অরিজিত কুণ্ডুর প্রেম ও দ্রোহের কবিতা
প্রকাশিত : মার্চ ২৮, ২০১৮
হারানো বসন্তের প্রেয়সীকে
Tom Odell এর গান Another love থেকে অনুপ্রাণিত
কথা ছিল শীতের রাতে পায়ের উপর চাদর টেনে দেবো,
কথা ছিল ঝড়ের রাতে সজোরে আঁকড়ে ধরবো,
কথা সেসব কিছুই রাখা হল না,
কারণ আজ সে কথা অন্য কাউকে দিয়েছি ।
গত বসন্তে তোমার জন্য শহর খুঁজে পলাশ এনেছিলাম,
এই বসন্তে সব শুকনো ম্রিয়মান ।
ভেবেছিলাম চাতক পাখির মত মেঘের দিকে চেয়ে
একফোঁটা বৃষ্টির অপেক্ষায়
এমন এক গান লিখবো
যা শুধু তুমি শুনবে।
কিন্তু আজ কেন জানি গান লিখছি অন্যকারও জন্য ।
একযুগ ধরে অন্ধকারের হাত ধরে
আমি আর তুমি শুধু দেখলাম
পথের ধারে রাজকীয় গণহত্যা ।
আমরা বদলের স্বপ্ন দেখে ব্রত নেয়াছিলাম
একে অপরের কমরেড হওয়ার ।
আজ দেখছি গণহত্যা হয়েই চলেছে
আর আমার পাশে অন্য কেউ ।
৭১ এর যুদ্ধে রাজাকারদের ধর্ষণ থেকে
৬৮ এর নকশালবাড়িতে পুলিশের হাত থেকে
তোমায় বাঁচাতে গিয়ে বারবার আহত ক্ষত আমি ।
আজ আর তোমার জন্য আহত হতে প্রস্তুত নই ।
রাত কত হলো ?
গভীর রাত ।
বন্ধুবরদের হারিয়ে নিঃসঙ্গ একাকী তুমি,
শুধু ঘরের দেওয়ালে মৃত শিশুর ছবি দেখছো,
আর আমি এতটাই ক্লান্ত
এই নিদ্রাহীন ধ্বংসমুখী মৃত্যুমুখী দিনে
তোমায় শেষ আলিঙ্গনটাও দিতে পারবো না
কারণ সে আলিঙ্গন বাঁচানো রয়েছে
সযত্নে অন্যকারও জন্য ।
আজ তোমার চারপাশ জুড়ে
নিঃসঙ্গতা , গণহত্যা, ধর্ষণ ,
আর আমার পাশে অন্যকারও শীতল দেহ ।
আমরা একই সুতোয় তারকাটা, নিরালম্ব , অবাস্তব,
আমরা একই শিকারে আহত, প্রেমহীন ।
এক যুগ অপেক্ষা শেষে
চারপাশে যৌনউৎসবের মাঝে,
মধ্যগগনে বিজ্ঞাপনের অশ্লীলতায়,
ধোঁয়া আর ধূলোর এই সার্কাসে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্য কাতর সে ।
উনবিংশ শতকের শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই
নাগরিক জঞ্জালে অস্তিত্বসংকট ।
কখনও নিয়েৎসে , কখনও এডওয়ার্ড মুংকের
ছবিতে প্রেম - অপ্রেম , বিশ্বাসের
উত্তর খুঁজে চলেছে
দুশো বছর বয়সী সেই যুবক ।
বৃষ্টির জন্য , একফোঁটা বৃষ্টির জন্য
তার হাহাকার ।
দুশো বছর ধরে সাইক্লোন আর ঝড়ের মাঝে
বৃষ্টিস্নাত হয়েছে মাত্র কয়েকবার ।
দুশো বছর বয়সী সেই যুবকের
আকাঙ্ক্ষায় এমন এক পৃথিবী আসবে
যেদিন মানুষ বৃষ্টিস্নাত হবে,
ভালোবাসতে শিখবে ।
গত কয়েকদিন অঝোড়ে বৃষ্টিস্নাত এই বৃদ্ধ যুবক ,
সূর্যালোকে স্নাত সে ।
কারণ তার আকাঙ্ক্ষার পৃথিবী
তার প্রেমিকার জঠরে
ভ্রূণের মত ধীরে ধীরে সযত্নে
জন্ম নিচ্ছে যে ।
প্রেমহীন নির্জনতা
বিনিদ্র রাত্রি,
হাতে জ্বলন্ত সিগারেট আর
মাথার উপর ঘ্যানঘ্যান করছে
মাঞ্জা দেওয়া সিলিং ফ্যান ।
এই কবিতা তোমার জন্য না,
বা তোমাদের জন্যও নয় ,
এই কবিতা আত্মানুসন্ধানের প্রকল্প ।
নারকেলের পাতায় পাখি শুয়ে নড়লে
অদ্ভূত শব্দ হয় আজ প্রথম জানলাম ।
প্রথম জানলাম তোমার বদলে নিজেকে খুঁজলে
আমি আলমুস্তাফা হয়ে যেতে পারি,
আলমিতরার মত বিচ্ছেদ সইতে তখন
তোমায় থাকতে হবে প্রস্তুত ।
আঙুল বাড়ালে নিসর্গ ছুঁতে পারি একাকী ,
স্বাদহীন সিগারেটের ঘ্রাণে ভুলে যেতে
প্রস্তুত হয়ে যেতে পারি যাবতীয় দেনা পাওনা ।
আঙুল তুমি না বাড়ালে
কোটরে তুমিই থাকবে বন্দী ।
একাকী আমি ছুটবো বিনিদ্র রজনী সন্ধানে ,
একাকী শুনে ফেলবো বিগ ব্যাঙের শব্দ ।
রাষ্ট্র আর আমি
ভীষণ গ্রীষ্মে যখন আমার ঘরে পাখা ঘোরে
এদেশে আত্মহত্যা করে চাষীরা
আর সেটা ফেসবুকে শেয়ার হয় ।
এদেশ মোচ্ছবের দেশ
এখানে ইতরেরা রাজা আর রাজারা পরাজিত ,
এখানে লোহা যোনি ভেদ করে যায় সাত মাসের শিশুর ,
এখানে তুঘলকি রাজার আদেশে
এটিএমে লাইন পরে
আর কুলি ঠেলা টানতে গিয়ে ভাবে -
সে কিছুই ভাবে না ।
তাকে ভাবার অধিকার দেয়নি রাষ্ট্র
সুযোগও দেয়নি
তাই সবাইকে মেনে নিতে হয় সব
মুখ বুজে, চোখ বুজে ।
এদেশে রাজকীয় মলে মলিন পোশাক দেখে
সকলে ট্যারা চোখ ,
এদেশে নাকি সব আছে কিছুর ,
বাকির তো দেখি অর্ধবিকশিত শরীর
পরাধীন মন ছাড়া কিছুই নেই ।
এদেশে প্রেমিকা আমার চাষীর খেয়াল রাখে ,
আর আমি বিয়ার গিলি ।
এদেশে মা আমার ভালো রান্না করে ,
কিন্তু শুধু রান্না করে ।
এদেশে আমার সন্তানকে সর্বত্র দেখি ,
মাঠে বাদারে বড়লোকের কোলে ,
স্বপ্ন দেখি তাদের গান দিয়ে ঘুম পারাবার ।
কিন্তু আমার উড়ো রোম্যান্টিকতার ঠাই নেই এদেশে ,
আজকাল তাই সন্তানের মুখ দেখলে ভাবি ,
"একটাই শখ আহ্লাদ রেখে যাবো সাথে
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে । "























