নতুন গ্রহে বসতি স্থাপন পদ্ধতি

অমিতাভ পাল

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৯, ২০১৮

প্রথমেই তোমাকে বয়ে আনা মহাকাশযানটাকে নষ্ট করে ফেলো
নইলে হোম সিকনেস বারবার তোমাকে পৃথিবীতে ফিরতে প্রলুব্ধ করবে
জীবনানন্দের ঘাস তোমাকে ডাকতে থাকবে সবুজ সোহাগে
আর এসব সিকনেস ও সোহাগ তোমাকে স্থবির করে রাখবে এমনভাবে
যে জেলখানাও এরচেয়ে ভালো ছিল বলে মনে হতে থাকবে

ফিরবার পথ বন্ধ করে শুরু করো নতুন গ্রহে তোমার বাড়ি বানানোর কাজ
নষ্ট মহাকাশযানের টুকরাগুলিকে ব্যবহার করে বানিয়ে ফেল
তোমার থাকার বাড়িটা
তাহলে আর অপচয় হবে না বরং মনে হবে
সবসময় তুমি মহাকাশযানেই আছো ফলে কোনও কোনও
অপ্রতিরোধ্য মূহূর্তে যখন আর নতুন এই নিঃস্ব গ্রহে
থাকতে তোমার ইচ্ছাই করবে না তখন
মহাকাশযানটাই হবে তোমার এমন পরিচিত যে সবসময়
পাশের বাড়িতেই থাকত কিন্তু কেন যেন কখনো পরিচয়
হয়নি ফলে একটা নতুন সম্পর্ক তৈরি হবে তার সঙ্গে আর
পুরানো অভিজ্ঞতা থেকে তোমার তো জানাই আছে
বিশ্বের সব পুরাতন একদা নতুন হয়েই জন্মেছিল

বাড়ি বানানো শেষ হতেই তোমার কাজ হবে পৃথিবী থেকে
নিয়ে আসা গাছের একটা বীজকে নিজের উঠানে লাগানো
কিন্তু নতুন এই গ্রহ যেহেতু এর আগে কখনো কোনও
গাছের জন্ম দেয়নি তাই বীজ লাগানোর আগে
উঠানের মাটি তৈরি করে নিও আর শিশুদের স্কুলশিক্ষকের মতো
গ্রহটাকে শিখিও কি করে তার শূন্য আকাশে একটা
প্রাথমিক মেঘের ছবি আঁকতে হয় এবং ধীরে ধীরে সেই
মেঘটাকে শেখাতে হয় ঝরে পড়ার নিয়ম
তারপর গ্রহটাকে শুনিও প্রথম বৃষ্টিপাতের রোমাঞ্চিত শিহরণের গল্প
সেই গল্পে তুমি যোগ করতে পার জলরঙে আঁকা
কিছু মধ্যবর্ষার ছবি, যাতে উদাহরণ হিসাবে থাকবে
সিক্ত অনুভূতিসমূহের ভিড় ফলে বর্ষা কী রকম, সে ব্যাপারে
একটা আসন্ন ধারণা জমে উঠবে পৃথিবীর পোয়াতি মেয়েদের
গর্ভের মতো আর তুমি তার মা-মাসির মতো
আশেপাশে থেকে বোঝাবে বর্ষণ কত সহজ
তারপর একদিন যখন হঠাৎ তোমাকে চমকে দিয়ে
একটা ঠাণ্ডা জলের ফোঁটা কোত্থেকে যেন এসে পড়বে
তোমার কপালে আর তুমি পৃথিবীতে থাকার সময় শেখা
অভ্যাসবশত আকাশের দিকে তাকাবে, তখন তোমাকে
আশ্চর্য করে দিয়ে সেখানে উদ্ভাসিত হবে সেই প্রাথমিক মেঘ কিন্তু
এখন সে আর প্রাথমিক নেই বরং বিরাট কালো আর বুনো হয়ে উঠেছে
উঠতি একটা তরুণ মোষের মতো
জলের ফোঁটাটা ছিল ওই মেঘটার তোমাকে ডাকার কৌশল এবং
যেই তুমি সেই ডাকে তার দিকে ফিরলে, অমনি সে
শুরু করে দেবে তার প্রথম ঝরে পড়ার খেলা এবং হাসতে হাসতে
তোমাকে ভিজাতে থাকবে জলোৎসবে
এই বৃষ্টি রুক্ষ একা অনভ্যস্ত কুমারী গ্রহটার মাটিকে
নরম করবে, তার মধ্যে জন্ম দেবে আশ্রয়ের টান, বীজ
তাতে থাকতে ভালবাসবে- ভালবাসবে শিকড়েরা পাতালের
পার্কে বেড়াতে

তারপর সব আয়োজন যখন সম্পন্ন হবে, থেমে যাবে
গভীর এক স্থিরতার প্রয়োজনে যাবতীয় অস্থিরতার টান
ঠিক তখনি কোনও এক অতিপ্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে
তুমি দেখবে উঠানের মাটির জানালা খুলে মুখ বাড়িয়ে হাসছে
এই গ্রহের প্রথম সন্তান, তোমার অদ্ভুত সবুজ শিশু
তুমি তার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সস্নেহে একটু হেসো
হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিও তার ছোট ছোট পাতার নরম আঙুল
আর তারপর এক উদ্দাম উল্লাসে পিতৃত্বের সুখ অনুভব
করতে করতে যখন তুমি দেখবে তোমার উঠান
শিশুবিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের মতো শব্দে নতুনত্বে থৈ থৈ করছে
ঠিক তখন থেকেই শুরু হবে তোমার চাষিজীবন

চাষি হওয়ার পর তোমার প্রথম কাজ হবে গ্রহের আকাশটাকে
ছয়টি ঋতুতে ভাগ করে ফেলা
সেখানে গ্রীষ্ম আসবে গমগমিয়ে, বর্ষা বাঁধবে বেড়া
শরৎ সহাস্যে হবে হেমন্তের পড়শি আর শীত ও বসন্ত
মফস্বল শহরের সাহিত্যের অধ্যাপকের দুই যমজ কন্যার মতো
কাটাবে গান আবৃত্তি উপস্থাপনের সাংস্কৃতিক জীবন
ঋতুরা আসতেই এতদিনকার এই নীলাভ ঠাণ্ডা গ্রহটাকে
তৈরি করার কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়বে আকাশ
সারাক্ষণ শোনা যাবে বিরাট কোন কারখানার অবিরাম
ঝনঝন শব্দ আর শিফ্ট বদলের সাইরেন
এই কারখানার দায়িত্ব হবে গ্রহটাকে সবুজ করে তোলা
যা কিনা প্রকৃতপক্ষে তোমার উঠানেরই সম্প্রসারণ
পৃথিবী থেকে আনা তোমার প্রথম বীজটা এইক্ষেত্রে পালন করবে
প্রথম জন্ম নেয়া এককোষী প্রাণের ভূমিকা
এদিকে বৃষ্টি ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে ঝরে পড়ার রুটিনে
আর তার জল গ্রহটার এতদিন ধরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে থাকা
গর্তগুলিকে ভরে তুলবে এবং তাদের নাম হবে সমুদ্র
তুমি তার তীরে দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গতার বেদনায় তাকিয়ে থাকবে
দূরের দিগন্তে কোন একটা জাহাজ দেখার আশায়
পৃথিবীর দ্বীপে আটকে পড়া জাহাজডুবির নাবিকের মতো
কিন্তু সমুদ্র তখনো যেহেতু জাহাজ শব্দটির সাথে পরিচিত হয়নি
তাই দিগন্ত থাকবে শূন্য ফলে তোমার উড়িয়ে দেয়া
সাদা পতাকা কিংবা চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার
তোমার কাছেই ফিরে আসবে তবে ওই যে তোমার চিৎকারের
শব্দ, মনে রেখো এই গ্রহে এটাই কোনও প্রাণীর উচ্চারিত
শব্দের প্রথম নমুনা, বর্ণমালার প্রথম স্থানীয় অক্ষর

তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তুমি স্পষ্ট
টের পাবে তোমার অনুভূতি প্রচ-ভাবে চাইছে একটি নারীর সঙ্গ
ঠিক যেইভাবে পৃথিবী চায় চাঁদের সখ্যতা কিংবা মঙ্গল খোঁজে
তার দুই উপগ্রহের প্রেম ফলে এইবার তোমাকে ভাবতে হবে
কিভাবে একটি নারীকে সংগ্রহ কিংবা নির্মাণ করা যায় কিন্তু
নারীর ব্যাপারে তোমার নিঃসঙ্গ হয়ে থাকাটাই হবে স্বাভাবিক কেননা
ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকে যেভাবে নারীর
জন্মের উপকথা তৈরি করেছে, মহাকাশযুগে তা হাস্যকর একটি
গল্প ছাড়া আর কিছুই না হওয়ার ফলে বিরহই হবে তোমার
প্রথম প্রেমিকা এবং তাকে নিয়েই কাটবে তোমার নতুন গ্রহের দিন
আর অপেক্ষা তোমাকে আশা জোগাবে কোনও দিন হয়তো
আরেকটি মহাকাশযান এসে পৌঁছাতে পারে এই গ্রহে এবং সেখানে
থাকতে পারে পৃথিবীর একটি নারী যে তোমাকে দেখার পরে
তোমার মতোই নষ্ট করে ফেলবে তার মহাকাশযানটিকে এবং
তোমারই মতো একটি বাড়ি বানিয়ে তার উঠানে পুঁতে দেবে
তার নিজের বীজ আর তারপর তার শূন্য আকাশে একটি মেঘের
ছবি এঁকে অপেক্ষা করবে বৃষ্টির

তারপর একদিন যে নতুন ঊষর গ্রহটাতে তোমরা এসেছিলে
তার দিগন্তের রঙ হয়ে উঠবে সবুজ
দূর থেকে যার দিকে তাকালে মনে হবে আশ্রয় পাবার কথা
এবং এই আশ্রয়ের কথা মনে হতেই তুমি ও সেই মেয়েটি
হাঁটতে শুরু করবে ওই দিগন্তের দিকে এবং একদিন যখন
সেখানে পৌঁছাবে, দেখবে তোমরা আসলে পরস্পরের
দিকে হাঁটছিলে আর এখন নিজেদের কাছে আসার পরে শুরু হবে
তোমাদের মিলনপর্ব
তোমাদের আলাদা দুইটি বাড়ি
পরিণত হবে একটি দুই কামরার বাসায়
তোমাদের আলাদা আলাদা মেঘ জমাট বেঁধে তৈরি করবে মেঘের পাহাড়
গাছগুলির মিলিত নাম হবে বনভূমি আর তোমরা দুইজন
কোনও এক বিস্ময়কর বেদনাদায়ক মূহূর্তে পরিণত হবে
তিন-চার-পাঁচজনের দলে
তোমাদের ঘরগুলি গিজগিজ করবে শব্দের হামাগুড়িতে
আর এইসব কিছু দেখতে দেখতে তোমরা ভুলে যাবে কোনও একদিন
ফেলে আসা তোমাদের পুরানো পৃথিবীর কথা যেখানে
এখনো হয়তো গাছপালায় ভরা শান্ত গ্রামের বাড়িতে রয়ে গেছে
তোমাদের পূর্বপুরুষের ভেঙেপড়া জীর্ণ দালানকোঠার মতো সমাধি
তোমাদের অনুপস্থিতিতে যেখানে ঘাসেরা এসে জানিয়ে যায় নম্র শ্রদ্ধা
ঠিক এইরকম শ্রদ্ধা একদিন তোমরাও পাবে তোমাদের রোপিত
ঘাসগুলির কাছ থেকে
সেইদিন এই ঊষর নতুন গ্রহটি আর নতুন থাকবে না এবং
তোমাদের আজকের এই মূহূর্তের মতোই
সেইদিন সেই গ্রহ থেকে মহাশূন্যযান নিয়ে অন্য কোনও নতুন
গ্রহের দিকে যাত্রা করবে তোমারই মতো আরেক অভিযাত্রী
সেও হয়তো পৌঁছে যাবে আরেকটা কোনও গ্রহে
হয়তো সেও ফিরবার আশা ছেড়ে দেবে মহাকাশযানটিকে
নষ্ট করে ফেলে এবং সেই নষ্ট আকাশযানের যন্ত্রাংশ দিয়ে
তৈরি করবে তার নিজের বাড়ি এবং উঠানে রোপণ করবে বীজ
শূন্য আকাশে জলরঙে আঁকবে মেঘ এবং তার
প্রথম বৃষ্টিপাতে রোমাঞ্চিত হবে
সেও তোমারই মতো অপেক্ষা করবে কোনও নারীর
এবং তারও ঘর ভরে যাবে শব্দের হামাগুড়িতে
সবুজ হয়ে উঠবে দিগন্ত এবং তারপর একদিন সেই ঊষর
গ্রহটিও পুরানো ও পরিচিত পৃথিবীর মতো ভরে ওঠে
আবার কাউকে উষ্কানি দেবে বেরিয়ে পড়ার
আর এইভাবেই মহাশূন্যের বিভিন্ন ঊষর গ্রহ একটা একটা করে
পৃথিবী হয়ে তৈরি করবে তাদের নিজের জগৎ

পৃথিবীতে কবিরাও এইভাবে নিজেদের জগৎ তৈরি করে নেয়
নিজেদের কবিতাগুলিতে
আর আমরা পাঠক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেইসব জগতের ভাষা
উপমা আর চিত্রকল্পের নতুনত্বে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি দূরবীনের কাচে