চিত্রকর্ম: মনিরুল ইসলাম
আহমেদ মুজিবের কাব্যনাটক ‘গর্ত’
প্রকাশিত : আগস্ট ২২, ২০১৮
(বাংলা একাডেমি, ২১ শের বইমেলা, ইউলিসিসের সম্মুখ, ৩টি কিশোর, কিশোরদের ওপরে কিশোরদের কালো মুখ।)
১ম কিশোর: ঝরাপাতার মতো ছুঁড়েছি শিশুর পোশাক,
অন্ধকার চকির বুকে ছোটো ছোটো হাতপা এবং
ভেজা খাতার মেঘের মতো নিস্প্রাণ দেহ দলেদলে,
আর ফুল হয়ে ফুটেছি বহুদিন লাল টবের কিনারে;
যাই হোক, এগুলো নয় প্রশ্ন - যদি দাড়াঁই নতুন গর্তের সামনে
যদি পাই নতুন গর্তের রেখা, তা’হলে।
২য় কিশোর: বড়ো ভাই আছে নাকি নতুন গর্ত ? গত বর্ষায় বৃষ্টিতে চড়ে আসা?
৩য় কিশোর: এই ফাল্গুনের সকালে হিম ইশবগুল ঝরে।
আমার হাতে জেগেছে কোদালের আহাজারি,
সারা রাত উঠোন যাকে শিশির দিয়েছে হানা
সারা রাত টুকরির হলুদ বুকেও কতো !
এখন গর্ত পেলেই কোদাল পাবে তাপ
এখন গর্ত পেলেই টুকরির বুকে কালো মাটির চাপ।
১ম কিশোর: গর্ত আছে, গর্ত? স্বাভাবিক কালো আঁধারে ভরা
ছায়াময় আবার চকচকে, কিংবা স্ফুটোন্মুখ
এক হাত গভীর যন্ত্রণায়?
২য় কিশোর : সামান্য টাকায় বুজে দেবো ভাই তাকে
দেখো তোমাকে ক্রেতারা বাসবে বহু ভালো।
যদি চাও তাতে মাঠের শুষ্ক অনুভুতির স্বাদ
ঘাস-বোনা মাটি ছড়িয়ে তার ওপর ঢালবো চিকন হাওয়া
তোমাকে ক্রেতারা বাসবে বহু ভালো।
দেখো, সোনার সুড়কিতে বসবে তোমার ক্রেতার পা।
৩য় কিশোর: সাতটি গর্তের মৃত্যু হলো ভোরে
যেভাবে আমরা ইঁদুরকে মারি ষড়যন্ত্রে
যেভাবে আমরা কাগজের সৈন্যকে মৃত্যুর জন্য কাগজের গুলি করি
যেভাবে আমরা ছোট্র দেশকে আত্মসাৎ করি লোভে
সেভাবে, সেভাবে, সচেতন সাতটি গর্তের মৃত্যু হলো আজ।
১ম কিশোর: আহা, সাতটি গর্ত গোলাপফুলের মতো।
পুঁজি কেড়ে নিলো দেহ থেকে তাদের আত্মা।
একটি মা-গর্তও ছিলো, তারপাশে ঘুমুচ্ছিলো ছয়মাসের শিশু-গর্ত
কলেজে যেতে রাফখাতা হাতে যুবক-গর্ত ছিলো তৈরি
একটি গর্তের কন্ঠস্বরে জেগে উঠছিলো বিষফোঁড়া
অপরিচিত আর অচেনা একটি গর্তমুখ বুঝি
এসেছিলো কোনো এক গৃহ হতে
মোলায়েম ও নরোম ছিলো যে মেয়ে।
২য় কিশোর: কি করবো ? আমরা তো চাই না কারোর অদৃশ্য মৃত্যু
বুলেট, ডায়রিয়া, আততায়ীর মারফত কিংবা ক্যান্সার
কিংবা না-খেতে-খেতে এই সমগ্র জীবন।
কি করবো ? ঝরাপাতা গুনি দিনে - তবুও যে লাগে ক্ষিদে।
৩য় কিশোর: আর সময় দেয়া যাবে না কোনোমতে
পার্কে বাড়ছে ফুল, ধীরে-ধীরে সবুজ গাছের ছায়া
জিজ্ঞেস করো, লাগবে কি না দেশি কোদালের ধারালো অনুমতি
আছে কি নতুন গর্ত ইউলিসিসে ?
