আকরাম খান

আকরাম খান

আকরাম খানের ৬ কবিতা

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

লেখনি তাহার

বিষণ্ণতার আতরে ভেজা কবিতাগুলা
কেন লেখা হয় রূপসী হাতের লেখায়!
ছিল কি স্মৃতি বিরামহীন বৃষ্টি ধারার
জলে ডোবা অসহনীয় সবুজের বঙ্গে
কালো মেঘের মতো মশার পাল
রক্তে ম্যালেরিয়া সাপের বিষ,
সূর্যাস্তে নদীর তীরজুড়ে জ্বলন্ত চিতা!

হয়তো পরদাদার হাতে ছেনা মাটি
শিল্প হয়ে উঠতো লাল উনুনে
প্লাবনে যেত নিভে,
আর পেটের আগুন ধিকিধিকি জ্বলত হারমাস।
বুলবুলির উদর ভরতো খাজনার ধানে
ঠগিরা কালির পায়ে রাখতো নরমুণ্ডু।
হুকায় টান দিয়ে কবি স্মৃতি-বিস্মৃতির ঢেউয়ে
ঝিমায় আর দোলে!

শৈশবে নাজুক কবির হাতে দোস্ত-বন্ধুরা কি ধরায় দিতো চড়ুইয়ের ভাজা ঠ্যাঙ,
শালিকের নরম গোশ দাঁত থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে
চলতো হুল্লোর, চড়ুইভাতি!
গলাকাটা হাঁস-মুরগি ছটফট করতে করতে মাটির দাওয়ায়
রক্ত ছিটাতো, চুনকাম দেয়ালে পড়তো পানের পিক।

মানিপ্লান্টের বারান্দায় মরচেধরা স্মৃতির দেরাজ খুলে
গোটা গোটা অক্ষরে এখন নোনা স্বাদ
কবির নিটোল শব্দ থেকে চুয়ে চুয়ে পড়ে
করুণা আর বিষাদ!

নজরুল স্মরণে

গণপ্রেমে যদি হয় গনোরিয়া
অনেক দেখিলাম ভাবিয়া
খাঁখাঁ দুপরে শূন্য কলসের চেয়ে ভালো
ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ দরিয়া!

একটি ধ্বংসাত্মক কবিতা

ডাঙায় মাছগুলা তড়পায়,
উল্টে যাওয়া কচ্ছপ মরার আগে
আঁকড়ে ধরে আকাশ বাঁচতে চায়,
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাঁটু ভেঙে মহিষ
পড়ে যায় আবার কাদা-জলে,
সারি সারি শকুনের পাশে আরেকটা শকুন
এসে বসে।
মরা নদীর উপরে উন্নয়নের সেতু দিয়ে চলে যায়
সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন।
মাঠ ভরা পাকা ধানে কারা যেন মই দেয়।
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে
খাট পালঙ্কের তোয়াক্কা না করে ঘাড়ে চড়ে বসে।
গু-গোবর সোনা হিশাবে চালাবার ধান্দায়
বেনিয়ারা গন্ধ শুঁকে ফেরে
মধ্যবিত্ত লাভের ছিটেফোটা পাওয়ার আশায়
ভেড়ার পালের মতো ভেড়ে।
লিকলিকে কৃষক বন্দুক কাঁধে তুলে, হাতে নেয় ছুরি
মেথরপট্টিতে চলছে চোলাই
তাতানো শিকে ছেঁদা হয় শুয়োরের ভুরি।
রাতভর রঙ্গ-তামাশা
কাচের বোতল ভাঙে, চলে ইয়ার্কি,
হৃদপিণ্ডে বিস্ফোরক, মগজে আমার
এনার্কি এনার্কি শুধু এনার্কি!

শব্দ শিকারি

প্রেমিকার ঠোঁটে শব্দের অলীক পুষ্প ফোটার প্রতীক্ষারত
হৃদস্পন্দন যেন সময় বেঁধে দেয়া বিস্ফোরক।
শব্দ! বেদুঈনের জলের থলেতে জমানো পানির চেয়ে
বেশি কাঙ্ক্ষিত,
যুদ্ধের ময়দানে স্নায়ু চাপে পীড়িত সৈনিকের সিগারটের চেয়েও অধিক মূল্যবান।
শব্দের মোহে বেহেস্তের শরাবন তহুরা দূরে ঠেলে
হাবিয়া দোজখের আগুনে ঝাঁপ দেয় কবি।
পতিতার যন্ত্রণা কাতর মুখ থেকে বের হওয়া
নৈঃশব্দ্যে চাপা পড়া শব্দ!

