আমার ওকাম্পো: রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ
চয়ন খায়রুল হাবিবপ্রকাশিত : আগস্ট ০৭, ২০১৮
নিচের কবিতাগুলা ‘ডৌল: জুলেখার জেরাপর্ব’ ২০১৫ সংগ্রহে গ্রন্থবদ্ধ
১.
হেই বুড়ামিয়া দিনরাত কী এত আঁকিবুঁকি
উমধা বেতালা আমরা তোর আঁকনের ঢঙ্গে
জলপাই গেরুয়া কাচ্চির পাক্কির খাকিয়াল রঙ্গে
কুন্দনের জংগে মোরা নিজেদের তরাই
তরঙ্গভঙ্গে গর্জে বোলপুরের খোয়াই
বেগানা রাক্ষসী এক লালজবার রক্তে রঙ্গিলা
খোক্কস খোক্কসি সব বেহদ্দ উদিলা
হেই বুড়ামিয়া, কী এত আঁকিবুঁকি
চুমাচুমির আশ্লেষে হুদাহুদির ফাঁকি
দেহ থেকে অদেহায় মাংস থেকে মাটিতে
রাখে মূর্তি, মারে কে...
বুকে গেড়ে বসেছিল
সাজোয়ালদের ধুকপুক সাওঁতালদের ধিতাং ধিতাং
রান্নাঘর-শ্রেণির ভাওতা পাকঘর-শ্রেণি বুঝে ফেলেছিল কড়ায় গণ্ডায়
রবীন্দ্রনাথ, তুই আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মাদ্রাসা, গুরুকুলা, বলিউড, হলিউড
সুদাসলে মিটানো পরানের পরম আমনের খুঁদ
২.
ঝাপটাবাজেরা ছিলইতো ওইখানে
এবং আবহাওয়া দফতরের লোমনাশকতার কারণে
আকাশে মেঘ করলে বৃষ্টি হতেও পারে আবার নাও পারে
নির্ভর করে রবীন্দ্র জয়ন্তীর দমকা কতটা অস্থির
কতটা মোমনাশক কতটা লোম বিনাশক
কতটা বর্ষা বিধায়ক
কারণ, রবীন্দ্রসঙ্গীতে থাকলেও
তেরছা কাটা প্রকৃতির কোনোই বিশুদ্ধ স্বরলিপি নাই
খোয়াইয়ের ভরাকোটালে কাঁকড়া আর কিকড়িদের নির্বাণ-নগ্ন-দেহ
হীরক সূত্রের সঙ্কেতে কেঁপেছিল অজন্তা ইলোরা খাজুরাহ
কিন্তু-নির্বাণ-কিন্তু-নিরাকার-কিন্তু-নির্মোহ...
এসবকে পিছে ফেলে বর্তমানের মরাকোটালে
কাঁকড়া আর কিকড়িদের সমস্বর: হতে চাই কেহ ফিরে চাই দেহ
৩.
চারুলতাদের চকিত-চাহনিতে ভুলভাল জোনাকিগুলা কাঁপে
মোম-মাখানো আকাশের হাজারো লোমকূপে
কাঁপে নিশ্বাস: ভাঙে রেলগাড়ি:
উহু কুহু উহুদের কুসুমে পদ্মাপারের কুঠিবাড়ি
ভাঙে যা কিছু ভাঙার কথা
সুলুক সন্ধানি শুল্কতরুর আবেশে
দাবাগ্নির দাগনি-ধ্বনি শেষে
ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া সাবালক সাবালিকা মোমের উদ্দামে
জঙ্গলজুড়ে জঙ্গলপোড়া কামের কোরক
সাঁওতাল আদিবাসে অনাদি উল্লাসের স্মারক
ভূতগ্রস্থ এক অ্যালবাট্রসের অডানায় ভর
রামকিঙ্কর শেখে নাই বর্ণাশ্রমের মানা
দারুচিনি দ্বিপে অচল বেহেস্ত দোজখের জরিমানা
৪.
সঞ্চয়িতার অক্ষরগুলাকে হিশাব-বিজ্ঞানের তালাচাবিতে ঘুরায়ে পেঁচায়ে
কেউ বলে ধুপকাঠি কেউ বলে আগরবাতি
খুবই রহস্যঘন আবার সহজ জনগণমন এই রবীন্দ্র-রসায়নাগার
শুধু ছুটি শুধুই ছুটি সারা বছর মাস দিন বার
সেই যজ্ঞে ঢুকিলে পরে আর সব যজ্ঞ ফিকা
বানভাসি ভাতের হাঁড়িতে কামেল-ক্যামেলিয়ার কুহেলিকা
বৈষ্ণব পদাবলি গলে ভানুসিঙ্ঘের-বালক-ফসিলে
দম দেয়া পুরাণ-পুতুলার নাচন
মেলার দাদুর মাথায় খনি শ্রমিকের হেলমেট
রক্তকরবীর ভরপেট সংরাগে দাঁত ফোকলা গৌতম
পরান জুড়িয়া গীতাঞ্জলী মালাইকারি কুলফিতে সিক্ত
বাদবাকি বর্ণাশ্রম শারিয়া-প্রথা বাহ্য এবং অতিরিক্ত
পুরাণ-পুতলার কষ্টকে বোলনা মামুলি
ন্যায্য মজুরির যে আবহমান দাবি
গীতাঞ্জলী তার অধ্যাত্ম আর মেরুদণ্ডের মজ্জায় রক্তকরবী
৫.