২য় কিশোর: দেরি হলে ঘুমাবে টুকরি
তার কালো ছায়া;
কোপাতে-কোপাতে হাঁটবে না কোদালখানি
জানো না পৃথিবীতে মাটি না-কাটলে কোদালেরা মরে যায়।
১ম কিশোর: তাই তো! অনেকক্ষণ ধ`রে আমার দুটো হাত
কেন হচ্ছে না ময়লা ?
ও ঝুরঝুরে মাটি
ও কাঁকরে পাওয়া মৃত্তিকা
আমার হাত দিয়ে
ময়লা দেবে কাগজের দশ টাকা !
২য় কিশোর: দেখো, দেখো, চটে-চটে পেরেক গাঁথছে হাতুরির সংযোগ
পার্ক ছুঁয়ে আসা বাতাসে মিলায় শব্দ তারই।
ডাকবো ? ডাকবো কি ক`রে ? তার পেরেকে খেয়েছে মন
মন: পেরেকের মতো ভারি
তার চেয়ে আমরাই খঁজে নিই গর্ত, হোক অল্প
কিন্তু হীরার মতো উজ্জ্বল।
১ম কিশোর: যদি পাই ভাসাভাসা
কিংবা তার মুখ ছোট্রো
ডাকবোই, চলে যাক বেলা।
(থুতু ফেলতে বাবলু তাকাবে সামনে। দুতিনটা ঘামের ফোঁটা দাঁড়াবে না আর তার গালে।)
বাবলু: কি চাস ?
সূর্যের মতো সকালে হয়েছিস হাজির ?
উলঙ্গ, তোদের করে না শীত - শীতের পাউডারে ?
কোরাস: আমরা গান গাই, গর্ত বোজার দল
আমরা গান গাই, গর্ত বোজা হলে।
আমরা ঘাসের নিচ থেকে মাটি তুলে আনি বারবার
আমরা ভাঙি কেঁচোর ভালোবাসা, যা নয় ফুরোবার;
আর কখনো আমরা লাল কোন্নাকে করি না ভয়।
বাবলু: দেখা তোদের অভিজ্ঞতার স্তুপ,
প্রমাণ কর নিমেষে গর্ত বোজার দক্ষতা।
তা ছাড়া আছে কি কোনো গর্ত, আমাদের দোকানে ? দেখতে হবে।
আছে কি কোনো গর্ত, আমার জীবনে ? দেখতে হবে।
যেখানে কোনোদিন আঁধার সরিয়ে ঢোকেনি শাদা আলো
আর বিশুদ্ধ বাতাস আর ভালো মানুষের ক্ষমতাবান দৃষ্টি !
কিন্তু আর একটি বিশাল গর্ত তো রয়েছে এই পৃথিবীর বুক চিরে !
প্রতিদিন যার কালো গর্ত থেকে নেমে আসে রাত।
১ম কিশোর: গর্ত হলেই হলো, বুজলে পাবো টাকা,
তখন সবার কালো মুখে ফুটবে শাদা আলো।
পেরেক: এসছে গর্ত বোজার দল, তিন সদস্যের আর কোদাল-টুকরির,
আমার মতো ওরা কি খুব শক্ত ?
সমানে-সমানে হাতুরির নিচে,
পারবে কি ওরা পেরেক ভেবে কালো মাথা দিতে ?
আহারে খাওয়ার জন্য ঘুরছে শিশুরা
আহারে শস্যদানার জন্য হারাচ্ছে কঠিন মেরুদন্ড।
হাতুরি: পেরেক, কি বলছো মনে-মনে ? কেন এই ফিসফাস ?
কিছু শুনছি অধর কিছু কোথায় মিলায় গিয়ে ?
ওদের জন্য তোমার কান্না
আমাকে ভেজায়,
তাই পিচ্ছিল পথে দিই জোর বাড়ি।
ওরা যেন পায় বড়ো গর্ত।
বাঁশ: আমি হলুদ বাঁশ, বাঁেশর শুটকি
কিংবা ঘুণপোকাদের খাদ্য।
যেখান থেকে কেটেছে আমার হাঁটু
সেখানেই আমার প্রাণ তাজা রয়ে গেছে আজো।
পাতারা নেই
কঞ্চিরা নেই
নেই সাথে ছেলেপুলে
পেরেক-হাতুরি বন্ধ করো সব, বন্ধ করো কাজ।
আহা তিনটি শাদা ফুল, কথা বলছে রাজপথে -
তোমরা বন্ধ করো কাজ, বন্ধ করো সব।
দোয়া করো, ওরা যেন পায় একটি ভালো গর্ত।
বাবলু: গলায় আবার এসেছে জীবন-নিঙড়ে থুতু।
কেন আসে, কোত্থেকে আসে এই লাল কফ-থুতু ?
