিক যে থিওরির কথা বলা হয়, তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা আছে। তর্কের খাতিরে আমরা না হয় মেনে নিলাম, বিজ্ঞানের এই তত্ত্ব শতভাগ নির্ভুল। প্রশ্ন হলো, বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কিছু সঠিক প্রমাণ হলেই কি তা সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়?

একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষে আমরা একটা সাবজেক্ট পড়েছিলাম। ক্রিমিনোলজি। মানুষ কেন অপরাধ করে, কোন কোন বিষয় একজন মানুষের অপরাধী হবার পেছনে ভূমিকা রাখে, আর তার প্রতিকারই বা কি... ক্রিমনোলজির আলোচ্য বিষয়। একজন মানুষ অপরাধী হবার পেছনে অনেকগুলো বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। শারীরিক বৈশিষ্ট্য, জীনগত বৈশিষ্ট্য, তার বেড়ে ওঠা, পারিবারিক সামাজিক অবস্থা... অপরাধ সংঘটনের পেছনে এসব কিছুরই কমবেশি ভূমিকা আছে।

কিছু গবেষণায় দেখা যায়, সিরিয়াল কিলারদের অপরাধী হবার পেছনে তাদের জীনগত বৈশিষ্টেরও দায় আছে। নির্দিষ্ট কিছু জীনগত বৈশিষ্ট্য একজন মানুষকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি হতে সাহায্য করে। এখন জীনগত বৈশিষ্ট্যের দায় আছে বলে একজন সিরিয়াল কিলার কি ক্ষমা পেতে পারে? পৃথিবীর কোনো আইন-আদালত কি এই যুক্তিতে তাকে ক্ষমা করবে? বলবে, খুন করার জন্য ব্যক্তি নয় বরং তার জীন দায়ী? মানুষের সাথে অন্য চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হলো, মানুষের নীতি নৈতিকতা (ethics) ও বিবেক (conscience)। বিবেকের চর্চাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

বিজ্ঞান ও নৈতিকতা দুটো আলাদা বিষয়। সামাজিক রীতি নীতি, ধর্মীয় মুল্যবোধ, রাষ্ট্র কাঠামোর উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের বিবেক সমৃদ্ধ হয়, নীতি-নৈতিকতা গড়ে ওঠে। বিবেক ও নৈতিকতার উপর ভিত্তি করেই মানুষের গ্রহণ বর্জনের নীতি তৈরি হয়। বিজ্ঞান এক্ষেত্রে নিরুত্তর। বাবা-মায়ের সাথে কেন সৎ ব্যবহার করতে হবে, কেন অসৎ পন্থায় অর্থ উপার্জন করা অন্যায়... বিজ্ঞানের কাছে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রও নয়। তাই সমকামিতার পক্ষে বিজ্ঞানকে ঢাল বানাতে যাওয়া একেবারেই অযৌক্তিক।

সমকামিতার পক্ষে দ্বিতীয় যুক্তি হলো, ইচ্ছেঘুড়ির স্বাধীনতা। দুজন মানুষ সম্মতির ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তা করতে পারে, এতে রাষ্ট্র বা সমাজ বাধা দেবে কেন? কথাটা শুনতে ভালো। কিন্তু আসলেই কি দুজন মানুষের সম্মতি থাকলেই সব কিছু আমরা মেনে নেই? কয়েকটা উদাহরণ দেই।

ক. মাদকের বেচাকেনা ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতির ভিত্তিতেই হয়। সম্মতিই যদি সমাকামিতার পক্ষে যুক্তি হয়ে থাকে, সব দেশে মাদক নিষিদ্ধ করার হেতু কি? ক্রেতা মাদক সেবন করে সাময়িক আনন্দ উপভোগ করে। বিক্রেতারও কিছু পয়সা উপার্জন হয়। তাহলে মাদককে নিষিদ্ধ করা কি মাদকসেবীদের ব্যক্তি স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপ নয়? এটা কি তাদের প্রতি অবিচার নয়?

