চিত্রকর্ম: মনিরুল ইসলাম

চিত্রকর্ম: মনিরুল ইসলাম

আহমেদ মুজিবের একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : আগস্ট ২২, ২০১৮

বোল্ড ক. আর র.

কালিঝুলি মাখা কবিতা সাজাই,
তোমাকে পাই না কেন?
তাই এমন দিনে বোল্ড ক.-এর পর তিন এম দিই।
এমন দিনে তাইলে বোল্ড র. এর আগে তিন এম।

গণ্ডগোলে বুক কী যে,
তলপেটের আর্দ্রতায় সীসার ছয় এম বীজ পুঁতে
বসে থাকি আরামে,
মাটির ওপরে, পা দোলানোর কথা ভাবি;
সাফ করি নখ, ধুলো দূরে যাও।

অজানা রক্ত খাইয়ে, মাটি খুঁড়ে মূলে
খুঁড়ি হিম জলে মৃত প্রতিবিম্ব ভুলে,
একি রক্তমাখা!

ছয় এম ফাঁকা কবিতা সাজাই
এই দুর্গত হাতে,
এমন দিনে ক. আর র.
সাঁতার শিখেনি রাতে।

কালো

সবাই তো কালো।
কি লিখবো কবিতা,
কোথায়?
শাদা কালি দিয়ে?
লাল রক্ত?
মনে-মনে? কিন্তু আমি যে সব কালোগুলো গেড়ে!

এই যে শাদা পাতা
শাদা নয় ও মোটেই-
গাঢ় আর ঠান্ডা, আর নিচ কালো,
কালোর ভিতরে একপিন্ড জমাটই কালো।

যে মেঘ উড়ে যায়
যে গোল চাঁদ রুটি ফেলে রাতে
যে ঢেউ তীরে এসে ফেনার পাপড়ি ধরে
বাড়ি খায় ঘুরে,
তার কিছু দূরে ক্ষেতের পর ক্ষেত, আনমনা জ্বলাঘাস,
কালো বাতাস আর নদী কালো,
কান্না কালো,
লবণে ডুবে কালো যে আছে, তাও কালো।

কালো বাতাসে
লাল পিঁপড়ের তাপ পেলে এখন তো মরা শিশুটি খেলছে।

খেলছে সুন্দর
কালো মায়ের কালো স্তন ঘিরে
মরা আর মতে শিশুটি
দেখছো না ছোট্ট আঙুল নাড়ছে একে-একে
দেখছো না চিৎকার ঝরছে ছোট্ট ফুসফুসে
দেখছো না হামাগুড়ি দিচ্ছে বুকে
দেখছো না একটু একটু নড়ছে সজুব দুটি ঘাসের মতন,
আর চোখ খুলছে ঠিক ভোরের ভিতরে গিয়ে
সে
সে
সে।

সে
মরা আর মৃত শিশুটি
কালো কাদায়
চলতি কালো; কিন্তু
আমি খুঁজি তাকে
হে গলিত সোমবার।

পোকা

চারটি নিবিড় পোকাকে দেখি, আর তাদের জীবন;
হালকা অথচ কত দামি তারা তাদেরই শক্ত ভিতরে।

ঘুণ খেয়ে যায় কাঠ আমৃত্যু,
ও সবুজ ময়দা তুমি তেলাপোকার
প্রতিরাত পায় টের এইসব
যখন ঠাণ্ডা আর কালো,
আর পিঁপড়ে আর উঁই বাড়ায় আবাস ধীরে
                 বইয়ের ভিতরে
                             নতুন লালায় যতো।

বাঁধাই করা বই উঁইয়ের সুদিন
বাঁধাইকারের আঙুল তেলাপোকার দেওভোগ
আর নতুন কাঠের কেসে ঘুণপোকার হল্লা
আর সব পিঁপড়ের।

সরসর সরে যায় ঠাণ্ডা হাওয়া রাতের ওপর দিয়ে
জ্বলে তারা থোকাথোকা যদি বাতি নিভে যায় একসাথে।
তখন প্রেসে, ও পোকার দল
তোমরা কি ভাবো–
একটি লোহার মেশিন কত হালকা
                         যদি বন্ধ থাকে ছাপায়।

