অলঙ্করণ: দীপাঞ্জন সরকার

অলঙ্করণ: দীপাঞ্জন সরকার

এহসান হাবীবের গুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

ডিসেম্বর ২০১৭

আরও আগেই গারদগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে
আমাদের পূর্বপুরুষের মহামান্বিত হয়ে ওঠার পেছনে
সংগ্রামের, বিপ্লবের, যুদ্ধের সাথে লেপ্টে ছিল যেসব কয়েদখানা
আমরা, আমাদের প্রেরিত পুরুষেরা সেসব ভেঙে ফেলেছেন।

আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম করে ফেলেছি নিজেদেরকে
আমরা আনন্দে প্রতিদিন তিনবেলা গান গাই
প্রতিদিন মাছ ধরি, মনের সুখে খাই
সন্ধেবেলা রাজার গুণগান গাই।

গারদ ছেড়ে বেরিয়ে আসা ডাকাত
গারদ ভেঙে বেরিয়ে আসা টাউট
গারদ থেকে পালিয়ে আসা চোর
হাজার বাতির ঝলমলানো রাতে
জাদুর কাঠির আচানক ছোঁয়ায় ক্যামন বদলে গেল!

প্রতিদিন আমরা জাতীয় জীবনে
আমাদের চেতনার অনুরণনে, আমাদের সামনের অনাগত দিনের
ভরসার মাঝি, জাহাজের কাপ্তেন, দূরের সারেং
আমাদের দিক প্রদর্শক।

জাদুর কাঠি নিয়ে তারা ফিরে এলো আমাদের মাথায় বাজাবে বলে।
আমরা প্রতিদিন তিনবেলা গান গাই
মাছ ধরি, মনের সুখে খাই
আর তাদের গুণগান গাই।
আমাদের মুখে এর বেশি কথা নাই।

আমরা আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গারদগুলো ভেঙে ফেলেছি।
আমরা আরও বেশি স্বাধীন ও সার্বভৌম হয়ে উঠেছি
এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের এক বিশাল কয়েদখানার ভেতর।

নভেম্বর ৭

কাস্তের ওপর থেকে কৃষক
হাতুড়ির থেকে শ্রমিক
বন্দুকের থেকে বিপ্লবী তার অধিকার সরিয়ে নিয়েছে।
মাটির ওপর থেকে অধিকার সরে যাচ্ছে পায়ের।

এই বধির বোবা উপত্যকায়
আমাদের শোকেসে সাজানো ছিল জং ধরা পিস্তল
দাঁত কেটে যাওয়া কাস্তে আর নুলো হাতুড়ি।
আমাদের সেল্ফে সেল্ফে সাজানো ছিল পুঁজির মৌনপাঠ।

প্রতিটা বিকেল তুমুল কথার তুবড়ি ছুটিয়ে
আমরা গোল হয়ে বসি, আরও ঘন হয়ে বসি।
যেন গোপন পরিকল্পনা। আসন্ন গেরিলা যুদ্ধ।
শীতের আগমন। যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই
আমাদের সেল্ফ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে ভারি পুস্তকগুলো।
নদীর জল থেকে পলিগুলো সরে গিয়ে জমা হবে নতুন উপত্যকায়।
নুলো হাতুড়ির গান বেজে উঠবে, কাস্তে বাজাবে সাইরেন
আর জং ধরা পিস্তল লাফিয়ে নামবে শোকেস থেকে, মুহুর্মুহু ছুটবে গুলি
বৃদ্ধ ভিখিরির পিঠে চাবুক কষিয়ে হবে নয়া জামানার তুমুল উদ্বোধন।

কিন্তু অনন্ত মৃত্যুর ঘুম ভেঙে
তুমি আসবে তো? বিপ্লব?

অক্টোবর ২০১৭

যেন আমার বাড়ির পাশে ব্রহ্মপুত্র নয়, ইউফ্রেটিস।
যেন আমি শীতলক্ষ্যায় সাঁতরে বড়ো হইনি, দজলার লাল জলে কেটেছি সাঁতার।
আমাদের দরোজায় হুকুমতের নিশানা সাঁটানো ছিল
আমাদের সদর রাস্তায় উড়ছিল মুক্তবাকের বিলবোর্ড
আমাদের কলিজায় ভয় আর শংকার কৃমি গেড়ে বসেছিল।
আমাদের মুখে হাসির ফল্গু ছড়িয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল।

গোপনে গোপনে সত্য ছড়িয়ে পড়েছিল।
পাড়ার খসে যাওয়া পাতাটি থেকে শুরু করে
সঙ্গিন উচিয়ে হেঁটে যাওয়া সান্ত্রী
বিকেলের অলস বুদ্ধিজীবী
ঝানু তার্কিক
ধাড়ি অধ্যাপক
বেশ্যা মিডিয়াজীবী
কেঁচো
সাপ, ব্যাঙ
গ্রামের কৃষক
ন্যূব্জ বিদ্যার্থী
আর অণ্ডকোষ ফেটে যাওয়া বিশাল অপজিশন

আমরা সবাই জানতাম
আসলে কী ঘটেছিল, আর কী ঘটতে যাচ্ছে।
এ এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা যে
সত্য নিজ গরজে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রান্ত পর্যন্ত
আর পৃথিবী তার ভবিষ্যৎ ঘটনাপুঞ্জকে আগাম উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

সব কিছু আমাদের অধিকারে ছিল
জানা ছিল সকল মিথ্যা ও সত্যের প্রভেদ।
গ্যারেজ মালিক থেকে শুরু করে
বন্দুকের নল পরিষ্কারকারী শ্রমিকটি পর্যন্ত
সহজেই আলাদা করে ফেলতে পারছে শত্রুমিত্র।

শুধু আমাদের চোখে দৃষ্টিশক্তি ছিল না
আমাদের মুখে ভাষা ছিল না
আমাদের কানে শ্রবণশক্তি ছিল না।
আমাদের হাত ভারপ্রাপ্ত ছিল।

আমরা শুধু ভারপ্রাপ্ত ছিলাম।

আমরা তো ভারপ্রাপ্ত হতে হতে ক্রমশ ভারবাহী হয়ে উঠছি।