খ. সব সভ্য সমাজেই মা-বোনসহ খুব কাছের নারীদের সাথে কোনো পুরুষের এ ধরনের সম্পর্ক (Incest) গড়ে তোলাকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখা হয়। সাধারণত নিজের মাকে এমন চোখে দেখার কথা কোনো পুরুষ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এখন দুজন নারী পুরুষ যদি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে তাকে কি স্বীকৃতি দেয়া উচিত? টেন মিনিটস স্কুলের সেই সব বন্ধুরা কি বলেন? নিজের পরিবারে এমন কোনো সম্পর্ককে কি তারা মেনে নেবেন? তাদের সমর্থন যোগাবেন?

গ. ধরুন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই একজন লোক আরেকজনকে গুলি করে হত্যা করল। এটাকে কি আইনসিদ্ধ বলা যাবে? পৃথিবীর কোনো দেশ এভাবে হত্যা করাকে বৈধতা দেবে? প্রশ্ন হলো, কেন  দেবে না? এখানে তো পারস্পরিক সম্মতি ছিল।

ঘ. প্রাচীন হিন্দু সমাজে অনেক নারীরা সহমরণে যেত। স্বামী মারা গেলে স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় নিজেদের সপে দিত। এখনো যদি কোনো নারী একইভাবে সহমরণে যেতে চায়, সমকামি বন্ধুরা কি তাকে সমর্থন দেবে? একজন নারী স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিতে চায়, তাহলে রাষ্ট্র কেন তাকে বাধা দেবে?

ঙ. পৃথিবীর সব সমাজেই পরকীয়াকে খারাপ চোখে দেখা হয়। প্রশ্ন হলো, খারাপ চোখে দেখার কি আছে? যা হচ্ছে, তা তো দুজন নারী পুরুষের সম্মতিতেই হচ্ছে। এতে অন্যদের বাধা দেয়ার কিংবা একে খারাপ ভাবার কি আছে?

উদাহরণ দিতে থাকলে শেষ হবে না। এই সকল ক্ষেত্রে সমকামি বন্ধুরা কি সম্মতির যুক্তিতে সব কিছুকে বৈধতা দেয়ার পক্ষে? নাকি তাদের সম্মতি তত্ত্ব কেবলই যৌনতার সাথে সম্পর্কিত? শুধু যৌনতার বেলায় পারস্পরিক সম্মতি যে কোনো কাজকে বৈধ করতে পারে, অন্যক্ষেত্রে নয়... এই তত্ত্বেরই বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি? এর ফয়সালা দেবে কে?

তাহলে আমরা দেখতে পেলাম, সমাকামিতার পক্ষে দেয়া দুটো যুক্তিই অত্যন্ত দুর্বল। ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় আইন কানুনের কথা বাদই দিলাম। সাধারণ চিন্তা বুদ্ধিতেও এই দুই যুক্তি ধোপে টেকে না। মজার বিষয় হলো, এইসব মুক্তমনা দাবিদার সমকামি ও তাদের মিত্ররা নারীর হিজাব দেখলে আঁতকে ওঠে। একজন পুরুষের চারটে বিয়ের করার কথা শুনলে লাঠি হাতে তেড়ে ওঠে। এরাই ১৮ বছরের কম বয়সী দুজন নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যে খারাপ কিছু দেখেন না। কিন্তু তাদের বিয়ে করাকে বড্ড সেকেলে, প্রাচীনপন্থি ও অর্বাচীন কাজ বলে আখ্যা দেয়, বিদ্রুপ করে।

এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতির কোনো মুল্য তাদের কাছে নেই। তাহলে কি বোঝা গেল? পারস্পরিক সম্মতি তত্ত্বের উপরে সমকামি ও তাদের মিত্রদেরও খুব একটা আস্থা নেই। যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেকের চাইতে নিজেদের বিকৃত কামনা বাসনা চরিতার্থ করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। ধর্মের উপরে কারও আস্থা নাই থাকতে পারে। কিন্তু দ্বিচারিতা ও হিপোক্রেসি ধার্মিক অধার্মিক সব সমাজেই অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।