খুলিতত্ত্ব দুই: সুরাইয়া খানম, আবুল হাসান দুইবার!

চয়ন খায়রুল হাবিব

প্রকাশিত : আগস্ট ০৪, ২০১৮

`ভিতরের পাতাগুলি বা খুলিতত্ত্ব’ নামে একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করছি। এর কবিতাগুলা ভাষিক নিরীক্ষাধর্মী এবং নিবেদনমূলক। `ভাঙা লিরিক ও ভাঙা বয়ান` প্রবর্তনাতে পৌঁছাতে যে কবিদের, শিল্পীদের কাজ সতীর্থরাসহ আমাকে পার হয়ে আসতে হয়েছে; তাদের ঘিরে বাংলা ভাষার উদযাপনে অংশীদার হওয়াটাই `ভিতরের পাতাগুলি`র লক্ষ্য। এ পাণ্ডুলিপিতে আছে চন্দ্রাবতী, শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, বিনয় মজুমদারের পাশাপাশি রুমি, শেক্সপিয়ার, সিলভিয়া প্লাথ, কাভাফি ও আপোলিনেয়ার; ভাস্কর নভেরার পাশাপাশি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। আয়োজনের চূড়ান্তে এসে পাণ্ডুলিপিতে দেখলাম সুরাইয়া খানম ও আবুল হাসানকে নিয়ে দুটা কবিতা এখানে ঠাঁই করে নিয়েছে। প্রাগুক্তে ঈ, উ, চাঁদবিন্দু, ণ ব্যবহার না করলেও কবিতাগুলাতে প্রচলিত বাংলা বানান প্রয়োগ করা হয়েছে।

সুরাইয়া খানম

জয় সুরাইয়া
জয় আমাদের চমচম মিয়া:

পিলখানার বিডিআর গেট থেকে
শহিদ মিনার অব্ধি ঊনিশশো পঁচাত্তুরে
মহাবট অশ্বত্থ রেন্ট্রির খোন্দল থেকে খোন্দলে
ডাক হরকরা মাটির পাতালে ছড়ায়েছে
মাইলকে মাইল লম্বা আবুল হাসানের কবিতার রাত

সে-রাতের একপাশে অমাবস্যা
অন্যপাশে পূর্ণিমার চাঁদ
চাঁদের বুকের বোঁটায়
দু’রকম বাংলাদেশকে চুমোচুমির হাহুতাশ শেষে
ঢাকার রাস্তাঘাটে বাজারে ক্যাম্পাসে পার্কে
আর পুলিশের চৌকিতে শাপলা শালুকের ডাঁটায়
বানভাসি ফণাগোটানো গোখরাদের লুকোনোর
আয়োজনে মুগ্ধ কবি আবুল হাসান দেখেছিল,
রাতের বেলাকার আজিম্পুর কলোনির পুকুরগুলোর বুকে
খোলা আর বন্ধ জানালাগুলোয়
লাল নীল সবুজ পাঁচমিশেলি ছায়াদের সাথে
পর্দাদের ধন্ধ

পর্দা ও ছায়াদের দোলাচলে
আবুল হাসান এখন লখিন্দর
আর সুরাইয়া খানম হলো বেহুলা
এক লখিন্দরকে লুকিয়ে আরেক আবুল হাসান
এক বেহুলাকে না জানিয়ে আরেক সুরাইয়া
গোলাপি কাঁকড়াদের উত্তেজনায় এফোঁড় ওফোঁড়
কামড়াকামড়ি জড়াজড়ি শেষে দুজনের ঘামে ঝলসায়
সাগরসেঁচা বালির মিহিদানা মুক্তার নেকলেস
এ দুজন এখন অবিনশ্বর
মুক্তি ও মুক্তার মালিক ও মালকিন

ধিন্তাধিনাত মহুয়ায় মাত বেহুলা চিৎকার করে:
অই লখিন্দর আমার মুক্তা ফিরায় দে
লখিন্দরে কয়: অরে আমার মরা মুক্তার মা
গার্মেন্টসে যা, কাম কৈরা খা

অই অই ঝগড়া কাজিয়া ভালা না
এ বলে আবুল হাসান ও সুরাইয়া খানমকে
আমি লখিন্দর ও বেহুলার স্বপ্ন সিঁথানে বসাই
অনুজ কবির বিনীত নিবেদনে
পোড়াবাড়ির চমচম শুধাই

চমচমগুলা এখন লোমশ কান্না হয়ে
কাঁচের শোকেসে বসে আছে
এবং বসে বসে আঠাআঠি ফাটাফাটি মজায় দেখছে
মিষ্টির কারিগরেরা হাঁটুর ওপর লুঙি তুলে
রফিক জব্বার নূর হোসেন চলেসের
মৃত্যুর বার্তাবাহক পুরানো খবরের কাগজ ঘষে ঘষে
শোকেসের কাঁচের ওপর থেকে
মিষ্টির আঁঠা পরিষ্কার করছে

রাস্তার অন্যপারে জিঞ্জিরা হোটেলে
ডিম বাদাম দারুচিনি মেশানো
ভুতুড়ে চায়ের চুমুকে চুমুকে
আবুল হাসান সুরাইয়ার আঁচল সরানো বুকে
হঠাৎ থমকে গুলিয়ে ফেলেছে
কোনটা গণতন্ত্রের এন্টিকাটার
আর কোনটা বারবার বিক্রি হওয়া
আত্মার ধনুষ্টংকার

