আবু তাহের সরফরাজের দরবেশি কবিতা
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৮
এবার বইমেলায় প্রকৃতি প্রকাশনী থেকে বের হচ্ছে আবু তাহের সরফরাজের কবিতার বই ‘দরবেশি কবিতা’। জালালুদ্দীন রুমির একটি কবিতা হচ্ছে: ‘যা দেখছ, বিশ্বে এর কোনও পণ্ডিতি প্রমাণ নেই; সে শুধু গোপন, গোপন আর গোপন।’ ওই গোপনকে আবু তাহের সরফরাজ নিজের ভেতর যেরকম চিনেছেন, সেরকমই আঁকতে চেষ্টা করেছেন দরবেশি কবিতায়। জীবন ও জগৎ নিয়ে কবির অনুধ্যানমূলক দর্শনকথা হচ্ছে দরবেশি কবিতা। বই থেকে ছয়টি কবিতা পাঠকদের উদ্দেশে:
বেগ
হাগু পেলে মানুষ চটপট তা সেরে নেয়
বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারে না
আর যদি চেপে সে রাখে তবে তার মলাশয় বিস্ফোরিত হবে
তাই বেঁচে থাকতে গেলে মানুষকে হাগতেই হয়
প্রতিমুহূর্তে মানুষের বোধের জগতে কত কত রঙছবি কত কলস্বর
স্মৃতির কুয়াশার মতো জড়িয়ে যাচ্ছে
স্মৃতি-বিস্মৃতির এইসব ছবি আর অচেনা গ্রহ থেকে
ভেসে আসা অস্ফুট স্বর
কেঁপে ওঠে থরো থর...
তারা প্রকাশ চায়
বেরিয়ে আসতে চায় ইথারলোকে
অনন্তে মিশে যেতে চায় মানুষের জগৎ দেখার অনুভূতি
বেগ তৈরি হয় বোধের জগতে, আর মানুষ
বাধ্য হয় বোধের প্রকাশ ঘটাতে
প্রকাশ ঘটে গেলে মানুষ আরাম পায়
নির্ভার লাগে নিজেকে তখন তার
মানুষের বোধ যা হেগে দেয় জগৎ-সংসারে তা শিল্প
জগতে শিল্পের প্রতিষ্ঠান আছে, আছেন অধ্যাপক
আছে সুবিধেবাদী সামাজিক মানুষ
বোধের গু নিয়ে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে
নানা কথাটথাও বলে মোটা মোটা বইতে
আলোচনা সভায়
এদিকে হেগেটেগে আমাদের শিল্পীবাবু
একা একা হাসছেন জগতের দিকে চেয়ে।
রে বৈকুণ্ঠ
আমরা তো সংসারই করতে চাই রে বৈকুণ্ঠ
আমরা তোর আঙুল থেকে ঝরে পড়া অমৃত
চেটেপুটে খেয়ে ফেলতে চাই, হজম করতে চাই, আর
রে বৈকুণ্ঠ আমাদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে শীতের রাত ছুটে গেলে
আমরা সংসারেই যাত্রা করতে চাই
আমরা জানিরে বৈকুণ্ঠ, সংসারে যে যে ফাঁদ পাতা আছে
সে সে ফাঁদ ঠিকমতো চিনে পেরিয়ে যেতে পারলেই
পৌঁছনো যায় জগত-সৃষ্টির সূত্রে, তাই বন্ধুবর বৈকুণ্ঠ আমার কথা শোনও
আমরা সংসার করব। আমাদের সংসারে থাকবে নারী, ছায়াবীথি আর
প্রজাপতির নানারঙা ডানা
আমাদের সংসারে রিপা খাতুনের আঁচল থেকে তার শরীরের থেকে
তার হাসি থেকে কী রকম সংসার সংসার গন্ধ ভেসে আসবে
আর তুই তো জানিস বৈকুণ্ঠ, সংসার জীবনের
এইসব গন্ধে পরমের গন্ধ মিলেমিশে রয়েছে, তাই
রে বৈকুণ্ঠ
আমরা সংসারই করব রে বৈকুণ্ঠ...