কম্পিউটার যখন নগরে ঢুকলো

১.
তুমি সবুজ ধান ছেড়েছো, চেপেছো হলুদ গোলার চিন্তা মনে।
ঐ দূরে, এখনো, তোমার হাত দেখায় একটি ক্ষেতের চিনচিনে ব্যথা,
                    ছায়ায়-ছায়ায় সোনার গম আরো মাড়াইয়ের শব্দ।
তুমি নদীর ছেলে কৃষক, যার ঢেউগুলি একটু-একটু জীবনের
                                                   কাদাকে ছোঁয়।
অথচ তুমি এখন কম্পোজিটর, কাঠের টুলে, চরম আঙুলে ব্যস্ত।
হররোজ মেশিনে-গড়া সীসার পলিতে শব্দের হ্রদনদী বানাও। আর
যন্ত্রের ঝিঁঝি ডাকে, ঐখানে কানে, ধাতুর রানে,
যখন শাদা সুতোয় বাঁধা সোজা দুই তীর ফের ঘিরে চলে।

তুমি কম্পোজিটর,
চকচকে গ্রামের বাঁধানো ছবি একরাগে ভেঙে এসেছো বলে
ঐ কাচের উষ্ণ টুকরোটি তুমি, আর ভাঙা টুকরোর কাঁপা আলো
                                                   শুধু হিম নগরের।
যা থেকে জানতে গ্রামের অর্থই, জানতে না নব-নগরের ফাঁদ
কিভাবে প্রকাশ্যে ভাসে একখানি প্লাস্টিকের চাঁদ!

লাল ডোবায় গ্রামীণ মন পুঁতে আসলে?
তাই কি একটি শাপলাফুল ফুটে আছে, শাদা আর হলুদে,
                                         থরেথরে খোলা জলে!
ধরি, সকালের রোদে তা ডোবার নাকফুল হলো, ভালো, ধরি ভালো,
কিন্তু কোনো ভ্রমরই কি তাতে থাকলো,
কপালে জোড়া পা রাখলো?

২.
প্রজাপতি-ম্যাচ জ্বেলে বিকেলে দেখলো ও
      গরমকালের তারারা উঠেছে।
      তারপর মন দিয়ে আবেদন জানালো
হে লেখক, হে দুখী কবি, ময়লা রেণু-শূন্য আকাশের
       ঐ অসংখ্য তারাদের মতো
              অনেক পাতার
          একটি উপন্যাস দাও...
       অনেক পঙ্ক্তির একটি কবিতা চাই...
সারারাত ধরে আমরা কম্পোজ করবো আর গাইবো গান রাঙা ফুসফুসে।
        কাল চলে যাচ্ছি, কাল, গ্রামের দিকে ধুলো উড়িয়ে,
                শহরের শেষ সীসা নেড়ে।

প্রেসের কবিতা

প্রেসের মধ্যদিয়ে সময় ঐ যায়, সময়।
রাত তুমি যাও?

আহা, কী সুন্দর হাওয়া
টেবিলের মধ্যখান দিয়ে যায়
আর আমার চুল ছোঁয়
আর আমার কান্না ছোঁয়।
কয়েকটি কান্না যায় গড়িয়ে, ঐ।
কোথায়?

দিনগুলো কোথায় যাও? প্রেসে?
শাদা আমাকে নাও না।
রঙ, প্রেসে যাও?
কাগজ, কালো ক্যালেন্ডার, টাকা তুমি,
পাইপের জল, আর ঐ তিতাসের চাপ
কই যাও, কোথায়,
        কোন প্রেসে?

