নীলিমা খাতুন

প্রণয়কাব্য

আবু তাহের সরফরাজ

প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৮

নীলিমা খাতুন

এক.

নীলিমা খাতুন ছুরি শানাচ্ছে           খুন হতে হবে এবার
রক্তের কোষে মেধা আর বোধে         ঢেউ তুলবে না সে আর।
খড়কুটো কিছু ঠোঁটে তুলে এনে         তৈরি করেছি ঘর
শানিত ছুরির অগ্নিচ্ছটায়             পুড়তেছে সেই খড়।
নীলিমা খাতুন আদিমতা বোঝে        নীলিমা খাতুন ভালো
আড়াল থাকে না খুনের দৃশ্যে         পরদা হলেও কালো।

নীলিমা খাতুন বস্তুত বিবি হাওয়া
          গন্ধম তার শেষ হয়ে গেছে খাওয়া
                    আদমের প্রাণ তাই তার হাতে
                              থত্থর কাঁপে কুয়াশার রাতে...
                                             নীলিমা খাতুন কুয়াশার নিচে
                     ছুরিতে দিচ্ছে শান
          আর আমি ভয়ে, আর শীৎকারে
ডেকে উঠি, বিবিজান।

দুই.
নীলিমা খাতুন কে, বলতেছি শোনো
         আসলে তাহার রূপে দেহ নেই কোনো।
                  এই কথা লিখলাম, এরপর দেখি,
                            কহলিল জিবরান হাসতেছে, একি!
                                      বলতেছে বিড়বিড়, শোনো হে প্রেমিক
                                      কিছুই নও তুমি বোধের অধিক।
                            পুরুষের বোধে থাকে তার দুই প্রেমিকা
                   এক তার কল্পনা, আর শ্রী রাধিকা।
        রাধিকা আছেন কোনো অচেনা জগতে
এই ভবে তাকে আর পাবে কী নগদে!


আদম হাওয়া

হাওয়া বিবি হাওয়া বিবি... ডাকছে আদম
যেন তা কাতরতা, সৃষ্টি মাতম।
জ্ঞানফল কার্যত দেহ অনুভূতি
দেহে তবু রুহ থাকে, একী বিচ্যুতি!

ইবলিস খিকখিক হাসতেছে দূরে
আদম নাচতে থাকে হাতপা ছুড়ে।
বলছে সে বিড়বিড়, ধেই ধেই ধিন তা
সুন্দর ছাড়া আর নেই কোনো চিন্তা।

এই ঘোরে হাওয়া বিবি
গান গায় হাবিজাবি
আর তার আদমের হাত
ধরে রাখে আলতো
তুলতুলে গালতো
এভাবেই কেটে যায় রাত।

