অমিতাভ পালের একগুচ্ছ কবিতা
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৮
বিজয় দিবস
কুয়াশার অবরোধে সকাল থেকে জিম্মি হয়ে ছিল আমাদের ঢাকা শহর
হঠাৎ একটা পাশ ছিন্ন করে একদল রোদের ফলা
ঢুকে পড়লো গেরিলাদের মতো
আর শুরু হলো অস্তিত্ব বিনাশকারী এক বিশাল যুদ্ধ
ঘণ্টাখানেকের সেই যুদ্ধ শেষ হতেই
আলো তাপ আর উচ্ছ্বাসে মাখামাখি হয়ে গেল শহরের সমস্ত জীবন
ঠিক এইভাবেই একদিন ষোলই ডিসেম্বর এসেছিল আমাদের দেশে
আমরা খুব মুক্তি ভালোবাসি
শুক্রবার
হাতুড়ি ঠকঠকিয়ে পেরেক মারছে মিস্তিরি
পেরেকগুলি যৌনসুখ পাচ্ছে
শীতকালীন ফ্যানের শরীরে শীতনিদ্রার সুখ
লোকটার সাথে জামাকাপড়গুলিও অফিসে যাচ্ছে
জানালা তার ঘর দেখাতে প্রচণ্ড উন্মুখ
রাস্তাগুলি শুয়ে থেকেও চলার মজা পাচ্ছে
শীতের সকাল- সবাই রোদের ভুখ
কুয়াশার জিহ্বা তাদের অনবরত চাটছে
সবাই যেন সারমেয় শিশুর মতো- কুঁকড়ানো লাজুক
অলিভ অয়েল সাহস দিয়ে যাচ্ছে
শুক্রবারের পৃথিবীটা ছুটির মজা পাচ্ছে
সংস্করণ
বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের মতো
অনেকখানি সম্পাদিত হয়ে গেছি আমি
জীবনের বিভিন্ন প্রহরে
আমার মৌলিক ঘোড়ার মুখে এখন লাগাম, পিঠে জিন
মুখে ফেনা তুলে আমি দৌড়াচ্ছি
জুয়াড়িভরা গ্যালারির সামনে দিয়ে
প্রতিযোগিতার রেসকোর্সে
আমাকে একটু জল দাও পিপাসার
আমার প্রথম সংস্করণে একটা রুক্ষ পৃথিবীর
ঝোঁপঝাড় পথ প্রান্তর ছিল
ছিল বুনো ঊদ্দাম দৌড়
দিকবিদিক ইচ্ছামাফিক
পক্ষীরাজ এখন পাখা ওড়াচ্ছে কার্টুন মুভিতে
পরস্পর
বাইশ চালের পর দাবা বোর্ডের মতো সাজানো আমাদের ঢাকা
বহুতল বাড়িগুলি বিভিন্ন ঘুঁটির মতো দখল করে আছে
নিজের নিজের জায়গা
আর বস্তিুগুলি যেন সৈন্যের দল- নির্দেশ পেলেই
ঝাঁপিয়ে পড়বে আক্রমণে
এগিয়ে যাবে কয়েক ঘর
এক ঘোরতর দাবাযুদ্ধে মেতে আছে আমাদের ঢাকা
এখন কিস্তিমাতের অপেক্ষা
ঘরে ঘরে আতশবাজি রেডি
আমরা সবাই এখন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ শত্রু
দুই দুর্বোধ্য শব্দ
অফিস ফেরতা বাসে তুমি আর আমি পাশাপাশি
সিটে বসে এলাম
আমরা ছিলাম দুটি অচেনা ভাষার দুই দূর্বোধ্য শব্দের মতো দূরে
শুধু আমাদের দুই কাঁধ মাঝেমাঝে পরস্পরকে
ছুঁয়ে দিচ্ছিল এমন একটা হাইফেনের মতো
যা তৈরি করতে পারে নতুন শব্দবন্ধ-
অর্থের নতুনতর মোহ
আর এভাবেই সারাটা রাস্তা আমরা পার হয়ে এলাম
নতুনের গন্ধে বিভোর হয়ে
তারপর যাত্রা শেষ হওয়ার পরে
আবার আমরা ফিরে গেলাম নিজের নিজের ভাষায়
আর আমাদের বাসা
দরজা খুলে দিল আমাদের নিজেদের ডিকশনারির
পবিত্র মলাটের মতো
এখন আমরা শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছি আমাদের পরিচিত অর্থে
পরিচিত উচ্চারণে
আমাদের কোথাও কোন সংশয় নেই
শুক্রাণুর গতি
শহর একটা বিরাট গর্ভাশয়ের মতো
আর আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটছি শুক্রাণুর গতিতে
পছন্দমাফিক ডিম্বাণুর খোঁজে
আমাদের লক্ষ্য একটা সম্ভাবনার ভ্রুণ
আমাদের ব্যর্থতাই বেশি
ওরা সব আলো ভালোবাসে
সূর্য উঠলেই বিছানায় ছটফট করে ওঠে আমার জীবন
সন্ধ্যায় ঘরে লাইট জ্বললে কিংবা
অন্ধকারে ম্যাচের কাঠি-
ওই একই ছটফটে ভাব আমি টের পাই
আমার কোষগুলির ভিতরে ভিতরে
আর স্পষ্ট বুঝতে পারি ওরা সব আলো ভালোবাসে























