করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৪৫৮০৫ ২৫২৩৩৫ ৪৮৮১
বিশ্বব্যাপী ৩০৩৭৫৩৯৭ ২২০৬০০১৬ ৯৫০৯৮৮
খনা

খনা

সেলিনা হোসেনের প্রবন্ধ ‘নারীর প্রজ্ঞা পুরুষের কুণ্ঠা’

প্রকাশিত : আগস্ট ২৫, ২০২০

পৃথিবীতে বসতি শুরু হয়েছিল নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টায়। সভ্যতার শুরুতেই নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক তফাত তৈরি হয়নি, মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার শ্রেয়োবোধটি ছিল প্রধান। কিন্তু সময় একরকম থাকেনি, গড়িয়েছে প্রবল ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে। নারী ছিটকে পড়েছে মানুষ নামের বিশেষণ থেকে, শুরু হয়েছে পুরুষের একতরফা কর্তৃত্ব। তারা এ কর্তৃত্ব গড়ে তোলে দুটো ভিত্তির ওপর। ধর্ম আর অর্থনীতি। এ দুটো ক্ষেত্র নারীকে প্রবলভাবে কোণঠাসা করে রেখেছে। এ দুটো এ সংস্কৃতির মধ্যে নারী সংক্রান্ত ভাবনার মৌল সত্য। এর পাশাপাশি নানা ধরনের ভিন্নমুখী তরঙ্গ এসে আঘাত করতে শুরু করেছে।

গণিতবিদ পিথাগোরাস একটি ভ্রাতৃসংঘ গঠন করেছিলেন। এ সংঘের প্রধান কাজ ছিল, গাণিতিক চিন্তাধারার তত্ত্বঘটিত অভিমত তৈরি করা। তারাই প্রথম আবিষ্কার করে, পৃথিবী চ্যাপ্টা নয়, গোলাকার। কোনো নারী এই ভ্রাতৃসংঘের সদস্য ছিল না। ড. কাজী মোতাহার হোসেন গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস বইতে উল্লেখ করেন, পিথাগোরিয়ানরা জোড়-বেজোড় সংখ্যার নামকরণ করেছিলেন। তারা জোড় সংখ্যাটি স্ত্রী আর বেজোড় সংখ্যাকে পুরুষ বলে মনে করত। তাদের ভ্রাতৃসংঘের সদস্য সকলেই পুরুষ ছিল। এজন্য স্বভাবতই বেজোড় সংখ্যাকে স্বর্গীয় আর জোড় সংখ্যাকে পার্থিব বলে বিবেচনা করা হতো। তাদের জোড় সংখ্যা বা নারীজাতি এর জন্যে কোনো প্রতিবাদ করেনি। অন্তত বেজোড় সংখ্যা যে পয়মন্ত তা স্বীকার করতে ওই যুগের নারী সমাজের দ্বিধা ছিল না।

বাংলার সংস্কৃতিতে জোড় সংখ্যা নারী বলে উল্লেখ পাওয়া যায় খনার বচনে। যেমন, বাণের পৃষ্ঠে বাণ/পেটের ছেলে গনে আন/নামে মাসে করে এক/সাতে হরে সন্তান দেখ/এক তিন তাকে বাণ/তবে নারী পুত্রবান/দুই চারি ছয়/অবশ্য তার কন্যা হয়/থাকিলে তার শূন্য সাত/হবে নারীর গর্ভপাত। এই বচনে দেখা যাচ্ছে জোড় সংখ্যা নারী। কিন্তু বেজোড় সংখ্যা পুরুষ দেখানো হলেও তা পয়মন্ত নয়। বলা হয়েছে, থাকিলে তার শূন্য সাত হবে নারীর গর্ভপাত।

খনা জ্যোতিষির দৃষ্টিকোণ থেকে জোড়-বেজোড় সংখ্যার ভালোমন্দ বিচার করেছেন। কিন্তু পিথাগোরিয়ানরা ধারণা থেকে নিজেদের স্বর্গেও প্রতিনিধি বানিয়েছে এবং এককভাবে স্বর্গীয় সুখলাভের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। গণিতের মতো জটিল শাস্ত্র যারা চর্চা করেছিলেন তারা দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করেছিলেন যে, পৃথিবী নারীর। নারীরা এটা সানন্দে স্বীকার করেছিল। এজন্য পিথাগোরিয়ানদের সময়ের নারীরা জোড় সংখ্যায় কোনো আপত্তি করেনি। আপত্তি করার যে কথা নয় সে সময়কে নিয়ে যারা বিশ্লেষণ করেছিলেন তারা নারীর মনোভাব বুঝতে চাননি। নারীদের বোঝার মতো পরিসর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ রাখেনি।