শুধু আমাকে নাও না,
ও বিদ্যুৎ
ও নতুন মিটার
শুধু আমাকে নাও না।

ক্ষমা

বারবার তোমাকে ক্ষমা করি আমি।
যদি কালো পাথরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম
তাহলে সে ছুটতো ঝর্ণার মতো শাদা কণ্ঠস্বরে।
যদি কুকুরকে ছুঁয়ে দিত আমার দু’হাত
তাহলে সে হতো মানুষের ছোটো ভাই।
ক্ষমা করার জন্য আকাশের দিকে তাকালে
মুক্তি পেত খুচরা পয়সার মতো ঝমঝমে তারা;
প্যারেক থেকে প্যাঁচ খুলে মশারির চিকন দড়ি কালসাপ হয়ে
ফিরে যেত মায়েরই কোলে।
বারবার ক্ষমা করি আমি তোমাকে, বার-বার।

মহেশ

আহ, মহেশের চামড়ার ওপরে কী চিরস্থায়ী আঁধার!
পশ্চাৎপদের ভিতর থেকে বেরুনো যে-লেজ সে-ও তৈরি লম্বা অন্ধকারে।

রাতের আকাশে দুটি তারা যেন মহেশের খোলা চোখ,
হঠাৎ উড়ে গেল তাকে ফেলে,
গাবতলী থেকে আসা বিশ্বরোডে
একটি ট্রাকের দু’টি হেডলাইট জ্বলজ্বল করে,
মনে হয় ঐ মহেশের হারানো দু’টি চোখে,
দু’ফোঁটা জল চোখ মেলে তাকিয়েছে বিশাল আকাশে।

 

খুব বেশি প্রিয়

প্রকৃতি-মাখানো নেচার পাশে রেখে কেটে পড়বো পৃথিবীর থেকে গোল পৃথিবীতে,
স্মৃতিতে গোপন ক্ষত নিয়ে রাতের আকাশে সুকষ্টে জায়গা করে
গভীর পর্যবেক্ষণে এক মধুর কাগুজে তারা হ’য়ে ফুটব
তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ও পাপড়ি মেলে মিষ্টি ম্যানহোলের চেয়ে থাকা
খুব চিনি কিন্তু অচেনা ভঙ্গিতে
দু’দিকে চলে যাওয়া বারবার, প্রতিদিন, বহু বছর।

তবু খুব গোপনে কেটে পড়তে ফুটছে ত্যক্ত-বিরক্ত মন নিয়ে
ভোমরার জন্য সার্থক ধুতরাফুল তোমাদের বাগানে!
প্রবাহিত চারকোনা পাসপোর্টের প্রয়োজন নেই গোরকর্তৃপক্ষ
ঘাসের মতো সবুজ কভারে মুড়ে দিও উঁচু এপিটাফ:
হেঁটে হেঁটে ‘একটি পিঁপড়েও কেমন পরাজিত করে আমাকে’
আনন্দিত হলে তরুণ কবির এরকম পঙ্ক্তি ছিল খুব বেশি প্রিয়।

বল্লারও বাসা বানাতে বহুদিন লাগে

মিষ্টিই উড়েউড়ে যাচ্ছে কালো মাছির কাছে
আকাশের তারা শিশুর হাতে ছড়ানো দইয়ের ফোঁটা
কিন্তু লোডশেডিংয়ে তার মিষ্টি আলো এসে পড়ে গরম বিছানায়।

সড়ককে বুকে নিয়ে চলে যায় লম্বা সহাসড়ক বহুদূর,
শাদা ঝর্ণার বীজের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে মোটা এক নদী,
ঘোষণা দিতে দিতে নামছে গোল শাদা ডিব্বা থেকে কিছু স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না,

মাঠের ভিতরে থাকে ক্ষেত,
ক্ষেতের ভেতরে থাকে ধানগাছ,
থেমে থাকা মহাসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ধানগাছে সবুজ সমুদ্র নড়ে।
গাছের সবুজ পাতাগুলি বিন্যস্ত বলে
দূরে কোথাও একটি মৌচাক থেকে ভ্রমরের ফোঁটাফোঁটা
গুঞ্জন ভেসে আসছে;
ভ্রমরের গুঞ্জন থেকে বেরিয়ে আসছে বিষাক্ত বল্লার গুঞ্জন,
বল্লা, আহ বল্লা, তোমরা জানো না
বিষাক্ত বল্লারও বাসা বানাতে বহুদিন লাগে!

আহমেদ মুজিবের ‘প্রেসের কবিতা’ কাব্যগ্রন্থ ও ‘পত্তর’ সাহিত্য পত্রিকা থেকে পুনঃমুদ্রিত