কাউসার মাহমুদ

কাউসার মাহমুদ

কাউসার মাহমুদের ৫ কবিতা

প্রকাশিত : এপ্রিল ০২, ২০২০

দীর্ঘ দূরত্ব থেকে

পৃথিবীর পারে শুধু এক জড়োসড়ো মানুষের মতো,
কতকাল ধরে ফিরে ফিরে আসছি আবারো।
যেন এই বিতাড়িত প্রাণের গৃহতলে আসতেই হবে—
ক্ষুদ্র পতঙ্গ হয়ে তোমার বু্কের ধারে,
বুঝি; সুরভিত মৃত্তিকা ঝরে পড়ে।

বুঝি মৌতাত! লাবণ্যঘেরা তোমার দু`হাত
বিছায়ে দিয়েছো শীতের সবুজ ঘাসে,
এখানে, ওখানে আমার হাঁটার পথে—
যেন এক অদৃশ্য আয়ুর আঁতাত।

হয়তো বেঁচে থাকা; ভূমিভাগ মানুষের সহপাঠী হয়ে
কি`বা ওই আত্মীয় বিরোধের চাপে পিষ্ট পিঠ
চাকরির বশ্যতা মেনে সুভাষিত অভিনয় কীট!
অথবা, ঋণের ক্লান্ত বাহুতে রঞ্জিত কংক্রিট।

তবু এক; জীবনের নাম ধরে ডাকি হায়—
নষ্ট ফুলের মতো অসহায়।
বিমূর্ত মানবীর কাছে নত; নিদ্রা অপহৃত।
মৃত্যুকে যদি অপহরণ করা যায়!

মন্থরতা

নৃত্য থেমে গেলে, সমস্ত চোখ একে একে পিছে চলে যায়
ক্ষণকালের সে মদিরা, আনন্দকন্দ; ভূবলয়
কোথা যেন উড়ে যায়!

যেন এক নিরাভরণা, কিছুকাল আগের বহ্নিবিবিক্ষু
তীর্যক দৃষ্টি থেকে ছিটকে গেছে।

মৃগাক্ষী সে। অন্তঃসুরভি ঘেরা উপাসনার উদগাতা এক।
তবুও আসরের আসক্তি শেষে, ক্লান্তির মতোই সে মন্থর।
যেন এক নিশীথের সহিস; ভুল পথে পুনরায় অন্ধকার ছিঁড়ে ফিরে আসছে। আর, যূথবদ্ধ তুষারকণা পুষ্পরেণুর মতোই মন্থর মিশে যাচ্ছে তার রক্তিম গালে।

নিঃসঙ্গতা

কতখানি নীরবতা হলে নীরবতা ঝড়ে পড়ে মানুষের পাশে।
শুনশান মরে গিয়ে শুধু সেই অবিস্তৃত নীরবতাই থাকে।

চাঁদের ঊরুর মতো উজ্জ্বল হাসির তলে—
কে কোথায় কোন ব্যাথা লুকিয়ে রাখে পৃথিবীর কে জানে!

মনে হয় শুধু জানে মাটি, কান্না ভুলে যাওয়া স্তব্ধ করোটি।
আর জানে কিছু কিছু খাতা, কোনোদিন ভোরে মাড়িয়ে যাওয়া গাছের পাতা।

তাহলে এসবের পরে কে কবে ভালোবেসেছিল কাকে!
মানুষের মৃতদেহ মানুষেই টানে পৃথিবীতে।

দুঃখবোধ

ও হাওয়া, আরো ধীর হও, আরো নমিত
কোথায় কোথায় যে তুমি বয়ে যাও,
কেন যে এত দ্রুত হও!
আমি জানি না।

পৃথিবীর সমান আয়ু ধরে কত কি জানলে তুমি,
কত কি ভাসালে, ওড়ালে।
কত ঝড় হাঁকালে বৃথাই, সমুদ্র পোড়ালে—
যেন তোমার এই দার্ঢ্যের কাছে,
একাকে আরো একা করে দিলে।

ভ্রম ও বৈদগ্ধতা

কেমন এ রাত অন্ধকারের ছায়ায়,
কোথায় কে হায় হাঁটছে দ্বিধান্বিত।
সমস্ত পথ বিছিয়ে গেছে কায়ায়,
পায়ের নিচে অনন্ত ডাক বিস্তৃত।

পূবের কোথাও বাজছে করুণ স্বর;
পাহাড় থেকে উঠছে হাওয়ার গান।
পথের ধারে বসা এ কোন প্রাণ!
দুই চোখে তার শঙ্খ সমুদ্দুর।

ভীতিপ্রদ ত্রিলোকের এই খরায়,
কেইবা এমন গম্ভীরা এই নারী?
মেঘের মতো গাঢ় তাহার চোখ,
কোনখানে তার কান্নামাখা শাড়ি।

মৃতের মতো খণ্ডিত এই রাতে—
ভাবছি আমি হাঁটছি ভীষণ একা।
সমান্তর দুখিনী এই নারী;
কেমন করে এইখানে এই পথে!

চারপাশে এ কোন বিষণ্ণতার মায়া?
অনন্তলোক থমকে গেছে কথায়!
সমূহ শোক কান পেতেছে ভাষায়—
গুঞ্জিত এই নিঝুম রাত্রি মাথায়।

ত্রস্ত ভীষণ সঙ্কোচ ও সাবধানে,
পিঁপড়ে পায়ে এগিয়ে আসা কাছে।
তাতেই কেমন মন্দাকিনী জাগে—
বিলুপ্ত সেই অন্ধ রাতের ঘ্রাণে।

হঠাৎ কেমন আকাশ ফাটে দ্রিম,
বিজুরি ওই স্নিগ্ধ জলের উপর।
মৃদুতর বাতাস খোয়া গেলে—
হাতটা কেমন বুক ছেড়ে উড্ডীন।

একটা দুটো কথার চোটেই জল,
নিরুদ্ধ সেই বিলাপ ফেটে আসে।
বিদীর্ণ ওই করুণ কণ্ঠ কাঁদে—
চারপাশে তার খাঁখাঁ মরুর ঢল।

আচম্বিত কোথায় কী যে হলো!
হঠাৎ কেমন চোখের উপর আলো।
মত্ত সুরায় বিধ্বস্ত সেই আমার
একটুখানি বোধের ধারা এলো।

পথের থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখি,
আমার উপর হাঁটছে কোন ভ্রম!
গভীর তাপে কুঞ্চিত তার ভ্রু—
বিমর্ষ শোক ধীর, নামছে অস্তাচল।

কেমন যেন গূঢ় তাহার রূপ;
মিশ্রিত ভাব আপন সত্তা সনে।
যেই ভেবেছি নিজের স্বরূপ জানি,
অমনি আবার ভ্রম জেগেছে মনে।

এই বুঝি এই ছায়ার ভেতর মায়া,
আমার ভেতর বলছে যেন কেউ—
কোথায় তুমি, কোথায় তোমার পথ
কোথায় দেখা দুখিনী সেই নারী!