: তোমার ডাকনাম কি?>
ঘুম-জড়ানিয়া-সুরাইয়ার এ-প্রশ্নে
আবুল হাসান বলেছিল, ডাকনামগুলো জীবন ও যত্নের সীমান্ত
আমার ডাকনাম জ্যোতি
মেয়ে হলে ডেকো মৌলিক বোলে
ছেলে হোলে ডেকো দ্বৈত
আর ওদের বোলো
আমার আরেকটা ডাকনাম হলো চমচম মিয়া

শোক ও স্বৈরতন্ত্রের দেশে
ওরা যাতে সবসময় হাসে

জয় আবুল হাসান জয় চমচম মিয়া
জয় সুরাইয়া খানম জয় চমচম মিয়া

২০০৭
লন্ডন

পাপুয়ার সুরাইয়া:
পোড়াতে পোড়াতে
পালকগুলোর হলকায়
অন্তর্মুখী সারি সারি বেতরঙা বেতফল
হরণের হাসিতে বালেশ্বওয়ার উপচানো ভরা বর্ষার ঢল

রানি বাঘিনীর ডোরাকাটা ব্রেসিয়ারে
সুরাইয়াকে নাচাও সুন্দরবনের হেঁয়ালিতে
গোড়ালির অল্প উপরে কাতুকুতু সঙ্কেতে
মায়াবিনী বনবিবির নিদাঘে জ্বালাইলি
দক্ষিণা রায়ের উছিলায় এক আবুল হাসানি অজগর

অজগর নাচাও কেওড়াদের হোগলাদের বেতার তরঙ্গবার্তায়
জরুরি লবঙ্গলতায়:
বানে ডোবা কবরের ফুটায় এবং অর্গাজমের তীব্রতায়

ইনি তানি সম্ভোগে সাগরকল্মিরা আছড়ায়
তালগাছকাটা মহামাতাল বেতাল পঞ্চবিংশতি ডোঙার অল্প দূরে
পাপুয়াপাকা পাপুয়াগিনির কাকাতুয়াদের বাটিক-বর্ণালি পাখসাটে

আদমসুরাতের মৌলিকতায় প্রাচীনতম মৃত্তিকায়:
ধান মাড়াইর কার্পেটে নাচাও
শিকারি জীবন আর নিপবনখাকি সন্তাপী আতপের খুদ
বিপণিবিতান সাজ পোষাকে সবুজ কমলা হলুদ

হাসানের খাটিয়ার পাশে কাকাতুয়াদের দোলনায়
গরম গরম কদমের পরানে গ্রীষ্মের দাবদাহ কদমেই নাচাও

নাচাও প্রশান্ত রাওয়ের পিছু হটা পত্তনি
নেতিধোপানিতে হার্মাদ দস্যুর লুটেরা দোকান:
শাল তমাল গরানের আড়ালে মাইক্রো ক্রেডিটের
অভিধান খুলতেই কদম কদমিরা মুখোমুখি:

দেয়া-চুমু নেয়া-চুমুর বাড়াবাড়ি
পানকৌড়ি মাছরাঙা সারসের ভরপেট পৌষমাসে
বাইন আর গলদার শর্মিন্দা হাহুতাশে
জঙ্গল ও জঙ্গিলি তাদের পেখম গুটায়েছে রেশমের সম্মোহনে

জলার্দ্র সমুদ্রনিষ্ঠ পরম এবং বুনো সিল্কের পোকা
নীরবতাকে ধরে সুন্দরী গাছে ঝোলা অর্কিড ফুলের থোকা

নাচাও চম্পাচিন্ন নাচাও শম্পাচিন্ন
মরিচাধরা সিঁথির সিন্দুরে নাচাও কয়েকটা গারদ
পারদের নোনায় নাচাও কয়েকটা নার্ভাস সন্দেহ
করাতি কুমীরের নিপুণতায় দুই অর্ধেক কবিতার দুইটা প্রাচীন দেহ

দেহকে ডাকো দেবাহুতি: মনসা বাইদানির হাতে ধরা
সম্পন্ন সাত বিষের বাহাদুর ডাক নাম যাদের গোখরা
নাচাও দংশন নাচাও চৈতন্যের লাভা কমলাভা
লেজ থেকে ফণায় জ্বালাও মগ্ন সেই কাকাতুয়ার শ্লোক

বিশালে বিষাক-শ্রাবণ সংশ্লেষণে ভেসে যাক আত্মার অমল এঞ্জিন
ভরা বাদলার ওয়াশিং মেশিনে পাশাপাশি ধৌত বিধৌত
দুঃখ ডাকাতিয়াদের যৌথহনন:
পশলা পশলা ঝরে পাপুয়া-প্রযুক্তির মেঘমল্লার তান

কাকাতুয়াগো কাকাতুয়াগো
কাব্যগ্রন্থের দাম দিয়ে যাও গো বলে পাড়া মাত করে চেঁচায়
নৈকট্যধামের গ্রন্থকার আবুল হাসান

বাকির খাতায়ও ঠাঁই পায় না প্রেম কাব্যের সেই রশিদ চালান

৯/০৬/২০১০
ব্রিটানি