আমি ফেলবো না তাকে মাটির মঞ্চে
গিলে খাবো সূর্য যেভাবে খায় পৃথিবীর ভোরবেলা।
১ম কিশোর: মনে হয় ও নয় রিয়েল দোকানদার
এখনো বোঝেনি ব্যবসার গূঢ় ভাষা;
তা না হলে গর্তের খবর জাগে না কেন মনে ?
১ম কিশোর: প্যান্টের ভাঁজে শার্টের কলারে ছাত্রের ছায়া উজ্জ্বল,
কলমের আঁকে ছাত্রপনা গাঢ়।
ও নয় রিয়েল দোকানদার।
১ম কিশোর: হত্যা করেছি সাতটি গর্তের আত্মা;
আরো দুটো হলে
প্রতিজনে পাবো তিরিশ টাকার মতো,
চলবে বহুদিন।
জানি না, একমাসের পরেও থাকে নাকি আরো মাস,
আরো সূর্য-ওঠার দিন, জ্যোৎøা-মাথা ছাদে অন্যের ঠান্ডা চাঁদ।
৩য় কিশোর: যে গর্ত রয়েছে দোকানের পায়ের পাতায়
ভাবুন গর্ত বলে তাকে।
আমরা গর্ত বোজার দল,
গান গাই গর্ত বুজে নীরব কন্ঠস্বরে;
২য় কিশোর: পেয়েছি, ঐ যে গর্ত খুঁটির সাথে, কাত হয়ে বাঁধা নিচে,
কয়েকটি ঝরাপাতা বুজেছে তার আসল গভীরতা।
ঝরাপাতা: তারও আছে গর্ত আর আঁধারে ঢাকার অদ্ভুত ক্ষমতা।
কোরাস: ইউলিসিসে আমরা পেয়েছি গর্ত এক লম্বা
গর্ত আমাদের জীবনে এসেছে ভারি লম্বা।
পাতা সরালে ভাসবে ঠান্ডা রূপ
পাতা সরালে ভাসবে কালোরা চুপ।
মাটির প্রতি কোদাল যখন মেশে
আমরা ঘুমানো গর্ত জাগাই ভালোবাসে।
১ম কিশোর: এসো পাতা সরাই, হলুদ হলুদ একযোগে।
পেরেক/হাতুরি/বাঁশ: আকাশ থেকে তারা-তোমরা নামো গাছের ডালে,
আকাশ থেকে সূর্য- তুমি নামো সমতলে,
ইউলিসিসে গর্ত পেলো গর্ত বোজার দল।
আমি পেরেক: এখন হাতুড়ি হতে চাই
আমি বাঁশ: পেরেক হতে চাই
আমি হাতুড়ি: এখন বাঁশ হতে চাই
আনন্দে... আনন্দে... আনন্দে।
১ম কিশোর: কারা কথা বলে ? কারা ? আমাদের অগোচরে ?
এজন্যে মমতা-মাখানো বাতাস বইছে কি চারিদিকে ?
পার্কের ফুল ছেড়েছে সৌরভ রাশিরাশি ?
কিন্তু কারা ? কারা ?
আমাদের জন্য ?
৩য় কিশোর: গুবরেপোকা - ঘাসের নিচে তোমাকে জানাই সালাম;
আমরা পেয়েছি গর্ত।
২য় কিশোর: আকাশের মেঘ - কলের পানি ছুঁয়ে তোমাকে জানাই সালাম;
আমরা পেয়েছি গর্ত।
১ম কিশোর: সরোয়ার্দির পুকুর - বালতি দেখে তোমাকে জানাই শুভেচ্ছা।
আমরা পেয়েছি গর্ত।
বাবলু: শোনা যাচ্ছে মধুর চিৎকার
আর পৃথিবীর মঞ্চে সম্প্রীতির কথোপকথন।
ব্যাপারখানা কি ? ফুটছে কেন কথা ?