আলোর পাখি
তোমাকে আলোর দিকে ডেকে নিয়ে গেল যে পাখি
দ্যাখো, সে এখন মরে ঝুলে আছে আসমানে
গনগনে সূর্যের নিচে
জ্বলজ্বলে চাঁদের নিচে
সে ঝুলে আছে আর অদৃশ্য শক্তি থেকে
তাকে রক্ষা করছে এক লাখ ফেরেস্তা
তাদের ডানার বিস্তারে প্রথম আসমান ছায়াচ্ছন্ন
ছায়া ছায়া জগতে মানুষের ছায়া হয়ে তুমি এখন হাঁটছো
দূর-দূরান্তের গ্রহ থেকে শুনতে পাচ্ছ ইঙ্গিতবাহী ভাষা
হাঁটতে হাঁটতে তুমি গ্রহান্তরের ভাষা
নিজের ভাষায় অনুবাদ করে নিচ্ছ
আসমানে ঝুলছে তোমার পথপ্রদর্শক মৃত পাখির নিথর দেহ
তুমি তোমার পথপ্রদর্শকের গল্প বলো
বলো, তোমার অনুদিত ভাষায়
আমরা তা লিপিবদ্ধ করে রাখব আরেক কোনো গ্রহে
আরেক কোনো প্রাণিরাজ্যে
যখন ইসরাফিল ফুৎকার দেবে শিঙায়, আর
ধ্বংস হয়ে যাবে এ বিশ্বসৃষ্টি আরেক কোনো বিশ্বসৃষ্টির জন্য!
পৃথিবীর সব অক্ষর মৃত
পৃথিবীর সব অক্ষর মৃত, আর মৃত গোধূলির রঙ
গাছের পাতার সবুজ, নরম রোদের বিকেল কিংবা
শিশুদের খেলার মাঠ অক্ষরের ভেতর দিয়ে
আমাদের অনুভূতি হয়ে ওঠে, আর তখন যে রঙ আমরা দেখি
যা দেখি, তাই কেবল জীবিত
এভাবে সবকিছুই, পৃথিবীর যা যা রঙ
যা যা বস্তু, সবকিছু
ছেঁকে তুলে আনে অক্ষর
যা তুলে আনে
অক্ষরের বাইরে তা কত মূল্যহীন
মানুষ পৌঁছতে পারে না তার সৌন্দর্যে
যদিও চোখের সামনে সব, সব কিছুই
তবু আড়াল রাখে চোখ
যতটা পারে তুলে আনে অক্ষর আমাদের অনুভূতি রাঙিয়ে
এরপর পড়ে থাকে রঙ ও বস্তুর ফসিল
মানুষের কাছে যা মৃত
এভাবে মৃত হয়ে ওঠে অক্ষর, আর
জীবিত হয়ে বেঁচে থাকে যা এসেছিল অক্ষরের ভেতর দিয়ে, তা
মানুষের অনুভূতির অসীমত্বে।
কলম
সৃষ্টিজগতের প্রথম সৃষ্টি কলম
কার্যত সে ছিল নিঃসঙ্গ, আর তাই
একা একা অনন্তের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনে যেত
হঠাৎ নির্দেশ এলো, লেখো
সাড়া এলো কলমের দেহে
সে তবে নিরালম্ব নয়, আরও কেউ আছে
সে শুধু প্রকাশের বাহন
আর তাই কলম লিখতে শুরু করল
যা লেখে, তা আত্মলিপি
কিন্তু কার?
কলম তা জানে না
তবে সে লিখতে থাকে
যেন সে, সে নয়, আর কেউ
লিখতে লিখতে কলম দ্যাখে,
সে যেখান থেকে শুরু করেছিল
আবার সেখানেই ফিরে এসেছে
কলম আবারো একা হয়ে গেল
আর নিঃসঙ্গ, অনন্ত শূন্যতায় একা থেকে আরো একা
তারপর সৃষ্টি হলো প্রাণ
তারপর আর আর সব
বস্তুত সৃষ্টিজগৎ আদি-অনন্ত বিস্তৃত নাট্যমঞ্চ
যার প্রতিটি চরিত্র আগে থেকেই লিখিত।