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেন রাজ্যের চেরনোবিলে সংঘটিত ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার পর এক মা বলেছিল, পুরুষরা জীবন কী তা বোঝে না। ওরা বোঝে শুধু যুদ্ধ আর শত্রুকে জয় করা। তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দীর্ঘ বছর ধরে বিপর্যস্ত করে রেখেছিল জাপানিদের জীবন। জন্মেছিল অসংখ্য বিকলাঙ্গ শিশু। আর চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর যে কথা শোনা যায় তা হিরোশিমার পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের চেয়ে আরো ভয়াবহ। বলা হয়, এই দুর্ঘটনায় বিস্ফোরিত নানা ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থেও মধ্যে শুধু প্লুটোনিয়ামের রেডিওঅ্যাকটিভিটি অর্ধেক কমতে সময় লাগবে ২৪,০০০ বছর। প্রকৃতি ও জীবনের বিরুদ্ধে পুরুষ যে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয় তার বিরুদ্ধে প্রকৃতির এই নির্মমতা, অন্য অর্থে প্রতিশোধ গ্রহণ। চেরনোবিলের দুর্ঘটনা যুদ্ধ ছিল না, ছিল যুদ্ধেও পূর্বপ্রস্তুতির সামগ্রী উৎপাদন। পুরুষ নিজের শ্রম ও মেধার এমন অপব্যবহার করে।

দেখা গেছে, কখনো কোনো নারী রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পুরুষতন্ত্রের কাছে বন্দি হন। তার প্রমাণ ভারতের ইন্দিরা গান্ধী। তার সময়ে ১৯৭৪ সালে ভারত পরমাণু শক্তির বিকাশ ঘটায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পরমাণু শক্তি হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ভারত। ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো প্রসঙ্গে ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় লেখেন, পারমাণবিক বোমা নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। এ প্রবন্ধে শান্তির পক্ষে, মানুষের পক্ষে তার আবেদন ছিল সংবেদনশীল। এক্ষেত্রে নারীর মেধা ও মননের সমন্বয় পুরুষতন্ত্রেও কাছে নতি স্বীকার করেনি।

প্রাচীন বাংলায় লীলাবতী নামে এক নারী ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে তার দখল ছিল অসামান্য। এই নারী চাষাবাদ, গার্হস্থ্য জীবন ও পশুপালন সম্পর্কে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা খনার বচন নামে সুপরিচিত। এই প্রজ্ঞার জন্যে তার জিহ্বা কেটে নেয়া হয় বলে তার নাম খনা। উড়িয়া ভাষায় খনা অর্থ বোবা। খনাকে নিয়ে উড়িয়া ভাষায় প্রচলিত কিংবদন্তি উল্লেখ করা দরকার মনে করছি। রাজা বিক্রমাদিত্যেও নবরত্নসভার অন্যতম জ্যোতির্বিদ ছিলেন পণ্ডিত বরাহ। তিনি ভুলবশত তার নবজাত সন্তানের অকাল মৃত্যুও কথা গণনা করেছিলেন। সেই সন্তানকে একটি বাকসে করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন, এভাবে সন্তানটি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। একই সময়ে আরেক রাজ্যের রাজাসহ অন্য লোকেরা বিদ্রোহী রাক্ষসদের হাতে নিহত হন। বেঁচে যায় শিশু লীলাবতী। এই শিশু রাক্ষসদের হাতে প্রতিপালিত হতে থাকে। নদীতে ভেসে আসা শিশুসহ বাকসোটি দ্বীপবাসী রাক্ষসদেও হাতে পড়ে। তারা দুজনকেই লালন-পালন করতে থাকে। বরাহের ছেলের নাম রাখা হয় মিহির। বড় হয়ে দুজনে জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী হন এবং গোপনে বিয়ে করেন। পরে দুজন ওই দ্বীপ থেকে পালানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন। তারা জ্যোতিষী গণনায় পালানোর নিরাপদ সময় বের করে সাগর পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন। লীলাবতী তার গণনায় মিহিরের পরিচয় জানতে পারেন, ভারতের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও উজ্জয়িনী নগরের রাজসভার পণ্ডিত বরাহ তার বাবা। দুজনে রাজসভায় গিয়ে তাদেও পরিচয় দিলে অতীতের ঘটনা স্মরণ কওে বরাহ পুত্র ও পুত্রবধূকে স্বীকার করে নেন।