মনে পড়ে আম্মা প্রতি শবে-বরাতে টাকা দিতো
তারাবাতি মোমবাতি কিনতে
চঞ্চল দুই বালক বালিকা দৌড়ে দৌড়ে
বাংলো বাড়ির গোল বারান্দা জুড়ে
জ্বালাচ্ছে শত শত ছোট ছোট আঙুল সাইজ মোমবাতি
ছোট ছোট ভ্রূণ ছোট ছোট হারানো জরায়ু
আম্মা বোলতো, শবে বরাতে রবীন্দ্র-পাঠে বাড়ে হায়াত দরাজ আয়ু
শুনতে পেয়েই য্যানো লোকটা খসালো অনন্তকালের অন্তরে
মৌসুমের বাইরে মহাশূন্যের নির্ভার রিতু:
রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরায়ত নিভু-নোভা
লোকটার নাম কখনো `অবাক` কখনো `আভা`
হাতবদল হতে হতে কারখানা থেকে পাইকারে বা মুদি ঘরে
কখনো বাসরে কখনো কবরে
ঠোঁট পোড়ালো সে শীতে ফাটা ঠোঁটের আশ্লেষে
ভালোবেসে নিজের দহন
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ আস্ফালন
৬.
মহর্ষি হলেও হাঁচি কাঁশি ও হিসি-যন্ত্রে
লোকটা অন্যান্যদের মতোই সাধারণ ছিল
বা কখনো কখনো অসাধারণভাবে সচল
কারণ দৈনন্দিনের টুকটাক খতিয়ান শেষে
রোজরাতে ঘুমাতে যাবার আগে
লোকটা পান করত এক গেলাস চিরতা
এভাবেই শুদ্ধ হতো যাকে কেউ কেউ বলে
সালতামামির নামতা কেউ বা পরমাত্মার হালখাতা
পদ্মার পাঠশালায়: নদীপারের ঘাটলাগুলাতে
ঘরকন্নাদের ভেজা ভেজা বাটলাগুলোর সাথে
বাসন কোসনের সম্পর্কের নিরিখে
লোকটা বুঝে নিত জোয়ার ও ভাটার সাথে
তামা পিতল ও অন্যান্য ধাতবের আত্মীয়তা
যত বেশি ধোয়া পাখলা তত বেশি ভাল ফসল উঠেছে
আর নদিপারের জটলা যত কম মহাজনের গদি তত সরগরম:
জোয়ারের ঘুঙুর বাঁধা পড়েছে ভাটার টানে
ঘাটের কথাগুলো ভাঙে নীরবতার প্রাচীন ইস্কুল
৭.
পরমেশ্বরী গোলাপি মসুরির ডালে রসুন পেঁয়াজ তেলে বাঘার দেয়া
জয়পুরের হাওয়া মহলে ঝাঝরিকাটা জানলাগুলা সয়
রাজস্থানি বালু সেচা গরম নিশ্বাস
ক্ষুধিত পাষাণের চরম-মানবিক হাসফাস
ওয়াশিং মেশিনে ঢোকে করতোয়া কপোতাক্ষ গোদাবরী ডাকাতিয়া
শীতলক্ষ্যা আড়িয়াল খা` রূপ নারানের স্বপ্রাণ উদ্ধত জল
ফারাক্কায় থমকায় চমকায় শান্তি নিকেতনের সম্পন্ন সাবান
ওয়াশিং মেশিন থেকে বেরোয় একের পর এক রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত গীতবিতান
গীতবিতান জ্বলে পেট্রলে পাতালে: চাঙ্খার পুলের জরুরি হাসপাতালে
এমনকি হরতালে যখন মানুষেরা আর আর মানুষদের অ্যাম্বুলেন্সে পোড়ায়
গীতবিতান তখনো চলে খোঁড়ায় খোঁড়ায়
পরম-মানবিক-ফসিলে পেট্রল ওড়ে, পেট্রল পোড়ে
বিশাল বেলুনের ভর গীতবিতান ভাসে মেঘের ওপর
৮.
তবুতো পরীবিবি কাদম্বরী দেবীর প্রলাপে
ভরা বর্ষার ঠিক আগে আগে কাঠফাটা কদমের সম্ভোগে
হঠাৎই বন্য
হননের অনন্য বানে ডোবা নাইয়রিদের
নক্সিকাথায়: দিন আনা দিন খাওয়া
সদরঘাটের ভারবাহী গুদারায়:
হায় বিবি পরি হায় দেবী কাদম্বরী
হায় মরণের নীল নীল নীল বাংলাদেশের হংসী
মরণের নীল নীল তুই আমদের যাপিত জীবনের যমজ অধ্যাপিকা
কুস্তাকুস্তি ধস্তাধস্তির ডাকনাম চয়ন উল্লাসকে ডাকি চয়নিকা
চয়নকে কষে বেঁধে ওর দেহে যত ফুটাফাটা আছে
তার সবগুলা দিয়ে চয়নিকা রবীন্দ্রনাথ ভরে দিলো
তারপর চয়নের হাড় মাংস পচা সারে
বসরাই গোলাপ ফোটালো চয়নেরই ছায়ায়
তারপর, চয়নের দেহ কোথায়, চয়নের ছায়া কোথায়
এইসব বলে চয়নিকা পাড়া মাত করে চ্যাচায়:
হায় হায় হায় পাজি বুড়ামিয়াটার বেআক্কেল কারসাজি
যা ছিল শ্রাবণ-ভেজা-লাল তাই এখন গরম লালশাক-ভাজি
৯.
ওরা কি কথা বলতে পারে
এরকম প্রশ্ন মনে মনে ভেবে চোখ খুলতেই
যেখানে ওদের গলা থাকবার কথা
সেখানে ও দেখতে পেল কোমড়ার লতা
ওরা কি দেখতে পায়
এরকমটা ভেবে চোখের জায়গায়
ও দেখতে পেল চাকভাঙা মোম
গলতে গলতে কোমড়া ফুলের সাথে
মৌমাছিদের হুলাহুলি দোস্তালির পর
মাঁচার ওপর আসন পেতে
নিজের রসে ও রসবতী হতে থাকলো
যেখানে আসলে কোমড়াদের বসবার কথা
একে অন্যের কোলে
কোমড়াদের কোরকিরাই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রোতা
গান শুনতে শুনতে আনাজপাতি সব হয়ে উঠলো নীল
নীল গড়ালো লালে লাল গড়ালো সবুজে
লাল সবুজ নিলেরা নিজেদের খোসা ছাড়িয়ে
লবণ মরিচ মাখিয়ে একে অন্যকে খেতে থাকলো
আর পরস্পরের পাকস্থলীতে হজম হতে হতে
ভাবতে থাকলো ঘটবার কথা ছিল অন্যরকম
উলটাপালটা খাওয়াখাওয়িতে
ঘটে গেল যাকে আমরা বলি মন্দের ভালো
লাল সবুজ নীল মিশায়েই তৈরি বিদ্যুতের সাদা আলো
১০.
ওই তঞ্চংগ্যা ওই পাহাড়ভাঙা হিদল ওই আচিক অসীম
দেহছিন্ন অঙ্গগুলা বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সঙ্কেতে
আঁকড়ে খামচে ধরে আছে প্রত্যঙ্গগুলা
যা নাই তা ধরে রাখা অসম্ভব জেনেও
হাতগুলোর পাশে দস্তানা বেয়নেট এবং গিটার
পাগুলোর পাশে বুট মহুয়ার শিকড় ও ঘুঙুর
চোখের গর্তে মোমবাতি আর থেঁতলানো মৌচাক
পাঁজরের ভাঙা হাড়ে গীতবিতান কিন্তু তখনো টানটান:
দেহ সংলগ্ন অদেহা গানগুলো দেহকে আলতো আদরে পৌঁছে দিয়েছিল
সম্ভ্রমের সীমানায়
ওইটুকুই ও করতে পারত
ওইটুকুই ও করেছিল মগ্ন চেতনার সমাদরে
১৯৭১ এর চোখবাঁধা নিরীহ কবিতাগুলো
সামরিক-যন্ত্রদানবটার সাথে যাবতীয় মোকাবেলা শেষে
মরণ অব্দি যার যা চোখ কান নাক অবশিষ্ট ছিল
তা নিজেরাই উপড়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল
অন্ধ শরীরগুলা যখন আবার জীবনে ফিরে এলো
তখন বুঝলো যে, চোখ বাঁধবার কোনো প্রয়োজন ছিল না
কারণ চোখের জায়গাতে চোখ কখনোই ছিল না
পিছমোড়া চোখবাঁধা চোখগুলার শত্রুদের এবং মিত্রদের কেউ কেউ
চোখের বালি উপন্যাসটা পড়েছিল
জুন-জুলাই ২০১৪, ব্রিটানি