১ম কিশোর: গর্ত।
২য় কিশোর: গর্ত।
৩য় কিশোর: গর্ত।
পেরেক: গর্তই।
হাতুড়ি: গর্তই।
বাঁশ: সত্যি।
বাবলু: কোথায় ! এই দোকানে ? কি›তু কোনো গর্ত নেই কো আমার জীবনে।
কোনোভাবে আসেনি গর্ত আমার মনে।
১ম কিশোর: চাপা পড়েছিলো, চাপা।
২য় কিশোর: অবহেলাও ছিলো কিছু।
৩য় কিশোর: মাত্র দশ টাকায় পুরবো কালো মাটি
মাত্র দশ টাকায় সরাবো আঁধার ঘাঁটি।
বাবলু: ভাগ, বাংলা একাডেমি আমাদের
দেয়নি গর্ত উপহার।
যদি থাকে চামে, থাকুক,
গর্ত ভরলে সরাসরি আসবে চাঁদাবাজ
আর মাথায় তেল মেখে রঙিন বইচোর।
আমি জানি, প্রকৃত ক্রেতা সমুদ্র ডিঙিয়ে আসে।
ভাগ।
কোরাস: নিজের গর্ত নিজেই বুঝে নাও।
অন্যের গর্তের কথা না-বলাই ভাই ভালো।
তোমার গর্তে তুমি যে পড়ে আছো।
বাবলু: একটি পুকুর বাংলা একাডেমিতে করেছে বিরাট গর্ত।
তাকেই তোরা ভর।
আর নতুন গর্ত
তৈরী কর ভবনগুলির তলে।
তারপর বুজ যদি লাগে ২৮ বছর।
১ম কিশোর: তলপেট থেকে উঠে-আসা মিথ্যে কথা বলছি না।
২য় কিশোর: সাক্ষী লাল সুতার ত্রিপল।
চাঁদের পাশে সাক্ষী ঐ তারে ঝোলা বাদুড়।
৩য় কিশোর: অবিশ্বাস তৈরি করে দূরত্ব।
১ম কিশোর: স্বীকার করুন ঐ দৃশ্যমান গর্ত।
২য় কিশোর: স্বীকার করুন গর্তের বাস্তবতা।
৩য় কিশোর: আমরা মিথ্যে কথা বলছি না শিশিরকণা সম।
কোরাস: কাকে গর্ত বলে, সব গর্তে থাকে না গহ্বর;
কাকে গর্ত বলে কে না জানে !
কাকে গর্ত বলে আমরা শুধু জানি
কাকে গর্ত বলে, আমরা শুধু মাটির মাপে মানি !
গর্ত বলে কাকে –
চাকা পড়লে ঘোরে,
ঘোরে না রঙিন গাড়ি।
বাবলু: গর্ত কোথায় নেই ?
জেনো, অদৃশ্য গর্ত ঘিরে জন্ম পূর্ণতার।
তাই আমার গর্ত আমারই থাকুক পাশে।
২৮ দিন দেখবো তাকে আমি
সে ক্রেতার চাপে-চাপে আরো বড় হোক
১ম কিশোর: (মনে-মনে) বলিনি আমি, ও নয় রিয়েল দোকানদার !
২য় কিশোর: (মনে-মনে) হাতে কলমের আঁকিবুঁকি !
৩য় কিশোর: (মনে-মনে) পোশাকে রয়েছে তাজা ভার্সিটির ভাঁজ।
(হঠাৎ বইয়ের পুট থেকে একটি উঁইপোকা মাথা বের করে।)
বাবলু: দেখেছো, ঐ যে ক্ষুদে গর্তরা বইয়ের ভিতর জ্যান্ত
সোনালি উঁই গড়েছে সাম্রাজ্য তাতে।
ভাই যদি পারিস ভরে দে এই বিশ্রী গর্ত,
তাদের ভালোবাসা। বিক্রি হবে বই, দেবো দশ টাকা।
১ম কিশোর: না। আমরা পারবো না।
২য় কিশোর: না। না। আমরা পারবো না।
বলছি, লেখককে ডেকে আনুন।
৩য় কিশোর: লেখকের গর্ত কি করে বুজবো আমরা ?
বইয়ের ভিতরে ভিতরে
কলম দিয়ে নেমেছে যে পরিচিত উঁইপোকা !
(বইয়ের অন্ধকার গুহায় তিনটি সোনালি উঁই দ্রুত প্রস্থান করবে।)























