সংগ্রহনঃ গুগল

সংগ্রহনঃ গুগল

সাংবাদিকদের অপসাংবাদিকতা এবং অপসাংবাদিকদের সাংবাদিকতা

মোরশেদুল আলম মহব্বত

প্রকাশিত : অক্টোবর ২২, ২০১৯

অল্প কিছুদিন আগে আমার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়। তিনি অবশ্য এখন আর সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি তার সময়কালের (৮০ দশকের সময়) সাংবাদিকতার ধরন এবং সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে আলোকপাত করলেন। তার সাথে কথা শেষে আমি যখন তার দেখা সাংবাদিকতার সাথে আমার দেখা সাংবাদিকতার একটা তুলনা করার চেষ্টা করলাম, এটা বুঝতে আমার খুব সমস্যা হলো না যে, পার্থক্যটা বিশাল। । দেখা যায় প্রায় অনেক সাংবাদকিরেই নিজস্ব গাড়ি রয়ছে। এখন প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকদের এই আমূল অর্থনৈতিক পরিবর্তন কিভাবে আসলো? যদি বেতন বিবেচনায় নেয়া হয় তাহলে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাংবাদিকদের বেতন অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক কম। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অন্য অনেক পেশাজীবীর চেয়ে এখন অনেক সাংবাদিকদের জীবনভঙ্গি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এমন অর্থনৈতিক পরিবর্তন কি নৈতিকতার নিম্নমুখী অবস্থানের দিকে কোনও ইঙ্গিত দেয়? আর সাংবাদিকতার মানের অবস্থানটা কোথায় এখন?

নামকরা অনেক সাংবাদিক এখন অপসাংবাদিকতায় মেতে উঠেছেন। আবার দেখা যায়, অপসাংবাদিকরা সাংবাদিকতা করার মুখোশ পরে এই পেশার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। আসলে একটি দেশের সাংবাদিকতার গুণগত মান কতটুকু বা সাংবাদিকদের কার্যকলাপ সন্তোষজনক কিনা, তা বুঝতে হলে ওই দেশের পাঠক বা দর্শকদের মতামতের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। একটা সময় ছিল যখন সাংবাদিকদের থেকে মানুষ অনেক কিছু প্রত্যাশা করতো এবং এই পেশার সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের সম্মানের সহিত বিবেচনা করতো। কিন্তু এখন সময় বদলে গেছে, সাথে বদলেছে সাংবাদিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। অন্য অনেক পেশার মতো সাংবাদিকতাও বিভিন্ন কারণে বিভিন্নভাবে কলুষিত হয়েছে। আগের মতো আস্থা পাঠকদের আর নেইও।

সাংবাদিকদের প্রধান কাজ হলো, পাঠকদের/দর্শকদের সঠিক তথ্য দিয়ে ওই নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা। এটা না হলে তাকে হলুদ সাংবাদিকতা বলে। সাংবাদিকতার ধরন হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ বা ব্যক্তিনিরপেক্ষ। কিন্তু এখনকার সাংবাদিকতার অন্যতম লক্ষ্যণীয় উপাদান হলো, ব্যক্তিস্বার্থ। আর বস্তুনিষ্ঠতা এবং সাংবাদিকতার মধ্যে দূরত্ব এখন অনেক। সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা কতটুকু নষ্ট হয়েছে তা একটি বিষয় আমলে নিলে সহজেই বোঝা যায়। সেটা হলো, গোয়েন্দা সাংস্থাগুলোর সাথে সাংবাদিক বা মিডিয়া আউটলেটের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। এখন মাঝে মাঝে দেখা যায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত ফোনালাপ প্রকাশ করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফোনালাপ/কথোপকথনের রেকর্ডিং ঐসব মিডিয়া হাউস বা সাংবাদিকরা কোথা থেকে পায়? অবশ্যই সেগুলো কেউ বা কোনও প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে। এ বিষয়ে এটা মনে রাখা ভালো যে, যে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত ফোনালাপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জাতীয় গণমাধ্যমে ফাঁস করা খুব একটা উঁচু মানের সাংবাদিকতার স্বাক্ষর বহন করে না।

এই ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে কিছু সাংবাদিক অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ পেশার গুণগত মান ও নৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দেখা যায়, তারা দুই দিক থেকে স্বার্থ সুরক্ষার চেষ্টা করেন। চেষ্টা করেন, গণমাধ্যমের মালিক ও সরকারের কাছে অবস্থান ভালো রাখার। মালিকপক্ষের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেয়ার ব্যাপার তার থাকে। ফলে অনেক সাংবাদিক পাঠকের তথ্যের অধিকার পূরণের চেয়ে মালিকের স্বার্থ রক্ষার দিকে আগ্রহ দেখান বেশি। এভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের প্রক্রিয়া বিভিন্নভাবে ব্যহত ও প্রভাবিত হয়। সাংবাদিকতার মূল ধরণ ও সংজ্ঞা অনুসারে, গণমাধ্যমের সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা উচিত। অথচ তারা কি তা করছেন?

সাংবাদিকদের মধ্যে এখন পেশাদারিত্বের খুব অভাব। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ও ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে এখনকার সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বের এবং মানসিকতার বিস্তর ফারাক। আর পেশাদারিত্বের অভাবে আছে বলেই সাংবাদিকরাও বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে সাংবাদিকরা নিজেদেরকে নিজেদের শত্রুতে পরিণত করেছে এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের বিভাজন নিজেদের পেশাদারিত্বের অভাবের দিকেই ইঙ্গিত করে।

সাংবাদিকতার এই সংকটের অন্যতম কারণ হলো ‘সেন্সরশীপ’। যেহেতু সাংবাদিকরা দুই দিক থেকে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ‘সেন্সরশীপ বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও দুই দিক থেকেই আসে, সরকার ও মালিকপক্ষের থেকে। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে পত্রিকার সম্পাদক কে হবে এই ব্যাপারে মালিক পক্ষকে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়। অথচ তা হওয়া উচিত যোগ্যতার ভিত্তিতেই।

অনেক গণমাধ্যম আছে, বাধ্য হয়ে নিজেদের পেশাদারিত্বকে সংকোচিত করেছে। একটি দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়ছে মানে এই না যে, সে দেশের গণমাধ্যম অনেক স্বাধীন বা সে দেশের সাংবাদিকতার গুণগত মান ঊর্ধ্বমুখী। একই সাথে এটাও বুঝতে হবে, গণমাধ্যমেক অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষের আগ্রহ গণমাধ্যমে থেকে সরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি বাড়বে। ফলে নির্ভরশীলতাও বাড়বে। যেটা দেশের জন্য মোটেও শুভকর হবে না।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ জরুরি। সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। এখানে দ্বন্দ্ব চার পক্ষের মধ্যে। পাঠক/দর্শক, সাংবাদিক (ব্যক্তিস্বার্থ), মালিকপক্ষ ও সরকার। সাংবাদিকদের ঠিক করতে হবে, কোন পক্ষকে বেশি অগ্রাধিকার দেবেন। যদি উত্তরটা পাঠক/দর্শক হয়, তাহলেই সম্ভব সাংবাদিকতার হারানো গৌরব ও জৌলুস ফেরত পাওয়া।

লেখক: সাংবাদিক
 
লেখকের একান্ত মতামত, এই মতের সাথে ছাড়পত্র.কম কর্তৃপক্ষ কোনোভাবে দায়ী নয়।র কোনো ধরনের ও কোনো প্রকার দায়বদ্ধতা নেই।

ধারাবাহিক