বড়শিতে অমোঘ শব্দ বেঁধার আশায়
ছিপ ফেলে বুক বাঁধি
নিস্তরঙ্গ নৈসর্গ থেকে শব্দ টেনে আনে
বন্য, রোদে ঝিলিক দেয়া আস্ত কবিতা!

কৃষ্ণ গহ্বর

কত নক্ষত্র কৃষ্ণ গহ্বরে হারিয়ে গেল
নূর হোসেন, বিশ্বজিৎ, ফেলানি, অভিজিৎ, কল্পনা, দীপন, সাগর-রুনি, তকী, নুসরাত, তনু
আরো কত নামি-বেনামি, অচ্ছুৎ, পতিত...
কৃষ্ণ গহ্বর কি পুরাণ?
পৌরাণিক তাহলে নক্ষত্রগুলো!
পুরাণের আদলে পৃথিবীতে আমরা
হুবুহু একটা বিস্মৃতির সাগর বানিয়েছি।
মানুষ, পশুপাখি, বৃক্ষ, নদী-নালা, অরণ্য, দেশ, মহাদেশ, ইতিহাস
বিস্মৃতির সেই অতলে চিরতরে তলিয়ে যায়।

সন্ধ্যারাতে কাব্যি করতে আর ভাল্লাগে না
বৃষ্টি হইলে জ্যাক ডেনিয়াল, শুকনা দিনে ব্ল্যাক লেভেল
আর কিছু না পাইলে কেরুতে আপত্তি নাই।
কাচের গ্লাসে বরফের টুকরা যুবতীর চুড়ির মতো
মিহি শব্দ তোলে
মন থেকে তেজস্ক্রিয় মেঘ কেটে যায়।
রাত বাড়ে, বাড়ে দূরাগত মাদলের ধ্বনি!
একটা শেষ পাহাড়, প্রান্তিক দ্বীপ অথবা কল্পনার
কোনো জঙ্গল থেকে বিরামহীন বেজে যায়।
ঢাকের তালে তালে বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে
হাতি, ঘোড়া, গণ্ডার, মানুষ-মানুষ আর মানুষ।
পদ ভারে রোজ হাসরের মতো জমিন কাঁপে,
চির ধরে, মাটি ফাঁক হয়!
পতনোন্মুখ পরাশক্তি প্রথম বিশ্ব,
প্রথম বিশ্বের বিষের ভাগার তৃতীয় বিশ্ব।

নেশায় পা লড়বড় করে, খাড়াইতে পারি না।
কেয়ামতের এই দিনে এখন কি করি? কই যাই?
মঙ্গল গ্রহেই যামুগা।
কিন্তু মঙ্গল গ্রহ, কুলাঙ্গারদের আগমনের আগাম বার্তায়
দুর্বার গতিতে ছুটছে কৃষ্ণ গহ্বরের দিকেই।

পেয়ারার সুবাস
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে

প্রজাপতির ডানা ছিড়ে
ফুলের পাপড়ি পিষে আঙুলে
নিরীহ সাব্যস্ত শৈশব, বেকসুর খালাসে
শিস বাজাতে বাজাতে ঘুরে বেড়ায় বন-বাদাড়।
সঙ্গমরত কুকুর পলকহীন দেখে! ছুঁড়ে মারে পাথর।

সুশীল রক্তে বিদ্রোহের বিউগল বাজায় বয়ঃসন্ধি,
ছদ্মবেশে পালানোর পরিকল্পনা নস্যাৎ করে
সেনাবাহিনীর বন্দুকের নলে প্রাপ্তবয়স্ক নজরবন্দি।

বৈধতার সনদ ঝুলিয়ে ময়মুরুব্বির নাকের ডগা দিয়ে
শোবার ঘরে ঢুকে ছিটকানি দেয় যৌবন।
শীৎকারের শব্দে একদল মহল্লাবাসী মেসওয়াক
করতে করতে বলে, নাওযুবিল্লাহ!
আরেকদল আস্তাগফিরুল্লাহ বলে হাত চাপা দেয়
পোলাপানের কানে।

জীর্ণ ঘোড়ায় সওয়ার শীর্ণ বার্ধক্যের পেয়ারার সুবাসে লাগে ঘোর!
কচি দাঁতের কামড়ের স্বপ্নে নওশা সাজে তখন সে বিভোর।