বাংলা কিংবদন্তিতে খনা লঙ্কাদ্বীপের রাজকন্যা। শুভক্ষণে জন্ম হয়েছিল বলে তার নাম খনা রাখা হয়। লঙ্কাদ্বীপের অধিবাসী ছিল রাক্ষসরা। তারা একদিন খনার পিতামাতাকে হত্যা করে এবং খনাকে প্রতিপালন করে। একই সময়ে পণ্ডিত বরাহের ভাসিয়ে দেয়া কাঠের বাকসো থেকে দ্বীপবাসী রাক্ষরা মিহিরকে উদ্ধার করে। দুজনই রাক্ষসদের কাছে প্রতিপালিত হয়। বলা হয়, খনা বয়সে বড় ছিলেন এবং তিনিই মিহিরকে দেখাশুনা করতেন। পরে দুজন জ্যোতিষশাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। এরপরের গল্প উড়িয়া কিংবদন্তির মতোই। তবে পার্থক্য এই যে, বরাহ তাদের কথা বিশ্বাস করতে না চাইলে খনা একটি বচনের মাধ্যমে বরাহের গণনা ভুল প্রমাণ করেন।

খনার কিংবদন্তির উল্লেখ এই কারণে যে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পণ্ডিতরা যথাযথ মর্যাদায় খনার মূল্যায়ন করেনি। অথচ সমসাময়িককালে খনার মতো এমন গভীর জ্ঞানের অধিকারী কেউ আর ছিল না। ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে সুদীর্ঘকাল ধরে তার মতো এত সুপ্রিয় কেউ ছিল না। তারপরও নারী হয়ে জন্ম নেয়ার অপরাধেই ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রেও ইতিহাসে খনার নাম নেই। কেউ কেউ উল্লেখ করেন, খনা তার বচনগুলো সাধারণ মানুষের জন্যে রচনা করেছিলেন বলে অভিজাত পণ্ডিতেরা তাকে হেয় চোখে দেখত। কারণ অভিজাত পণ্ডিতেরা তাদের জ্ঞানচর্চাকে নিয়োজিত রেখেছিলেন রাজকীয় কার্যকলাপের সীমানায়।

অবাক হতে হয় যে, পরবর্তী সময়ের কোনো কোনো গবেষক খনাকে পুরুষ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। কারণ একজন নারীর মুখ থেকে এমন অসাধারণ বচন নিঃসৃত হয়েছে এটা স্বীকার করতে তাদের কুণ্ঠা ছিল।

নারী মানুষ নয়, যেন ভোগ্যপণ্
গণমাধ্যম নারীকে বিষয় হিসেবে নির্বাচন করে নানা রকম ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। নারী ও গণমাধ্যম যখন বিষয় হিসেবে কেউ নির্বাচন করে তখন ধরে নেয়া যায়, এ দুটি শব্দের মধ্যে এক অলিখিত ও অনির্দেশিত বিবেচনা আছে। এখানে দেখা জরুরি, ইতি ও নেতি নিজেদের জন্যে কতটা জায়গা করে নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, স্বাধীনতার পঁচিশ বছর ধরে সাধারণ মানুষের মনে নারী সংক্রান্ত ধারণা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসে সিংহভাগ ভূমিকা পালন করছে মুদ্রণ মাধ্যম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দেশের ষাটভাগ নিরক্ষর লোকের জন্যে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা অনেক বেশি কার্যকর। তারপরও দেখা গেছে এদুটো মাধ্যম ব্যাপক অর্থে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এর কারণ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। এ সংস্থা দুটোকে রাষ্ট্র কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বলে যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের মর্জিমাফিক সংস্থা দুটো পরিচালিত হয়। ফলে এদের নিজস্ব কোনো চরিত্র গড়ে ওঠার সুযোগ হয় না। সঙ্গত কারণে কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর কার্যকরী অনুষ্ঠানমালা তৈরি করে তাকে জনসাধারণের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে হয়। এ কারণে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম হওয়ার পরও নিছক বিনোদন পরিবেশন করা হয়ে ওঠে তার মুখ্য ভূমিকা, যা সাধারণ মানুষের মূল্যবোধের গুণগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে তেমন কাজে আসে না। এই সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা একটি জাতির মননের অগ্রগতিকে পিছিয়ে রাখে। ফলে নারী বিষয়ক ধারণায় যে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হলে একটি সুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্যে জীবনযাপন বিন্যস্ত হয়ে পারে সে বোধ থেকে সাধারণ মানুষ দূরে সরে যায়। নষ্ট হয় সামাজিক সুস্থতা, পারিবারিক হৃদ্যতা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যাই এখানে। ইলেক্ট্রিক মিডিয়া যে মানুষকে অনেক বেশি সচেতন করতে পারে, এই বোধটি তারা লালন করে না। এই মিডিয়া বিনোদন পরিবেশনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের প্রচারের মুখপত্র হয়। তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের ইলেক্ট্রিক মিডিয়া সংক্রান্ত স্বপ্নের অনেকটা এভাবে চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। রক্ষা প্রিন্টিং মিডিয়াকে নিয়ে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ধর্ষণের কারণে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত হয়েছিল। সে এক কঠিন সময় ছিল আমাদের জীবনে। অসংখ্য ধর্ষিত নারীর পুনর্বাসন এবং যুদ্ধশিশুর সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছিল তৎকালীন সরকারকে। ১৯৭২ সালে এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গঠন করা হয় নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন।