রাত শেষে ভোর হয় অসীমের শূন্যে
গান গেয়ে ওঠে হাওয়া আদমের জন্যে।

আমি যা দেখি তা

আমাদের খুব একা একা লাগে তাই
     আমাদের এক নদীর তীরে যাই।
          ধানক্ষেত পাশে রেখে ধুধু পথরেখা
               হেঁটে যায় পাশাপাশি গল্পের লেখা।
                    আমি আর সে এক মাঠ পাড়ি দিয়ে
                         এক হতে এসেছি কাতরতা নিয়ে।
                              চুম্বনে লালা ঝরে কম্পনে বুক
                              মুখর হইয়া কথা নাচে ধুকপুক।
                         ঘন নিশ্বাসে তার বুক ওঠে-নামে
                    কাতরতা নিয়ে সে দোলে ডানে-বামে।
               আমিও কাতর তবু, দেখি কাতরতা
          আমাদের চারদিকে ছিল নীরবতা।
     আমি দুলি যেন আমি, আমি নই, আর
নত হয়ে চুমু খাই বাম পায়ে তার।
     সেজদায় নত হই, হে প্রগাঢ়
          আমারে মুগ্ধ করো তো আরও।
               তুমি যা তুমি তাই, এই তুমি জানো
                    আমি জানি, কী মায়া পৃথিবীতে আনো।
                         গোধূলির রঙে আঁকা নদীর তীরে
                              তুমিই ছিলে নীল, আমায় ঘিরে।
                              চোখে চোখ রেখে তাই মিনিট দেড়েক
                                   নিজজ্ঞানে গেঁথে নিই, বোধের পেরেক।
                                        ও পেরেক দ্যাখ দ্যাখ, কত দূরে সে
                                             আয়নার দেশে তার ঘুম ভেঙেছে।
                                        আমি যা দেখি তা বাইরে দেখা
                                   ভেতরটাকে সে রেখেছে একা।
                              একা তাই একা একা নদীর তীরে
                         বারবার কেন তবে যেতে চাই ফিরে?
                    আমাদের খুব একা একা লাগে বলে
               আমরা দুজন যাব না কোথাও চলে।
আমাদের যে নদী আছে তার কাছে
আমাদের ছায়া কেন আজও বসে আছে?
ছায়া নিয়ে নদীতীর
                     হাওয়া খায় ঝিরঝির
                                           আর আমি আর সে
                                                                দুজনেই আলসে...
একা একা থাকি তাই কথা বলি না
     ‘কী কথা তাহার সাথে’ তাই বুঝি না।
          কথা তবু ঢেউ হয়ে ছড়াতেছে বুকে
               কী আড়াল খোঁজে সে, দেখি তাই ঝুঁকে।
                    আমি চাই রক্তে আর তার কোষে
                         বুদবুদ হয়ে ঠায় থাকব বসে।
                              শুনব কান পেতে তার বোধিকথা
                                   বোধের মধ্যে থেকে উঠে আসা ব্যথা।
                                        চেয়ে থাকি চোখে তার অপলক চাউনি
                                             কী আড়াল বোধে তা বলতে চাওনি।
                                                  বলবে কেন সে? আমি তো জানি
                                                       আমাদের লিখছেন অন্তর্যামী।
আমি আর তুমি মিলে গল্পের কাহিনি
     পেরিয়ে এক হাজার আরও এক যামিনী।
          তবু কেন চেনা নয় তোমাকে আমার?
               তোমার বোধের ভেতর ইচ্ছে নামার।
                    যদি দাও অনুমতি ঘুরে আসি প্রভু
                         দেখে আসি সুন্দর, আড়ালে তবু
                              যে বলে, সে করে, সে-ই যায় ঘুমোতে
                                   আমারে পাগল করে প্রগাঢ় চুমোতে।

ধূসরতা ছায়া ছায়া

জীবনানন্দ দাশ
তুই ধূসর হইতে চাস?

ধূসরতা ছায়া ছায়া
সংসারে আবছায়া
থেকে গেলে কেউ কিছু বলতো না
এটুকুই এই ভবে আমাদের সান্ত্বনা।  

রাত্তিরে চাঁদ ওঠে গোলগাল
মুগ্ধতা ছড়িয়ে তা দেখো কাল
আজ যাও বাজারে, এই নাও ব্যাগ
কবি তাই, নেই তার সামাজিক ট্যাগ।

এই ভব সায়রে জীবনবাবু
ইঁদুরজীবন নিয়া হয়েছে আবু।

ঘোড়ার খুড়ের মতো ধুলো উড়িয়ে
নীলিমার নীল আমি দেব ছড়িয়ে।
মওলানা রুমি যদি সামনে দাঁড়ান
বিবিজান বিবিজান দুই পা বাড়ান।
জীবনের ভেতর সে আরেক জীবন
আমারে বহন কী করে তার মন?

ধূসরতা আবছায়া মুখের ছবি
আঁকতে পারি না তা, বালের কবি!

আমার মৃত্যু

রাত্রি তোমার নিকষ কালো অন্ধকারের থাবা
ভয় করি না, আমার বুকে সুরক্ষিত কাবা।

ইটের ওপর ইট সাজানো ইট মানে ঈমান
বিশ্বাসে তার দৃঢ়তা আর চরিত্রে ধীমান।

সমাজ এবং মানুষ নিয়ে আবার সামাজিক
এক মানুষের ভাঙাগড়া, এই তো নানাদিক।

রাত্রি আমি নতজানু বিনয় এবং ধ্যানে
হঠাৎ হঠাৎ ভাঙে সে ধ্যান, হঠাৎ পাওয়া জ্ঞানে।

জ্ঞান তো আছে নানারকম, বিভিন্ন তার মানে
সকল জ্ঞানের দাড়িপাল্লা সব মানুষই জানে।

রাত্রি আমার বুক পকেটে ভোরের সুর্যোদয়
দূর নীলিমার বুকেই যেন আমার মৃত্যু হয়।