চেশোয়াভ মিউশের চারটি কবিতা

অনুবাদ: মাসুদ খান

প্রকাশিত : আগস্ট ২৮, ২০১৮

চেশোয়াভ মিউশ (১৯১১--২০০৪) পোলিশ কবি, গদ্যকার, অনুবাদক ও কূটনীতিক। জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাদীক্ষা লিথুয়ানিয়ায়। দীর্ঘদিন স্লাভিক ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়েছেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায়। পোলিশ কালচারাল অ্যাটাশে হিসেবেও কাজ করেছেন প্যারিস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৭০-এ মার্কিন নাগরিকত্ব দেয়া হয় তাকে। কবিতা, প্রবন্ধ ও তার অন্যান্য লেখালিখির জন্য পান নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ১৯৭৮-এ এবং তার পরপরই ১৯৮০-তে পান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।

অন্ধকার নিরাশার ভেতর

ধূসর সংশয় আর অন্ধকার নিরাশার মধ্যে
ধরিত্রী ও বাতাসের উদ্দেশে করেছি স্তোত্র রচনা
নিয়ে আনন্দের ভাব, যদিও-বা ছিল আনন্দ-অভাব।
বয়সই বাহুল্য করে তুলেছিল শোক ও বিলাপ।

অতএব, এখানেই সেই প্রশ্ন... কে পারবে জবাব দিতে তার...
লোকটা কি ছিল কোনো বাহাদুর পুরুষ, নাকি সে ভণ্ড, মোনাফেক?

একটা নির্দিষ্ট বয়সে

আমরা তো করতে চেয়েছি পাপস্বীকার, শোনার ছিল না কেউ।
শাদা শাদা মেঘদল, তারাও হয়নি রাজি।
হাওয়া ছিল মহামশগুল, দরিয়ার পর দরিয়া সফরে।
আগ্রহী হয়নি প্রাণিকুলও, পারি নাই বোঝাতে তাদের।
হতাশ কুকুরেরাও, তারা ছিল হুকুমের প্রত্যাশায়।
বিড়ালিনী এক, যথারীতি দুরাচারী, ঘুমিয়ে পড়েছে সেও।
কাছের মানুষ বলে মনে হতো যাকে,
বিগত বিষয় নিয়ে কথা শুনতে আগ্রহী ছিল না সেও।
বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠবার পরও বাতচিত চালিয়ে যাওয়াটা ঠিক নয়,
ইয়ারবান্ধবদের সাথে, ভদকা বা কফি বিষয়ে।
সে তো হবে এক মহা-বেইজ্জতি ব্যাপার, যে,
শুধু শুনে যাবার জন্যেই কোনো ডিগ্রিধারী মানুষকে ঘণ্টা
হিসাবে মজুরি দিয়ে যাওয়া।

গির্জা। হয়তো গির্জাই। তবে সেখানে কী আর আছে তওবা করবার?
আমরা তো নিজেদের মনে করতাম খুব সৌম্যকান্ত, এবং মহাত্মা,
পরে দেখি এক কদাকার কুনোব্যাঙ আমাদের জায়গায়।
আধেক খোলা তার পুরু চোখের পল্লব
এবং আরেকজন, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে: ‘ওটাই তো আমি।’

মুখোমুখি

গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম আমরা
হিমে জমে-যাওয়া মাঠের ভেতর দিয়ে ভোরে।
একটি লাল ডানা ঝলকে উঠল অন্ধকারে।

এবং হঠাৎ একটি খরগোশ দৌড়ে রাস্তা পার হলো।
আমাদের একজন আঙুল তুলে দেখাল তা।

সে অনেকদিন আগেকার কথা। আজ বেঁচে নেই তাদের কেউই,
না সেই খরগোশ, না সেই আঙুল তুলে দেখানো লোকটা, কেউই না।

হে আমার প্রেম, তারা কোথায়? কোথায় চলে যায় তারা?
সেই যে হাতের একটা ঝলক, চকিত সরে যাওয়া, আর নুড়ির টুকটাক শব্দ?

দুঃখবোধ থেকে নয়, এসব জিজ্ঞেস করি অবাক হয়ে।

ভুলে যাও

ভুলে যাও ভোগান্তির কথা
ভুগিয়েছ যা অন্যকে।
ভুলে যাও দুর্ভোগের কথা
যা অন্যেরা ভুগিয়েছে তোমাকে।
জলেরা তো বয়ে চলে, বয়েই চলেছে,
ঝরনারা করে ঝলমল, ব্যস ওটুকুই,
হাঁটো ধরিত্রীর বুকে, যাকে ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছ তুমি।

মাঝে মাঝে শোনো দূর থেকে ভেসে আসা এক গানের কলি
তুমি জিজ্ঞেস করো— কী-বা অর্থ হয় তার, গাইছেই-বা কে?
তাতিয়ে ওঠে শিশুসূর্য এক।
জন্ম নেয় এক পৌত্র, প্রপৌত্র আরেক।

নদীদের নাম স-ব থেকে যায় তোমার সাথেই।
কী নিঃসীম মনে হয় ওইসব নদী!
তোমার মাঠেরা পড়ে থাকে ডাহা পতিত,
নগর-টাওয়ারগুলি আর নাই আগের মতন।
দাঁড়িয়েছ তুমি বোবা সূচনারেখায়।