ইতোমধ্যে বীরাঙ্গনা শব্দটি থিতিয়ে গেছে। সামনে এগিয়ে এসেছে অন্য শব্দ। এখন উচ্চারিত হচ্ছে মহিলা মুক্তিযোদ্ধা। যারা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেছিল তারা ভেবেছিল, এই শব্দের ভেতর যে গৌরব আছে সে গৌরববোধ নারীকে একটি সম্মানজনকব অবস্থানে নিয়ে যাবে। তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এরচেয়ে বেশি কিছু হয়তো ভাবা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা এ ব্যাপারে উল্টো হয়ে গেছে। বীরাঙ্গনা শব্দ দিয়ে কতিপয় নারীকে চিহ্নিত করা না হলে এমন কোনো ক্ষতি হতো না। তারা অনায়াসে মিশে যেতে পারত অন্য নারীদের সঙ্গে। যুদ্ধ কিংবা সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাকৃতিক নিয়মে নারীকে খানিকটা বাড়তি মূল্য দিতে হয়। এই মূল্য যুদ্ধের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে কেন? এ রূপান্তরের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে প্রিন্টিং মিডিয়া। আমাদের সংস্কৃতিতে নারীসংক্রান্ত বিবেচনার এটি একটি বড় ধরনের অভিঘাত। একটি জনযুদ্ধ নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব হতে পারে না, এটি যেমন মৌলিক সত্য, তেমনি তারামন বিবি বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হয়ে এই ধারণাকে স্থায়িত্ব দিয়েছেন।

অধিকার মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদার স্বীকৃতি। যদি তাই হয়, তবে শুধু নারীর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন? যেখানে বঞ্চনা সেখানেই অধিকারের প্রশ্ন। আর নারীর বঞ্চনার শেকড়টি অনেক গভীরে প্রোথিত। কেননা এই সংস্কৃতির একটি লক্ষণীয় দিক হলো, নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে তাকে নারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। ফলে মৌল সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কারণে এই সংস্কৃতিতে নারীর প্রতি বিবেচনা অনেক ক্ষেত্রেই নেতিবাচক।

বাঙালির সংস্কৃতি ও নারী
আমাদের দেশে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ভাগ্যবানের বউ মরে আর অভাগার গরু মরে। কোনো কোনো পুরুষ এই প্রবাদে উৎফুল্ল হয়। ভুলে যায়, কত কুৎসিত এর অন্তর্নিহিত অর্থ। এই প্রবাদে নারী গরুর চেয়েও কম মূল্যবান। কেননা অভাগার স্ত্রী মরলে কিছু যায় আসে না, কিন্তু গরু মরলেই সে সর্বস্বান্ত হয়। এখানেই নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রশ্ন। সম্পর্ক যেখানে শরীরের তখন সেটা এমনই কদর্য। এই একই কারণে কোনো সুস্থ মননশীল মস্তিষ্ক যখন বলে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। সেই সঙ্গে মনমতো পতি যদি মেলে। তখন দেখা যায়, প্রথম পঙক্তি প্রায়ই উচ্চারিত হয় দ্বিতীয় পঙক্তি বাদ দিয়ে। এটাও সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ সম্পর্কের নেতিবাচক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে অনায়াসে নারীকে দাবিয়ে রাখার এক ধরনের মানসিক কৌশল। নারীকে সংসারের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি করে রাখার এমন নানাবিধ উপায় পুরুষ নিরন্তর খুঁজে ফিরছে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক